ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২১ মে ২০২৪, ১২ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিদিনের ধারাবাহিক

টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (২৯) || অনুবাদ: আলীম আজিজ

অনুবাদ উপন্যাস / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬৩৮ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৯, ২০১৪
টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (২৯) || অনুবাদ: আলীম আজিজ অলঙ্করণ: মাহবুবুল হক

___________________________________

এর্নেস্তো সাবাতো (২৪ জুন ১৯১১-৩০ এপ্রিল ২০১১) আর্জেন্টাইন লেখক এবং চিত্রকর। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন লিজিওন অফ অনার, মিগুয়েল দে সেরভেন্তেস পুরস্কার।

এছাড়াও তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জগতের বেশ প্রভাবশালী লেখক। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনের এল পায়েস—তাঁকে উল্লেখ করেন ‘আর্জেন্টিনাইন সাহিত্যের শেষ ধ্রুপদী লেখক’ বলে।
‘এল তুনেল’ (১৯৪৮), ‘সবরে হেরোস ইয়া টুম্বাস’ (১৯৬১), ‘অ্যাবানদন এল এক্সতারমিনাদোর’ (১৯৭৪) তাঁর জগদ্বিখ্যাত তিন উপন্যাস।
___________________________________

২৮তম কিস্তির লিংক

স্বভাবতই, ও যেহেতু আলেন্দেকে বিয়ে করেছে, এটা খুবই যৌক্তিক যে ওই লোকের প্রতি এক সময় ওর কোনো না কোনো ধরনের অনুভূতি ছিল। আর আমাকেও মানতেই হবে যে এটা একটা সমস্যা, এবং এই সমস্যা অন্য অনেক সমস্যার মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, কাজেই একে ‘আলেন্দে সমস্যা’ বলাই শ্রেয় হবে। এছাড়া আরও অনেক বিভ্রান্তি আছে যার ব্যাখ্যা হওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে এই দুটো। ও কি একসময় আলেন্দেকে ভালোবাসত? ও কি এখনও তাকে ভালোবাসে? এই প্রশ্ন দুটোকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নাই; কারণ এগুলো অন্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। ও যদি আলেন্দেকে ভালো না বাসে, তাহলে ও কাকে ভালোবাসে? আমাকে? হান্তেরকে? ওই রহস্যময় টেলিফোনকারীদের কাউকে? নাকি বিভিন্নজনকে— কোনো কোনো পুরুষ এরকম করে— ওর মতো করে ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় ও ভালোবাসে তাদের? আবার এটাও খুব সম্ভব যে ও আসলে কাউকেই ভালোবাসে না, আর সে কথাই ও আমাদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বলার চেষ্টা করে—বোকার হদ্দ, নিরপরাধ বোকারহদ্দ—আমরাই হলাম ওই গাধার দল, আর অন্যরা স্রেফ ছায়ামাত্র, যাদের সঙ্গে ওর সর্ম্পক ওপর ওপর কিংবা নিশ্চিত ভালোবাসার সর্ম্পক।

শেষে আমি একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, আলেন্দে সমস্যা ঝেড়ে ফেলতে হবে। মারিয়া ওই লোকটাকে কেন বিয়ে করেছে এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলাম আমি।
‘আমি ওকে ভালোবাসতাম,’ জবাব দিল ও।
‘তাহলে এখন কি তুমি ওকে ভালোবাসো না?’
‘আমি ভালোবাসি না এ কথা তো বলিনি,’ জবাব দিল ও।
‘তুমি বলেছ, “আমি ওকে ভালোবাসতাম” তুমি বলোনি, তুমি ওকে ভালোবাসো। ’
‘তুমি সব সময়ই আমার কথা নিয়ে প্যাঁচাও, আর অর্থ বিকৃত করো,’ প্রতিবাদ জানাল মারিয়া। ‘আমি যখন বললাম আমি ওকে বিয়ে করেছি কারণ ওকে আমি ভালোবাসতাম, কিন্তু আমি তো বলিনি ওকে এখন আমি ভালোবাসি না। ’
‘ওহ্, তাহলে বলছ ওকে তুমি ভালোবাসো,’ আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম দ্রুত, যেন আগের প্রশ্নের জবাবে যে ও মিথ্যা বলেছে তা প্রমাণ হয়।
মারিয়া আর কোনোরকম উত্তর করল না, তাকে পরাস্ত দেখাচ্ছে।
‘তুমি জবাব দিচ্ছ না কেন?’
‘কারণ উত্তর দেওয়ার কোনো মানে দেখছি না। এর আগেও অসংখ্যবার আমরা এই একই বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি। ’
‘না, অন্যবারের চেয়ে এবারেরটা আলাদা। আমি জানতে চেয়েছিলাম তুমি আলেন্দেকে এখনও ভালোবাসো কিনা, তুমি বলেছ হ্যাঁ। কিন্তু আমার মনে পড়ছে এটা খুব বেশি আগের কথা না, বন্দরে, তুমি আমাকে বলেছিলে আমিই প্রথম ব্যক্তি যাকে তুমি ভালোবেসেছো। ’

মারিয়া আবারও নিরুত্তর থাকল। ওকে আমার বিরক্তিকর লাগছে সেটা শুধু যে ওর পরস্পরবিরোধী কথা, তার জন্য না— ওর মুখ থেকে কোনো কিছুই বের করা প্রায় অসম্ভব।
‘এর কোনো জবাব আছে তোমার কাছে?’ বললাম আমি।
‘ভালোবাসার কিংবা কাউকে পছন্দ করার অনেক ধরন আছে,’ ক্লান্ত গলায় জবাব দিল ও। ‘তুমি হয়তো ভাবছ যে বছরখানেক আগে আমাদের বিয়ের সময় আলেন্দেকে আমি যে রকমভাবে ভালোবাসতাম, তুমি কেন ধরে নিচ্ছ এখনও সেই একই রকমভাবে ওকে আমি ভালোবাসি। ’
‘তাহলে এখনকার এটা কোন রকমের?’
‘কোন রকম” মানে কী? তুমি ভালো করেই জানো আমি কী বলতে চেয়েছি। ’
‘না, আমি কিচ্ছু জানি না। ’
‘আমি বার বার তোমাকে বলেছি। ’
‘তুমি হয়তো বলেছ, কিন্তু তুমি কখনই পরিষ্কার করে কিছু বলোনি। ’
‘পরিষ্কার করে বলিনি?’ হঠাৎ তেতো গলায় বলে উঠল ও। ‘তুমি আমাকে হাজারবার বলেছ যে সব কিছু ব্যাখ্যা করা যায় না, এখন তুমিই আমাকে এরকম জটিল একটা বিষয় ব্যাখ্যা করার জন্য চাপ দিচ্ছ। আমি তোমাকে এক হাজারবার বলেছি আলেন্দে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, ভাইয়ের মতো ভালোবাসি ওকে আমি, ওর দেখাশোনা করি, ওকে আমি যথেষ্ট স্নেহ করি, ওর প্রশান্ত স্বভাবকে আমি অসম্ভব শ্রদ্ধা করি, সব দিক থেকেই ও আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যে কারণে ওর সঙ্গে তুলনা করতে গেলে নিজেকে আমার ঘেন্না লাগে, অপরাধী মনে হয়। কাজেই তুমি কী করে ভাবো যে ওকে আমি ভালোবাসি না?’
‘তুমি ওকে ভালোবাসো না এটা আমি বলিনি। তুমিই বলেছিলে ওকে বিয়ে করার সময়ের পরিস্থিতি আর এই পরিস্থিতি এক না। হয়তো সে কারণেই আমি ধরে নিয়েছিলাম তুমি যখন ওকে বিয়ে করেছিলে তখন তুমি ওকে ওইরকমভাবেই ভালোবাসতে এখন আমাকে যেমন বাসো। কিন্তু এটাও মনে আছে কিছুদিন আগে বন্দরে তুমিই আমাকে বলেছ যে আমিই প্রথম ব্যক্তি যাকে তুমি সত্যিকার অর্থে ভালোবেসেছো। ’

মারিয়ার চোখে দুঃখ ফুটে উঠল।
‘ঠিক আছে এই অসঙ্গতিকে আমরা আমলে না নেই,’ আমি বলে চললাম। ‘কিন্তু আলেন্দের আলাপে ফিরে আসি। তুমি বললে তুমি ওকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসো। আমি তোমার কাছে এখন একটা প্রশ্নের জবাব চাই: তুমি ওর সঙ্গে শুয়েছো?’

মারিয়ার অভিব্যক্তিতে আরও দুঃখ ঘনালো। জবাব দেওয়ার আগে কিছু সময় চুপ করে বসে থাকল সে, আর তারপর কান্নার গলায় জিজ্ঞেস করল:
‘আমাকে এই প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে?’
আমার কঠিন গলা। ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। ’
‘আমাকে এ রকম প্রশ্ন করা তোমার জন্য ভয়ঙ্কর হচ্ছে। ’
‘ব্যাপারটা খুবই সোজা: তুমি হ্যাঁ, অথবা না বলো। ’
‘উত্তরটা এতো সোজা না: তোমার সর্ম্পক থাকতে পারে...’
‘ঠিক আছে,’ আমি শীতল গলায় উপসংহার টানলাম। ‘তারমানে তুমি ওটা করো। ’
‘হ্যাঁ! করি। ’
‘তারমানে তুমি ওর সঙ্গে শোও। ’

(চলবে)

৩০তম কিস্তির লিংক



বাংলাদেশ সময়: ১৬৩৮ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৯, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।