[x]
[x]
ঢাকা, শনিবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
bangla news

আমার মধ্যে নাকি ছয়টি গুণ আছে: লাকী ইনাম

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১২-০৮-২৬ ৫:৪৬:০১ এএম

লাকী ইনাম, আমাদের নাট্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ। নাট্যচর্চায় কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের চার চারটি দশক। আর তার জীবন গাড়িটি এরই মধ্যে পেরিয়েছে ৬০ বছরের মাইল ফলক।

লাকী ইনাম, আমাদের নাট্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ। নাট্যচর্চায় কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের চার চারটি দশক। আর তার জীবন গাড়িটি এরই মধ্যে পেরিয়েছে ৬০ বছরের মাইল ফলক। স্বামী ড. ইনামুল হকের সঙ্গে একদিন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের রিহার্সেল দেখতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন থিয়েটারের বাঁধনে। তারপর থিয়েটারে পথ চলা শুরু। অভিনয় করেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় সব নাটকে। গড়ে তোলেন নিজস্ব নাট্যদল নাগরিক নাট্যাঙ্গন।

লাকী ইনাম শুধু মঞ্চেই নয়, নিয়মিত অভিনয় করছেন টিভিনাটকেও। অভিনয়ের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়ে উঠলে শুরু করেন নাটক লেখা ও পরিচালনা। ‘টিকিট’ নামে একটি নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থাও আছে তার। টেলিভিশন মিডিয়ার শত ব্যস্ততার মধ্যেও ভুলে যান নি থিয়েটারের কথা। থিয়েটারের সঙ্গেই আছেন এবং যতোদিন সামর্থ্য আছে থিয়েটারে কাজ করে যেতে চান তিনি।

শিল্পকলা একাডেমির রেপারটরি প্রযোজনা ‘বিদেহ’ নাটকের নির্দেশনা নিয়ে এ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন লাকী ইনাম। বীরাঙ্গনাদের দুঃখগাঁথা নিয়ে এ নাটকটিতে অভিনয়ও করছেন তিনি। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের ২ ও ৩ তারিখে নাটকটির প্রিমিয়ার শো হবে জাতীয় নাট্যশালায়।

তাছাড়া থিয়েটারে লাকী ইনামের ৪০ বছরের পথচলাকে বেশ জাঁকজমকভাবে উদযাপন করবে তার দল নাগরিক নাট্যাঙ্গন। এ উপলক্ষে লাকী ইনাম নির্দেশিত ৬টি নাটক নিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে নাট্য উৎসব।

থিয়েটারে ৪০ বছর পূর্তি উৎসবের আগে লাকী ইনামের মুখোমুখি হয় বাংলানিউজ। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন থিয়েটার, মিডিয়া আর ব্যক্তি জীবনের নানা কথা।

বাংলানিউজ : একজন শিল্পী হিসেবে জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার পর কিভাবে নিজের মূল্যায়ন করেন?

লাকী ইনাম : জীবনের ৬০ বছর অতিক্রম করছি, এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে থিয়েটারে ৪০ বছর পার করছি। ২০ বছর বয়সে থিয়েটার শুরু করেছিলাম, ৪০ বছর ধরে থিয়েটার করছি এবং বিরতিহীনভাবে করেই যাচ্ছি। তাই থিয়েটার জীবনের এই দীর্ঘযাত্রায় আমি বলব, জীবন খুবই চমৎকার এবং আনন্দদায়ক।

থিয়েটারে অর্থনৈতিক কোন প্রাপ্তি নেই, কিন্তু অনেক বড় মানসিক প্রাপ্তি আছে। থিয়েটার আমাকে মানসিকভাবে অনেক ভাল রেখেছে। আমি খুবই তৃপ্তি পাই যে, থিয়েটারকে আমরা একটা চমৎকার নান্দনিক জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি। আমি আশা করি, যতদিন বাঁচব থিয়েটার করব এবং নতুনদের থিয়েটার শিখিয়ে যাব। আমি মনে প্রাণে চাই, বাংলাদেশে থিয়েটার যেন সুস্থ সংস্কৃতির শাখা হিসাবে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে।

বাংলানিউজ : থিয়েটারে যুক্ত হয়েছিলেন কিভাবে?

লাকী ইনাম : আমি ছোটবেলা থেকেই গান আর নাচ শিখতাম। আমাদের পরিবারে পড়াশুনার পাশাপাশি এগুলোও ছিল বাধ্যতামূলক। ইনামের (ড. ইনামুল হক) সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হয়, তখন দেখলাম আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও দারুণ সংস্কৃতিমনা। ইনাম তখন থিয়েটার করত। ১৯৭২ সালে আমি ইনামের সঙ্গে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যাই। তখন নাগরিকে কোন নারী সদস্য ছিল না। নাগরিক থেকে তখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটি করার ব্যপারে আলোচনা চলছিলো। দলের সবাই যখন জানলেন যে আমি নাচ জানি, গান গাইতে পারি তখন সবাই আমাকে নাটকটিতে কাজ করতে বললেন। এভাবেই নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রথম নারী নাট্যকর্মী হিসাবে থিয়েটারে আমার পথচলা শুরু।
 
বাংলানিউজ : আপনার নির্দেশনায় নতুন নাটক ‘বিদেহ’ সম্পর্কে জানতে চাই?

লাকী ইনাম : চেষ্টা করছি শৈল্পিক এবং দর্শকগ্রাহ্য একটা নাটক নির্মাণের। বীরাঙ্গনাদের দুঃখগাঁথা নিয়ে ‘বিদেহ’ নামের এই নাটকটি লিখেছেন শাহমান মৈশান। শিল্পকলা একাডেমি এ বছর রেপারটরি প্রযোজনা হিসেবে তিনটা নাটক মঞ্চে আনছে। বাংলাদেশের তিনজন নাট্য নির্দেশককে তিনটি নাটকের নির্দেশনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম নাটকটি নির্দেশনা করেছেন মামুনুর রশীদ, নাম ‘টার্গেট প্লাটুন’। আতাউর রহমান নির্দেশনা করেছেন ’রুদ্র রবি ও জালিয়ান ওয়ালাবাগ’। আমি নির্দেশনা করছি ‘বিদেহ’। এ নাটকটিতে আমি অভিনয়ও করছি। নাটকটিতে আমি ছাড়াও মণিপুরি থিয়েটারের জ্যোতি সিনহা এবং আরণ্যক নাট্যদলের মোমেনা চৌধুরী অভিনয় করছেন। নাটকের সেট ও লাইট ডিজাইন করছেন তরুন প্রতিভাবান নাট্য নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী। আমরা ১৪ ও ১৫ আগস্ট দু’দিন কারিগরি প্রদর্শনী করেছি এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাসের ২ ও ৩ তারিখে নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন করব।

বাংলানিউজ : রেপারটরি থিয়েটারের মধ্য দিয়ে নাট্যচর্চায় পেশাদারিত্ব আনা কি সম্ভব?

লাকী ইনাম : বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় পেশাদারিত্ব নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নাটক একটা সংকটাপূর্ণ অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। এখন বাংলাদেশের থিয়েটারকে বাঁচাতে হলে পেশাদারিত্ব তৈরি করতে হবে। আর এক্ষেত্রে সরকারকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

শিল্পকলা একাডেমি রেপারটরি প্রযোজনা হিসেরক তিনটি নাটক মঞ্চে নিয়ে আসছে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক একটা দিক। তবে সামগ্রিকভাবে পেশাদারিত্ব তৈরি করতে হলে অবশ্যই পেশাদারিত্বের অব-কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। বিভিন্ন নাট্যদলকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে অগ্রসর হতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে রেপারটরি প্রযোজনা মঞ্চে নিয়ে এলে পেশাদারিত্ব তৈরি হবে না, তবে পেশাদারিত্বের পথ তৈরি হবে।

বাংলানিউজ : আপনার থিয়েটার জীবনের ৪০ বছর উদযাপন করতে নাট্যাৎসক আয়োজন করছে নাগরিক নাট্যাঙ্গন। এ বিষয়ে কিছু জানতে চাই।

লাকী ইনাম : আগামী ৪ সেপ্টেম্বর থেকে জাতীয় নাট্যশালায় আমার নির্দেশিত ৬টি নাটক নিয়ে উৎসব করবে নাগরিক নাট্যাঙ্গন। দলের সবাই মনে করে, আমার মধ্যে নাকি ছয়টি গুণ আছে। অভিনয় শিল্পী, নাট্যকার, নির্দেশক, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী এবং নাট্য শিক্ষক -এ ৬ গুণের সমন্বয়ে নাকি আমি লাকী ইনাম। তাই থিয়েটারে আমার ৪০ বছর উদযাপন উপলক্ষে ‘ষড় ঐশ্বর্য্যে লাকী ইনাম’ শিরোনামে দল থেকে এ উৎসব করা হচ্ছে। সাধারণত নাট্যাৎসবে বিভিন্ন দলের নাটক থাকে। কিন্তু এ উৎসবের সব নাটকই আমাদের দলের এবং আমার নির্দেশিত।

বাংলানিউজ : টিভি মিডিয়ায় আপনার কাজের খবর জানতে চাই?

