ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
bangla news

শওকত আলীর ছোটগল্পে সমাজ-মনস্তত্ত্ব

|
আপডেট: ২০১১-০২-১১ ২:৪৯:০০ পিএম

সমাজ-নৃতত্ত্বের আলোকে গল্পভাষা বুনন-কৌশলে বাংলাসাহিত্যে এক বিশেষ প্রতিভা শওকত আলী (জন্ম : ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ রায়গঞ্জ, পশ্চিমবঙ্গ)। নিম্নবর্গের মানুষের জীবন-প্রণালী, স্বপ্ন আর আশাভঙ্গের বিবরণভাষ্য নির্মাণে তিনি সাবধানী ও উত্তীর্ণ শিল্পী।

সমাজ-নৃতত্ত্বের আলোকে গল্পভাষা বুনন-কৌশলে বাংলাসাহিত্যে এক বিশেষ প্রতিভা শওকত আলী (জন্ম : ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ রায়গঞ্জ, পশ্চিমবঙ্গ)। নিম্নবর্গের মানুষের জীবন-প্রণালী, স্বপ্ন আর আশাভঙ্গের বিবরণভাষ্য নির্মাণে তিনি সাবধানী ও উত্তীর্ণ শিল্পী। বাংলাদেশের ুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আত্মস্বরূপ সাহিত্যে রূপ দিতে তাঁর নিয়ত প্রচেষ্টা আমাদের সাহিত্য-অভিযাত্রায় তৈরি করে বিচিত্র-অনাস্বাদিত-নবতর মাত্রা। বাঙালি মধ্যবিত্ত-নিুমধ্যবিত্তের জীবনচর্চায় বিলাস-অনাচার আর চিরন্তন লোকায়ত মানবসভার অস্থির রূপান্তর-প্রক্রিয়া শওকত আলীর গল্প-পরিসরে প্রবেশ করে আপন অস্তিত্ব-অন্বেষার অভিপ্রায়-কাঠামোর অবস্থিতির আবরণে। বিচ্ছিন্নতাবোধ, নৈঃসঙ্গ্য, প্রেমজাত অস্থিরতা আর টিকেথাকার সংগ্রাম, তাই, তাঁর কাহিনীকথার সমান্তরাল মনোভঙ্গি। শ্রেণীচেনতা আর মৌলিকত্ব-ভাবনা তাঁর অন্য একটি চিন্তাঅঞ্চল।

শওকত আলী যে সময়-আবহে বেড়ে ওঠেন; নিজেকে তৈরি করেন সাহিত্যের সেবক হিসেবে, তখন তাঁর প্রতিবেশ সামাজিক-রাজনৈতিক-সাস্কৃতিক বিশেষ কালপর্ব অতিক্রম করছে। বিশ্বযুদ্ধ, দেশবিভাগ, সাম্প্রদায়িক-সংঘাত, দুর্ভি, মাতৃভাষা-রাষ্ট্রভাষা সংকট আর জাতীয়চেতনার প্রতি প্রবল অভিঘাত তাঁর শিল্পীমানসের বিরাট প্রভাব ফেলে। যাপিত প্রজন্মপ্রহরে তিনি আত্মস্থ করতে থাকেন মানবিকবোধের উচ্চকিত ধারণা, বাসস্থান স্থানান্তরজনিত ঐতিহ্যবিচ্যুতির মতো অসহ্য যন্ত্রণা, ধর্মীয় পরিচয়লালিত বিভেদ আর প্রতিবেশী নিধনের প্রচলসত্য। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অনুভব করেছেনÑ প্রতারণা-লোভ-অত্যাচার-হত্যাকাণ্ডই জীবনের শেষকথা নয়; সমূহ বিপর্যয় আর ধ্বংস¯ু—পের আড়ালে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রত্যাশা আর সৃজনধর্মের প্রবহমানতা। লেখক হয়েওঠার পরিপ্রেতি সম্বন্ধে শওকত আলী জানাচ্ছেন :

কারাবাসশেষে কলেজের পাট চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গৃহশিকতার সুবাদে ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারে নাগরিক জীবনযাপনের নানান টানাপোড়েনের ঘটনা চোখে পড়ে। তরুণদের রাজনীতি আর সংস্কৃতিচর্চা বা লেখালেখি অথবা প্রেম ভালোবাসা কিংবা প্রতারণা াার স্বার্থপরতা সংক্রান্ত বহু কিছু জানার সুযোগও ঐ সময়ই হয়। তারপর ঠাকুরগাঁও কলেজে শিকতা করার সময় ঐ অঞ্চলের গরিব কৃষিজীবী মানুষের সঙ্গেও মেলামেশা করতে ভালো লাগতো। বিশেষ করে আদিবাসী রাজবংশী আর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে। ঠাকুরগাঁও আর দিনাজপুরে যাওয়া আসার পথে বাস ড্রাইভার হেলপারদের সঙ্গে পরিচিত হই, বন্ধুত্বও হয় অনেকের সঙ্গে। কর্মজীবনে শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা হওয়ার ফলে আমার এই ধারণা জন্মায় যে আমরা, ভদ্দরলোকরা, এঁদের থেকে আলাদা। এঁদের চিন্তাভাবনা, জীবনযাপন, সবই অন্যরকম, যার নাগাল পাওয়া যায় না। অথচ পুরো সমাজটা দাঁড়িয়ে এঁদেরই ওপর। [‘লেখকের কথা’, শওকত আলীর সব গল্প (প্রথম খণ্ড), অরিত্র, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্র“য়ারি ২০০১]

বিচ্ছিন্নতাবোধজাত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সংসারবিমুখতা কিংবা যুক্তপরিবার-ধারণার বিরুদ্ধচারণ একরমক প্রগতিশীলতার বার্তা বহন করলেও শওকত আলী তাতে কোনো আকর্ষণ অনুভব করেননি কখনো। বিশ্বসাহিত্যের স্বপ্নবিহারবিমুক্ত বাস্তবতার নিরীখে সাজিয়েছেন তিনি তাঁর চিন্তাভাষ্য। ক্রোধ-প্রতিরোধ-আবেগ-ঘৃণা-অনুরাগÑ ফলত মানবতা তাঁর আরাধ্য। গল্প-উপাদান আর ভাষা তুলে এনেছেন নির্ভর-কাহিনী ও চরিত্রের সামাজিক অবস্থার সত্যসত্য থেকে। ‘রঙ্গিনী’ তাঁর প্রথম গল্প। এ গল্পে দেশবিভাগ-পরবর্তী সামাজিক-পারিবারিক বিবর্ণতা, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অস্বচ্ছতা, ব্যক্তির মনোবিকলন, পুরুষের নারীভাবনা, নারীর মানসিক শূন্যতাবোধ আর শেষত অনাচারীর শুভবোধে উন্নীত হবার প্রবণতা অঙ্কিত হয়েছে জীবনবাঁকের ছোট্রপরিসরে। নটবর আর মিস্তিরির চোরাকারবার আর ব্যক্তিগত জীবনের অসংলগ্নতার আড়ালে এখানে নির্মিতি পেয়েছে দেশের সংকট, সামাজিকের ভ্রান্তি আর মানসিক অস্থিরতা। দৃশ্যত তিনটি চরিত্রের ভাব-অনুভব-উত্তেজনায় অগ্রসর ও সমাপ্তির পথ খুঁজেছে গল্পের ক্যানভাস। রঙ্গিলা নামক নারীর প্রতি পুরুষ দুটির আকর্ষণ আর প্রতারণা, প্রতিহিংসা, ােভ, ভয় আর উত্তেজনা-প্রশমন ও জীবনবোধের উজ্জ্বলতায়। বৃষ্টিজনিত কারণে ট্রাকভর্তি মালামাল সীমান্তের ওপারে পাচারের অপোয় যাপিত অলস-বিরক্তকর-ভীতিযুক্ত সময়পরিসরে গল্পটির আবহ নির্মিত। মহাজন নটবর আর ট্রাক ড্রাইভার মিস্তিরিÑ দুজনেই জরিয়ে পড়ে ঝাড়–দার কাম ডাকাতের স্ত্রী রঙ্গিলার আকর্ষণীয় শরীরের মোহজালে। গল্পকার মিস্তিরির, পরিপাটি পোশাক  আর সুগন্ধী সিগারেটে আভিজাত্য-অন্বেষী, মুখ দিয়ে বলিয়েছেন নারীদেহের প্রতি পুরুষের লোভের সারকথা :

মেয়ে মানুষের শরীরের ভেতরে কী আছে ভগবান জানে। সব নেশার চাইতে বড়ো নেশা হলো এই মেয়ে মানুষ। যখন পুরুষ মানুষকে এই নেশা টানে তখন বিচার, বুদ্ধি, বিবেচনা কোনো কিছু করার শক্তি থাকে না। তখন জানোয়ার আর মানুষের মধ্যে কোনো ভেদ থাকে না। আমার কাজ, আমার ভবিষ্যৎ, আমার সাধ, সুখের চিন্তা, মুনাফার লোভÑ সবকিছু তখন তালগোল পাকিয়ে গেছে। [শওকত আলীর সব গল্প, পৃ. ২৮]

ব্যবসায়ী নটবর সংসারবিমুখ, নারীমাংসলোভী বেহিসেবি মানুষ। বাজারের মেয়েমানুষ নিয়ে রাতকাটানো আর মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বুদ হয়ে থাকা এই লোকটির সংসার-পরিবার রাষ্ট্রীয় সীমানার ওপারে। আয়-উপার্জনের বেশিরভাগই সে ব্যয় করে বেপথে। নতুন রাষ্ট্রের নানাবিধ জটিলতার ঘেরাটোপে আবৃত জীবনের কিঞ্চিত যন্ত্রণা নটবরের জীবনেও আঘাত হেনেছে। বিভাজনতত্ত্বের বেড়াজালে আটকে-পড়া মানুষের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাভাবনা, নৈঃসঙ্গ্য আর বিবর্ণতার আঁচ আমরা অনুভব করি নটবরের জীবনাচারে। তার চোখে ঘোরলাগানো যুবতী রঙ্গিলা, নটবরের বন্ধুকে জানায় তার অভিব্যক্তি :

‘কতো বলি, আমার পেছনে না ঘুরে, বউ ছেলেমেয়ে আনিয়ে রাখো, তা শুনবে না। রোজগার করবে এখানে, মজা লুটবে এখানে আর ঘর সংসার সাজিয়ে রাখবে হিন্দুস্থানে, কীরকম ঘোড়েল লোক, দ্যাখো।’ [পৃ. ২৯]
রঙ্গিলা অবশ্য সে অর্থে বিপথগামী নারী নয়। পারিবারিক আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্যে হয়তো সে স্বামীর চৌর্যবৃত্তিতে সঙ্গ-সহায়তা দেয় কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বিবাগী; মনের মানুষ পেলে সংসার ছেড়ে নতুন ঠিকানা গড়তে তার আগ্রহ আছে। স্থুল অর্থে সে পুরুষের সঙ্গকামী কামুক রমনীমাত্র নয়; সামাজিক ও মানসিক স্বস্তি খুঁজতে-থাকা এক চিরায়ত নারীব্যক্তিত্ব। নটবরের কাছে সে ধরা দেয়নি; ছল করেছে মাত্রÑ প্রতারণা করেছে, তার ব্যবসাকেন্দ্র লুট করার কাজে স্বামীপুরুষকে সাহায্য করার প্রচেষ্টা হিসেবে। মিস্তিরি তাকে পাওযার আশায় জোর করতে চাইলে, অনেক টাকার লোভ দেখালে, রঙ্গিলা নির্বিকারচিত্তে জানিয়েছে তার অবস্থান :
তুমি তো আমাকে বিনি পয়সার মাল ভাবছো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো গাই বকরির সমান ভেবে বসে আছোÑ ...টাকা নিয়ে কী করবো মিস্তিরি। যদি ঘর বাঁধতে আমাকে নিয়ে, তাহলে অন্যকথা ছিলো। তুমি হাসালে মিস্তিরি। ...আমি তোমাকে চিনে ফেলেছি। এই দেহটা দেখে তোমার মন উল্সে উঠেছে। এখন কতো কথা শোনাবে তুমি। সবাই তোমরা এরকম। শুধু শরীরটার জন্যে ছোঁক ছোঁক করে কাছে আসো। কিন্তু মন? মনের কথা ভাবতে পারো না। [পৃ. ৩১]

পাপবোধ-কাপুরুষতা-অসহায়তা-অস্থিরতা-প্রায়শ্চিত্ত আর পঙ্কিলতার যাবতীয় আবরণ ছিঁড়ে সামাজিক-রাষ্ট্রীয় আশ্রয়, মানসিক প্রশান্তি আর উপলব্ধির শুদ্ধতায় উন্নয়ন-প্রাপ্তির প্রত্যাশায় বর্তমান গল্পের পরিসমাপ্তির আবহ নির্মিতি স্থিত। সমাজবিবর আর মানবিক আর্তির চিত্রভাষ্য সাজাতে গিয়ে শেষত কাহিনীকার প্রতীকে প্রতিবেশ প্রলেপ করেছেন গল্পগাত্রে। তাঁর বর্ণনা :
বৃষ্টি, বৃষ্টি। তখন চারদিক থেকে তীরের মতো বৃষ্টির ফোঁটা এসে গায়ে বিঁধছে। আমি ছুটছি প্রাণপণে, একখানা খড়ো চালার নিচে মাথা গুঁজবার জন্যে। চারপাশে শুধু শোঁ শোঁ শন শন শব্দ। সেই হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়েও বহুদূর থেকে একটা মেয়ের তীè হাসি আমার কানে বাজতে লাগলো। [পৃ. ৩২]

‘ফাগুয়ার পর’ গল্পে জায়গা পেয়েছে ভেঙে-পড়া সংসার-কাঠামো, নরনারীর অসামাজিক সম্পর্ক আর মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্রমদূরত্ব। বৃদ্ধ পিতার তার তিনপুত্রের সঙসারে যেন বাড়তি ঝামেলা হয়ে দাঁড়ায়। আশ্রয়চ্যুতি আর আর্থিক-অনিশ্চয়তার অনাগত জীবনকে তার ভীষণ ভয়। জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো, ঝামেরা থেকে দূরে থাকতে চাওয়া বুড়ো আজ পড়েছে বড় মুশকিলে; পালাবার কোনো পথ নেই তার। শরীরের ভার আর উত্তাপ দুহাতে সরাতে চাইলেও সে একরকম অসহায়-অপারগ। তার স্থির অবস্থান ছেলেদের অবহেলার শেষস্তরে। ঘরে বড়ছেলে বনোয়ারীলালের বউ গঙ্গামায়ী তৈরি করে এক অসহ্য পরিবেশ; দেবর গিরিধারী আর ছেদিলালকে ঘিরে জমতে থাকে তার ছেনালিপনা। শ্বশুর অবশ্য তাকে সতর্ক করেছিল কিন্তু তাতে ফল হয়েছে উল্টো। সুখলালের মনখারাপ লাগে, সংসারের হারানোদিনের কথা মনে জাগে তার :

হ্যাঁ, সুখ ছিল সুখলালের। উঠোনে ঝাঁট পড়তো। নিমপাতা যতোবার ঝরে পড়তো ততোবারই ঝাঁটার শব্দ শোনা যেতো। বারান্দায় বসে বসে পানি পেতো। কোলের কাছে ভাত আসতো। মাটির সরায় করে আচার শুকোতো। আর তিনটে জোয়ান ছোকরা যখন তখন বাসায় ফিরতো। সব সময় একটা মেয়েলি হাসির ঝঙ্কার চারপাশ থেকে জেগে উঠতো। [পৃ. ৩৭]

এরকম সাজানো-গোছানো সংসার আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে; ছেলেদের মন নারীদেহের প্রতি আর তাদের অম দৃষ্টি প্রসারিত খোলা পৃথিবীর দিকে, পঙ্গু পিতাকে তারা ভিাৃত্তিতে বসাতে চায়Ñ উপার্জনের আশায়। সুখলাল তাতে রাজি নয় কিন্তু জোর করে ছেলেরা, তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে পর্যন্ত। সামাজিক কাঠামোর এ দুঃসহ পরিবর্তনে, ব্যক্তির এ বিচ্ছিন্নতাবোধের যাতাকলে আটকে যায়, সুখলাল নামক নিরুপায় পরিবারপ্রধানের অবস্থার রূপকে, জাগতিক মানবিকবোধ। সুখলালরা আজ ভেঙেপড়া সমাজব্যবস্থার নির্বাক দর্শকমাত্র। এ থেকে বেড়োনোরও কোনো পথ নেই। ব্যক্তির আপেকিতাবাদ আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের ভিতে দাঁড়ানো সমাজপথিক মানষ আজ বিবর্ণ, নির্বিকার। সুখলালের অনুভবের ছোঁয়ায় লেখক ধরতে চেয়েছেন সেই সত্য। তিনি লিখছেন :

