ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ শ্রাবণ ১৪৩১, ১৬ জুলাই ২০২৪, ০৯ মহররম ১৪৪৬

কৃষি

হাজারো প্রজাতির গাছের সমাহার জাতীয় বৃক্ষ মেলায়

সুব্রত চন্দ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১১৬ ঘণ্টা, জুন ৮, ২০২৪
হাজারো প্রজাতির গাছের সমাহার জাতীয় বৃক্ষ মেলায়

ঢাকা: গাছে গাছে ঝুলে আছে সুমিষ্ট ফল আম। শুধু এক জাতের নয়।

নানা রঙের, নানা ধরনের বিভিন্ন জাতের আম ঝুলছে গাছে। আম ছাড়াও দেখা মিলছে কাঁঠাল, লিচু, লটকন, বেলসহ নানা প্রজাতির ফলের। তবে এসব ফল খেতে হলে ক্রেতাকে কিনতে হবে পুরো গাছ। চাইলে কেনা যাবে ওই প্রজাতির ফলের গাছের চারাও। এমন সব ফলজ গাছের পাশাপাশি বনজ, ওষুধি ও সৌন্দর্যবর্ধক হাজারো প্রজাতির গাছের সমাহারে ভরে উঠেছে জাতীয় বৃক্ষ মেলা।

গত ৫ জুন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (বিআইসিসি) সংলগ্ন মাঠে শুরু হয়েছে জাতীয় বৃক্ষ মেলা- ২০২৪। ওইদিন মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  

‘বৃক্ষ দিয়ে সাজাই দেশ, সমৃদ্ধ করি বাংলাদেশ' শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে মেলা প্রাঙ্গণ। মেলায় ঢুকতে লাগবে না কোনো প্রবেশ ফি। এমনকি মেলায় আগত দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার জন্যও লাগবে না কোনো পার্কিং ফি। মেলার মূল গেটের পাশে নিজ দায়িত্বে রাখা যাবে ব্যক্তিগত গাড়ি।

শনিবার (৮ জুন) মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, ১২০টি স্টলের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ৮০টি প্রতিষ্ঠান ও নার্সারি এবারের বৃক্ষ মেলায় অংশ নিয়েছে। মেলায় ঢাকার নার্সারির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নার্সারিগুলোও নিজেদের গাছের প্রদর্শনী ও বিক্রি করছে।

ফলজ গাছের মধ্যে দেখা মিলছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, ডুমুর, বেল, খেজুর, কলা, লেবুসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ফল। আছে বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি ফল গাছও। কিছু কিছু গাছে ফলও দেখা গেছে। এর মধ্যে ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করছে ব্রুনাই কিং জাতের আম গাছ। কয়েক ফুট উচ্চতার এসব গাছে ৩-৫ কেজি ওজনের আমও আছে। ছোট ছোট কাঁঠালের মুচিও দেখা গেছে গাছে।

বনজ গাছের মধ্যে মেহগনি ও বটসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ রয়েছে বৃক্ষ মেলায়। বিভিন্ন জাতের ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছও শোভা বাড়াচ্ছে মেলার। আছে ক্যাকটাস, পাতাবাহারসহ বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট। এসব গাছের মধ্যে দর্শনার্থীদের সবচেয়ে আকর্ষিত করছে বিভিন্ন প্রজাতির বনসাই। বেগুন-মরিচসহ নানা ধরনের সবজি গাছও পাওয়া যাচ্ছে এই মেলায়।

মেলায় গাছের পাশাপাশি বীজ, সার, মাটি, টব, অর্গানিক খাদ্যপণ্য, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, টব বা গাছ রাখার বিভিন্ন আসবাবপত্রও প্রদর্শনী ও বিক্রি করা হচ্ছে।

মেলা এখনো পুরোপুরি জমে না উঠলেও দর্শনার্থীর সংখ্যা নেহাতই কম নয়। সকাল থেকেই অসংখ্য বৃক্ষপ্রেমীকে মেলায় ঘুরতে ও গাছ কিনতে দেখা গেছে। তবে বিক্রেতারা বলছেন, মেলার শুরুর তুলনায় মাঝামাঝি বা শেষের দিকে বেশি কেনা-বেচা হয়।

মেলায় অংশ নেওয়া আশুলিয়া গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী মজিদ সর্দার বলেন, আমাদের কাছে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির গাছ রয়েছে। সামনের আরও গাছ আনা হবে। মেলার শুরু থেকেই মোটামুটি দর্শনার্থী আসছে। তবে কেনা-বেচা হবে মেলার মাঝামাঝি সময়ে। এখন যারা আসছে তাদের বেশিরভাগই গাছ দেখতে আসছে।

গ্রিনল্যান্ড নার্সারির বিক্রয়কর্মী নূরে আলম বলেন, আমাদের কাছে ৪০০-৫০০ জাতের গাছ রয়েছে। সামনে ঈদ হওয়ায় এখন তেমন কেনা-বেচা নেই। শেষের দিকে কেনা-বেচা ভালো হবে আশা করি।

মেলায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য কি জানতে চাইলে রেনোভা নার্সারির স্বত্বাধিকারী ফাতেমা বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ কতটা জরুরি সেটি বর্তমান প্রজন্মকে বোঝানোর জন্যই এই মেলায় অংশ নেওয়া। আমাদের স্টলে আউটডোর প্ল্যান্টের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উপকারী ইনডোর প্ল্যান্ট রয়েছে। আমরা আমাদের স্টলে আসা দর্শনার্থীদের বোঝাচ্ছি ইনডোর প্ল্যান্ট মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী। যদিও এখন পর্যন্ত তেমন ভালো বেচাকেনা হয়নি। তবে আশা করি মেলার শেষের দিকে ভালোই বেচাকেনা হবে।

এদিকে বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণি-পেশার মানুষদের বৃক্ষ মেলায় ঘুরতে দেখা গেছে। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছেন, তো কেউ এসেছেন একা। দেশি দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি দর্শনার্থীদের মেলায় ঘুরতে দেখা গেছে। তারা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্টলের গাছ দেখছেন, বিক্রেতাদের কাছ থেকে সেগুলো সম্পর্কে জানছেন এবং গাছ কিনছেন।

চার ও ছয় বছরের দুই ছেলেকে নিয়ে মেলায় এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মামুন আব্দুল্লাহ। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, মেলায় আসার উদ্দেশ্য ছেলেদের গাছ দেখানো এবং সেগুলোর সঙ্গে পরিচয় করানো। তারা হয়তো বিভিন্ন ধরনের ফল খাচ্ছে, কিন্তু সেই ফল গাছ কেমন তা জানেনা। এই মেলায় তারা বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে। মেলায় ঘুরে তারা বেশ মজাও পাচ্ছে।

বৃক্ষ মেলায় একা এক ঘুরতে এবং গাছ কিনতে এসেছেন শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের চিকিৎসক মাহিম মুনতাকিম। তিনি বলেন, আমি ছাদ বাগান করি। তাই নিজের বাগানের জন্য কিছু গাছ কিনতে মেলায় এসেছি। কিন্তু মেলায় গাছে অনেক দাম চাচ্ছেন বিক্রেতারা। যে ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট আমি সাধারণ নার্সারি থেকে মাত্র ২০০ টাকায় কয়দিন আগে কিনলাম, সেটি এখানে দুই হাজার টাকা চাচ্ছেন বিক্রেতারা। এটি হতাশাজনক। এমন দাম চাইলে হয়তো গাছ কেনা হবে না। তবে ভালো অভিজ্ঞতা হবে। কারণ এখানে অনেক গাছ আছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন ওয়াহিদ। তিনি মেলা থেকে একটি বেগুন গাছ, একটি মরিচ গাছ ও কিছু ফুলের গাছ কিনেছেন। সাধারণ নার্সারি বাদ দিয়ে বৃক্ষ মেলায় আসা ও গাছ কেনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ নার্সারিতে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ পাওয়া যায়। কিন্তু বৃক্ষ মেলায় অনেক প্রজাতির গাছ রয়েছে। দশটি নার্সারির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রয়েছে, বেশি জানার সুযোগ রয়েছে। তাই এখানে ঘুরতে ও গাছ কিনতে এলাম।

বৃক্ষ মেলার তথ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা মেলে বন বিভাগের ওয়াইল্ড লাইফ ফরেনসিক ল্যাব, ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের সিনিয়র ল্যাব টেকনিশিয়ান (ল্যাব ইনচার্জ) কনক রায়ের সঙ্গে। মেলার সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, মানুষ যাতে গাছ সম্পর্কে জানতে পারে, গাছ কেনায় উদ্বুদ্ধ হয় তাই প্রতি বছর বন বিভাগ জাতীয় বৃক্ষ মেলার আয়োজন করে। তারই ধারবাহিকতায় এই বছর ৫ জুন বৃক্ষ মেলা শুরু হয়েছে। এই মেলার মূল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে গাছের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা এবং গাছ কেনায় উৎসাহিত করা। পাশাপাশি এই মেলায় হাজারো প্রজাতির গাছ থাকায় মানুষ সেগুলো সম্পর্কে জানতে পারছে।

মেলায় কেমন দর্শনার্থী ও ক্রেতা আসছে এবং কেমন কেনা-বেচা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাত্র তো মেলা শুরু হলো। এখনো অনেক বেশি দর্শনার্থী যে আসছে তা বলা যাবে না। তবে এই দুইদিনেই অনেক মানুষ মেলায় ঘুরতে আসছেন। ৫ ও ৬ জুন এই দুই দিনে প্রায় ৪১ হাজারের অধিক গাছ বিক্রি হয়েছে, এর মূল্য প্রায় সাড়ে ২০ লাখ টাকা। সাধারণত মেলার শেষের দিকে দর্শনার্থী ও কেনা-বেচা বাড়ে।

মেলায় গাছের দাম অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে ক্রেতাদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা মেলায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের নিজস্ব বিষয়। আমরা দাম নির্ধারণ করে দিতে চাই না। ক্রেতাদের দেখে-শুনে গাছ কিনতে হবে।

বাংলাদেশ সময়: ২১১৬ ঘণ্টা, জুন ০৮, ২০২৪
এসসি/এএটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।