bangla news

ফার্মাসিস্ট ও দেশের স্বাস্থ্যসেবা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৩-০৪-০৯ ৪:৪৪:১৮ এএম

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির পর স্বল্প সময়ে আমাদের দেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। বর্তমানে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ৮৭টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হচ্ছে যা অত্যন্ত গৌরবের।

ঢাকা: স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির পর স্বল্প সময়ে আমাদের দেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। বর্তমানে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ৮৭টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হচ্ছে যা অত্যন্ত গৌরবের।

এজন্য আমাদের দেশের মেধাবী ফার্মাসিস্টরা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

১৯৮২ সালে যেখানে কয়েকটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি দেশের মোট ওষুধ বাজারের ৭৫% নিয়ন্ত্রণ করত, এখন সেখানে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে ৮৮% বাজার, আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে ৭% বাজার। বাকি মাত্র ৫% ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।

১৯৮২ সালের আগে ৭০% ওষুধ আমদানি করতে হতো। বাংলাদেশ এখন ওষুধ আমদানিকারক দেশ থেকে রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। আমরা আশা করতেই পারি যে, এখন থেকে বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণটি ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।

১৯৮১ সালে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি টাকা । ১৯৯১ সালে এই বিক্রির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫ কোটি টাকা। ২০১০ সালে স্কয়ারের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা এবং বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ১৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ১৯৮১ সালে ব্যবসা করে ৫ কোটি টাকা এবং ২০১০ সালে এই বিক্রির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৫৬৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে অবস্থানকারী ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালসের ২০১০ সালে বাৎসরিক বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬১১ কোটি টাকা। ২০১১ সালে এই বিক্রির পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা যায়।

ফার্মাসিস্ট বা ওষুধ বিশেষজ্ঞ হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি ফার্মেসি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বিধিবদ্ধ সংস্থা বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে ফার্মেসি পেশা চর্চার জন্য নিবন্ধন পেয়েছেন।

একজন ফার্মাসিস্ট নতুন ওষুধ আবিষ্কার থেকে শুরু করে রোগী কর্তৃক ব্যবহার পর্যন্ত যেকোন প্রকার কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেন।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবার পর পূর্ব বা পশ্চিম পাকিস্তানের কোথাও ফার্মেসি শিক্ষার কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ফার্মেসি বিভাগ খোলা হলেও পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালের ১ জুলাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য যার সক্রিয় উদ্যোগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে , তিনি হলেন ফার্মেসি বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আবদুল জব্বার। তবে ১৯৬৭ সালে ফার্মেসি বিভাগ থেকে প্রথম বি.ফার্ম ব্যাচটি বের হলেও তারা কোথাও চাকরি পাচ্ছিলেন না। ফলে প্রথম দিককার ফার্মাসিস্টদের একটি বিশাল অংশ দল বেঁধে বিদেশ চলে যেতে থাকেন। কারণ দেশে চাকরি না পেলেও ইউরোপ ও আমেরিকায় ফার্মাসিস্টদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। অন্যদিকে ওষুধ সংক্রান্ত আইন-কানুনের শক্ত উপস্থিতি না থাকায় দেশে ফার্মাসিস্টদের চাকুরির নিশ্চয়তা এবং ওষুধের গুণগত মানের সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান ছিল না।

পরবর্তীতে যখন ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান “ফার্মেসি অধ্যাদেশ” জারির মাধ্যমে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ “ওষুধ (নিয়ন্ত্রন) অধ্যাদেশ” জারির মাধ্যমে যখন জাতীয় ওষুধ নীতি ঘোষণা করেন, তখন ১৩ নং ধারায় ওষুধ কোম্পানিগুলোতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়।

এরপর শুধুই সাফল্যগাঁথার ইতিহাস স্থাপন করেছেন ফার্মাসিস্টরা। তারা যেখানেই গেছেন সেখানেই তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

ফার্মেসি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশে ‘এ’ গ্রেডের ফার্মাসিস্টের সংখ্যা ২৭৬০ জন। ‘বি’ গ্রেডের ৮১৬৭ এবং ‘সি’ গ্রেড ফার্মাসিস্টের সংখ্যা প্রায় ৩০,০০০ জন।

‘বি’ গ্রেডের ফার্মাসিস্ট বিভিন্ন ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ‘সি’ গ্রেডের ফার্মাসিস্টরা ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানে কাজ করেন।

তবে হতাশাজনক বিষয় এই যে, ‘এ’ গ্রেডের ফার্মাসিস্টরা হাসপাতালগুলোতে তাদের সেবাদানের সুযোগ পাচ্ছেন না। ২০০৬ সালের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে হাসপাতালের সংখ্যা ১৬৮৩-এর মধ্যে ৬৭৮টি সরকারি এবং ১০০৫টি বেসরকারি। দেশের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার, নার্সদের পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট থাকার কথা থাকলেও স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও আমরা এ সংস্কৃতিটা চালু করতে পারিনি। অন্যদিকে এলোপ্যাথিক কোম্পানিতে ফার্মাসিস্ট থাকলেও হোমিওপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক, ইউনানী এবং হারবাল জাতীয় ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোতে ফার্মাসিস্টের সংখ্যা মাত্র হাতেগোনা।

উন্নত বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে সম্পাদন করেন ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট ও নার্স। তাই স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে এদেশের ফার্মেসি সেবার মান বাড়ানো অতীব জরুরি, তা না হলে স্বাস্থ্যসেবা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে না।

এ দেশের হাসপাতালগুলোতে ফার্মেসি সেবা বলতে বোঝায়, বাজার থেকে ওষুধ সংগ্রহ করা এবং ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীর কাছে হস্তান্তর করা। এটা খুবই আনন্দদায়ক ও আশার বিষয় যে এদেশের বেসরকারি হাসপাতাল, যেমন স্কয়ার, ইউনাইটেড, অ্যাপোলো কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই উন্নত মানের ফার্মেসি সেবা দানের জন্য ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করছে।

এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ওষুধ বিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর ড. আব্দুর রশীদ এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেনÑ “আমাদের মনে রাখতে হবে যে, স্বাস্থ্য পেশাজীবি হিসেবে ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং নার্স এই চার শ্রেণীর পেশাজীবির পূর্ণাঙ্গ টিম যতদিন না গঠিত হবে, ততদিন জনগণের জন্য কল্যাণকর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সম্ভব হবে না।”

বিশেষজ্ঞ ফার্মাসিস্টরা চিকিৎসার জন্য ওষুধ ব্যবহার সংক্রান্ত জটিলতার সমাধান, ওষুধের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার নজরদারি ও প্রতিরোধকরণে বিশেষ পারদর্শী। সর্বোপরি রোগীর চাহিদা অনুযায়ী ফার্মেসি সেবা প্রদান করতে হলে ফার্মাসিস্টের কোন বিকল্প নেই।

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে ভালো ফার্মাসিস্ট ছাড়া সঠিক গুণগত মানের ওষুধ উৎপাদন অসম্ভব। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ফার্মেসি বিভাগ খোলা হলেও বর্তমানে দেশের অনেকগুলো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি পড়ানো হচ্ছে। এই বিভাগগুলো দেশের ওষুধ শিল্পকে নিয়মিতভাবে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করছে। পৃথিবীর অনেক দেশই যেখানে ফার্মাসিস্টদের অভাবে তাদের ওষুধ শিল্পকে বিকশিত করতে পারছে না সেখানে দক্ষ জনশক্তি ও বিদেশ থেকে এদেশে প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।

তাই ওষুধের গুণগতমান ও সঠিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি সব ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি নিশ্চিত করা উচিত।

লেখক পরিচিতি: নিবন্ধটির লেখক মো.আরিফুর রহমান ফাহিম দেশের প্রখ্যাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

বাংলাদেশ সময়: ১৪৩০ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৯, ২০১৩
সম্পাদনা: রাইসুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2013-04-09 04:44:18