ঢাকা, সোমবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭, ০১ মার্চ ২০২১, ১৭ রজব ১৪৪২

শিক্ষা

করোনাকাল: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেড়েছে শিশুশ্রম 

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৮৪৩ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৬, ২০২১
করোনাকাল: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেড়েছে শিশুশ্রম  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেড়েছে শিশুশ্রম। ছবি: বাংলানিউজ

ফেনী: করোনাকালে কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুশ্রম বাড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। করোনায় নিম্ন আয়ের মানুষের সংসারে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলো তাদের স্কুল পড়ুয়া সন্তানদের বাড়তি আয়ের আশায় শিশুশ্রমে নিয়োজিত করছে।  

ফেনী শহরের লালপুল, ডাক্তারপাড়া, রেলওয়ে স্টেশান, বিরিঞ্চি এবং বারাহীপুরে কলোনিগুলো (কম ভাড়ার কাঁচা পাকা ঘর) ঘুরে ভাসমান পরিবারগুলোতে এমনই চিত্র দেখা গেছে।  

ফেনী জেলা মহিলা অধিদপ্তর বলছে, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেলায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ১৭৭ জন শিশুশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। তবে করোনাকালীন ভাসমান বিভিন্ন বসতি এবং নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে শিশুশ্রম বাড়ায় এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন উপ-পরিচালক নাসরিন আক্তার।

নাসরিন আক্তার বলেন, জেলায় শিল্প প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিশু শ্রমিকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছিল ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। দীর্ঘদিন এর কোনো ধরনের সভা সেমিনার নেই। তবে সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে ৫ জন শিশুর পরিবারকে তখন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়েছিল। এছাড়া শিশুশ্রমে নিয়োজিতদের পুনর্বাসনের জন্য জেলায় কোনো প্রকল্প নেই বলেও জানান তিনি।

ফেনী সরকারি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ফখরুল আমিন বলেন, করোনাকালে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে বেড়ে ওঠা শিশুদের একটি অংশ বিভিন্ন হোটেল ও ছোট কারখানাগুলোতে কাজ নিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে শিশু অপরাধ বাড়ার আশংকা রয়েছে, মাদকের বাহকও বাড়তে পারে। বিরিঞ্চি বসতির মো. আকরাম হোসেন নামে এক শিশু বলে, করোনার সময়ে বাবার কাজ কমে যাওয়ায় আমাকে পান-সিগারেট বিক্রির কাজে নিয়োজিত করেছে। তার আগে জিএ একাডেমিতে ৭ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতাম। এখন সপ্তাহে ১৫শ টাকার মত রোজগার করতে পারি। করোনা পরবর্তী বিদ্যালয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও আর পড়ালেখা করবে না বলে জানায় আকরাম।

মাছ ধরতে যাচ্ছে তিন শিশু।  ছবি: বাংলানিউজ

শহরের পুরাতন রেজেস্ট্রি অফিসের ভূঞা বাড়ি কলোনির মো. মোকাব্বির নামে আরেক শিশু জানায়, গত এক বছর চানাচুর বিক্রি করি। দৈনিক সাড়ে ৩শ হতে সাড়ে ৩শ টাকা আয় হয়। ওইগুলো দিয়ে পরিবার চলে।

এ বয়সে এ কাজে আসার কারণ জানতে চাইলে এ শিশু বলে, আমি ছোট থাকতে বাবা মারা যায়। মা মানুষের বাসায় কাজ করে আমাদের ৪ ভাই-বোনকে বড় করেছে। এখন মা-ও অসুস্থ হয়ে গেছে। গতবছর মোকাব্বিরের পিইসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল।

একইভাবে আট বছরের সাগর, নয় বছরের জামশেদ, শহরের ডাক্তারপাড়ায় ময়লা হতে প্লাস্টিক খুঁজতে থাকা রিসাদ হাসান জানে না আর কখনো স্কুলে যাওয়া হবে কিনা।

নাসরিন আক্তার বলেন, এসব শিশুদের বিভিন্ন পেশা থেকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকসহ অভিভাবকদেরও বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার সচেতন না হলে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে।

শিক্ষাবিদ ও ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বিমল কান্তি পাল বলেন, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং শিশুশ্রমে নিযুক্ত হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে পারিবারিক অস্বচ্ছলতা। একটি শিশু শ্রমে নিযুক্ত হওয়ার আর যে কারণগুলো রয়েছে, সঠিকভাবে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে, তাহলে এ সমস্যার সমাধান সহজ হবে।  

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ধারায় শিশুদের সুবিধাপ্রাপ্তি-সংক্রান্ত বিশেষ বিধান রয়েছে। শ্রম আইন, ২০০৬ অনুসারে, কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স হচ্ছে ১৪ বছর আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে তা ১৮ বছর। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে হালকা কাজ করলে সেটাকে ঝুঁকিমুক্ত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না।

বাংলাদেশ সময়: ০৮৪২ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৬, ২০২১
এসএইচডি/এমএইচএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa