ঢাকা, শনিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৮ মে ২০২৪, ০৯ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

দার্শনিক হাইডেগারের চিন্তায় কবি হ্যোল্ডারলিন | তাপস গায়েন

অনুবাদ রচনা / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮৪১ ঘণ্টা, অক্টোবর ৩০, ২০১৪
দার্শনিক হাইডেগারের চিন্তায় কবি হ্যোল্ডারলিন | তাপস গায়েন দার্শনিক হাইডেগার / কবি হ্যোল্ডারলিন

নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধটি দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের ‘...পোয়েটিক্যালি ম্যান ডুয়েলস...’ প্রবন্ধের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ  [১] । আমি নিতান্তই অনুবাদকের ভূমিকায় থেকে গেছি; এখানে আমার নিজস্ব চিন্তার কোনো ছায়ারূপ নেই।

কিন্তু হাইডেগারের চিন্তা সঠিক অর্থে প্রকাশ করতে পেরেছি কী না সেই সংশয় থেকেই যায়; এবং যদি না পেরেই থাকি, তবে সেই অপূর্ণতার দায় একান্ত আমার নিজস্ব। আর যে কবিতাটিকে ভর করে হাইডেগার তাঁর চিন্তাকে পাঠকের কাছে হাজির করেছেন, সেই কবিতার একটি পূর্ণতর অনুবাদ, ভিন্ন সূত্র থেকে নেয়া, এখানে উপস্থিত করছি [২] । - অনুবাদক


‘...পোয়েটিক্যালি ম্যান ডুয়েলস...’ কবিতা পঙ্‌ক্তির এই ভগ্নাংশটুকু যেমন দার্শনিক হাইডেগারের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম [১], তেমনিভাবে এইটি কবি হ্যোল্ডারলিনের পরিণত জীবনের একটি কবিতা পঙ্‌ক্তির ভগ্নাংশ, যে কবিতাটি শুরু হয়েছে এইভাবে, “এই লাবণ্যময় নীলে, ধাতব ছাদে জেগেছে চূড়া, কান্না জাগে সোয়ালো (পাখির) একে ঘিরে...। ” প্রকৃত প্রস্তাবে, কী অর্থে কবিতায় মানুষের বসবাস, দার্শনিক হাইডেগার সেই অধিবিদ্যাকে বুঝতে চেয়েছেন কবি হ্যোল্ডারলিনের এই কবিতাটিকে ভর করে; কিন্তু হ্যোল্ডারলিন ছিলেন এমনই একজন কবি, যার নিজের জীবনযাপনই দুঃসাধ্য এবং অসম্ভবপর হয়ে উঠেছিল এই পৃথিবীতে। জীবন-জীবিকার সংগ্রামে পর্যুদস্ত, ভিনদেশে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত থাকাকালীন গৃহকর্ত্রীর সাথে অপূর্ণ প্রেম, দেশে ফিরে জেনেছেন প্রেমিকার অকাল মৃত্যু, এবং উন্মাদ্গ্রস্ত অবস্থায় অতিদীর্ঘ শেষ দিনগুলি নিয়েই ছিল কবি  হ্যোল্ডারলিনের জীবন এবং তাঁর অন্তিম প্রস্থান।

দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে, কল্পনার জগতে যে কবির বসবাস, সেই কবি কী অর্থে কবিতায় মানুষের বসবাস সম্ভব করে তোলেন, যখন এই ছোট্ট পৃথিবীতে আবাসনের অপ্রতুলতা একটি বাস্তবতা এবং কবিতা যখন  নিতান্তই একটি রঙিন ফানুস। এই প্রস্তাবনাকে মান্য করেই হাইডেগার যখন হ্যোল্ডারলিনের উক্ত কবিতার সূত্র ধরে ‘ডুয়েলিং(জীবনযাপন)’-কে কবিতার সমাঙ্গ করে তোলেন, তখন তিনি, প্রকৃতপক্ষে, জীবনযাপনকে—এই পৃথিবীতে মানুষ নামক সত্তার অস্তিত্বের একটি মৌল চরিত্র হিসেবে দেখতে এবং দেখাতে চান। হাইডেগার মনে করেন, কবিতাই পৃথিবীতে মানুষের বসবাসকে ‘বসবাস’ হিসেবে সম্ভব করে তোলে। জীবনযাপনের প্রকৃতি যেমন দেখিয়ে দেয় মানুষের অস্তিত্বকে, একইভাবে কবিতার প্রকৃতি জীবনযাপনকে সম্ভব করে তোলে, সেইদিক থেকে কবিতা এক বিশেষ ধরনের নির্মাণ। ‘নির্মাণ-বসবাস-চিন্তা’—এই তিনটি উপাদান হাইডেগারের কাছে প্রয়োজনীয় ভাবনার বিষয়, যার বিস্তারিত আলোচনা এখানে উহ্য রয়ে গেল। কবিতার প্রাতিস্বিকতার মধ্যেই জীবনযাপনের অনন্যতা লুকিয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ‘কবিতা কিভাবে সম্ভবপর হয়ে উঠে ?’

