ঢাকা, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০ সফর ১৪৪৩

ফিচার

রসগোল্লার ‘ম্যানেজার’

ফেরদৌস আহমেদ, মৌলভীবাজার থেকে | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯২৪ ঘণ্টা, আগস্ট ৩০, ২০১১
রসগোল্লার ‘ম্যানেজার’

স্পঞ্জ মিষ্টি। সাক্ষাৎ রসগোল্লা।

নাম শুনলেই জল এসে জিভে লুটোপুটি খায়। মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। উষ্ণতা ও ভিন্ন স্বাদ জিহ্বায় অনুভূত হয়। অতিথি আপ্যায়ন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঈদ, পূজা-পার্বণে এটি না হলে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পায় না। এটির কদর জেলাব্যাপী। ষাট বছর ধরে এই মিষ্টি বানাচ্ছে ‘ম্যানেজার স্টলের’ কারিগররা ।

পঞ্চাশের দশক থেকে মৌলভীবাজার জেলার মিষ্টান্নপ্রেমীরা এই মিষ্টির স্বাদ পরখ করে আসছেন। সময়ের সাথে সাথে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই মিষ্টির গুণগান। বাইরের জেলা থেকে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সঙ্গীতশিল্পী, রাজনীতিবিদ, আমলা যারাই মৌলভীবাজার আসেন, এই মিষ্টি না খেয়ে যেতে শোনা যায় না।

পরিচিতজনদের অনেকেই রাতে গরম গরম রসগোল্লা খেতে স্টলে ভিড় করেন। আবার অনেকেই ভোরবেলা প্রাতঃভ্রমণ শেষে মিষ্টি ও নিমকি কিংবা লুচি দিয়ে নাশতা সারেন। অনেকেই ত্রিশ/চল্লিশ বছর ধরে এই স্টলের ক্রেতা। এখানে অনেকেই নবীন বয়সে ক্রেতা হয়েছে এবং প্রবীণ বয়সেও এই মিষ্টির স্বাদ পরখ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার স্টল বা মদন মোহন মিষ্টান্ন ভান্ডার। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ক্রেতার ভিড় লেগেই থাকে। কয়েক বছর আগেও কাঠের বেঞ্চ ও টেবিলে বসে ক্রেতারা মিষ্টি খেতেন। বর্তমানে স্টলটিতে এসেছে কিছুটা জৌলুস। যুগোপযোগী চিন্তাভাবনায় আধুনিক আদলে ডেকোরেশন করা হয়েছে।


ম্যানেজার স্টলের বর্তমান স্বত্বাধিকারী সুমেশ দাশ যিশু বাংলানিউজকে জানান, তার বাবা সুশীল চন্দ্র দাশ। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পর শুরু করেন ম্যানেজার স্টলের যাত্রা। তখন মৌলভীবাজারের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই স্টল। এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডাররা অনেক পরিকল্পনার ছক এঁকেছেন। আবার এখন যারা জেলার প্রবীণ রাজনীতিবিদ তাদের অনেকেই তরুণ বয়সে এখান থেকে রাজনীতির মন্ত্র ও কলা-কৌশল শিখেছেন অগ্রজদের কাছ থেকে।

বায়ান্ন সালে ম্যানেজার স্টলের পাশে রাধিকা স্টল নামে আরেকটি স্টলের জন্ম হয়। যিশুর বাবার বন্ধু রাধিকা রঞ্জন দাস স্টলটির মালিক ছিলেন। এই দুজনের কেউই বেঁচে নেই তবে লোকমুখে ম্যানেজার স্টলের নাম বেশি পরিচিতি লাভ করেছে।

যিশু জানান, স্পঞ্জ মিষ্টি অতি সাধারণ প্রক্রিয়ায় গাভীর দুধের খাঁটি ছানা দিয়ে তৈরি করা হয়। সন্ধ্যার পর ছানা কাটা হয়। সন্ধ্যারাতে ছানা দিয়ে স্পঞ্জ মিষ্টি তৈরি করা হয়। সারারাত পাতের মধ্যে রসযুক্ত মিষ্টি থাকে। প্রতিদিন ৬০/৭০ কেজি ছানার প্রয়োজন হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রাম থেকে ছানা সংগ্রহ করা হয়। ছয় টাকা করে প্রতি পিস স্পঞ্জ মিষ্টি বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন এক হাজার থেকে পনেরশ মিষ্টি বিক্রি হয়ে থাকে। সাথে প্যারা সন্দেশ, বুন্দিয়া, রসমলাই, দই, নিমকি, জালমোহন মিষ্টিও বিক্রি হয়।

ম্যানেজার স্টল সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তৎকালীন ছাত্রনেতা, সাবেক গণপরিষদ ও সংসদ সদস্য আজিজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, মৌলভীবাজারের প্রগতিশীল সব দলের আড্ডা ছিলো এই স্টলে। তিনি আরও বলেন, সেই পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে এখনও ম্যানেজার স্টলের মিষ্টি না হলে আমাদের পরিবারের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হয় না।

বাংলাদেশ সময় ১৯১৭ ঘণ্টা, আগস্ট ৩০, ২০১১

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa