ঢাকা, শনিবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৫ মে ২০২৪, ১৬ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিদিনের ধারাবাহিক

টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (২৩) || অনুবাদ : আলীম আজিজ

অনুবাদ উপন্যাস / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩২০ ঘণ্টা, অক্টোবর ২১, ২০১৪
টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (২৩) || অনুবাদ : আলীম আজিজ অলঙ্করণ: মাহবুবুল আলম

এর্নেস্তো সাবাতো (২৪ জুন ১৯১১-৩০ এপ্রিল ২০১১) আর্জেন্টাইন লেখক এবং চিত্রকর। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন লিজিওন অফ অনার, মিগুয়েল দে সেরভেন্তেস পুরস্কার।

এছাড়াও তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জগতের বেশ প্রভাবশালী লেখক। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনের এল পায়েস—তাঁকে উল্লেখ করেন ‘আর্জেন্টিনাইন সাহিত্যের শেষ ধ্রুপদী লেখক’ বলে।
‘এল তুনেল’ (১৯৪৮), ‘সবরে হেরোস ইয়া টুম্বাস’ (১৯৬১), ‘অ্যাবানদন এল এক্সতারমিনাদোর’ (১৯৭৪) তাঁর জগদ্বিখ্যাত তিন উপন্যাস।

২২তম কিস্তির লিংক

ওকে যে আমি কী ভালো বুঝতে পেরেছি; ওই চিঠি পড়ার পর আমার হৃদয়ে যে কী পরিমাণ অলৌকিক আবেগ উপচে পড়ছে, তা বলে বোঝানো যাবে না! ওর প্রতিটি শব্দের মধ্যে এমন পরিষ্কার এক অন্তরঙ্গতা প্রকাশ পেয়েছে যে আমি নিশ্চিতভাবেই ধরে নিলাম, মারিয়া আমার। একা শুধু আমার। ‘তুমি সাগর ও আমার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছো। ’ আর কেউ কোথাও নেই; শুধুই আমরা দুজন, যে মুহূর্তে ও জানালার ওই দৃশ্যটা দেখছিল—তখুনি আসলে কোন এক অন্তর্জ্ঞানবলে আমি এই কথাটা জেনে গিয়েছিলাম। আর তাছাড়া, ঘনিষ্ঠ হওয়া বা কাছাকাছি আসা ছাড়া তো আমাদের কোনো বিকল্প নেই, কারণ আমরা পরস্পরকে যখন হাজার বছর ধরে চিনি, এবং সারা জীবনের জন্যও তো? ও যখন আমার ছবিটার সামনে এসে থেমে দাঁড়াল এবং গভীর মনযোগ দিয়ে ছোট্ট ওই জানালাটার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল, চারপাশের মানুষজন-কোলাহল কোনো কিছুই যখন ও খেয়াল করছে না, তখুনি আমি বুঝে গিয়েছিলাম আমাদের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সেতুবন্ধ তৈরি হতে যাচ্ছে, ওই দিনই যেন আমার জানা হয়ে গিয়েছিল ও আমার চেনা, ও কেমন তাও যেন বুঝতে পারছিলাম, আর ভীষণভাবে অনুভব করছিলাম ওকে আমার প্রয়োজন, এবং আমাকেও ওর।

হায়, আল্লাহ! তারপরও আমি তোমাকে খুন করেছি! আমিই, আমিই হত্যা করেছি তোমাকে, আমিই, দেখেছি কিভাবে তুমি নীরব হয়ে যাচ্ছো, শঙ্কায় লীন হয়ে যাচ্ছো, কাচের দেয়াল ভেদ করে তোমাকে আমি ছুতে পারছি না। আমি, কতটা নির্বোধ, কতটা অন্ধ, কী ভয়ঙ্ককর রকম নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর!

বেশ, এ পর্যন্তই বলব। আমিই বলেছিলাম—এই কাহিনি আমি কোনো ভান-ভনিতার ধার না ধেরে সোজাসুজি বলব, এবং সেটাই করে যাচ্ছি।

আমি মারিয়াকে উন্মত্তের মতো ভালোবেসে ফেলেছি, যদিও তখনো ভালোবাসি এ কথা আমরা কেউই উচ্চারণ করিনি। আমি কোনো রকমে অপেক্ষা করছি এসতানসায়া থেকে মারিয়া ফিরে এলেই কথাটা ওকে বলব।

কিন্তু ও ফিরল না। আর এক এক করে অসহনীয় একেকটা দিন পার হতে শুরু করল, আমি টের পাচ্ছিলাম আমার ভেতরে এক ধরনের পাগলামী ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আমি ওকে দ্বিতীয় আরেকটা চিঠি লিখলাম, যাতে শুধু এই কথাটা লেখা, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, মারিয়া, ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি!’

