ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ ভাদ্র ১৪২৬, ২২ আগস্ট ২০১৯
bangla news

দেখা মিললো হিগস পার্টিকেলের!

2117 |
আপডেট: ২০১৫-০৫-১৫ ১২:১০:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের (European Organization for Nuclear Research-সার্ন) লার্জ হেড্রোন কোলাইডরের (এলএইচসি) এক দশকের গবেষণায় অবশেষে দেখা মিললো বিরল পদার্থের; যাকে বলা হচ্ছিল- ‘হিগস পার্টিকেল’, ‘হিগস-বোসন পার্টিকেল’ কিংবা ‘গড’স পার্টিকেল’।

ঢাকা: ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের (European Organization for Nuclear Research-সার্ন) লার্জ হেড্রোন কোলাইডরের (এলএইচসি) এক দশকের গবেষণায় অবশেষে দেখা মিললো বিরল পদার্থের; যাকে বলা হচ্ছিল- ‘হিগস পার্টিকেল’, ‘হিগস-বোসন পার্টিকেল’ কিংবা ‘গড’স পার্টিকেল’। এটি আন্তঃআণবিক কণা।

সার্নের বিজ্ঞানীরা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রকল্প ‘ঈশ্বর কণা’র খোঁজ করছিলেন অনেকদিন ধরেই। তারা তাত্ত্বিকভাবে ধারণা করছিলেন এমন একটি পদার্থ আছে, যা আমাদের পৃথিবী, সৌরমণ্ডলসহ বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা আরো ধারণা করছিলেন, এই ‘ঈশ্বর কণা’ই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তারা তা বাস্তবে প্রমাণ করতে পারছিলেন না।

নতুন এই ‘হিগস পদার্থ’(ঈশ্বর কণা)-এর আবিষ্কার পৃথিবীসহ সৌরমণ্ডল ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি রহস্যের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে বলে সার্নের বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন। তারা জানাচ্ছেন, এর মাধ্যমে ‘মানবপ্রজাতি কেন পৃথিবীতে’, তার রহস্যও জানা যেতে পারে। 

এই সপ্তাহে সার্নের বিজ্ঞানীরা পৃথক দুটি গবেষণার মাধ্যমে এই আন্তঃআণবিক কণার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন।

এ পদার্থ আবিষ্কারের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎফুল্ল সাইরেকজ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী শেলডন স্টোন এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, এই পদার্থ আসলেই অদ্ভুত। আমরা যা অনুমান করেছিলাম, এ পদার্থ ঠিক সেই রকম। শুধু তাই-ই নয়, আমরা যতটুকু রোমাঞ্চিত হবো বলে ভেবেছিলাম, তার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চিত হয়েছি আমরা।

তিনি বলেন, এটি সার্ন ও গবেষণার জন্য বড় ধরনের অর্জন বা সাফল্য।

সার্ন (সার্ন):
ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ (সার্ন) পৃথিবীর অন্যতম সেরা গবেষণাগার। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিষয়ক এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমানা ঘিরে। সার্ন জেনেভা শহরের পশ্চিমে ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড-এর মধ্যকার সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ কণা পদার্থবিজ্ঞান (Particle Physics) গবেষণাগার।

সার্নকে বলা হয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের (www) জন্মস্থান। মূলত এখান থেকেই ইন্টারনেটের বিকাশ শুরু হয়।

সার্নে ‘ঈশ্বর-কণা’ নামে পরিচিত ‘হিগস–বোসন কণা’র অস্তিত্ব প্রথম প্রমাণিত হয়, যার জন্য ২০১৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ত ও পিটার হিগস।

১৯৫৪ এর সেপ্টেম্বর ২৯-এ অনুষ্ঠিত এক সভায় সার্ন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি স্বাক্ষরিত হয়। প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের সংখ্যা শুরুতে মাত্র ১২ থাকলেও বর্তমানে এই সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে ২০-এ দাঁড়িয়েছে।

সার্ন-এর আদি নাম ফরাসি ‘কোঁসেই ওরোপেয়ঁ পুর লা রেশের্শে ন্যুক্লেয়্যার’ (Conseil Européen pour la Recherche Nucléaire)-এর আদ্যক্ষর চতুষ্টয় c, e, r, ও n থেকেই CERN বা সার্ন নামের উৎপত্তি।

সার্নে ‘ঈশ্বর-কণা’ নামে পরিচিত ‘হিগস–বোসন কণা’র অস্তিত্ব প্রথম প্রমাণিত হয়, যার জন্য ২০১৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ত ও পিটার হিগস।

লার্জ হেড্রোন কোলাইডর  (Large Hadron Collider- LHC) পৃথিবীর বৃহত্তম কণা ত্বরক। ৯ টেরা-ইলেকট্রন ভোল্টের প্রোটনসমৃদ্ধ রশ্মির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানোর জন্য এটা তৈরি করা হয়েছে।

এ ধরনের সংঘর্ষ ঘটানোর মূল উদ্দেশ্য প্রমিত মডেলের সত্যতা ও সীমাবদ্ধতা নির্ণয় করা। কণা পদার্থবিজ্ঞানে বর্তমানে এই প্রমিত মডেলই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।

এলএইচসি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী কণা ত্বরক। ৮৫টি দেশের ৮০০০-এরও বেশি বিজ্ঞানী এই ত্বরক নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করেছেন। এছাড়া অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগার এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছে।

২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো পুরো এলএইচসি-তে প্রোটন রশ্মি চালনা করা হয়। এর আগে ৮-১১ আগস্টের মধ্যে এতে প্রাথমিক কণা রশ্মি ঢোকানো হয়, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে ১.৯ কেলভিনে (-২৭১.২৫° সেলসিয়াস) নামিয়ে আনা হয়। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটানো হয়, ২১ অক্টোবর। তাই, ২১ অক্টোবরকেই এলএইচসি’র উদ্বোধন দিবস বলা হচ্ছে।

এর আগেও অনেকগুলো হেড্রোন-কোলাইডর তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এলএইচসি-র মতো অন্য কোনোটিই এত আলোচিত হয়নি। এর কারণ, এলএইচসি’র উচ্চশক্তি। এর মধ্যকার সংঘর্ষের মাধ্যমে মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন বা মহাবিষ্ফোরণের ঠিক পরের শর্তগুলো তৈরি করা যাবে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। অবশ্য এক্ষেত্রে শর্তগুলো খুব ছোট স্কেলে কাজ করবে।

অনেকেই এই পরিকল্পিত পরীক্ষার নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন, এর মাধ্যমে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু বিজ্ঞানী মহল় এ ধরনের কোনো নিরাপত্তাহীনতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সফলভাবোই গবেষণাটি পরিচালনা করেন।

নির্মাণের কারণ:

পদার্থবিজ্ঞানীগণ লার্জ হেড্রোন কোলাইডরের মাধ্যমে পদার্থ বিজ্ঞানের কিছু মৌলিক প্রশ্নের ঊত্তর খুঁজে পাওয়ার আশা করছেন; যার মধ্যে মৌলিক কণা, স্থান ও সময়ের গঠন, এই মহাবিশ্ব পরিচালনার মৌলিক নিয়মের সমন্বয়, বিশেষত কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং জেনারেল রিলেটিভিটির সেই সব জায়গা, যেখানে জ্ঞান অজানা, অস্বচ্ছ। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের ঊত্তরের আশায় লার্জ হেড্রোন কোলাইডর নির্মিত। যেমন- হিগস মেকানিজমে বর্ণিত ইলেক্ট্রোউইক সিমেট্রি ব্রেকিং পদ্ধতিতে কি মৌলিক কণার ভরসমূহ আদৌ পাওয়া সম্ভব কিনা;

- লার্জ হেড্রোন কোলাইডর দিয়ে আশা করা হচ্ছিল যে, এটি পদার্থ বিজ্ঞানের সোনার হরিণ ‘হিগস বোসন’ বা ‘ঈশ্বর কণা’র অস্তিত্ব প্রমাণ করবে বা বাদ দেবে; যার ফলে পুরো সাধারণ মডেল বাতিল বলে গণ্য হবে।

- সুপার সিমেট্রি যা সাধারণ মডেলের একটি বর্ধিত অংশ এবং পোইনকেয়ার সিমেট্রি (Poincaré symmetry), যা প্রকৃতিতে দেখা যায়। তারমানে কি সব জ্ঞাত কণার সুপারসিমেট্রিক জোড়া আছে?

- স্ট্রিং থিওরির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন মডেল যে অতিরিক্ত ডাইমেনশনের ভবিষ্যৎ বাণী করেছে, তা আদৌ আছে কিনা; কিংবা থাকলে আমরা কি তা আলাদাভাবে নির্ণয় করতে পারি?

- ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter)-এর ধর্ম কী, যার পরিমাণ মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৩ শতাংশ।

অন্যান্য প্রশ্নগুলো হচ্ছে-

- তড়িৎচৌম্বক বল, সবল নিউক্লিয়ার বল এবং দুর্বল নিউক্লিয়ার বল কি আসলেই একটি একত্রিত বলের বিভিন্ন প্রকাশ, যেমনটি পূর্বকল্পিত আছে গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন থিওরি মতে?

- কেন মহাকর্ষ অন্যান্য মৌলিক বলের তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল?

- আর কি কোনো কোয়ার্ক মিশ্রণ (Quark Flavor Mixing ) আছে সাধারণ মডেলের বাইরে?

- কেন পদার্থ এবং প্রতি-পদার্থের সিমেট্রির (Matter & Anti-Matter Symmetry) মধ্যে গরমিল দেখা যায়?

- মহাবিশ্বের প্রারম্ভে কোয়ার্ক-গ্লুওন প্লাজমার (Quark-Gluon Plasma) ধর্ম কী রকম ছিল?

হিগস কণার প্রাপ্তির পর এরপর সার্নের বিজ্ঞানীরা এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন।

আর হয়ত বেশিদিন লাগবে না যে, মানুষ কীভাবে পৃথিবীতে এলো, পৃথিবী, সৌরমণ্ডলসহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, এ সবের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে।

বাংলাদেশ সময়: ২২০৮ ঘণ্টা, মে ১৫, ২০১৫
এবি

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
db 2015-05-15 12:10:00