ঢাকা, রবিবার, ৯ মাঘ ১৪২৮, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

গাছ চিনতে নূহাশপল্লী

আসিফ আজিজ ও মীম নোশিন নাওয়াল খান | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৫৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৩
গাছ চিনতে নূহাশপল্লী

নূহাশপল্লী (গাজীপুর) থেকে: নূহাশপল্লী। কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সীমানা।

প্রয়াত এই জনপ্রিয় লেখকের সব স্বপ্ন যেন বাসা বেঁধেছে এই সবুজ স্বপ্নসীমায়। প্রকৃতিপ্রেমী হুমায়ূনের ভালোবাসা-মমতায় সিক্ত এখানকার প্রতিটি গাছ, উদ্ভিদ-লতার শাখা-প্রশাখা।

শুক্রবার সকালে সেই সবুজ স্বপ্নমেলায় একদল নিসর্গী, উদ্ভিদবিদ, প্রকৃতিপ্রেমী ভিড় জমান প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হতে। পরিচিত হতে অচেনা উদ্ভিদবৈচিত্র্যের সাথে, ঝালিয়ে নিতে পরিচিত গাছগুলোর সঠিক পরিচয়। সাথে নগর জীবনের ব্যস্ততায় ক্লান্ত মনকে প্রফুল্ল করার উদ্দেশ্য তো আছেই।

তবে নিজেরা নয়, এই অসাধারণ মুহূর্তটি প্রায় শতাধিক মানুষকে উপহার দিয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক একটি ভিন্নধর্মী সংগঠন ‘তরুপল্লব’। গাছ দেখা, গাছ চেনা শীর্ষক এই আয়োজনের এটি ছিল ১৫তম পর্ব।

প্রকৃতির বিশালতার ক্ষুদ্র একটি জগতের সাথে আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়েছে তরুপল্লব। এই দলে ছিলেন নিসর্গী মো. সামছুল হক, এস এম কামরুজ্জামান, ড. রুহুল আমিন, দেবাশিস বিশ্বাস, মোকারম হোসেন, কবি-সাহিত্যিক, মিডিয়াকর্মীসহ অনেকে। শিশুরাও কিন্তু বাদ ছিল না এই তালিকা থেকে। গভীর আগ্রহ এবং মনোযোগের সঙ্গে তারা উপভোগ করেছে পুরো আয়োজন।

শতাধিক নিসর্গপ্রেমী নিয়ে ঢাকা থেকে সকাল সাড়ে সাতটায় নূহাশপল্লীর উদ্দেশ্যে রওনা হয় তরুপল্লবের দু’টি বাস।

সাড়ে ১০টায় পৌঁছে বিশেষজ্ঞরা একে একে হ্যান্ড মাইকে পরিচয় করাতে থাকেন হরেক রকম গাছপালা আর তাদের বহুমুখী গুণাগুণের সঙ্গে। জানা হয় তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কেও।

তরুপল্লবের সাধারণ সম্পাদক ও নিসর্গী মোকারম হোসেন নের্তৃত্ব দেন প্রকৃতিপ্রেমীর এই দলটিকে। একেকটি গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন একেকজন নিসর্গী ও উদ্ভিদবিদ। হুমায়ূনের অতিপ্রিয় অবকাশ যাপনের স্থান বৃষ্টি বিলাসের প্রান্ত ঘেঁষে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক আয়োজন।

পোলাও দিয়ে শুরু হয় গাছ চেনায় হাতেখড়ি। কী, অবাক হচ্ছেন? না, ঘটা করে পোলাও রেঁধে খাওয়ার কথা বলছি না, বলছি মিষ্টি দেখতে পোলাও পাতা গাছটির কথা। তার সাথে পরিচয়ের মাধ্যমেই শুরু হয় আমাদের গাছ পরিচিতি। এরপর পরিচয় হয় তারই প্রতিবেশী বাজনার সাথে। তবে এই বাজনা বাজে না, ফুল দেয়, দেয় ফলও। বাজনা বাজানো যেমন সহজ নয়, তেমন সোজা নয় বাজনার ফুল বা ফল পাড়া। কারণ, প্রকৃতি তাকে দিয়েছে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার অদ্ভুত এক উপকরণ। আর কিছু নয়, সেই অদ্ভুত উপকরণটি হচ্ছে তার শরীর জুড়ে তীক্ষ্ণ কাঁটা।

পান খাওয়া না হলেও পরিচয় হলো পানের খয়ের গাছের সাথেও। দেখা হলো পানকে সুস্বাদু করার উপকরণ সরবরাহকারী পানবিলাসের সাথেও। সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত মশলা কারি পাতা, গোল মরিচ, দইগটার সাথে। সঙ্গে কর্পূর তো আছেই।

লুকলুকি, টক চেরি, রামবুটান, কাঠবাদাম, পেস্তা বাদাম, সবুজ নাশপাতি, রীঠা- এমন অল্প পরিচিত বা বিরল ফলের সাথেও দেখা হলো।

