bangla news

বালুচরে মিষ্টি কুমড়ায় সচ্ছল ভূমিহীনরা

আবু খালিদ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-০৫-৩০ ১২:৫০:৫২ এএম
ছবি: কাশেম হারুন-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: কাশেম হারুন-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল কিছুই না হওয়ার চেয়ে অন্তত কিছু হোক (অনেকটা নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো টাইপের)। গবেষণার আলোকে কৃষি উৎপাদন ও ভূমিহীন কৃষকদের জীবনের মান উন্নয়নকে সামনে রেখে কাজ শুরু। আর শুরুর বছরেই অনাবাদি ও পড়ে থাকা বালুর চরে পিট পদ্ধতিতে কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি চাষে মেলে সফলতা।
 

তিস্তার পাড় (রংপুর) ঘুরে: দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল কিছুই না হওয়ার চেয়ে অন্তত কিছু হোক (অনেকটা নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো টাইপের)। গবেষণার আলোকে কৃষি উৎপাদন ও ভূমিহীন কৃষকদের জীবনের মান উন্নয়নকে সামনে রেখে কাজ শুরু। আর শুরুর বছরেই অনাবাদি ও পড়ে থাকা বালুর চরে পিট পদ্ধতিতে কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি চাষে মেলে সফলতা।
 
এরপর শুধুই সামনের দিকে এগিয়ে চলার গল্প। চাষির সংখ্যা বেড়ে শত শত থেকে এখন হাজার হাজারে দাঁড়িয়েছে। ভূমিহীন এসব চাষির সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। সবুজের ঢেউ খেলেছে অনুর্বর মনে করে ফেলে রাখা বালুচরেও।

আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়নমূলক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের উদ্যোগ ও সহায়তায় বালুর চরে মিষ্টি কুমড়া চাষের এ সফলতার দৃষ্টান্ত এখন দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও ছড়িয়েছে।

২০০৫ সালেই গাইবান্ধা জেলার চরাঞ্চলের ১১টি স্থানে ১শ’ ৭৭ জন চাষিকে নিয়ে সবজি ফলানোর এ সংগ্রাম শুরু করে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। এরপরের কয়েক বছরের মধ্যেই রংপুর জেলার তিস্তা নদীর বিস্তীর্ণ বালুর চরসহ বেশকিছু চরাঞ্চলে মিষ্টি কুমড়া চাষে বিপ্লব ঘটে গেছে।

রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ে আলাপকালে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন, বাংলাদেশের এক্সট্রিম প্রোভার্টি প্রোগ্রাম হেড এ জেড এম নজমুল ইসলাম চৌধুরী বাংলানিউজকে জানান, ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিন হাজার ২শ’ ৭৩ জন চাষি এক হাজার আড়াইশ’ হেক্টর জমিতে ৩৩ হাজার মেট্রিক টন কুমড়া উৎপাদন করেন। যার স্থানীয় বাজার মূল্য ২২ কোটি টাকা। এ সফলতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ২০০৯ সালে সরকার ও ডিএফআইডি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ইইপি সিঁড়ি প্রকল্পের মাধ্যমে মিষ্টি কুমড়া চাষ সম্প্রসারণে সহায়তা করে।
 
২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন, বাংলাদেশের এ উদ্যোগের সফলতা তুলে ধরেন নজমুল ইসলাম আরও জানান, ‘পাথওয়েজ ফ্রম প্রোভার্টি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯ হাজার ২৫ হেক্টর বালুচর চাষের আওতায় আনা হয়। ওই বছরগুলোতে ১২ হাজার ৮৫৭ জন ভূমিহীন দরিদ্র চাষি প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন মিষ্টি কুমড়া উৎপাদন করেন। যার বাজার মূল্য ৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

নজমুল ইসলাম বলেন, কুমড়া উৎপাদনের এ প্রযুক্তি ভূমিহীনদের মধ্যে আশার আলো হিসেবে ধরা দিয়েছে। শুধু প্রকল্পের চাষিরাই নন, এর বাইরের চাষিরাও এ প্রযুক্তি অনুসরণ ও গ্রহণ করে উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি সাফল্য পাচ্ছেন।

এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে ভূমিহীনরা আর্থিক সচ্ছলতায় বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পান বলেও মন্তব্য করেন নজমুল ইসলাম চৌধুরী।

তিনি আরও বলেন, তৃণমূল এসব মানুষদের খুব বেশি অর্থের দরকার হয় না। সামান্য সহযোগিতা পেলেই তাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এছাড়া তারা খুব পরিশ্রমীও। ফলে এতে সফলতা আনতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।
 
ভূমিহীনরা যেন তাদের কষ্টের ফসলের ন্যায্য দাম পান, তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে উল্লেখ করে নজমুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের বাজারে তৃণমূল চাষিদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ কারণে আমরা দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন বাজারের সঙ্গে তাদের সংযোগ করে দিচ্ছি। বর্তমানে একাধিক দেশে তাদের মিষ্টি কুমড়া রফতানি হচ্ছে।
 
তিনি বলেন, শুরুতে মিষ্টি কুমড়া চাষে বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি চাষিদের বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়। সব সময় চাষিদের পাশে থেকে দিক-নির্দেশনাসহ নানা তথ্য সরবরাহ করায় চাষিরা বেশি উৎসাহিত হয়ে কাজ করেন। তবে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ও চাষি- উভয়ের শতভাগ করে অংশগ্রহণেই এমন সফলতা পাওয়া গেছে।

বালুচরে এ ধরনের সফলতা দেশের গণ্ডি পার হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্বীকৃতিস্বরূপ এই প্রযুক্তিটি ২০০৭ সালে জাপান থেকে ‘এশিয়া প্যাসিফিক ফোরাম ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ২০১৩ সালে ‘স্কটল্যান্ড থেকে সেন্ট এন্ড্রুস অ্যাওয়ার্ড ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ এবং ২০১৪ সালে ‘ইউএসএইড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে’। ২০১১ সালে এ প্রযুক্তিটি জার্মান গণমাধ্যম ডিডব্লিউটিভি’তে প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে ডকুমেন্টারিটি কান উৎসবেও প্রশংসিত ও পুরষ্কৃত হয়।
 
এ জেড এম নজমুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের নদীভাঙন কবলিত হতদরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির সফলতা এখন প্রমাণিত। দেশের ৩০ থেকে ৪০টি নদীভাঙন এলাকায় লক্ষাধিক পরিবার সব কিছু হারিয়ে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধের ওপর বসবাস করে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে যদি এ প্রযুক্তির আওতায় আনা যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদনসহ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিপ্লব ঘটবে। ভূমিহীনেরা পাবেন নতুন আলোর দেখা।
 
২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশের নদী ভাঙন কবলিত এলাকার এক হাজার চাষির জীবন মান উন্নয়নে সিকিউরিং ওয়াটার ফর ফুড প্রোজেক্ট অব ইউএসএআইডি বাজারভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে একটি বাণিজ্যিক মডেল তৈরিতে কাজ করছে। এতে টেকসই ফসল উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশ সময়: ১০৫০ ঘণ্টা, মে ৩০, ২০১৬
একে/এসএইচ/এএসআর

** ভূমিহীনদের মিষ্টি কুমড়া মালয়েশিয়ার বাজারে

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
db 2016-05-30 00:50:52