হাইডেগার মনে করেন, ভাষাই সার্বভৌম, মানুষ নয়; সত্তা হিসাবে মানুষ ভাষার মধ্যেই প্রকাশিত হয়ে ওঠে। ভাষার ভিতরে মানুষের বিশুদ্ধ প্রকাশ তখনই সম্ভব যখন মানুষ ভাষার সত্তার ওপরে শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং সে তখনই প্রকৃতপক্ষে  শ্রদ্ধাশীল, যখন সে ভাষার ভিতরে সত্যিকার অর্থে কান পেতে তার অন্তর্গত কথনে আস্থাশীল হয়ে ওঠে।   বিশুদ্ধ শ্রবণই কবিতার উপাদান; যত বিশুদ্ধ এই শ্রবণ, ঠিক তত বিশুদ্ধ হয় কবির উচ্চারণ, ঠিক তত বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে কবিতা।

‘...পোয়েটিক্যালি ম্যান ডুয়েলস...’ কবিতা পঙ্‌ক্তির এই ভগ্নাংশটুকু যে দুই কবিতা পঙ্‌ক্তি থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছে, এখানে তার উদ্ধৃত করছি:

উৎকর্ষতায়পূর্ণ, তবু কবিতার বৃত্তে
এই পৃথিবীতে মানুষের বসবাস।

‘কবিতার বৃত্তে’ এই শব্দবন্ধটিকে বুঝে নিতে হবে আগে ‘উৎকর্ষতায়পূর্ণ, তবু...’ এবং পরে ‘এই পৃথিবীতে’—শব্দবন্ধ-দুটির আলোকে। ‘তবু কবিতার বৃত্তে’ কবিতা-পঙ্‌ক্তির এই ভগ্নাংশটুকু ‘উৎকর্ষতায়পূর্ণ’ শব্দবন্ধটির উপরে সীমারেখা টেনে দেয়।   হাইডেগারের চিন্তায় কর্ষণ এবং পরিচর্যা—উভয়ই নির্মাণ; এই নির্মাণ যদিও বসবাস (কিংবা জীবনযাপনের) ফলাফল, এবং এই উৎপাদন ও নির্মাণ যা জীবনযাপনের উৎকর্ষতার জন্য প্রয়োজন; কিন্তু উৎকর্ষতায়পূর্ণ হয়েও বসবাস যে অর্থে প্রাতিস্বিকতাকে মূর্ত করে তোলে না, কারণ জীবনযাপনের মধ্যে প্রাতিস্বিকতার উন্মোচন এক বিশেষ ধরনের বসবাস; সেই অথেনটিক বসবাস তখনই পূর্ণ হয়ে ওঠে যখন মরণশীল সত্তা হিসেবে এই পৃথিবীতে তার বসবাস সম্ভব হয়ে ওঠে। সেই কারণেই ‘এই পৃথিবীতে’ শব্দবন্ধটি হ্যোল্ডারলিনের কবিতায় বাড়তি কোনো শব্দবন্ধ নয়, বরং একটি জরুরি অনুষঙ্গ এবং সেই অর্থেই, কবিতায় (কবিতার বৃত্তে) বসবাস আর কোনো অলীক ফানুস নয়, কারণ কবিতাই সাক্ষ্য দেয় বসবাস প্রকৃতপক্ষে এই পৃথিবীপৃষ্ঠেই মানুষের জীবনযাপন; এখানেই তার অধিষ্ঠান। এখানেই কবিতা বলে ওঠে যে কবিতা কোনো অলীক ফানুস নয়, বরং কবিতাই মানুষকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসে, তার অধিষ্ঠান দেয়, মানুষ নামক সত্তার বসবাস সম্ভব করে তোলে।

