ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ মাঘ ১৪২৮, ২০ জানুয়ারি ২০২২, ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৮

ব্রাজিল সবসময়ই ফেভারিট, তবে আর্জেন্টিনাও ভালো করবে...

জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৬৩৪ ঘণ্টা, জুন ৭, ২০১৮
ব্রাজিল সবসময়ই ফেভারিট, তবে আর্জেন্টিনাও ভালো করবে... পেলের সাক্ষাৎকার

[কড়া নাড়ছে রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮। ‘সর্বকালের সেরা’, ‘ফুটবল জাদুকর’ ‘ফুটবলের কালা মাণিক’ –এমন নানা অভিধায় ভূষিত এদসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। সবাই যাকে ‘পেলে’ বলে একনামে চেনে। যদিও ‘সর্বকালের সেরা’ কে পেলে নাকি দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা—এ নিয়ে বিতর্কের অবসান কখনোই হবে না। নিজের সময়ের ফুটবল নিয়ে, ব্রাজিলীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ নিয়ে, বর্তমানের সম্প্রচার যুগের চাকচিক্যময় ফুটবল নিয়ে, আগের ও এখনকার ফুটবলারদের নিয়ে ---সর্বোপরি নানা বিষয়ে পেলে মন খুলে কথা বলেছেন ব্রিটেনের জিকিউ ম্যাগাজিনের পল হেন্ডারসনের সঙ্গে। বাংলানিউজের ফুটবলপ্রেমী পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ বাংলায় তুলে এনেছেন কনসালট্যান্ট এডিটর জুয়েল মাজহার]

বাচ্চারা এখনো পেলে নামটি জানে দেখে আপনার অবাক লাগে না?
পেলে:
বেশিরভাগ বাচ্চা আজকাল (লিওনেল) মেসি, (ক্রিস্তিয়ানো) রোনালদো,নেইমারের খেলা দ্যাখে। তবে তারা পেলের নামটিও জানে।

হয়তো তাদের বাবাদের কাছ থেকে অথবা তাদের বাবাদের বাবাদের কাছ থেকে শুনে! 

আপনি কি মনে করেন লোকজন এখনও বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আগ্রহী, যতোটা আগ্রহী তারা ক্লাব ফুটবল নিয়ে?
পেলে:
আমি মনে করি, আমাদের সময়ের চেয়ে এখন খেলাটায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। তবে সবচে বড় পরিবর্তনটা এসেছে যোগাযোগের দিকটায়। অঅমি যখন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলছিলাম, তখন ফুটবল খেলাটা দেখা ও উপভোগের উপায় ছিল কেবল বেতারে ও টিভিতে। সবার ঘরে তখন টিভি ছিল না। এখন যে কেউ যেকোনো খেলা যখনখুশি দেখতে পারে--- ক্রিকেট, বক্সিং বা মিক্সড মার্শাল আর্ট (এমএমএ)। ফুটবল এখনো দুনিয়ার সবচে বড় খেলা। তবে বিশ্বকাপ আগে যেরকম খুব স্পেশাল একটা ইভেন্ট ছিল এখন আর ততোটা নেই। এটা দু:খজনকই বটে। আমার সময়ে বিশ্বকাপ (ফুটবল) সবাইকে এক সুতোয় বাঁধতে পারতো।   খেলার মাঠে দুরন্ত পেলেফুটবল কি সেই আগের মতোই সুন্দর আছে? 
পেলে:
আমার মনে হয় এখনো সুন্দরই আছে। তবে খেলার ধরনটার চেয়ে জয়টাই আজকাল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখনো অনেক গ্রেট প্লেয়ার আছে, যারা বিশেষ কিছু করে দেখাতে পারে। তবে আজকাল এমন অনেক প্লেয়ারও আছে যারা খেলার জন্যই খেলে যাচ্ছে আর তারা সুন্দর খেলছে না।  

এখনো কি আপনি যথেষ্ট ফুটবল ম্যাচ দেখে থাকেন?
পেলে:
হ্যাঁ, দেখি তো! এখনো আমি আমার পুরনো দল সান্তোসকে ভালোবাসি। সেই সঙ্গে দুনিয়ার সেরা দলগুলোর খেলা দেখতে আমার ভালো লাগে। এ মুহূর্তে সম্ভবত বার্সেলোনা। আগে আমার প্রিয় দল ছিল রিয়াল মাদ্রিদ।

আর আপনি কি আমার দল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলা দেখেন?
পেলে:
এ মুহূর্তে ম্যানইউ ব্রাজিলে খুবই জনপ্রিয় একটা দল।

আপনার গোটা ক্যারিয়ারে সবচে প্রিয় মুহূর্ত কোনটি?
পেলে:
একটিমাত্র প্রিয় মুহূর্ত বলতে কিছু আমার নেই...এমন মুহূর্ত অনেক অনেক। তবে এমন কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো আমার জন্য বিশেষ কিছু। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, ১৯৫৮ সালটিতে ছিল আমার প্রথম বিশ্বকাপ। আমার তখন ১৭  বছর বয়স। জীবনে প্রথমবার উড়োজাহাজে চড়ে ভ্রমণ। আর সুইডেনের সবকিছুই ছিল আমার জন্য নতুন আর আলাদা। এ যেন এক স্বপ্ন। এরপর আমার লালিত সব স্বপ্ন হয়ে উঠলো সত্যি। কেননা বিশ্বকাপ জয় করলো ব্রাজিল। আমার বয়স তখন কতোই না কম! সব অর্জনই মুঠোবন্দি করে ফেললাম আমি। তবে তথনো আরো অনেক অর্জন হাতছানি দিচ্ছিল আমায়। আরো একটা সুখস্মৃতি আছে আমার, যখন আমি সহস্রতম গোলের রেকর্ডটি করে ফেললাম। ওটা ছিল একটা পেনাল্টি কিক। আমার গোটা ক্যারিয়ারে সেবারই প্রথমবার আমার পা-দুটো থর থর করে কাঁপছিল। গোটা মারাকানা স্টেডিয়ামজুড়ে চলছিল চিৎকার চেঁচামেচি। আমার মনে আছে আমি ভাবছিলাম আর নিজেকে বলছিলাম: '‘ হা ঈশ্বর...গোল মিস করা আমার চলবে না!’’ ওই মুহূর্তটা ছিল একেবারেই আলাদা। যখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৭, আমার প্রথম বিশ্বকাপ, তবে আমার ওপর আলাদা কোনো দায়িত্বের চাপ ছিল না, কোনো আলাদা স্নায়ুচাপ ছিল না। কিন্তু ১০০০ তম গোলটি করার সময় যখন এলো ততদিনে আমি হয়ে উঠেছি পেলে, তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, বনে গেছি দুনিয়ার সবচে খ্যাতিমান ফুটবলার। এতোটা চাপে কোনোদিনই পড়তে হয়নি আমাকে।    

পেলের ফেভারিট তালিকায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের নাম
আপনি কি কখনো পেনাল্টি কিক মিস করেছেন? 

পেলে: না। ...জিন্দেগিতেও না। মাত্র দুবার। আরও ঠিকঠাক যদি বলি তাহলে মাত্র একটিবার।  
 
আপনার খেলা ব্রাজিলের সবচে সেরা দল কোনটি?
পেলে: সর্বকালের১৯৫৮-র ব্রাজিল দলে গারিঞ্চা ও ভাভার মতো খুবই স্পেশাল কয়েকজন খেলোয়াড় ছিল। তবে আমি মনে করি, ১৯৭০-এর ব্রাজিল দলটাই ছিল সবচে পরিপূর্ণ দল। এটা ছিল আমার সর্বশেষ বিশ্বকাপ। তখন ব্রাজিলে এতো বেশি গ্রেট প্লেয়ার ছিল যে ‘কাকে ফেলে কাকে রাখবেন’ এটাই ছিল সবচে বড় সমস্যা। এতো এতো গ্রেট প্লেয়ার! দল বাছাইয়ের প্রশ্নটা যখন এলো তখন, আমার স্পষ্ট মনে আছে, ১০ নম্বর স্থানটির জন্য কম করেও তিনজন গ্রেট প্লেয়ার আমাদের ছিল। আমাদের ছিল গারসন, রিভেলিনো ও পেলে। আর সবক’টি পত্রপত্রিকা লিখলো: '‘এটা কোনো কাজের কথা নয়। একটা পজিশনের জন্য এতোজন (গ্রেট) প্লেয়ার। ’' এভাবেই ওই দলটা হয়ে উঠল সর্বকালের সবচে সেরা ব্রাজিল দল। এটাই ফুটবল।  

ব্রাজিলের বর্তমান দলটা কেমন বলে মনে হয় আপনার? 
পেলে:
বরাবরের মতো এবারও আমরা বেশ কিছু ভালো খেলোয়াড় পেয়েছি। তবে আমাদের দলটা খুব শক্তিশালী ও সুসমন্বিত নয়। অবশ্য দুনিয়ার সবচে সেরা দলগুলোতে কোনো না কোনো ব্রাজিলীয় খেলোযাড় আপনি দেখতে পাবেনই পাবেন। পিএসজিতে নেইমার, রিয়াল মাদ্রিদে মার্সেলো, বার্সেলোনাতে (ফিলিপ্পে) কুতিনহো, লিভারপুলে (রবের্তো) ফারমিনো...তবে একটা শক্তিশালী বিশ্বকাপ দল হিসেবে এদেরকে খেলানোর কাজটা ব্রাজিলের কোচ তিতের জন্য খুবই কঠিন কাজ হবে।  

কোন কোন দল আপনার চোখে ফেভারিট?
পেলে:
ব্রাজিল সবসময়ই ফেভারিট দলগুলোর একটি। তবে আমার ধারণা আর্জেন্টিনাও ভালো করবে। বিশ্বকাপ সব সময়ই একটা '‘সারপ্রাইজ বাক্স’’। লোকজন ভুলে যায় যে, ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আর সেসব জয় তারা পেয়েছে ব্রাজিলের বাইরে। ব্রাজিলে যে দুটো বিশ্বকাপ হয়েছে, দুটোতেই আমরা হেরেছি।  

আপনি বলেছেন নেইমারের পিএসজিতে (প্যারিস সঁত জারমেঁ) যাওয়াটা ভালোই হয়েছে। কেন বললেন?
পেলে:
আমার মতে এটা ওর জন্য ভালোই হয়েছে, কেননা বার্সেলোনায় ওকে সব সময় মেসির ছায়ার আড়ালে থাকতে হয়েছে। প্যারিসে যাওয়ার পর যে ওকে ঘিরে সাজানো একটা দলে ওর নিজেকে প্রমাণ করবার একটা সুযোগ এসেছে। নাম্বার টেন হিসেবে খেলার জন্য এটা ওর বড় সুযোগ।

আপনি কি কখনো কোচিং করবার কথা ভেবেছেন?
পেলে:
এ বিষেয়ে অনেক আমন্ত্রণ পেয়েছি। তবে এটা (কোচিং) আমার জন্য যুৎসই কাজ নয়। আমি কিছু তরুণকে কোচিং করিয়েছি এবং সান্তোসকে কিছুটা সহায়তাও করেছি। তবে সার্বক্ষণিক কোচ হওয়ার ব্যাপারটা আমার জন্য নয়।  

আজকের দিনে যারা কোচ তাদের মধ্যে কারা আপনার পছন্দের?
পেলে: আমার পছন্দ (পেপ) গার্দিওলা। আমার পছন্দ (হোসে) মরিনহো। তবে আমি মনে করি ব্রাজিলের বর্তমান কোচ তিতে খুবই ভালো একজন কোচ। কেননা কেবল ফুটবল নয়, প্লেয়ারদের বিষয়ে সে খুবই যত্নবান। প্লেয়ারদের পরিবারের ভালোমন্দ নিয়েও সে ভাবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।   

আপনার একটি বইতে আমি পড়েছি, আপনি একবার এক গোলরক্ষককে নাকি কাঁদিয়ে ছেড়েছিলেন (আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সান্তোসের একটি প্রদর্শনী ম্যাচে)। ওই একবারই নাকি একজন গোলরক্ষকের জন্য আপনার মায়া লেগেছিল? 
পেলে:
একজন গোলরক্ষকের জন্য...হ্যাঁ...(হা হা হা)

এক হাজারেরও বেশি গোল করেছেন আপনি...
পেলে:
গোটা ক্যারিয়ারে আমি ১,২৮৩টি গোল করেছি। বেশ ক’বার এমন হয়েছে, ডিফেন্ডাররা আমার কাছে এসে বলেছে, ‘‘ওহ পেলে, কী আশ্চর্য গোলই না করলে তুমি!’’ কিন্তু যখন কোনো প্লেয়ারকে কাঁদতে দেখতাম তখন খুবই মনখারাপ হতো আমার।

আপনার সর্বকালের প্রিয়তম খেলোয়াড় কে?
পেলে:
ওহ, অনেক অনেক...তবে আমার কাছে প্রিয়তমদের মধ্যে প্রিয়তম খেলোয়াড় হচ্ছে জর্জ বেস্ট। আমি যখন নিউইয়র্কে ছিলাম, জর্জ ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসে। আমি তাকে (আমার দল) কসমসে ভেড়াতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ও বললো, ‘‘ ওটা মোটেই সম্ভব না!’’ ওই সময়টায় সে সূর্যালোকে ব্যাপক মৌজমস্তিতে ব্যস্ত।  ক্রুইফ ও (আলফ্রেদো) ডি স্তেফানোও আমার বড় পছন্দের খেলোয়াড়। ববি চার্লটন ও ববি মুর দুজনেই আমার বড় প্রিয়। আর কসমসে আমি (ফ্রাঞ্জ) বেকেনবাউয়ারের সঙ্গেও খেলেছি। সেও খুবই ভালো একজন খেলোয়াড়।

কিন্তু পেলেই হচ্ছেন সর্বকালের সেরা, তাই তো?
পেলে:
কানাকড়ি সন্দেহ নেই…

বাংলাদেশ সময়: ১২২৮ ঘণ্টা, জুন ০৭, ২০১৮
এইচএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৮ এর সর্বশেষ

Alexa