ঢাকা, শনিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৮ মে ২০২৪, ০৯ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

নোবেলজয়ী লেখকের উপন্যাস

নিখোঁজ মানুষ | পাত্রিক মোদিয়ানো (৭) || অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

অনুবাদ উপন্যাস / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮৩১ ঘণ্টা, নভেম্বর ২, ২০১৪
নিখোঁজ মানুষ | পাত্রিক মোদিয়ানো (৭) || অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান অলঙ্ককরণ: মাহবুবুল হক

___________________________________

‘নিখোঁজ মানুষ’ [মিসিং পারসন, ১৯৭৮] এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেওয়া পাত্রিক মোদিয়ানোর ষষ্ঠ উপন্যাস। যুদ্ধ মানুষকে কতটা নিঃসঙ্গ, অনিকেত, আত্মপরিচয়হীন, অমানবিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে, এটি হয়ে উঠেছে তারই চমকপ্রদ আলেখ্য।

‘রু দে বুতিক অবসক্যুর’ শিরোনামে ফরাসি ভাষায় লেখা উপন্যাসটির নামের আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘অন্ধকার বিপনীর সড়ক’। ড্যানিয়েল ভিসবোর্ট ১৯৮০ সালে এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এর প্রধান চরিত্র ডিটেকটিভ গাই রোলান্দ। রহস্যময় একটা দুর্ঘটনার পর স্মৃতিভ্রষ্ট গাই তার আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে নামে। ধীরে ধীরে তার সামনে উন্মোচিত হতে থাকে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা প্যারি কব্জা করে নিলে বন্ধুদের কাছ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নিখোঁজ হয়। বন্ধুরাও নানা দিকে ছিটকে পড়ে। সমগ্র উপন্যাসটি সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আসলে নিখোঁজ মানুষের গল্প। ১৯৭৮ সালে উপন্যাসটি অর্জন করে প্রি গোঁকুর্ত পুরস্কার। পাঠকদের উপন্যাসটি পাঠের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এখানে উল্লেখ্য যে, এর আগে মদিয়ানোর কোনো লেখা বাংলায় অনূদিত হয়নি। ফরাসি উচ্চারণ এবং কিছু বাক্যাংশের অর্থ উদ্ধারে সাহায্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফরাসি ভাষার অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য। - অনুবাদক
___________________________________

৬ষ্ঠ কিস্তির লিংক

স্তিওপ্পা হাঁটতে হাঁটেতে কয়েক পা এগিয়ে গেছেন। তিনি আসলে পথের শেষে নন, ফুটপাতের ওপরই দাঁড়িয়ে পড়েছেন। সোনালি চুলের হ্যাট পরা সেই নারী, কালো শাল পরা বাদামিচুলের রমণী, মঙ্গোলীয় চক্ষুবিশিষ্ট টাকমাথার ভদ্রলোক এবং আরও দুজন পুরুষের একেবারে মাঝখানে দেখতে পাচ্ছি তাকে।

এরকম মুহূর্তেই আমি রাস্তার এপার থেকে ওপারে চলে এলাম এবং পেছন ফিরে তাদের খুব কাছে এসে দাঁড়ালাম। কোমল রুশ ভাষার কথপোকথনে চারদিকের বাতাস তখন পরিপূর্ণ। আমি অবাক হইনি এই অনুরণিত ভাষার মধ্যেই বেজে ওঠা একটা গভীর সুরেলা কণ্ঠস্বর হচ্ছে স্তিওপ্পার। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। সৈনিকের হ্যাট পরা রমণীকে দীর্ঘ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। মনে হলো তাকে প্রায় ঝাঁকুনি দিচ্ছেন আর তারা উভয়েই বেদনার ভারে মুহ্যমান। একইভাবে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তিনি ন্যাড়ামাথার মোটা লোকটাকে দেখলেন এবং তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন। মনে হলো, তাদের বিদায়ের সময় আসন্ন। আমি দৌড়ে ট্যাক্সিতে ফিরলাম এবং লাফ দিয়ে তাতে উঠে পড়লাম।

“তাড়াতাড়ি করো... সোজা চলো... রাশান চার্চের সামনে যেতে হবে...”
স্তিওপ্পা তখনও তাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
“তুমি নেভি ব্লু পোশাক পরা লোকটাকে দেখতে পাচ্ছ?”
“হ্যাঁ। ”
“যদি সে গাড়িতে যায়, আমরা তাকে ফলো করবো। ”
ড্রাইভার আমার দিকে ঘুরে তাকালো, তার নীল চোখ তখন বিস্ফারিত।
“ব্যাপারটা নিশ্চয়ই মারাত্মক কিছু নয়, স্যার। ”
“কোনো চিন্তা করো না,” আমি বললাম।

স্তিওপ্পা ওই দলটার কাছ থেকে ততক্ষণে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছেন, কিছুটা এগিয়েছেন, না ঘুরেই সবার উদ্দেশে হাত নাড়লেন তিনি। অন্যেরা তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে দেখছেন তাকে। সৈনিকের হ্যাট পরা মহিলাটি সবার চাইতে কিছুটা আগে দাঁড়িয়ে, তার শরীরের ভঙ্গিটা ধনুকের মতো, জাহাজের সামনের দিকে খোদিত কোনো মূর্তি যেন। তার হ্যাটের একটা দীর্ঘ পালক মৃদুমন্দ বাতাসে কাঁপছে।

তিনি গাড়ির দরোজাটা খুলতে কিছুটা সময় নিলেন। আমার মনে হলো ভুল চাবি দিয়ে দরোজাটা খোলার চেষ্টা করছেন। চালকের আসনে তিনি যখন বসলেন, আমি আমার ড্রাইভারের প্রতি আরও ঝুঁকে পড়লাম। “নেভি ব্লু পরা লোকটি যে গাড়িতে উঠলেন, সেই গাড়িটা ফলো করো। ”

আমার বিশ্বাস আমি ভুল পথে এগুচ্ছি না, যদিও কোনো সূত্র নেই যার মাধ্যমে বুঝতে পারবো এই লোকটিই হচ্ছেন স্তিওপ্পা দ্য জাগোরেভ।


তাকে অনুসরণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। বেশ ধীরে গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি। পর্ত মাইওতে ট্রাফিকের লাল সতর্ক সংকেতকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেলেন। ট্যাক্সি ড্রাইভার তাকে অনুসরণ করার দুঃসাহস দেখালো না, কিন্তু খুব শিগগির আমরা মরিস-বারেসের কাছে তাকে আবার ধরে ফেললাম। একবার রাস্তা ক্রস করবার সময় আমাদের দুটো গাড়ি পাশাপাশি চলতে থাকলো। কিছুটা অন্যমনস্কভাবে তিনি একনজর আমার দিকে তাকালেন। ট্রাফিক জ্যাম থাকলে পাশাপাশি মোটর সাইকেল চালকেরা এরকমটা করে থাকেন, পরস্পরের দিকে তাকান, আমরাও তাই করলাম।

পোঁ দ্য প্যুতো এবং স্যেন নদীর কাছে অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্টের সামনে রিশার-ভালাসে তিনি তার গাড়িটা পার্ক করলেন। জুলিয়া পোতাঁ রাস্তার দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখলেন। আমিও আমার ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিলাম।

“ভালো থাকবেন,” ট্যাক্সি ড্রাইভার বললো। “সাবধানে থাকবেন ...”

আমি নিজেও যখন জুলিয়া পোতাঁ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম, বুঝতে পারলাম তার দৃষ্টি আমাকেও অনুসরণ করছে। হয়তো তার মনে হচ্ছে, আমিও কোনো মারাত্মক সংকটে পড়বো।

রাত্রি নামছে। একটা সংকীর্ণ রাস্তা, জড়ো পদার্থের মতো সারি সারি অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড়িয়ে, যে অ্যাপার্টমেন্টগুলো যুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল। রু জুলিয়া পোতাঁর দু’পাশেই সব অ্যাপার্টমেন্ট মিলিয়ে একটা একক দীর্ঘ সম্মুখদৃশ্য তৈরি হয়েছে। স্তিওপ্পা আমার সামনে মাত্র দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ঘুরে এরনেস্ত-দেলোয়াজোঁর রাস্তা ধরে এগুতে থাকলেন এবং একটা মুদি দোকানে ঢুকে পড়লেন।

সময় হলো তার সঙ্গে মুখোমুখি হবার। কিন্তু নিজের তীব্র লজ্জাবোধের কারণে আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ কঠিন হয়ে উঠলো। ভয় হলো সে হয়তো আমাকে পাগল ঠাওরাবে: আমি হয়তো তোতলাবো, কথা বলবো অসংলগ্নভাবে। খুব দ্রুত যদি সে আমাকে চিনতে না পারে, তাহলে তাকে আমার কথা বলার সুযোগ দেওয়াই ভালো।

একটা ব্যাগ হাতে তিনি মুদি দোকান থেকে বেরুলেন।
“আপনিই তো স্তিওপ্পা দ্য জাগোরেভ?”
বিস্ময়ভরা চোখে তিনি তাকালেন। আমাদের মাথা প্রায় সমস্তরে চলে এলো, ব্যাপারটা আমাকে আরও উস্কে দিল।
“হ্যাঁ, আমিই জাগোরেভ। কিন্তু আপনি কে?”

না, তিনি আমাকে চিনতে পারেননি। নিখুঁত উচ্চারণে তিনি ফরাসি ভাষায় কথা বলছেন। মনে হচ্ছে, আমার সাহসটাকে আরও একটু বাড়াতে হবে।

“আমি... আমি অনেক দিন ধরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাচ্ছিলাম... অনেক দিন ধরে...”
“কী জন্যে?”
“আমি লিখছি... দেশত্যাগ নিয়ে আমি একটা বই লিখছি... আমি...”
“আপনি কি রুশ?”

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আমি একই প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভারও আমাকে এই প্রশ্নটি করেছিল। আসলে বলতে গেলে, আমি হয়তো একজন রুশ।

(চলবে)

৭ম কিস্তির লিংক



বাংলাদেশ সময়: ১৮৩২ ঘণ্টা, নভেম্বর ২, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।