এইখানে আলোচিত হ্যোল্ডারলিনের কবিতায় আমরা চাষাবাদ কিংবা নির্মাণের উপস্থাপনা দেখি না, কিংবা কবিতা যে এক বিশেষ ধরণের নির্মাণ তার কোনও প্রসঙ্গ নেই এই কবিতায়। এটা বরং হাইডেগারের একটি চিন্তা, যে চিন্তার মধ্য দিয়ে হ্যোল্ডারলিনের কবিতাকে তিনি দেখতে আগ্রহী, কিন্তু একইসাথে হাইডেগার আমাদের সজাগ থাকতে বলেন, যেন আমরা হ্যোল্ডারলিনের কবিতায় তাঁর অনুচ্চারিত চিন্তা না ঢুকিয়ে দেই, যদিও একইভাবে দার্শনিক হাইডেগার সাক্ষ্য দিচ্ছে‌ন,  ‘উৎকর্ষতায়পূর্ণ’ জীবনযাপন ভাবনাটি একান্তভাবে হ্যোল্ডারলিনের। হ্যোল্ডারলিনের ভাবনা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ভাবনা থেকে পৃথক, তবু হয়তো বা কবিতার মধ্যে বসবাস বলতে আমাদের ভাবনায় চিন্তার যে অভিমুখ নির্দেশিত হয়, তা হ্যোল্ডারলিনের চিন্তার সাথে, বোধকরি, এক। দেখি, হ্যোল্ডারলিন এই নিয়ে আর কী ভাবছেন।

কবিতা এবং চিন্তার তখনই প্রকৃত মেইলবন্ধন হয়, যখন তারা নিজস্ব সত্তায় প্রাতিস্বিক থেকে পাশাপাশি জড়ো হয়। কারণ, সবকিছুর এক হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে নয়, বরং প্রাতিস্বিকতার মধ্য দিয়ে, একত্রিত হবার সাজুয্যেই সত্তার প্রকৃত উন্মোচন সম্ভব। হ্যোল্ডারলিনের চিন্তায় কী সেই, ‘কবিতার বৃত্তে বসবাস?’ এই কবিতার চব্বিশ থেকে আটত্রিশ নম্বর পঙ্‌ক্তির মধ্যে কান পেতে শুনতে হবে তার উত্তর।

‘উৎকর্ষতায়পূর্ণ’ তবু কবিতায় জীবনযাপন সম্ভব, যদি সে কঠোর পরিশ্রমের জীবন থেকে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়, এবং দেখে বেহেশ্তকে। এই পৃথিবীতে দাঁড়িয়েই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ আছে উপরে আকাশ আর নিচে পৃথিবীর দিকে, এবং সে মেপে নিচ্ছে আকাশ এবং পৃথিবীর অন্তর্বতী ব্যাপ্তিকে, এই অন্তর্বতী ব্যাপ্তির পরিমাপ সম্ভব হচ্ছে জীবনযাপনের শর্তে; আর এই সেই ব্যাপ্তি যা কবিতাকে সম্ভব করে তোলে।   এবং এই সেই মাপ যার ভিতর দিয়ে সে বেহেশ্তের বিপ্রতীপে, অর্থাৎ যা কিছু স্বর্গীয়, তার সাথে নিজেকে মাপছে। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ তখনই মানুষ হয়ে ওঠে যখন সে নিজেকে কোনো স্বর্গীয় সত্তার সাথে (কিংবা তার বিপ্রতীপে) তুলনা করে এবং নিজের পরিমাপ জেনে নেয়। এই ‘গডহেড = স্বর্গীয় সত্তা’ হচ্ছে সেই ‘পরিমাপক’ যা দিয়ে সে এই পৃথিবীতে, অর্থাৎ এই আকাশের নিচে এবং পৃথিবীর উপরে ব্যাপ্ত নিজের জীবনযাপনকে মাপছে, দেখে নিচ্ছে নিজেকে অনবরত। কিন্তু এই পরিমাপ গজ, ফুট, কিংবা মিটারে নির্ধারিত জ্যামিতি নয় কিংবা নয় কোনো বিজ্ঞান, বরং এইটি এমনই এক পরিমাপ, যা বেহেশ্ত এবং পৃথিবী—এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যাপ্তিকে মাপছে, এবং মাপছে সেই প্রক্রিয়াকে যা এই আকাশ আর পৃথিবীকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসে। যে প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে, যে জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে, এই পৃথিবী এবং আকাশ নিকটবর্তী হয়ে ওঠে, সেই হলো কবিতার বৃত্তে জীবনযাপন। কবিতাই তখন পরিমাপক! কিন্তু কী মাপছে এই কবিতা?

কবিতায় সকল পরিমাপ শেষ পর্যন্ত সক্রিয় আছে সত্তার আনুভূমিক ভূমিতে, অর্থাৎ মানুষ নামক সত্তার পরিমাপ গ্রহণে। কবিতা লেখাই হলো এক বিশেষ ধরনের পরিমাপ, যার মধ্য দিয়ে কবি জেনে যায় তার সত্তার ব্যাপ্তি। মানুষ মরণশীল, অর্থাৎ মানুষ মরতে জানে। যতক্ষণ সে এই পৃথিবীতে আছে, মৃত্যুকে সে মৃত্যু হিসেবে গ্রহণ করতে জানে, ততক্ষণ এই পৃথিবীতে তার জীবনযাপন কবিতার মধ্যেই নিহিত থাকে। ‘পোয়েটিক’ হলো সেই এক পরিমাপ, যার মধ্য দিয়ে মানুষের পরিমাপ সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সে এই পরিমাপ নেয় কোন এক দিব্যসত্তার বিপ্রতীপে। কিন্তু ঈশ্বর কি অজ্ঞেয়? জানা যাকে যায় না, এমনই ঈশ্বর ছিল হ্যোল্ডারলিনের; কবির কাছে সেই ঈশ্বরই আরাধ্য—এমনই প্রত্যয় রেখেছেন দার্শনিক হাইডেগার। যদি তাকে জানাই না যায়, তবে ঈশ্বরের বিপ্রতীপে সেই পরিমাপ কিভাবে সম্ভব? রহস্যময় এই ঈশ্বরকে নিয়ে হ্যোল্ডারলিন, তদুপরি,  প্রশ্ন রাখেন, ঈশ্বর কি আকাশের মতো প্রকাশিত?

তখন প্রসঙ্গ আসে মানুষের পরিমাপের! কিন্তু, মানুষের পরিমাপের জন্য মাত্রা কী? তা যেমন ঈশ্বর নয়, এমন কি নয় এই আকাশের প্রকাশ।   আকাশের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের দর্শন উন্মোচন করে তাই, যা আকাশকে আবৃত করে রাখে, যা রহস্যময় তাকে অনাবৃত না করেই তা ব্যাপ্ত। প্রকাশমান এই আকাশের মধ্যে অজানাময় ঈশ্বর যেন অপ্রকাশিত থেকে যান। এর উদ্ভাসই মানুষের পরিমাপ। কবিতা সেই অর্থেই পরিমাপক, যা এই পৃথিবীতে, তা উৎকর্ষতায়পূর্ণ হয়েও মানুষের জীবনযাপনকে সম্ভব করে তোলে। ‘(পৃথিবীর) উপরে’ এবং ‘(আকাশের) নীচে’ একে অপরের সাথে অন্বিষ্ট হয়ে আছে। তাদের মধ্যে নিরন্তর চলাচল হলো সেই ব্যাপ্তি যা মানুষ মরণশীল সত্তা হিসেবে নিয়তই অতিক্রম করে চলছে।   ভিন্ন কোনও এক কবিতার খণ্ডাংশে হোল্ডারলিন বলেন:

                                 আহা, ভালোবাসা অনুক্ষণ, যা  করে রাখে 
                                 পৃথিবীকে গতিশীল এবং ধরে রাখে স্বর্গকে

এইখানে আসে সেই পরিমাপের প্রসঙ্গ! কিন্তু কবিতার পরিমাপ কী? “উৎকর্ষতায়পূর্ণ, তবু কবিতার বৃত্তে এই পৃথিবীতে মানুষের বসবাস...” অগ্রসর হতে থাকে এইভাবে

                                 ঈশ্বরের আদলে মানুষের অবয়ব থেকে
                                 নক্ষত্রময় রাতের ছায়া অধিক পরিচ্ছন্ন নয়।

‘রাতের ছায়া’—রাত নিজেই তো ছায়া; আঁধার নিতান্তই আঁধার নয়; কারণ, আলো আর অন্ধকার মিলেমিশে যে ছায়ার নির্মাণ করে, আলো সেই ছায়াকে বিম্বিত করে মাত্র। সকাল এবং সন্ধ্যার আকাশের আলোর বিচ্ছুরণ সবকিছুকেই রহস্যময় করে রাখে। সুতরাং, কবি প্রশ্ন রাখেন:
   
                                 কিছুই কি নেই এই পৃথিবীর পরিমাপ?

এবং তিনি অবশ্যই উত্তর দেন, ‘কিছুই নেই। ’ কারণ কী? কারণ হলো এই যে মানুষের এই পৃথিবীতে বসবাসের মধ্য দিয়েই সে এই পৃথিবীকে পৃথিবী করে তোলে। আর কবিতা হলো সেই বসবাসের বৃত্তে প্রবেশ। অর্থাৎ, কবিতা এবং জীবনযাপন একে অপরকে আবাহন করে। কবিতার কোনো এক ছত্রে কবি লেখেন, “রাজা ঈদিপাশের একটি চোখ মূলতঃ অনেক। ” তেমনিভাবেই, আমাদের অকাব্যিকভাবে বসবাস, এবং তাকে না মাপতে পারার অক্ষমতা আসলে উদ্ভুত হয়েছে উন্মত্ত হিসাব এবং মাপজোকের ভিতরে!

কিন্তু কিভাবে জন্ম নেয় অথেনটিক কবিতা; কখন এবং কতক্ষণ থাকে এই বিশুদ্ধ কবিতা! কবিই উত্তর দেন, “...যতক্ষণ কারুণ্য আর বিশুদ্ধি তাঁর হৃদয়ের সাথে থাকে/ যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষ নিজেকে আনন্দহীনভাবে ঈশ্বরের সাথে মাপে” ততক্ষণ পর্যন্ত  বোধকরি বিশুদ্ধ কবিতা সম্ভব।

যখন এই পরিমাপ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তখন পোয়েটিকের অন্তর্গত সত্তা থেকে মানুষ কবিতা লেখে; যখন কবিতা পূর্ণ আলোয় পাখা মেলে ধরে, তখন মানুষ মানবিক শর্তে এই পৃথিবীতে বসবাস করে, জীবনযাপন করে!

নিচের কবিতাটি সম্ভবত হ্যোল্ডারলিনের লেখা শেষ কবিতা, ‘মানুষের জীবন’ প্রকৃতই ‘এক যাপিত জীবন। ’
 
অতিদূর দিগন্তে মানুষের যাপিত জীবন ধাবমান;
সেইখানে, আঙ্গুরের কাল উজ্জ্বল দীপ্তিমান
গ্রীষ্মে পরিত্যক্ত মাঠ, পড়ে আছে শষ্যহীন শূন্য
বনবীথি পরিব্যাপ্ত, তার কৃষ্ণকায়া প্রতিকৃতি দৃশ্যমান।
প্রকৃতি আঁকে, পূর্ণতায় উদ্ভাসিত ঋতুর অবয়ব;
সে মান্য করে, কিন্তু কী ধীরতায় চলে যায়
যেন পূর্ণতারই অবয়ব; সেইক্ষণে বেহেশ্তের দীপ্তিময় উচ্চতা
অভিষিক্ত করে মানুষকে, যেভাবে আলোয় পরিশুদ্ধ পুষ্প করে বৃক্ষকে।

ইন লাভলি ব্লু [২]
ফ্রেডারিক হ্যোল্ডারলিন

এই লাবণ্যময় নীলে, ধাতব ছাদে  জেগেছে চূড়া,
কান্না জাগে সোয়ালো (পাখির) একে ঘিরে, আর তার চতুর্দিকে
জেগেছে নীল, সবচে মধুর। সূর্য, মাথার উপরে,
তপ্ত করে তুলে টিনের ছাদ, কিন্তু বাতাস গভীরে
ডাকে [আবহাওয়া সংকেতের] নিঃশ্চুপ মোরগ।
কেউ  যখন নেমে আসে গির্জাঘণ্টির খুপরি থেকে, সে তো
বিম্বিত করে এক স্থবির জীবন। যদিও সে এক কিম্ভুত আকার
কিন্তু শেষাবধি সে তো মানুষেরই অবয়ব। যে জানালা দিয়ে
গির্জাঘণ্টির ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়, সে তো অবারিত করে সৌন্দর্যের দরোজা।
প্রকৃতির দিকে উন্মোচিত এই পথ অনুকৃতি এক অরণ্যবৃক্ষের
সারল্য, সেও তো সুন্দর। বস্তুর বিচিত্র সজ্জা থেকে মনের গভীরে
জেগে ওঠে এক অদ্ভুত মানস। এতো পবিত্র, এতো সারল্যের
এইসব রূপকল্পনা যে ভীতি জাগে মনে এইসব আশ্চর্য বর্ণনায়।
কিন্তু আছেন যারা, দেবতারা,  দয়ালু সকল কিছুর প্রতি, তারা
সততায় উজ্জ্বল এবং আনন্দে মুখর,
মানুষ হতে পারে অনুকরণপ্রিয় এইসবকিছুর।
কঠোর পরিশ্রমের জীবন থেকে মুখ তুলে
আকাশের দিকে চেয়ে যেন 
সে বলতে পারে: আমিও কি হয়ে উঠবো
এইসবকিছুর মতো? অবশ্যই তাই। করুণা  যতক্ষণ স্থায়ী
হৃদয় যার স্বচ্ছ্ব, তিনি কি নিজেকে পরিমাপ করতে পারেন
বেহেশ্তের প্রেক্ষিতে? ঈশ্বর কি অজ্ঞাত?
তিনি কি প্রকাশিত আকাশের মতো? আমি আগ্রহী অন্তত
এই বিশ্বাস করতে। এইরূপই তো  মানুষের পরিমাপ।
উৎকর্ষতায়পূর্ণ, তবু কবিতার বৃত্তে
এই পৃথিবীতে মানুষের বসবাস। যদি সম্ভব, তবে বলে রাখি
ঈশ্বরের আদলে মানুষের অবয়ব থেকে
নক্ষত্রময় রাতের ছায়া নয় অধিক পরিচ্ছন্ন।
এই পৃথিবীতে কি তার কোনো স্থিরতা আছে? কিছুই নেই।
ঈশ্বরের এই গ্রহে কিছুই করে না রুদ্ধ বজ্রের করতালি
ফুল সেও সুন্দর, কারণ সে ফুটেছে সূর্যের প্রচ্ছায়ায়।
চোখ প্রায়শই জেনেছে ফুলের থেকে এইসব প্রাণী সুন্দর
বিশেষভাবে এইসব জেনেছি আমি।
শরীর এবং হৃদয়ে রক্তক্ষরণ এবং পূর্ণতার থেকে নাস্তি
এইসব কি ঈশ্বরকে করে প্রসন্ন? আত্মাকে হতে হবে শুদ্ধ
অন্যথায় হাজারো পাখির কণ্ঠস্বর এবং গানের প্রশংসা নিয়ে
ঈগল উড়ে যাবে সর্ব্বশক্তিমানের দিকে।
এইতো বস্তু, এইতো আকৃতি। কী সুন্দর, ক্ষীণ এই জলস্রোত
কী আচ্ছন্নতায় বেঁধে রাখো, যখন বয়ে যাও ক্ষীণতোয়া তুমি,
ছায়াপথ দিয়ে প্রবাহিত পরিশুদ্ধতায় যেন ঈশ্বরের চোখ
তোমাকে জেনেছি আমি; কিন্তু আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জল।