নিসর্গী ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের অবসরপ্রাপ্ত বোটানিস্ট মো. সামছুল হকের সঙ্গে কথা হলো এক ফাঁকে। তিনি বলেন, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রভৃতি স্থানে আগে এমন আয়োজন করা হলেও নূহাশপল্লীতে এটাই প্রথম। এখানে ফুল-ফল, ওষুধি, মশলা ও কাঠজাতীয় গাছ রয়েছে প্রায় সাড়ে চারশ’ প্রজাতির। এর মধ্যে অনেক বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় দেশি গাছ রয়েছে। রয়েছে বিদেশি গাছও।

আমরা পরিচিত হলাম তালমাখনার সাথেও। ভাবছেন তালের নতুন কোনো প্রজাতি? না না, আমাদের অতিপ্রিয় খাদ্য ফুচকায় ব্যবহৃত উপকরণ তালমাখনার উৎস এই গাছ।

মান্দার, হাপরমালি, দাঁতমাজনকেও ভুলে যাননি হুমায়ূন। দলের সঙ্গে আসা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রোকেয়া আলম নূহাশপল্লীর গাছের এই বিচিত্র সম্ভার দেখে মুগ্ধ। তিনি বলেন, গাছগাছালি, প্রকৃতি- এগুলো সবসময়ই ভালোবাসি। তাই প্রাণের টানে ছুটে এসেছি তরুপল্লবের দলে।     

এরপর হঠাৎ কানে ভেসে এলো ‘কুসুমে কুসুমে চরণ চিহ্ন দাও...’
থমকে দাঁড়ালাম। কুসুম গাছের সাথে পরিচয় করাতে গিয়ে এভাবেই রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে ওঠেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং তরুপল্লবের প্রকাশনা প্রকৃতিপত্রের সহযোগী সম্পাদক দেবাশিস বিশ্বাস। তারপর কিছুক্ষণ চলল গান আর আড্ডা।

দেবাশিস বিশ্বাস বলেন, নূহাশপল্লীর মতো এমন ওষুধি গাছের সমাহার শুধু বাংলাদেশে নয়, উপমহাদেশেও কম দেখা যায়। আর সবার উপরে প্রকৃতিপ্রেম। এজন্যই এখানে আসা।

তারপর কলাবাগান দিয়ে ছুটে চললাম গিলাতলায়। ড. রুহুল আমিন জানালেন, গাছটি সাংঘাতিক পরাশ্রয়ী। নামের সাথে মিল রেখেই অন্য গাছকে গিলে খায় সে। ফলগুলোর বিচি একদম মুরগির গিলার মতো দেখতে।  

এরই মাঝে নূহাশপল্লীতে আজকের এই আয়োজন সম্পর্কে মোকারম হোসেন বলেন, আমরা সবসময় যেতে চাই এমন কিছু জায়গায় যেখানে প্রচুর গাছগাছালি আছে, যেখানে উদ্ভিদবৈচিত্র্য আছে, প্রকৃতিতে মানুষ পাবে ভিন্নতার স্বাদ। সেজন্যই আমরা নূহাশপল্লীকে বেছে নিয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখানে আনুষ্ঠানিক বৃক্ষের বাগান রয়েছে। আমাদের পরিকল্পনায় আছে, ঢাকার বাইরে গাছের সমারোহে যাওয়ার। অনেকে আমাদের আমন্ত্রণ জানায় বিভিন্ন বাগানে যাওয়ার জন্য। আমরা বলব, আপনারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা নিশ্চয়ই যাব।  

গিলাতলা থেকে আমলকী, জগ্যডুমুর, কলাবতী, হরিতকী বাগান পেরিয়ে গেলাম পুরাণ খ্যাত গুলঞ্চতলে। জানলাম রাবণ, শিব আর গুলঞ্চ অমৃত দিয়ে বানর বাঁচানোর কাহিনী। সেখান থেকে চলে এলাম লবঙ্গলতিকার দেশে। এখানেই দেখা পেলাম বিশ্বখ্যাত মশলার রাজা অল স্পাইসের। ডাল, পাতা থেকে শেকড় পর্যন্ত সবকিছুই তার কাজে লাগে মশলা হিসেবে। পাশেই সগর্বে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণবট, গোলাপি বট, বাবলা।

এসবেরই মাঝে এক ফাঁকে হর্টিকালচারিস্ট এস এম কামরুজ্জামান বলেন, আমি একটি প্রকল্পে কাজ করছি। আমাদের উদ্দেশ্য তিনটি। প্রচলিত ফলকে সঠিক ভাবে পরিচিত করা, অপ্রচলিত ফলকে প্রচলিত করা এবং যেসব বিদেশি সম্ভাবনাময় ফল আমাদের দেশে জন্মে, সেগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া।

দুপুরে খাওয়ার পর্ব শেষে সবাইকে দেখা গেল খানিক বিমর্ষ। ধীর পায়ে সবাই এগিয়ে এলেন হুমায়ূনের প্রিয় লিচুতলায়, যেখানে তিনি আছেন চিরনিদ্রায়। সব আয়োজন শেষে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়ে ফিরে গেলাম প্রতীক্ষার রাজ্যে, আবার কবে ফিরব প্রকৃতির কোলে!

বাংলাদেশ সময়: ১৭৩০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৩
এএ/এমএনএন/এসএটি/জেসিকে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa