ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২১ মে ২০২৪, ১২ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

জুতো এবং একজন তীরন্দাজ | প্রজ্ঞা মৌসুমী

গল্প / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬৩৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৯, ২০১৪
জুতো এবং একজন তীরন্দাজ | প্রজ্ঞা মৌসুমী ইলাস্ট্রেশন: কেলসি ম্যাকন্যাট

রেহনুমার সঙ্গে দেলোয়ার আর সানজিদার প্রথম পরিচয় জুতোর দোকানে। খুব মনোযোগ দিয়ে এক জোড়া বুটজুতো দেখছে—মিড হাইট হিল, চকচকে লেদার, এক পাশে জিপার।

কোথাও পড়েছিল—এই হাই হিলের জন্ম হয়েছিল যুদ্ধের প্রয়োজনে। এরপর থেকে হাই হিল চোখে পড়লেই মনে আসে একটা চকচকে লালচে ঘোড়া আর এক বেপরোয়া তীরন্দাজ—হাই হিল পরে রেকাবে দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে যাচ্ছে। সেই তীরন্দাজ যেন রেহনুমা নিজেই; ছুটছে আর ক্রমাগত তীর ছুঁড়ে যাচ্ছে ঈশ্বরের দিকে, জীবনের দিকে...

ভাবতেই ভাবতেই শুনতে পেল ‘স্লামালিকুম’। মাঝে মাঝে এইসব ট্যাগ নিয়ে ঝুলতে ভালো লাগে না রেহনুমার। একটা মানুষের দিকে একবার তাকিয়ে তার জীবনের অর্ধেকটাই কত অনায়াসে বলে দেয়া যায়! পরের শুক্রবার আবারো ওদের সঙ্গে দেখা, সেদিনও জুতোই দেখছিল রেহনুমা। তবে ওরা আর এগিয়ে এলো না, রেহনুমাও ডাকেনি। হয়তো থ্রিফট স্টোরে মুখোমুখি হওয়ায় খানিকটা অস্বস্তি কাজ করে। সেই থেকে রেহনুমা—সংকোচে জুতোর দোকানে যেতে পারছে না আর, যদি আবার দেখা হয়ে যায়—এই আশঙ্কায়। কাকতালীয়কে নিশ্চিত ভাববার মতো কুসংস্কার তার বরাবরই ছিল। একবার নীল কালিতে ফিজিক্স পরীক্ষা দিয়ে খারাপ করেছিল বলে আর কোনোদিন নীল কালিতে কোনো পরীক্ষা দেয়নি ও। আরেকবার, টানা তিন রবিবার খারাপ খবর আসায় রবিবার এলে এখনও বিপদের আশঙ্কায় মনে মনে ‘দোয়া ইউনুস পড়তে থাকে ও। খারাপকে এড়িয়ে যাওয়ার এত চেষ্টা—অথচ খারাপ সময় যেন কাটতেই চায় না ওর।

দু’মাস হলো রেহনুমা এক জোড়া জুতো খুঁজছে। শখের বশে নয়, খুব দরকার। চাই বলে কিছু কেনার বিলাসিতা ভাসান দিয়েছে সে তো অনেক কাল। আজকাল প্রয়োজনের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হয়। ডান পায়ের জুতোর একটা দিক ছিঁড়ে গেছে, হাঁটতে গেলেই পা ফসকে যায়; দ্রুত রাস্তা পেরুনোর সময় মনে হয় আজই বুঝি গেল! আর জুতোর গোড়ালীর তলায়, ছোট ফোকরে, কী করে যেন প্রতিদিন ওক গাছের শুকনো গোটা ঢুকে যায়। হাঁটতে গেলেই শব্দ হয় কট-কট, কট-কট। কাজে গিয়ে, প্রথমেই রেস্টরুমে ঢুকে কলম দিয়ে কায়দা করে গোটা বের করা নৈমিত্তিক রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনায়াসে হাঁটা যায়, কাজেও আসা যায়—এমন একজোড়া জুতোর খুব দরকার তার, যা দিয়ে নিশ্চিন্তে কয়েকটা বছর চালিয়ে নেয়া যায়। কিছু টাকা জমলেই অনায়াসে কিনে নেয়া যায় এমন এক জোড়া জুতো। বাজেটের সাথে ধস্তাধস্তি করে এই সেকেন্ডহ্যান্ডের দোকান থেকেই না হয়।

জীবন—প্রয়োজনে অথবা অপ্রয়োজনে যা কিছু টেনে নেয়, মনও কি পারে সেগুলোই নির্বিঘ্নে টেনে নিতে? কখনো কখনো একটু বেহিসাবি হতেও ইচ্ছে করে রেহনুমার। এক জোড়া জুতো হবে—যেটা পরলে বেঢপ লম্বা দেখাবে না, আবার খাটোও নয়। এমন এক জোড়া জুতো যা পরে পায়ের উপর পা তুলে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসবে অথবা মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলেই সামনে চেয়ার টেনে ক্লান্ত পা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে লম্বা করে হেলান দেবে। কখনো সখনো গোপন ভাবনায়, ইকরামের কাঁধ বরাবর দাঁড়িয়ে খানিকটা গর্ব হবে। তারপর সিনেমার গল্পের মতো দুজন ঘরময় নেচে বেড়াবে। আচমকা ইকরাম তাকে কোলে তুলে নেবে। রেহনুমা খুশি, লজ্জা আর ভয় মেশানো গলায় বলবে, ‘এই ছাড়ো, ছাড়ো লক্ষ্মীটি... পড়ে যাবো তো। ’

লম্বা মেয়েদের প্রতি গোপন দুর্বলতা ছিল ইকরামের, অন্তত রেহনুমার তা-ই মনে হতো। রেহনুমা দেখেছে, দু’বার ইয়াসিনের বিয়ের জন্য মেয়ের খোঁজ আনলে, ইকরামের প্রথম প্রশ্ন ছিল—‘আচ্ছা, মেয়ে লম্বাতো?’  নিজের বাড়িতেও রেহনুমা এমন দেখেছে, বড় জ্যাঠু বলতো ‘লম্বাদের একটাই দোষ—ওরা লম্বা, আর খাটোদের হাজারটা দোষ। ’ ছোট ফুপু পিয়াসী খানম—রেহনুমাকে তার ছেলের বউ করেননি হয়তো খাটো বলেই আর পাশাপাশি একারণে যে সে খুব-একটা সুন্দরীও নয়। তবে তিনি রেহনুমার ছোট বোন পারুকে চেয়েছিলেন। পারু—যার নয়ন জুড়ানো রূপ; চৌষট্টি দশমিক আট ইঞ্চির এক নয়ন জুড়ানো লকলকে রজনীগন্ধা। আহা, রেহনুমার মেঝো ননদ ইলা—ছবি দেখে দুষ্টুমি করে বলেছিল ‘আগে জানলে তো একেই ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতাম। ’ শুনে ইকরাম এতটুকু রাগ করেনি বরং রেহনুমার মনে হয়েছিল—ওর চোখ যেন চকচক করে উঠলো, আকাশে যেমন দু-একবারের জন্য অনেকটা জ্বলে ওঠে তারা। কিংবা পাশের বাড়ির জাহানারা ভাবীকে নিয়ে ইকরামের যে উচ্ছ্বাস, রেহনুমার চোখে যাকে উচ্ছ্বাস বলেই মনে হতো, কই তাকে নিয়ে সেরকম উচ্ছ্বাস তো কোনোদিন দেখেনি সে। জাহানারা ভাবী অনায়াসে টক বরই পেড়ে নিয়ে মুখে পুরতো, চট করে মুখের একটু জল ছিটকে পড়তো ঠোঁটে, থুতনিতে। রেহনুমা সেই ছিটকে পড়া লালা দেখতো, শীতের রোদে হাঁটু ভাজ করে বসা ইকরামকে দেখতো। ইকরামের চোখ দেখে রেহনুমার মনে হতো এভাবেই দেখতে দেখতে একটা মাছির কিংবা একটা ফড়িংয়ের আচমকা উড়ে যেতে ইচ্ছে করে... উড়ে যায়।

আরো একবার সেই উড়ে যাওয়ার ইচ্ছে দেখেছিল রেহনুমা, অথবা তার মনে হয়েছিল ওইটাই উড়ে যাওয়ার ইচ্ছে। ওরা দুজন সাম্পানে, মুখোমুখি বসে রেহনুমার কী যে ভীষণ ইচ্ছে করছিল কবিতা শোনাতে—ইকরামকে, অথচ ইকরাম তাকিয়ে ছিল দীঘল বৈঠার দিকে। ছোটবেলায় দশ বিন্দুর উপর রেখা টেনে টেনে ফুলের নকশা করতো। সেদিনও সে গোপন নকশা করে আর নকশার শেষে হঠাৎ তার মনে হয়—এই বিচ্ছিরি উলঙ্গ বৈঠাটাকে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরিয়ে দিলেই যেন সে এক অপ্সরী, যাকে দেখলেই এক পিপাসার্ত পুরুষ  অথবা প্রেমিকের আকাঙ্ক্ষা হবে কানে ফুল গুঁজে দিতে। কোনো বারোয়ারি ফুল নয়, পৃথিবীর সমস্ত সবুজ তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনা এক আশ্চর্য পাহাড়ি ফুল... পাহাড়ের একদম চূড়োয় ফোটা এক দুর্লভ ফুল। ইকরামেরও কি তাই মনে হয়েছিল? লোকে শুনে বলবে সবই রেহনুমার বোঝার ভুল। হয়তো তাই... মানুষ কি নিজের সত্যিটা ছাড়া অন্যের সত্যি হলফ করে বলতে পারে? ইকরামের হয়তো গোপন কোনো দুর্বলতা ছিল না; বরং সে দুর্বলতা হয়তো রেহনুমার নিজেরই ছিল। একদিন সবাই তো জেনেছিল, রোদের শেষ সীমানায় দাঁড়ালে যেখানে গোধূলি মেলে—সেই আলোয় আর তীব্র ট্রেনের শব্দের ঘোরে রেহনুমাকে প্রথম দেখেই মুগ্ধ হয়েছিল ইকরাম। রেহনুমার প্রতি ইকরামের শেষ উচ্চারণটাই তো ছিল— ‘ভালোবাসি’।