লাকী ইনাম : টিভি মিডিয়াতে এখন খুব একটা কাজ করা হচ্ছে না। আসলে আমি থিয়েটার আর সংসার নিয়ে একটু ব্যস্ত আছি। থিয়েটার আর মিডিয়া এক সঙ্গে দুই জায়গাতে কাজ করতে গেলে একটু সমস্যা হয়। তবে আমাদের প্রযোজনা সংস্থা ‘টিকিট’ থেকে নিয়মিতভাবেই টিভি নাটক তৈরি হচ্ছে। এখন হৃদি হক নাটক লিখছে, পরিচালনা করছে এবং আমাদের টিকিট নামের প্রযোজনা সংস্থাটি চালাচ্ছে। তবে একটু গুছিয়ে নিয়ে টেলিভিশন মিডিয়ায় আবার নাটক লিখব, অভিনয় করব। চলচ্চিত্র নির্মাণের একটা পরিকল্পনাও আছে।


বাংলানিউজ : সংসার জীবনের গল্প শুনতে চাই?

লাকী ইনাম : আমি ব্যস্ত আছি থিয়েটার আর আমার নাতী-নাতনী নিয়ে। আমার বড় মেয়ে হৃদি এবং লিটু আনামের সংসারে যমজ বাচ্চা ও ছোট মেয়ে পৈতি ও সাজু খাদেমের সংসারে একটি ছেলে সন্তান আছে।lucky আমি আমার তিন নাতী-নাতনি এবং থিয়েটার নিয়ে বেশ ভাল সময় কাটাচ্ছি। তাছাড়া আমার স্বামীতো খুবই মজার মানুষ। তাই বলা যায়, সব সময় খুবই আনন্দের মধ্য দিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। নাতী-নাতনি, থিয়েটার নিয়ে এখন আমার সংসার। তাই সংসার জীবনে আমি এখন আনন্দের মধ্যে আছি।


বাংলানিউজ : শৈশবের কোন মজার স্মৃতির কথা যদি বলতেন?

লাকী ইনাম : শৈশব তো সব সময় সুন্দর। শৈশবের মা সুন্দর, বাবা সুন্দর, ভাই বোন সুন্দর, আমার শিক্ষকরা সুন্দর। শৈশবের সব কিছুই মজার এবং সুন্দর। শৈশবের স্মৃতি কোন দিন হারিয়ে যায় না। তবে সময়ের বিবর্তনে হয়ত অনেক কিছু বদলে যায়। শৈশব পেরিয়ে, তারুণ্য পেরিয়ে এখন পৌড়ত্বে এসেছি। এরকম ধাপে ধাপেই তো জীবনটা শেষ হয়। এই যে জীবনের বিচিত্রতা এটা তো সব সময় ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষ উপভোগ করে। আমার শৈশব আর এখনকার মানুষের শৈশব তো এক হবে না। আমার শৈশবটা খুবই আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটেছে।

বাংলানিউজ : থিয়েটার নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে চাই?

লাকী ইনাম : নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামা (এন এন আই ডি) নামে আমাদের একটা থিয়েটার স্কুল আছে। আমরা চাই এ প্রতিষ্ঠান থেকে ছেলেমেয়েরা যেন শিল্পচর্চার প্রাথমিক একটা ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এই স্কুলটাকে আরও বড় পরিসরে দাঁড় করাতে চাই। ছেলেমেয়েদের থিয়েটার শেখাতে চাই, নিজে শিখতে চাই। যতদিন বাঁচি থিয়েটারের সঙ্গে থাকতে চাই।

বাংলাদেশ সময়: ১৪৫৭ ঘণ্টা, আগস্ট ২৬, ২০১২
সম্পাদনা : বিপুল হাসান, বিভাগীয় সম্পাদক/ জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14