পরিচ্ছন্ন জীবন, আমারই চারিপাশে জীবনের আকৃতি নিয়ে ফুটে ওঠে
সমাধিক্ষেত্রে নির্জন কবুতরের সাথে আমি তুলনা করি না এইসবকিছুর
আমাকে আহত করে মানুষের তিরষ্কার, কারণ শেষাবধি
আমারও আছে হৃদয়! আমি কি হতে চাই ধূমকেতু? আমি তাই জেনেছি।
পাখির মতো ক্ষিপ্র, আগুনের মতো তার প্রস্ফুটন, সরলতায়
তারা শিশুদের মতো।
এর অধিক আকাঙ্ক্ষা মানুষের আয়ত্তের বাইরে।
সততার সারল্য দাবি রাখে প্রশংসার, গম্ভীর অনুভূতি থেকে
উৎসারিত হয়ে যা ধাবমান বাগানের তিন স্তম্ভের মধ্য দিয়ে
কুমারী বাঁধবে তার চুল চিরহরিৎ গুল্মে,
প্রকৃতি এবং অনুভবে যিনি সাধারণ; গ্রীসে জন্মেছে এই গুল্ম
যদি কোনো দর্পণে তাকায় মানুষ
এবং সেখানে দেখে তার প্রতিবিম্ব, যেন
তার নিজস্ব অবয়বে সে হয়েছে চিত্রিত
চোখ আছে মানুষের প্রতিবিম্বের,
কিন্তু চাঁদের আছে আলো।
রাজা অউদিপাসের আছে একটি চোখ, অজস্র অনেক
এই মানুষটির কষ্ট বর্ণনাতীত,
প্রকাশাধিক, এবং কথন উত্তীর্ণ। যখন নাটকীয়তা
এইরূপে প্রতিভাত, হোক সে তখন এইরূপে প্রকাশিত।
কী আমার অনুভবে আসে, যখন আমি ভাবি তোমাকে?
ঝর্ণার মতো কোনো কিছুর অবশেষ আমাকে বয়ে নিয়ে যায়
যা এশিয়ার মতো বিস্তৃত। এই রকম কষ্ট পেয়েছেন রাজা অউদিপাস!
কারণ কি ছিল একইরকম? হারকিউলিস এইরকম যন্ত্রণা সয়েছেন?
অবশ্যই! তাঁদের বন্ধুত্বে ডায়স্কুরী কি যন্ত্রণা পান নি!
ঈশ্বরের সাথে দ্বন্দ্ব, জন্ম দেয় কষ্টের, যেমন করেছেন হারকিউলিস
জীবনের ঈর্ষার মধ্যে অবিনশ্বরতার বিভাজনও
জন্ম দেয় কষ্টের। গ্রীষ্মের রৌদ্রে-উদ্ভুত রক্ত-রঞ্জিত বিন্দুর সমাহার
যখন ফুটে ওঠে কোনো এক ব্যক্তির  মুখে, সেও তো কষ্টের।
এই তো সূর্যের কাজ, যা প্রতিটি বস্তুকে করে নিরাভরণ
সূর্যের আলোয় গোলাপ যেভাবে প্রণোদিত,
সেইভাবে উজ্জীবিত যুবকেরা খুঁজে নিক তাদের পথ
অউদিপাসের যন্ত্রণা যেন কোনো এক হত দরিদ্রের
যা নেই যেন তারই জন্য বিলাপ।
লাইওসের সন্তান, গ্রীসের জীর্ণ আগন্তুক,
জীবন মৃত্যুর সমাঙ্গ, এবং  মৃত্যু জীবনের।

তথ্যপঞ্জী
[1] Poetry, Language, Thought/ Martin Heidegger ;  Translated and introduction  by Albert Hofstadter; Harper & Row, 1971.
[2] Hymns and Fragments/ Friedrich Holderlin; Translated and introduced by Richard Sieburth; Princeton University Press, 1984.



বাংলাদেশ সময়: ১৮৩০ ঘণ্টা, অক্টোবর ৩০, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।