ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৮

ফুটবল বিশ্বকাপের যত বিতর্ক

মহিবুর রহমান, স্পেশাল করেসপনডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩১৫ ঘণ্টা, জুন ৬, ২০১৮
ফুটবল বিশ্বকাপের যত বিতর্ক ...

ফুটবল বর্ষের পরিক্রমায় আরও একটি বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে। আর মাত্র কয়েকদিন পর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে রাশিয়া বিশ্বকাপের।

ফুটবলের এই মহাযজ্ঞকে সামনে রেখে সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এখন বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে। বাড়ির ছাদে, উঠানে লম্বা খুঁটি পুঁতে প্রিয় দেশের পতাকা উড়িয়ে উন্মাদনায় মেতেছেন ফুটবলপ্রেমীরা।

প্রতিটি পাড়া মহল্লায় গড়ে উঠেছে ফ্যান ক্লাব।

রাজধানীসহ সারা দেশের সমর্থকরা নিজ নিজ দলের বিশাল বিশাল পতাকার রেকর্ড গড়ে সংবাদের শিরোনাম হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ফুটবলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ভক্তরা ইতোমধ্যেই ফেসবুকে একে অপরের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানে চলছে বাকযুদ্ধ।

১৪ জুন থেকে রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের ২১তম আসরের আগে বিগত ২০টি আসরে ঘটে গেছে বিতর্কিত নানান ঘটনা। যার সাথে জড়িত ছিলেন খেলোয়াড়, রেফারি, কর্মকর্তাসহ কোনো কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানও। তেমন কয়েকটি ঘটনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।

হ্যান্ডস অব গড
বিশ্বকাপ ফুটবলের অসংখ্য বিতর্কিত ঘটনার মধ্যে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে বেশি মুখে মুখে ফেরে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার দ্বৈরথে প্রথমার্ধের খেলা গোলশূন্য থাকে। পরে দ্বিতীয়ার্ধের ৬ মিনিটের একবারের শেষের দিকে ইংলান্ডের ডি বক্সের ভিতরে উড়ে আসা বলকে হেড দিতে লাফিয়ে ওঠেন ম্যারাডোনা ও ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিল্টন। কিন্তু হেড না করে ম্যারাডোনা কৌশলে হাত দিয়ে বলটি জালে জড়িয়ে দেন। রেফারি আল বিন নাসের তা ধরতে না পেরে গোলের বাঁশি বাজান এবং সেই গোলের সুবাদে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে জিতে নেয় আর্জেন্টিনা।

ব্যাটল অব সান্তিয়াগো
বলা হয়ে থাকে বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এটি সবচাইতে ন্যক্কারজনক ঘটনা। ঘটেছিল সান্তিয়াগোতে ১৯৬২ বিশ্বকাপে স্বাগতিক চিলি ও ইতালির ম্যাচে। ম্যাচটিতে সংঘর্ষের ঘটনা এত বেশি ছিলো যে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের খেতাব লাভ করে। তবে সূত্রপাত মাঠের ভেতরে নয়, বাইরে। দুই ইতালিয়ান সাংবাদিক তাদের সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন যে ‘চিলিকে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে দেওয়াটা পাগলামি ছাড়া কিছুই না। এখানে ফোন কাজ করে না, বিশ্বস্ত স্বামীর মতো ট্যাক্সিরও পর্যাপ্ত অভাব। এক শহরের ভেতর একটি চিঠি পৌঁছাতে সময় লাগে ৫ দিন। ’  

এমন খবর দেখে গোটা চিলির জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ক্ষোভ এতটাই চরমে পৌঁছে যে, ইতালির সাংবাদিক ভেবে আর্জেন্টিনার এক সাংবাদিককে তারা পিটিয়ে আহত করে। ঘটনা ইতালিয়ান শিবিরে পৌঁছালে খেলা শুরুর ১২ সেকেন্ডের মধ্যেই ইতালির জর্জিও ফেরেনি ফাউল করেন। ১২ মিনিটে ফেরেনি আবার ফাউল করলে রেফারি অ্যাস্টন তাকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু তিনি রেফারিকে পাত্তা না দিয়ে খেলা চালিয়ে যেতে থাকেন। পরে পুলিশ ঢুকে তাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। সমস্যার শেষ এখানে হলেই পারাতো। হয়নি, বরং ম্যাচের সময় যত গড়িয়েছে আরও কুৎসিৎ আকার ধারণ করেছে খেলাটি। চলেছে শেষ পর্যন্ত। কী না হয়েছে? লাথি, কিল, ঘুষি, যাচ্ছেতাই রকমের ফাউল, রেফারিকে হুমকি। শেষ পর্যন্ত চিলি ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতলেও তাদের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে ম্যাচ শেষে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপজয়ী গোল
১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড এবং পশ্চিম জার্মানি। নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২ গোলে সমতা থাকায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের ১১ মিনিটে ইংলিশ জিওফ হার্স্টের শট ক্রসবারের ঠিক নিচে লেগে বলটি নিচে বাউন্স করে। কিন্তু বল গোললাইন অতিক্রম করেছিল কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না রেফারি গডফ্রায়েট ডায়েন্সট। উদ্ভুত সমস্যা সমাধানে তিনি সোভিয়েত লাইন্সম্যান তোফিক বাহরামভের সাথে লম্বা আলোচনার পরে গোল হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু জার্মানরা আজও সেটি মেনে নিতে পারেননি।

এক খেলোয়াড়কে তিনবার হলুদ কার্ড 
হলুদ কার্ডের হিসেব রাখতে না পারায় ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার ম্যাচে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেন ওই ম্যাচের রেফারি গ্রাহাম পুল। ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড় জসিপ সিমুনিককে তিনি পরপর ২ বার কার্ড দেখালেও তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠের বাইরে পাঠাননি। কারণ তিনি প্রথমবার জসিপ সিমুনিকে যে হলুদ কার্ডটি দেখিয়েছিলেন সেটা ভুলক্রমে ১ জন অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়ের নামে লিপিবদ্ধ করেন। ম্যাচে রেফারির মতের বিরোধিতার কারণে জসিপ সিমুনিক তৃতীয়বারের মতো রেফারি গ্রাহাম পুল হলুদ কার্ড দিয়ে মাঠ ছাড়া করেন। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র হয়। এমন অপরিনামদর্শী কাণ্ডের পরে গ্রাহাম পুলকে আর কোনো বিশ্বকাপেই ম্যাচ পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি।

জিদানের ঢুঁস
২০০৬ বিশ্বকাপে তার এমন কাণ্ডে অবাক হয়েছিলেন ফুটবল বিশ্বের অনেকেই। রাগের মাথায় ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে ঢুঁস মেরে বসেন ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তী খেলোয়াড় জিনেদিন জিদান। অবশ্য এমনি এমনি তিনি এমন করেননি। পরে জানা যায় মাতেরাজ্জি তার মা-বোনকে উদ্দেশ্য করে নোংরা গালি দেওয়ায় তিনি ঢুঁস মারেন। অলইউরোপ ফাইনালের সেই ম্যাচে ইতালির কাছে পেনাল্টিতে বিশ্বকাপ হেরে যায় ফ্রান্স।

রেফারির অনুকম্পায় দক্ষিণ কোরিয়ার জয়
২০০২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনে জাপানের সাথে সহআয়োজক ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় ইতালির মুখোমুখি হয় স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া। সেই ম্যাচে ইকুয়েডরের রেফারি বায়রন মরেনো বেশকয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটান। সামান্য ড্রাইভ দেওয়ার অপরাধেও ইতালির ফ্রান্সিসকো টট্টিকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন। অথচ পরে রিপ্লেতে দেখা যায় টট্টিকেই ফাউল করা হয়েছিল।

এখানেই থামেননি মরেনো। অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ইতালির ১টি গোল অফসাইড বলে বাতিল করে দেন তিনি। যদিও সেটি অফসাইড ছিল না। তার  এমন বিতর্কিত একাধিক সিদ্ধান্তের কারণেই ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছিল দক্ষিণ কোরিয়া।

আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়া-পশ্চিম জার্মানি ষড়যন্ত্র
১৯৮২ বিশ্বকাপে মাঠের খেলায় বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় আলজেরিয়া। গ্রুপ পর্বের খেলায় দলটির প্রতিপক্ষ ছিলো পশ্চিম জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া। গ্রুপ পর্বের একেবারে শেষ ম্যাচটি ছিলো পশ্চিম জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ার মধ্যকার। কিন্তু গ্রুপের সবার হাড্ডাহাড্ডি পারফরম্যান্সের ফলে ৩ দলের সমীকরণই জটিল হয়ে উঠে। সমীকরণটি এমন, অস্ট্রিয়া যদি জার্মানির বিপক্ষে ড্র করে বা জয় পায় তাহলে পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যাবে। আর জার্মানি যদি ৩ বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জিতে যায় তাহলে অস্ট্রিয়া বাদ। কিন্তু যদি জার্মানি ১ বা ২ গোলের ব্যবধানে জিতে তাহলে আলজেরিয়া বাদ পড়ে যাবে।

মজার ব্যাপার হলো ম্যাচের ১০ মিনিটেই জার্মানি ১-০ গোলে এগিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় দু’দলের এলোমেলো বল ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা। জার্মানি এগিয়ে যাওয়ার পর দু’দলই পুরো ম্যাচজুড়ে এদিক সেদিক বল ছোড়াছুড়ি করতে থাকে। কোনো দলের মধ্যেই গোল করার প্রবণতা দেখা যায়নি। যেটা ছিল আলজেরিয়ার বিপক্ষে এক প্রকারের ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সেবার বিশ্বকাপ থেকে আলজেরিয়া বাদ পড়ে যায়।

হ্যারল্ড শুমাখারের পাশবিক কাণ্ড
১৯৮২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেই ঐতিহাসিক শত্রু ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় ফরাসি ডিফেন্ডার প্যাট্রিক বাত্তিস্তন বল নিয়ে জার্মানির পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন। অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে আটকাতে এগিয়ে আসেন জার্মান গোলরক্ষক হ্যারল্ড শুখামার। প্যাট্রিক বাত্তিস্তন যখন বলে শট নিতে যাবেন তখন শুখামার এসে তাকে সজোরে আঘাত করেন। বাত্তিস্তন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়ে তার ৩টি দাঁত ভেঙে যায়। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে পরবর্তীতে কোমায় চলে যান তিনি। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো রেফারি এই ঘটনায় কোনো ফাউলের নির্দেশই দেননি। ম্যাচটিতে পশ্চিম জার্মানি জয় পায় এবং ফাইনালে উঠে যায়।  

পেরু-আর্জেন্টিনা ম্যাচ বিতর্ক
১৯৭৮ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপটি ছিল বিতর্কেরই প্রতিশব্দ। আর তা বোঝা যায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দেখলেই; তারা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ নিয়ে যতটা বড়াই করেন ১৯৭৮ বিশ্বকাপ নিয়ে ততটাই নিশ্চুপ থাকেন।  

১৯৭৬ সালে সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে সামরিক সরকারের ক্ষমতা দখল সংশয়ের জন্ম দেয় বিশ্বকাপ আয়োজনেও। যা হোক ওই বিশ্বকাপে প্রথম বিতর্ক সৃষ্টি হয়, আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচই গ্রুপের অন্যদের ম্যাচের পরে রাতের বেলায় অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছিলো আর্জেন্টিনাকে বড় ধরনের সুবিধা পাইয়ে দিতেই এই ব্যবস্থা।  

তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কটি হয়েছিল স্বাগতিক আর্জেন্টিনা ও প্রতিবেশী পেরুর ম্যাচটি ঘিরে। কেননা ওই আসরের ফাইনালে যেতে আর্জেন্টিনাকে এই ম্যাচে ন্যূনতম ৪-০ গোলে জিততে হতো। তা না হলে একই গ্রুপে থাকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল আগেই উঠে যাবে স্বপ্নের ফাইনালে। কিন্তু পেরু সেটা হতে দেয়নি। প্রথামার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য রক্ষণ আলগা করে দিলে দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় পেরুর জালে আরও ৪ গোল দিয়ে উঠে যায় ফাইনালে।

সেমিফাইনালের ম্যাচে পেরুর এমন হেলেদুলে খেলার মানসিকতা সে সময়ে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন আর্জেন্টাইন সামরিক সরকারের হুমকির মুখে তারা ম্যাচটি ছেড়ে দিতে পেরুর খেলোয়াড়রা বাধ্য হয়েছিলো।

বাংলাদেশ সময়: ১৯১০ ঘণ্টা, জুন ০৬, ২০১৮
এইচএল/এমএমএস/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৮ এর সর্বশেষ

Alexa