ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৩ মে ২০২৪, ১৪ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিদিনের ধারাবাহিক

টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (১৯) || অনুবাদ : আলীম আজিজ

অনুবাদ উপন্যাস / শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫৩০ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৬, ২০১৪
টানেল | এর্নেস্তো সাবাতো (১৯) || অনুবাদ : আলীম আজিজ অলঙ্করণ: মাহবুবুল হক

এর্নেস্তো সাবাতো (২৪ জুন ১৯১১-৩০ এপ্রিল ২০১১) আর্জেন্টাইন লেখক এবং চিত্রকর। লেখালেখির জন্য পেয়েছেন লিজিওন অফ অনার, মিগুয়েল দে সেরভেন্তেস পুরস্কার।

এছাড়াও তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জগতের বেশ প্রভাবশালী লেখক। তাঁর মৃত্যুর পর স্পেনের এল পায়েস—তাঁকে উল্লেখ করেন ‘আর্জেন্টিনাইন সাহিত্যের শেষ ধ্রুপদী লেখক’ বলে।
‘এল তুনেল’ (১৯৪৮), ‘সবরে হেরোস ইয়া টুম্বাস’ (১৯৬১), ‘অ্যাবানদন এল এক্সতারমিনাদোর’ (১৯৭৪) তাঁর জগদ্বিখ্যাত তিন উপন্যাস।

১৮তম কিস্তির লিংক

অভ্যাসবশেই প্রতিক্রিয়া বুঝতে চাওয়া, আরেকটু বেশি কিছু বুঝতে চাইছে হয়তো, তারপর নীরবতা, এবং এরপরই সে যোগ করল:
‘মারিয়া এখনও ওর পারিবারিক নামটাই ব্যবহার করে। ’
মূর্তির মতো জমে গেলাম আমি।
‘আপনার পেইন্টিং নিয়ে মারিয়ার কাছে অনেক কথা শুনেছি। মোটামুটি জীবনের শেষভাগে এসে যেহেতু দৃষ্টি হারানো, তাই এখনও জিনিসপত্রের কথা ভালোই চিন্তা করতে পারি। ’
মনে হল সে যেন তার অন্ধত্বের জন্য ক্ষমা চাইছে আমার কাছে। আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। আমার শুধু মনে হচ্ছিল এই রুমে আর নয়, আমি একদম একলা হতে চাই এখনই, দূরে কোথাও গিয়ে নতুন এই তথ্যটা হজম করতে চাই আমি!
পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দিল সে।
‘এই আপনার চিঠি,’ সহজভাবে বলল সে, যেন আমাকে এই চিঠি হস্তান্তরের ঘটনাটা অতি মামুলি একটা ব্যাপার।
‘খুলে পড়ুন। যদিও, মারিয়ার চিঠি যেহেতু , খুব জরুরি কিছু হওয়ার কথা না। ’
কিন্তু আমার কাঁপন শুরু হয়ে গেছে। সিগারেট ধরাল সে—আমাকেও একটা আগে সেধে নিয়ে—আমি খামটা ছিঁড়লাম। ভেতর থেকে চিঠিটা বের করলাম। একটিমাত্র বাক্য লেখা এতে:
আমিও, তোমার চিন্তাই করছি।
মারিয়া
আমি চিঠি ভাঁজ করে রাখছি আওয়াজ শোনার পর, আলেন্দে জিজ্ঞেস করল:
‘তেমন জরুরি কিছু না, তাই না। ’
সব চেষ্টা একত্র করে জবাব দিলাম:
‘না, তেমন জরুরি কিছু না। ’
একজন অন্ধলোক খোলা দুই চোখের স্থির দৃষ্টি আমার আমার ওপর নিবদ্ধ রেখে হাসছে, এই দৃশ্যে আমার মনে হল আমি কোনো কিম্ভুতজীবকে দেখছি।

‘মারিয়া এ রকমই,’ বলল ও, যেন স্বগতোক্তির মতো চিন্তা করছে সে। ‘প্রায়ই লোকজন মারিয়ার এসব ব্যাপারকে জরুরি মনে করে ভুল করে। যদিও মারিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করে এসব, কিন্তু কোনো কিছু না ভেবেই করে ও। আমি আপনাকে ঠিক কিভাবে বোঝাই ব্যাপারটা?’
অন্যমনস্কভাবে মেঝের দিকে তাকাল সে, যেন পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজছে। কিছুক্ষণ পর, বলল:
‘ভাবুন মরুভূমিতে আটকে পড়া কেউ একজন আচমকা তীব্র গতিতে অন্য আরেকটা ভিন্ন কোনো অবস্থানের দিকে ছুটতে শুরু করল। আপনি বুঝতে পারছেন? ওই গতির আসলেই এখানে কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ সে এখনো ওই মরুভূমিতেই আটকে আছে। ’

সিগারেট খেতে খেতে আরও খানিক চিন্তা করল সে, যেন আমার কথা ভুলে গেছে, যেন আমার কোনো অস্তিত্ব নেই এখানে। তারপর সে যোগ করল:
‘যদিও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত না। রূপকের মতো করে কথা বলায় আমি অতটা পারদর্শীও না। ’
কিন্তু আমার অবস্থা, এই ঘর থেকে এখন আমি পালাতে পারলে বাঁচি। কিন্তু অন্ধলোকটার কোনো তাড়া আছে বলে মনে হল না। ‘এটা কি অদ্ভুত ধরনের রসিকতা?’ নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘আজকের কথাই বলি,’ আলেন্দে বলতে শুরু করল। ‘খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে ও, তারপর আমাকে জানাল ও এসতানসায়ায় যাচ্ছে। ’
‘এসতানসায়া?’ বিভ্রান্ত গলায় পুনরাবৃত্তি করলাম আমি।
‘হ্যাঁ, আমাদের এসতানসায়া। মানে আমার দাদার সম্পত্তি ওটা, এখন আমার চাচাতো ভাই হান্টার দেখাশোনা করে। আমার ধারণা আপনি ওকে চেনেন?’
নতুন এই তথ্য আমার দুশ্চিন্তা আরও তীব্র করল, এবং বিরক্তিও বাড়ল ততটাই। ওই মেয়েবাজ, নির্বোধ হাঁদারামটার মধ্যে মারিয়া কী দেখল? আমি জোর করে শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম, হান্টারের সঙ্গে থাকার জন্য নিশ্চয়ই এসতানসায়ায় যায়নি মারিয়া—নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলাম, ওর ওখানে যাওয়ার কারণ ওই গ্রামীণ নির্জনতার প্রতি ওর যে টান সেটা, আর আর একটা কারণ এটা ওদের পারিবারিক জমিদারীও। তারপরও আমার মন ভেঙে গেল।

‘ওকে আমি ভালো করেই চিনি,’ তেতো গলায় বললাম আমি।
অন্ধলোকটা জবাব দেওয়ার আগেই, আমি ভদ্রতার ধার না ধেরে ঘোষণা করলাম:
‘আমাকে এখন যেতে হবে। ’
‘ওহ, না কী বলেন!’ বলল আলেন্দে। ‘আশা করছি আমাদের আবারও দেখা হবে। ’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই,’জবাব দিলাম আমি।
দরজা পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিল সে। হাত মিলালাম আমি, তারপরই এক উড়াল। এলিভেটর যখন নামছে নিচের দিকে, রাগে ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছিল আমার: ‘এটা কি অদ্ভুত ধরনের রসিকতা হল!’

(চলবে)

২০তম কিস্তির লিংক



বাংলাদেশ সময়: ১৫৩১ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৬, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।