রেহনুমা—হাজার দোষের অতি সাধারণ এক মেয়ে, যে আজকাল ভীষণ জুতোর কথা ভাবে। বিছানার তোশকের নিচে কত যে ক্যাটালগ জমে গেছে জুতোর। ইদানীং ওর স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন সব এক জোড়া জুতোকে ঘিরে। একটা জুতোর বাক্সও তাকে কী ভীষণ রকম উত্তেজিত করে! পরক্ষণেই মনে আসে আম্মার হাড় ভাঙা আঙুল, মেডিকেল বিল, ইরা এসেছে আম্মাকে দেখতে, অপলার ডে কেয়ার, ক্রেডিট কার্ড ঋণ, স্লো বিজনেজ, সবশেষে দেয়ালে টাঙানো ইকরামের বর বেশে হাসিমুখের ছবিটা—যেটা দেখলে ইদানীং ভীষণ রাগ হয়। নাহ, আর দুটো মাস এভাবেই চলতে হবে। তারপর এক জোড়া জুতো হয়তো কিনতে পারা যাবে। প্রতিদিন শপিং মলটা পেরুনোর সময় এত লজ্জা হয় রেহনুমার। মনে হয় সবাই ওর জুতোর দিকে তাকিয়ে আছে। এমনকি দোকানের জানালায় দাঁড়ানো ম্যানিকিনগুলোও ওর জুতোর দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করছে। ছোটবেলায় পড়া কবিতা মনে পড়ে রেহনুমার “একদা ছিল না জুতা চরণ যুগলে/ দহিল হৃদয় মম সেই ক্ষোভানলে…” কবিতার সেই মানুষটার তো একটা সান্ত্বনা ছিল, পেয়েছিল। কিন্তু রেহনুমা সান্ত্বনা পায় না, বরং চারপাশের সবার কটাক্ষ যেন তাকে গলিয়ে দেয় তুমুল লাভায়। এক জোড়া  জুতোর ভীষণ দরকার! ইয়ানির মতো টিপসের বাক্স থেকে কিছু টাকা কায়দা করে মোজার ভেতর  বা ব্রায়ের তলে নিয়ে নিতে পারলেই… কিন্তু ম্যানেজার স্টিভেন যে ভীষণ বিশ্বাস করে ওকে। এসব ভাবতেই ভাবতেই বাসায় ফেরে রেহনুমা।

এসে দেখে ইরা চলে যাবার জন্য তৈরি—নিজের সংসারে। যাবার সময় বললো, ‘ভাবী, আমার এরকম চার জোড়া জুতো আছে। জানোই তো বড্ড বেহিসেবি আমি আর ও এত স্পয়েল করে না আমাকে... এই এক জোড়া তোমাকে দিয়ে গেলাম। ’ রেহনুমা দেখতে পায় ওর দিকে কটাক্ষে তাকিয়ে আছে দামী ব্র্যান্ডের কী ভীষণ চকচকে এক জোড়া জুতো। রেহনুমা হাসে, নিশ্চয়তা আর দুঃখবোধ একসাথে জমলে বুঝি এরকমই হাসি বেরোয়! আজ থেকে এক জোড়া জুতোর জন্য ওর আর নিজস্ব কোনো গোপন ভ্রমণ রইলো না। এতসব আকুল অপেক্ষা, একটু একটু করে টিকে থাকা, যুদ্ধ করা... যেন এক তীরন্দাজের হাতে ধরে রাখা সমস্ত তীর নিষ্ফল নিচে পড়ে গেল।



বাংলাদেশ সময়: ১৬৩৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৯, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।