অনন্তকালের মতো দুটো দিন পার হওয়ার পর, আমি কয়েক ছত্রের এই জবাবটা পেলাম: ‘আমার ভয় হচ্ছে আমি তোমার জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনছি। ’ আমি সঙ্গে সঙ্গে এর জবাব দিলাম। ‘আমি পরোয়া করি না কোনো বিপদের। আমি শুধু জানি তোমাকে ভালোবাসতে না পারলে, আমি মারা যাবো। তোমাকে না দেখে থাকার প্রতিটা মুহূর্ত আমার জন্য অসম্ভব যন্ত্রণার। ’

আবারও, একটার পর একটা ভয়াবহ দিন চলে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই ওদিক থেকে। মরিয়া হয়ে, শেষে আমি আবার লিখলাম: ‘তুমি আমাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছ। ’

পরদিন আমার ফোনটা বেজে উঠল, বহুদূর থেকে, ওর স্খলিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

কিন্তু মারিয়া শব্দটা শুনতে পেলাম না, অথচ দিনমান ওই নাম আমি জপে যাচ্ছি সমানে, আমি কথা হারিয়ে ফেললাম। কথা খুঁজে পাওয়া এমনিতেও প্রায় অসম্ভব ছিল, যাহোক; আমার কণ্ঠ এমন অসাড় হয়ে আছে আমি কিছুতেই পরিষ্কারভাবে কথা বলতে পারছিলাম না। মারিয়া জানাল:
‘আমি আগামীকাল বুয়েন্স আয়ার্সে ফিরছি। আমি পৌঁছামাত্র তোমাকে ফোন দেবো। ’
পরদিন বিকেলে বাসায় পৌঁছেই ফোন দিল ও।
‘আমি তোমাকে দেখতে চাই,’ বললাম আমি। ‘এক্ষুণি। ’
‘ঠিক আছে। দেখা করব,’ জবাব দিল ও।
‘আমি প্লাসা সান মারতিনে অপেক্ষা করব। ’
মনে হলো মারিয়া ইতস্তত করছে। ‘আমার পছন্দ রেহকালেহতে। আমি আটটার দিকে ওখানে থাকব। ’

দেখা হওয়ার আগের এই সময়টুকু আমি কিভাবে কাটাব। দ্রুত সময় কাটানোর জন্য আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলাম। আমার বুকের ভেতরটা যে কী রকম নরম-কোমল হয়ে আছে। পৃথিবীকে এত সুন্দর লাগছে, গ্রীষ্মের এই বিকেল, ফুটপাতে খেলায় মত্ত ছেলেমেয়ের দল। আজ ভাবি, ভালোবাসা কিভাবে মানুষকে এমন অন্ধ করে দেয়; কিভাবে ভোজবাজির মতো বদলে দেয় সব বাস্তবতা। এই পৃথিবী, সুন্দর? কি হাস্যকর!

আটটা বাজার কয়েক মিনিট পরই মারিয়াকে দেখলাম অন্ধকারে ও আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। রাত হয়ে গেছে ভালোই, যে কারণে আমি ওর মুখ দেখতে পারছিলাম না, কিন্তু ওর হাঁটার ধরনে ওকে আমি চিনতে পারলাম।

বসলাম আমরা। ওর হাত ধরলাম, তারপর চেতনাশূন্যের মতো বারবার ওর নাম আওড়ালাম, বারবার। ‘মারিয়া’ এই শব্দটাই কেবল উচ্চারণ করতে পারলাম; কোনো কিছু না বলে ও শুধু শুনল।

‘তুমি এসতানসায়ায় কেন গিয়েছিলে?’ জোর খাটানোর মতো জিজ্ঞেস করলাম। ‘তুমি আমাকে একা রেখে ওখানে কেন গেলে? চিঠিটা তুমি বাড়িতে রেখে গেলে কেন? তুমি কেন আমাকে বলোনি যে তুমি বিবাহিত?’
কোনো জবাব দিল না ও। ওর হাত খামচে ধরলাম আমি। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল ও।
‘তুমি আমাকে ব্যথা দিচ্ছ, হুয়ান পাবলো,’ মৃদু প্রতিবাদ করে বলল ও।
‘তুমি কিছু বলছ না কেন? আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছ না কেন?’
নীরবতা।
‘কেন? কেন?’
অবশেষে মুখ খুলল ও।
‘সব কিছুর কেন জবাব থাকতে হবে? আমি নিজের সম্বন্ধে কথা বলতে চাই না। প্লিজ, তোমার কথা বলো, তোমার কাজের কথা বলো, কিসে তোমার আগ্রহ বলো। আমি প্রায়ই তোমার পেইন্টিংয়ের কথা ভেবেছি, সেদিন প্লাসা সান মারতিনে বলা তোমার কথাগুলোও। তুমি কী করছো আমি জানতে চাই, তোমার ভাবনার কথা, তুমি যদি কোনো কিছু আঁকতে শুরু করে থাকো সেটার কথা। ’
আমি রুষ্ট হয়ে ওর হাত আবারও জোরে চেপে ধরলাম।
‘না!’ বললাম আমি। ‘আমি নিজের সম্বন্ধে কোনো কথাই বলতে চাই না। আমি, শুধু আমাদের দুজনের কথা বলতে চাই। তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা আমাকে অবশ্যই জানতে হবে। আর কিচ্ছু না: ভালোবাসো নাকি, না। ’

আবারও নীরব রইল ও। কোনো জবাব দিল না। ওর নীরবতা আর অন্ধকারের কারণে ওর চোখ দেখতে না পারায়, আমি দেশলাই জ্বাললাম। দ্রুত, ঘুরে দাঁড়াল ও, আমার দিক থেকে মুখ লুকাল। আমার খালি হাতে ওর মুখ ধরে, জোর করে ওকে আমি আমার দিকে তাকাতে বাধ্য করলাম: নিঃশব্দে কাঁদছে ও।
‘ওঃ...তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসো না,’ তীব্র গলায় বললাম আমি।

(চলবে)

২৪তম কিস্তির লিংক



বাংলাদেশ সময়: ১৩২১ ঘণ্টা, অক্টোবর ২১, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।