bangla news

মন ঠিক জানে তুমি কী হতে চাও : স্টিভ জবস

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৬-২৮ ৯:৩০:১৯ এএম

স্টিভ জবস ১৯৭৬ সালের দিকে বন্ধু স্টিভ উজনেককে নিয়ে ‘অ্যাপল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেন পারসোনাল কম্পিউটার বা পিসি ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। এর আগে সাধারণ মানুষের কম্পিউটার বিষয়ে খুব স্বচ্ছ ধারণাও ছিল না।

স্টিভ জবস ১৯৭৬ সালের দিকে বন্ধু স্টিভ উজনেককে নিয়ে ‘অ্যাপল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেন পারসোনাল কম্পিউটার বা পিসি ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। এর আগে সাধারণ মানুষের কম্পিউটার বিষয়ে খুব স্বচ্ছ ধারণাও ছিল না। কিন্তু স্টিভ জবসের পিসি মানুষের ধারণাকেই পাল্টে দেয়। এই কম্পিউটারের নাম তিনি দেন ‘অ্যাপল’।

মূলত এর পরই সাধারণের কাছে পৌঁছতে থাকে কম্পিউটার। গড়ে ওঠে অনেক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান।  কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্টিভ জবস ১৯৮৫ সালের দিকে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তবে ভেঙে না পড়ে পরে তিনি অ্যানিমেশন স্টুডিও পিক্সার প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে স্টিভ এখনো তথ্যপ্রযুক্তি জগতে নায়ক হিসেবেই আছেন।

২০০৫ সালের ১২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন স্টিভ জবস। সেটি এখনও বহু তরুণকে উজ্জীবিত করে।  দীর্ঘ সেই ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ পাঠকদের জন্য।   

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি। আমি কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করিনি। সত্যি কথা বলতে, আজকেই আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছ থেকে দেখছি।

রিড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার ছয় মাসের মধ্যেই আমি পড়ালেখা ছেড়ে দিই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার আগে প্রায় বছর দেড়েক কিছু কোর্স নিয়ে কোনোমতে লেগেছিলাম।

কেন আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিলাম?

আমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু আমি বোকার মতো স্ট্যানফোর্ডের সমান খরুচে একটি বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলাম। আর আমার নিম্নমধ্যবিত্ত বাবা-মার সব জমানো টাকা আমার পড়ালেখার পেছনে চলে যাচ্ছিলো। ছয় মাস যাওয়ার পর আমি এর কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

জীবনে কী করতে চাই সে ব্যাপারে আমার তখনও কোনো ধারণা ছিল না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া কীভাবে আমাকে সাহায্য করবে সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। অথচ বাবা-মা তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় আমার পড়ার পেছনে ব্যয় করে চলেছেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং আশা করলাম, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ওই সময়ে এটা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত। যখনই আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলাম, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই ডিগ্রির জন্য আমার অপছন্দের কোর্সগুলোও বন্ধ করে দিলাম।

২.
আমি খুব সৌভাগ্যবান। জীবনের প্রথমেই আমি আমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে পেয়েছি। বন্ধু উজনেককে নিয়ে যখন আমার বাবা-মার গ্যারাজে অ্যাপল কোম্পানি শুরু করি, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।

আমরা কঠিন পরিশ্রম করেছি। মাত্র ১০ বছরে অ্যাপল গ্যারাজের দুজনের কোম্পানি থেকে ৪ হাজার কর্মীর ২ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়।

আমার বয়স তখন ৩০। এর অল্প কিছুদিন আগে আমরা আমাদের সেরা কম্পিউটার ‘ম্যাকিন্টোশ’ বাজারে নিয়ে আসি। আর ঠিক তখনই আমার চাকরি চলে যায়। কীভাবে একজন তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে চাকরিচ্যুত হয়?
 
অ্যাপল যখন অনেক বড়ো হতে লাগল তখন আমরা প্রতিষ্ঠানটি খুব ভালোভাবে চালাতে পারবেন এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবলাম। নিয়োগ দেয়াও হলো। প্রথম বছর সবকিছু ভালো যাচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার সাথে আমার চিন্তাভাবনার বিভাজন স্পষ্ট হওয়া শুরু হলো। আর পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষ নিলো। ফলাফল, ৩০ বছর বয়সে আমাকে আমার কোম্পানি থেকে চলে যেতে হলো। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন এক নিমিষে আমার হাতছাড়া হয়ে গেলো। ঘটনাটা আমাকে বেশ হতাশায় ডুবিয়ে দেয়।

পরের কয়েক মাস ধরে আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করবো। মনে হচ্ছিলো আমি আগের প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছি; আমার হাতে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা আমি করতে পারিনি। একবার ভাবলাম ভ্যালি ছেড়ে পালিয়ে যাই।