ঝাপসা চোখ দুটোকে কচলালো এক হাতে। কি হচ্ছিলো? এনের ভেতরে কেউ যেন অশেষ প্রশ্ন করে উঠলো। ঝাপসা দুনিয়াটাকে দেখলো বনোয়ারী মাহাতোর বাপ সুখলাল। রাস্তাটা কি রকম বিবর্ণ, দুপাশের গাছপালাগুলোতে সবুজ রং নেই, মানুষজনের ভিড় নেই রাস্তায়। যদিও যাওয়া আসা করছে কয়েকজন, কেউ ওর দিকে নজর দিচ্ছে না। [পৃ. ৪০]

এই পৃথিবীতে মানুষ অসহায় পুতুলের মতো; সৃষ্টিকর্তা কিংবা প্রকৃতির নিদের্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর সাফল্য-ব্যর্থতার সব ব্যাপারাদি। শতচেষ্টা করেও যখন কেউ এড়াতে পারে না তার ভাগ্যের লিখন, তখন সে মোহগ্রস্তের মতো মানসিক ভ্রান্তিতে আটকে পড়তে পারেÑ এমন বক্তব্যই নির্মিতি পেয়েছে শতকত আলীর ‘ভগবানের ডাক’ গল্পে। প্রকৃতির নির্মলতার আবাহন-বারতা দিয়েই আরম্ভ গল্পটির; এমন উপস্থাপনভঙ্গিও প্রতীকি ঠেকে, পাঠকের চিন্তাদরোজায় :
ভজহরি দাসের ভালো লাগলো জ্যোৎøালোকিত ভেজা মাঠটাকে। বিশাল প্রান্তরে গুঁড়ো গুঁড়ো জ্যোৎøা। কেমন যেন অস্পষ্টতায় ছেয়ে আছে। হাওয়া থেমে গেছে। শুধু একটা সজল øিগ্ধতা  ছড়িয়ে পড়ে স্থির হয়ে গেছে জায়গাটা জুড়ে। দেখল ভজহরি ভেজা গাছের পাতায় জ্যোৎøার আলো চিক চিক করছে। [পৃ. ৪১]

কালোবাজির টকার নেশা, আর্থিক সাফল্য লাভ-প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক স্থিতির-উর্ধ্বগতির অশুভ প্রতিযোগিতা, পরাজয়ের গানি আর শেষত ঘোরলাগা অমোঘ নিয়তিলগ্নতা গল্পটির শরীর-কাঠামো সাজিয়ে তুলেছে। সামাজিক প্রাত্যহিকতা আর মানসিক বিভ্রান্তি এ কাহিনীর কথাবস্তু। বলরামের ব্যবসায়-স্ফীতি আর পান্তরে ভজহরির ক্রমাবনতির চিত্র মানুষের ভাগ্যনির্মাতাকে সচেতন পাঠকের চেতনভুবনে এনে হাজির করে। বলরামের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি ভজহরির নিদ্রা কেড়ে নেয়, গায়ে ধরায় অসীম জ্বালা; বর্ডার পুলিশের দৌরাত্ম্য আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের দাবানলে পুড়তে থাকে তার স্বপ্ন, তার সংসার। যদিও জাগতিক অর্থেÑ বিয়েশাদী করে সংসার পাতা হয়নি তার; আরেকটু গুছিয়ে ঘর করবার বাসনা বুকে বেঁধে এখন পৌঁচেছে চলিশবছরের যৌবনপ্রান্তে। আউলা-ঝাউলা হয়ে-ওঠা মানুষটাকে লোকে ভেবে বসেছে আধ্যাত্মিকশক্তি-পাওয়া কোনো বিশেষ মানুষ। ভগ্নমন ভজহরির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে লেখক আমাদের জানাচ্ছেন এসব তথ্যÑ

দোকানে এখন আর কর্মচারী নেই। দালাল ফড়ে’র দল ভিড় জমাতো আগে, এখন ওদের পাত্তা দেখা যায় না। শুধু আসে ফালতু লোক। কারো বউ-এর ছেলে হয় না, কারো সংসারে অশান্তি, কাউকে ভূতে পেয়েছেÑ শুধু এই ধরনের মানুষ। মারমূর্তি হয়ে তেড়ে আসে ভজহরি। এইসব উটকো বাজে লোকের জন্যে দোকানে গ্রাহক আসে না। তাই এইসব আজেবাজে ভিড়জমানো মানুষগুলোকে গালাগাল করে মারতে ওঠে। কিন্তু কেউ সরে না। আরো বিশ্বাস শক্ত হয়। মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চায়। ঠাকুরের কৃপার জন্যে ধন্না দিতে হয়, না দিলে ঠাকুর প্রসন্ন হন না, বিপন্মুক্তি হয় না। একথা কে না জানে! [পৃ. ৪৬]

সবকিছুর শেষ আছে; মানুষের জীবনেরও। আর যখন এই ভাবনা পেয়ে বসে কাউকে, তখন বোধকরি পৃথিবীর দৃশ্য-ব্যস্ততা কোনো বিশেষ অর্থ-তাৎপর্য বহন করে না; জ্যোৎøাপাওয়া অস্থিরতা তখন হয়তো মানুষের শরীরি অবস্থান নিয়ে দাঁড় করায় কোনো অব্যাখ্যেয় জীবনবোধে। এ গল্পের ভজহরিরও বোধকরি বর্তমান অবস্থা তা-ই। ঈশ্বরপ্রেম, প্রকৃতিলগ্নতা আর লৌকিকতাবিমুক্তি-আকর্ষণ গল্পটির পরিণতি-আবহ গড়ে এভাবে :

কৃষ্ণপরে চাঁদ কখনো ডোবেনি, পশ্চিম পাশে হেলে আছে। বৃষ্টি হয়নি আজ, তবে ঘাসের ওপরটা ভেজা ভেজা। শিশির পড়েছে হয়তো। ভজহরি দাস টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। প্রথমে রাস্তায়, তারপর জ্যোৎøালোকিত মাঠে। হেঁড়ে গলায় চিৎকার করতে লাগলো। বহু বিস্মৃত অতীতে শোনা একটা গানের অর্ধেকটা কলি।

শ্যাম গেছে বৃন্দাবনেÑ “সেই জ্যোৎøায় ভজহরি দাস মাঠের মাঝখানে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগলো। তখন সানাই থেমে গেছে বলরাম সাহার বাড়িতে। দাইমুদ্দিনের মা আর টেপু বর্মনের পোয়াতি বউ সারাদিন কান্না কান্তিতে মিইয়ে এসেছে।” [পৃ. ৪৯]

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায় সাঁওতালদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নারীপুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কচিত্র, ব্যক্তিগত আকর্ষণ-বিকর্ষণ, উৎপাদনমুখি কৃষ্যিবস্থার সাথে মানবপ্রজাতির বংশবৃদ্ধির প্রাকৃতিক সাদৃশ্যভাবনা, সংখ্যালঘু-আদিমদের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ফলত ধর্মান্তর শওকত আলীর ‘পুশণা’ গল্পের প্রাণবায়ু। কৃষিকাজ আর পশুশিকার সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রধান জীবিকা। কাজ আর সাংবাৎসরিক উৎসবাদি জড়িয়ে তাদের কালযাপনে আনন্দ-প্রাপ্তির লুকোচুরি খেলা। কান্তিমোচন আর উদ্যমসৃজনে তাদের ঐতিহ্যসংলগ্নতাকে গল্পকার রূপ দিয়েছেন এরকম বর্ণনায় :
ফসল তোলা শেষ হয়ে গেলে সবাই একদিন দলবেঁধে শিকারে চলো। জঙ্গলের মাঝখানে শিকার পোড়াও, সারারাত ধরে নাচগান হোক। তিতিরের রক্ত, ঘুঘুর রক্ত ঝরে পড়–ক মাটির বুকে। তাতে বুড়ো বোঙা তুষ্ট হবে। তখন আকাশ থেকে ‘দা’ ঝরে পড়বে অকৃপণ ধারায়। রু ধূসর মাটিতে সবুজ রঙ ফুটে উঠবে। তারপর শুরু হবে লড়াইÑ কালো মাটি আর কালো সাঁওতালে। মাটির নরোম গর্ভে বীজ ছড়িয়ে সাঁওতাল জোয়ান রাশি রাশি সোনার ফসল ঘরে তুলে আনবে। [পৃ. ৫০]

সাঁওতালরা মাটিকে নারীর মর্যাদা দেয়; মা আর স্ত্রীর মতো ঘরের লী আর উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু জানে। বনবাদারকে ভাবে আপন ভাই-এর সমান; যে ছায়া আর ফলমূলাদি প্রদান করে নির্বিকারচিত্তে। কাজেই এই সম্প্রদায়ের অশিতি আদিম মানুষ মাটি-জঙ্গলকে শ্রদ্ধা করে এক চিরআধুনিক বোধে। কিন্তু এই বিনত জাতিকে সময়ের দাবিতে পড়তে হলো মহাবিপদে; তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা আর সামাজিক অশিাকে পুঁজি করে, সহায়তার হাত প্রসারিত করার ছলে, মিশনের পাদ্রীরা দলে দলে তাদেরকে খ্রিস্টান বানাতে লাগলো। একটু আরামের আশায়, সামান্য স্বাচ্ছন্দ্যের আভাসকে আশ্রয় করে তাদের কেউ কেউ যোগ দিল জাতবিসর্জনের নোংরা আনন্দে। কিন্তু সাঁওতালদের বৃহত্তর অংশ, তাদের ধর্মীয় গুরু মারাং বুরুর শক্তিতে নিজেদের বলিয়ান করে সংগ্রাম করেছে নিজেদের পরিচিতি আর ঐতিহ্য রার প্রত্যয়ে। মাটি আর জঙ্গলে তারা শাদা মানুষদের ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করে, যুগ যুগ ধরে, আপন অধিকার সমুন্নত রেখেছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়; চক্রান্ত অব্যাহত রাখলো খ্রিস্টান পাদ্রীরা, কালক্রমে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী পড়লো অপ্রতিরোধ্য সংকটে, পৃথিবীর নানান ুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মতো, অনেক অসহায় অকৌশলী মানব¯প্রদায়ের মতো তাদেরকেও পড়তে হলো পরাজয়ের মহাস্রোতের করালগ্রাসে। এই সমাজসত্যের ক্যানভাস গল্পকার পাঠককে জানাচ্ছেন :

কিন্তু শত্রু যে ঘরে! সান্তালের ঘরে যে পাপ জন্মেছে। শত্র“কে তারা বলে দিলো পাহাড়ের কথা। জঙ্হলের কথা। তখন সাহেবেরা বাজের মতো হাতিয়ার নিয়ে পাহাড় ভাঙলো, জঙ্গল কেটে সাফ করে ফেললো। ভাই যখন মরলো তখন সাঁওতালের আর জোর কোথায়। হেরে গেল সাঁওতালেরা। [পৃ. ৫৩]

সভ্যতার অগ্রগমনে, নগরপত্তনের অন্তরালে, রয়েছে এমনই সব ভেতরবিপর্যয়ের করুণ ইতিহাস। আধুনিকতার পিঠে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আদিমতালোপাটের কড়া যন্ত্রণার দাগ। জমে আছে মানসিক অস্থিরতা আর হাহাকারের প্রবল বাতাস। আদিম উৎসবে নারীর কাছে পুরুষের আর্তি, পুরুষের কাছে নারীর হার্দিক আবেদন যেন উৎপাদনমুখি-বংশবিস্তারউন্মুখ প্রবণতাকে ধারণ করে আছে। যুবতী মেয়ের সেই আদিম হাসি, যুবকের বুকে-রক্তে উত্তাপের ঢেউ, সমাজপ্রধান বুড়ো গুপীনাথের দমেআসা মনে, আজও মোচড় জাগায়। সমাজভাঙনের আর মানবসম্প্রীতিবিনষ্টির শব্দ শুনতে থাকা, ছবি দেখতে থাকা বৃদ্ধ শেষরা করার জন্য হাকডাক ছুড়তে থাকে ক্রমাগত; একসময় বিকারগ্রস্ত আর অসাড় হতে হয় তাকে। কথাকারের ভাষ্য :

কিছুক্ষণ ঐভাবে নাম ধরে ধরে ডেকে ডেকে বলার পর শেষে গালাগাল আরম্ভ করে দিল। তার ভাঙা গলার চিৎকার তখন আর কেউ শুনছে না। তখন সে ছুটে যেতে চাইলো প্রবল আক্রোশ নিয়ে। কিন্তু পারলো না। উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগোতে না এগোতেই হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হলো তাকে। [পৃ. ৫৭]

একটা জাতির অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অন্য একটি মানবগোষ্ঠীর আগ্রাসি মনোভঙ্গি যে কতো সর্বনাশা হতে পারে, কী নির্মমভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে ুদ্র-অসহায় নৃগোষ্ঠীর অন্তরাত্মা-সমাজমানসভঙ্গি, তারই বিশ্বস্ত চিত্রভাষ্য বর্তমান গল্প।

মৃত্যুভাবনা, মানসিক বিভ্রম আর স্বপ্ন-আচ্ছন্নতার গল্প ‘তৃতীয় রাত্রি’। সার্কাসের খেলা-প্রদর্শনকারী দুই নরনারীর জীবনের নানান ঘটনাপ্রবাহ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর সে সবের পরিপ্রেেিত বিবর্তিত-আলোড়িত সমাজ-মনোবাস্তবতা বর্তমান গল্পের মূল ক্যানভাস। বিবৃতির পাটাতনে চিত্রিত হয়েছে সমকালীন প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংকট। মহামারী আর নরনারীর হৃদয়বৃত্তির প্রসঙ্গাদি এসেছে কাহিনীর প্রাণবস্তু হিসেবে। প্রায় সারাজীবন সার্কাসের মরণখেলা দেখিয়ে হাজার হাজার দর্শকের মন মাতিয়েছে যে কালু শেখ ওরফে সাজাহান ওস্তাদ, সে আজ বসন্ত রোগের আক্রমণে সত্যি সত্যি মরতে বসেছে। খেলা দেখাবার সময় বর্শার আঘাতে একবার মরবার উপক্রম হয়েছিল তার। আজ মৃত্যুশয্যায় কাতরাতে-থাকা সাজাহানের মনে পড়ে সেদিনের কথা, আর মনে জাগে অস্বস্তিকর এক বিভ্রম। গল্পকার শওকত আলী লিখছেন :

বাজনাটা হঠাৎ একসঙ্গে বেজে উঠেই ঝম করে বন্ধ হয়ে গেলো আর সাজাহান ওস্তাদ মাটিতে শুয়ে শুয়ে অনুভব করলো তার উরুতে তীব্র যন্ত্রণা। ত্রিফলা বর্শার ফলা বেঁধঅ উরুর তীব্র যন্ত্রণাটা এতোদিন পর সর্বঙ্গে ছড়িয়ে গিয়েছে। সেই যন্ত্রণাÑ কিন্তু জ্বালাটা কোথায়? সেই তীব্র আর প্তি জ্বালাটা কোথায় গেলো? [ পৃ. ৬০]

কলেরা-আক্রান্ত, সার্কাস দল থেকে বাদ-পড়া যুবতী কাননবালা আজ নিয়তির চক্রে সাজাহান ওস্তাদের সার্বণিক সঙ্গি। অবশ্য মহামারী তাকে কাবু করতে পারেনি। এখন সে দিনরাত সেবা করে চলেছে তারই সহযাত্রী-সহকর্মী সাজাহানকে। মনের জোর কিংবা টান কোনোটাই তার কম নয়। অন্যদিকে মনে মনে মরতে থাকা সাজাহান অবসন্ন দেহে ভাবতে থাকে ফেলে-আসা দিনের কথামালা-ঘটনারাজি। তার মনে পড়ে সার্কাসের সব সুন্দরী যুবতীদের টান-টান শরীর, শরীরের ভাঁজ আর ঢেউ। সেইসব রমণীদের অস্পষ্ট ছবি আর কাননবালাকে হারাবার ভয় তাকে বিচলিত করে, কান্ত করে। অবশ্য এরই মধ্যে সে নতুন দল গঠনের স্বপ্নও দেখে, যদিও তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আজ সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনেক বাধা। দিন বদলেছে, পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের চাহিদা আর জীবিকার ধরনের। নারীর সামাজিক অবস্থান-মনোভঙ্গিও আর আগের জায়গায় স্থির নেই। সার্কাসভুবনের ক্রম-বিলুপ্তি-পরিপ্রেতি আর শিল্পনির্ভর নগর-সংস্কৃতি বিকাশের ইঙ্গিত মেলে গল্পের এ অংশে :

গোল্ডেন সার্কাসও ভাঙছে। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা বৃথা। আজকাল আর সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী মেয়েরা সার্কাসে আসতে চায় না। কোম্পানিতে পয়সা বেশি। বাঙলাদেশে মাসের পর মাস ধরে বৃষ্টি পড়েÑ ভেজা মাটির ওপর ক্যাম্প খাটে শুয়ে থাকতে হয়। নিচে ব্যাঙের পিছু পিছু সাপ ঢুকে পড়ে, ব্যাঙে আর সাপের লুটোপুটি শব্দ হয়। [পৃ. ৬৪-৬৫]

মৃত্যুপথযাত্রী, জীবনের শেষপাদে দাঁড়িয়ে দুলতে-থাকা সাজাহানকে ঘিরে গল্পকার নির্মাণ করেছেন আশা-নিরাশার দোলাচলতা। সমাজ আর মানসিক অবস্থিতি তার ভাবনার ওঠানামার নিয়ামক যেন; সাজাহান নিয়তিতাড়িত এক অসহায় প্রেরিত-পথিক মাত্র। গল্পনির্মাতা প্রকৃতি আর পারিপার্শ্বের পরিচিত ছবি-বাস্তবতার আলোকে আঁকতে চেষ্টা করেছেন সার্কাসকর্মী দুই নরনারীর, পান্তরে জীবনের খেলা সমাপ্ত করতে-থাকা এক নিবিড় মানব যুগলের মানসিক বিভ্রমের চিত্রাবলি। প্রসঙ্গত, চরিত্রদুটির মনোবিকলন আর প্রত্যাশাঘেরা স্বপ্নযাত্রার দুটি উদ্ধৃতি :

এক. মনোবিকলন :
অদূরের শিমুল গাছ থেকে শকুন ছানার করুণ কান্না ভেসে এলো! কটা পেঁচা শ্মশান ঘরের ভাঙা দেয়ালের ফোকর তেকে হুপ হুপ শব্দ করে উড়ে চলে গেলো। কটা শেয়াল ডাকলো। তারা হুটোপুটি করছে নদীর ধারে। হয়তো কোনো মরা লাশের অবশিষ্ট খুঁজে পেয়েছে। [পৃ. ৬৭]

দুই. প্রত্যাশাঘেরা স্বপ্নযাত্রা :

কে জানে ভোর হতে কতণ বাকি। বারান্দার বাইরে শমশানের ওপর শীতের দীর্ঘরাত আর কয়াশা ঢাকা বিশাল আকাশ একাকার হয়ে আছে। উত্তরের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে নদীর ওপর দিয়ে। মেয়েটা অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে রাখলো। পঞ্চচূড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা আবার উত্তরের দিগন্তে ঝলমল করে উঠবেÑ যদি কাল আকাশ পরিষ্কার থাকে। [ পৃ. ৬৮]

শওকত আলী মনোবিকলনের গল্পনির্মাতা, সমাজ-অভ্যন্তরের গূঢ়তত্ত্ব বিশেষক। তিনি মানবসভ্যতা আর মানস-প্রবৃত্তির নিরাবেগ উপস্থাপক। তাঁর কাহিনী-পরিসরে আমরা পাই বাংলাদেশের উত্তর জনপদের দরিদ্র-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, ুদ্র নৃতাত্ত্বিক মানবসমাজের বৃত্ত ও সংস্কৃতি-সংশিষ্ট সমাজ-মনোভঙ্গি। তিনি এদেশের কথানির্মাণ-প্রকল্পে বিনত বর্ণনাকারী।

নারীর প্রতি পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত সমাজের অবহেলা-বঞ্চনা, ধর্ম ও ব্রতপালনে আস্থা-অনাস্থা আর মানসিক বিভ্রমের গহন-সন্ধানী কাহিনী ‘ব্রতযাত্রা’ গল্প। সমাজ-সংস্কার, লোকবিশ্বাস আর ধর্ম-আচারে আবৃত যে জীবন, তা রূপায়নে শব্দশিল্পী শওকত আলী এখানে প্রবল সতর্ক; যেন সমাজ-অভ্যন্তরে নীরবে লুকিয়ে-থাকা এক নিবিড় পর্যবেক তিনি। নানান অসুবিধা-অসুখ-অশান্তির বোঝা মাথায় নিয়ে কজন দরিদ্র গ্রামবাসী কান্তজীর মন্দিরের দিকে যাত্রা আরম্ভ করেছে, গল্পের শুরু এখান থেকেই। সমাজগতি আর মানব-প্রবৃত্তির একপ্রস্থ সাজিয়ে তোলেন গল্পনির্মাতা, কাহিনীর প্রায় প্রারম্ভেÑ

প্রথম প্রথম কথা বলছিল তারা, যখন যাত্রা শুরু করে তখন। বার চৌদ্দজন মানুষের একসঙ্গে যাত্র। গল্প হচ্ছিল দেশ-কালের কথা নিয়ে, জিনিসপত্রের দাম নিয়ে, কান্তজীর মাহাত্ম্য নিয়ে। এখন আর কেউ কথা বলছে না। এখন পিপাসার জ্বালা ধরেছে সবার বুকে, ুধা অসংখ্য সুচিমুখ হয়ে যন্ত্রণা দিচ্ছে পেটের ভেতরে। সম্মুখের আঁকাবাঁকা পথটা দেখে এখন মনে হচ্ছে, পথটা বুঝি ফুরোবে না কখনও। [পৃ. ৬৯]

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, ুধা-দারিদ্র, পারিবারিক-ব্যক্তিগত অশান্তি-অস্বস্তি, অসহায়তা আর কার্তিকের মাঠে রোদ-ছড়ানো প্রসন্নতাÑ এসবকে নিয়তির ঢাকনা দিয়ে ছায়ার নরম প্রলেপ লাগাতে চান শওকত আলী; ব্যথাক্রান্ত মানবশিশুর গায়ে যেন মাখেন কষ্ট-নিবারক সুগন্ধী মলম। লীলাবতী-ফুলমণি ঘরে-বাইরে দুই নীরব-নির্বিবাদী রমণী; নিখোঁজ স্বামীর অপোয় অফুরন্ত প্রহর গুনতে-থাকা সংসারী নারী। দাদিশ্বাশুরির আগ্রহে কান্তজীর মন্দিরের উদ্দ্যেশ্যে তাদের যাত্রা। কিন্তু তাদের ধারণা, এমনকি বিশ্বাসও বলা চলে, তাদের হারিয়ে-যাওয়া স্বামী আর ফিরবে না। নিয়তিতে আস্থাশীল লীলাবতী আর কান্তজীর মাহাত্ম্যে-বিশ্বাসী ফুলমণির কথোপকথন থেকে আমরা পেতে পারি ভাগ্যচক্রের ধারণা :

দাদী, কপাল বলে একটা জিনিস আছে, না?

হ্যাঁ, তাতে কী?

কপাল যার ভগবান পুড়িয়ে দিয়েছে, তার কপাল কি মানষ আবার বানিয়ে দিতে পারবে? [পৃ. ৭৩]

মানব-মনের দুরতিক্রম্য রহস্য আর অসীম স্বপ্নময়তার জাল আজও অনুদ্ঘাটিত; সমাজ-মনস্তত্ত্ব কিংবা বিজ্ঞান এসবের কোনো সঠিক হদিস বের করতে পারেনি। শিল্পকলায়ও আভাস-চিত্রে বিফল চেষ্টা-তদ্বির কিছুটা হয়েছে। মন যা চায়, তার কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়নি আজ-অব্দি। এই অব্যাখ্যেয় মানোসমীার উলেখ আমরা পাই, বর্তমান গল্পের একটি অংশে। প্রকৃতির রূপে আর রূপবদলের মোড়কে গল্পকার বানিয়েছেন মানসিক-বিভ্রান্তির সে ছবি :

দূরে দূরে হেমন্ত-সন্ধ্যার ধূসর কুয়াশা। ধানেেতর ওপর দিয়ে কাঁচা ধানের গন্ধ ভাসছে। পেছনে খালের সাঁকোর ওপর থেকে একটা মাছরাঙা চিৎকার করে ডেকে উঠলো। [পৃ. ৭৪]

কৃষি-উৎপাদননির্ভর ও গ্রামপ্রধান এদেশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পালা দিয়ে বাড়তে থাকে প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। খরা মোকাবেলা আর পানীয় জলের প্রতিকূলতা দূর করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় সেচ-আন্দোলন। নলকূপ স্থাপন, কৃষিজোয়ার আর তদকেন্দ্রিক সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং অনাচারের বাস্তব-অন্বেষা শওকত আলীর ‘জানোয়ার গল্প’। গল্পকার তাঁর কাহিনীভূমি উত্তরবঙ্গের কৃষকদের সামাজিক-পারিবারিক-মানসিক সংকটকে আঁকতে গিয়ে ক্যানভাস হিসেবে নির্বাচন করেছেন জমি-সেচ-উৎপাদন পরিপ্রেতি। লিখছেন :

‘উত্তরের দেশে উঁচু ডাঙা জমি বাঁজা হয়ে আছে। মাটির নিচেকার পানি যদি উপরে তুলে আনা যায়, তাহলে এই বিবর্ণ নিষ্ঠুর শুকনো মাইলের পর মাইল জুরে বিস্তৃত বাঁজা জমি ফুলে ফসলে হেসে উঠবে। সেলিম সাহেব যন্ত্র বসিয়ে জমি ফুঁড়ে নিচের মাটি তুলে পরীক্ষা করে দেখছে- পানি কত নিচে। কত নিচে হাত বাড়ালে তবে পাওয়া যাবে অগাধ পিপাসার পানি। লোকটা সেই হেসেবের জন্যই এখানে ক্যাম্প করেছে।’ [পৃ. ৮০]

সেলিম নামক এই কোম্পানিকর্তাকে ঘিরে এ অঞ্চলে জমে ওঠে জমীর চৌধুরীর কন্ট্রাক্টরি ব্যবসার পরিকল্পনা এবং ফায়দা আদায়ের নেশায় নানান ফন্দি-ফিকির।

কথাশিল্পী শওকত আলী বলেছেন : “তারাশঙ্করের উপন্যাসে সাঁতার কেটেছি তো বিভূতিভূষণের উপন্যাসে ডুবসাঁতার কাটতে হয়েছে-  দুটোই সানন্দ সন্তরণ”। আর এভাবেই হয়তো তাঁর গল্পে জীবনকে গভীরভাবে দেখার এবং উপলব্ধি করার বিষয়াদি প্রবেশ করেছে। অতীতের জীবন যেমন প্রায় অনুপুঙ্খ ফুটে ওঠে তাঁর লেখায়, তেমনি বর্তমানের বাস্তবতাও বহুমাত্রিকভাবে তাঁর রচনায় ধরা পড়ে। তৃণমূলের অপরাজেয় সংগ্রামী মানুষদের বিদ্রোহী তারুণ্যের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাহিনী তিনি নির্মাণ করেছেন সাফল্যের সাথে; শোষক ও শোষিতের বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের কথা বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। শওকতের কাহিনীতে ভালোবাসা ঘৃণা ক্রোধ পরতে পরতে চরিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গ করে তোলে।

শওকত আলী নিুবিত্ত মানুষের অন্তরঙ্গ কথাশিল্পী। তাঁর কাহিনী-পরিকল্পনা ও পরিবেশন কায়দায় সর্বদা জায়গা করে নেয় সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের আর্তি আর চাহিদার কথা; তাদের সমাজ-মনস্তত্ত্বকে প্রতিভাত করতে গিয়ে কথাকার আশ্রয় করেছেন অভিজ্ঞতা আর অনুভব-জ্ঞানের ওপর। মানুষের স্বপ্ন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্বপ্ন এবং পরিপ্রেেিতর আলোকে জীবনবীা শওকত আলীকে প্রনোদনা দেয় অবিরত। আর তখন তিনি লিখতে থাকেন মনের ভেতরে জমতে থাকা অনুভূতিমালা। শওকত আলী তাই আমাদের অনুভূতি বিবরণের শিল্পী; সমাজ প্রোপটে আমাদের মানস-পরিভ্রমণের লিপিকার।


বাংলাদেশ সময় ০০৫০, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2011-02-11 14:49:00