কিন্তু ধীরে ধীরে একটি বিষয় অনুভব করতে লাগলাম।

সেটা হচ্ছে, আমি আমার কাজকে এখনো ভালোবাসি! অ্যাপলের ঘটনাগুলো সেই সত্যকে এতোটুকু বদলাতে পারেনি। আমাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কিন্তু আমি এখনো আমার কাজকে ভালোবাসি। তাই আবার একেবারে শূন্য থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে তেমন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু পরে আবিষ্কার করলাম অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুত হওয়াটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। বরং ভারমুক্ত হয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়ের যাত্রা শুরু করলাম।

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমি নেক্সট এবং পিক্সার নামে দুটো কোম্পানি শুরু করি, আর প্রেমে পড়ি লরেন নামের এক অসাধারণ মেয়ের। তাকে আমি বিয়ে করি। পিক্সার থেকে আমরা পৃথিবীর প্রথম এনিমেশন ছবি ‘টয় স্টোরি’ তৈরি করি। পিক্সার এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সফল এনিমেশন স্টুডিও।

এরপর ঘটে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। অ্যাপল নেক্সটকে কিনে নেয় এবং আমি অ্যাপলে ফিরে আসি। এবং নেক্সট-এ আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করি সেটা এখন অ্যাপলের বর্তমান ব্যবসার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যদিকে লরেন আর আমি মিলে তৈরি করি একটা সুখী পরিবার।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এগুলোর কিছুই ঘটতো না যদি না আমি অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুত হতাম। এটা ছিলো আমার জন্য খুব তেতো একটা ওষুধ। কিন্তু রোগীর জন্য সেটা দরকার ছিলো। কখনো কখনো জীবন তোমাকে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে। তখন বিশ্বাস হারাবে না। আমি নিশ্চিত, যে জিনিসটা আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো সেটা হচ্ছে আমি আমার কাজকে ভালোবাসতাম। তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে। তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে যেভাবে খুঁজে পেতে হয়, ভালোবাসার কাজটিকেও তোমাকে সেভাবেই খুঁজে পেতে হবে। তোমার জীবনের একটা বিরাট অংশজুড়ে থাকবে তোমার কাজ, তাই জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে চমৎকার কোনো কাজ করা। আর কোনো কাজ তখনই চমৎকার হবে যখন তুমি তোমার কাজকে ভালোবাসবে।

যদি এখনো তোমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে না পাও তাহলে খুঁজতে থাকো। অন্য কোথাও স্থায়ী হয়ে যেও না। তুমি যখন তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পাবে, তোমার মন আর সব গভীর জিনিসের মতোই গোপনে তোমাকে তা অনুভব করাবে। যে কোনো সম্পর্কের মতোই, তোমার কাজটি যতো সময় যাবে ততোই ভালো লাগবে।

৩.
তোমরা নতুন, কিন্তু তোমাদের সময়ও সীমিত। অতএব, অন্য কারো জীবনযাপন করে সময় নষ্ট করো না। কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ো না, অর্থাৎ অন্য কারো চিন্তা-ভাবনা দিয়ে নিজের জীবন চালাবে না। তোমার নিজের ভেতরের শব্দকে অন্যদের চিন্তা-ভাবনার কাছে আটকাতে দেবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা,  নিজের মনের কথা শোনার সাহস রাখবে। মন ঠিকই জানে তুমি আসলে কী হতে চাও। বাকি সব কিছুও ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

যখন তরুণ ছিলাম তখন একটা পত্রিকা বের হতো, নাম ছিল ‘The Whole Earth Catalog’। এটা ছিল আমার প্রজন্মের বাইবেল। এ পত্রিকা বের করেছিলেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামে এক ভদ্রলোক। তিনি পত্রিকাটিকে কাব্যময়তা দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এটা ছিল ষাটের দশকের শেষ দিককার কথা। কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ পাবলিশিং তখন শুরু হয়নি। তাই পত্রিকাটি বানানো হতো টাইপরাইটার, কাঁচি, এবং পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে। পত্রিকাটিকে ৩৫ বছর আগের পেপারব্যাক গুগল বলা যায়। অনেক তত্ত্ব, তথ্যে সমৃদ্ধ আর মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত ছিল এটি।

স্টুয়ার্ট এবং তার দল পত্রিকাটির অনেকগুলি সংখ্যা বের করে। পত্রিকাটির জীবন শেষ হয় একটি সমাপ্তি সংখ্যা দিয়ে। এটি ছিল সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। আমার বয়স ছিল তোমাদের বয়সের কাছাকাছি।

সমাপ্তি সংখ্যার শেষ পাতায় একটা ভোরের ছবি ছিল। তার নিচে ছিলো এই কথাগুলি : ‘ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো’। এটা ছিল তাদের বিদায়বার্তা। ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো। আমি নিজেও সবসময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করি। আজ তোমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছেড়ে আরো বড় জীবনের গণ্ডিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছো, আমি তোমাদেরও এটা মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি : ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো।

বাংলাদেশ সময়: ১৯২০ ঘণ্টা, জুন ২৮, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
db 2011-06-28 09:30:19