ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ মাঘ ১৪২৮, ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

অর্থনীতি-ব্যবসা

আগের সেই রহিমআফরোজ নেই!

মনোয়ারুল ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৮২৭ ঘণ্টা, জুলাই ৩০, ২০১৩
আগের সেই রহিমআফরোজ নেই!

ঢাকা: নামস্বর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে রহিমআফরোজ। নানা রকম নেতিবাচক ইমেজের কারণে কোম্পানিটির সুনাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির নিম্নমানের ব্যাটারি, আইপিএস, টায়ার, আমদানি করা নিম্নমানের টেলিভিশন, আগোরাতে ভেজাল পণ্য বিক্রি, নিম্নমানের কাস্টমার সার্ভিস, বিক্রয়োত্তর সেবা দিতে টালবাহানার দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছে। সর্বোপরি কোম্পানির চাকরিজীবীদের সুবিধা কমানোর মাধ্যমে কর্পোরেট জগতে একটি ক্ষয়িষ্ঞু কোম্পানি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

হারিয়েছে তাদের ব্রান্ডিং লোকাল গ্রয়িং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ইমেজ । কোম্পানির পুরনো কর্মীরা বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, আগের সেই রহিমআফরোজ কোম্পানি নেই। এখন পেটের দায়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সব অন্যায় মেনে কাজ করতে হয়। যারা কোথাও সুযোগ পান তারা চলে যাচ্ছেন।

দেশের অন্যতম এই বড় প্রতিষ্ঠানটি মরহুম এ সি আবদুর রহিম ১৯৫৪ সালে নিবন্ধিত করেন। ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যের লুকাস ব্যাটারি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সফল ব্যবসার শুরু।   ১৯৮৫ সালে প্রথম শিল্প-ব্যাটারি উৎপাদন শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথম সোলার পাওয়ারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের সহায়তায় কাজ শুরু ও ১৯৯২ সালে প্রথম সিঙ্গাপুরে ব্যাটারি রপ্তানি করে কোম্পানিটি।

রহিমআফরোজ দেশে প্রথম ১৯৯৩ সালে আইপিএস চালু করে। ২০০০ সালে ভারতের আহমেদাবাদে অফিস খোলে এবং ২০০১ সালে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ অব দ্য ইয়ার হয় এবং একই সালে আগোরা ব্র্যান্ড নামে রহিমআফরোজ সুপারস্টোর্স লিমিটেড চালু করে।

২০০৪ সালে বাংলাদেশে ফাইবার অপটিকভিত্তিক মেট্রোনেট বাংলাদেশে চালু করেও রিনিউয়্যাবেল এনার্জির জন্য ম্যাক গ্র হিল প্যাট রিনিউঅ্যাবেল এনার্জি পদক পায় এবং ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার অর্ধশতক উদযাপন করে।

প্রতিষ্ঠানটি ২০০১-২০০২ সালে সেরা রফতানিকারকের ট্রফি অর্জন করে। ২০০৬ সালে অ্যাশডেন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। ২০০৮ সালে ব্র্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পায়। ২০১০ সালে  এশিয়ার বেস্ট ব্রান্ড ও বেস্ট ইম্পোয়ারের সিএমও অ্যাওয়ার্ড পায়। কিন্ত এরপর থেকে কোস্পানির অর্জনের খাতা একেবার শূন্য। ফলে কোম্পানির কর্মীদের মনোবল ভেঙে গেছে।

ব্যবসার সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও সুনাম কমেছে ও নেতিবাচক ইমেজ বেড়েছে। কোম্পানির দুর্বল জনসংযোগ ও কর্তাব্যক্তিদের অহংকারী মনোভাবেই পতন ডেকে আনছে বলে অনেক সাবেক ও বর্তমান কর্মী মত প্রকাশ করেন।

১৯৮২ সালে আবদুর রহিম মারা গেলে ব্যবসার হাল ধরেন তিন সন্তান আফরোজ রহিম, ফিরোজ রহিম এবং নিয়াজ রহিম। মুনাওয়ার মিসবাহ মঈন ও মুদাসসির মুর্তাজা মঈন গ্রুপ পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।

বর্তমানে ফিরোজ রহিম রহিমআফরোজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছেন। আফরোজ রহিম ও নিয়াজ রহিম অসুস্থতার জন্য অফিসের কাজে সরাসরি যুক্ত নেই।

রহিমআফরোজ গ্রুপে এখন যুক্ত হয়েছে তৃতীয় প্রজন্ম। আবদুর রহিমের তিন সন্তানের পর এখন ব্যবসার হাল ধরেছেন তার নাতি-নাতনিরা। বর্তমানে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন নিয়াজ রহিমের বড় ছেলে ফারাজ রহিম এবং তাদের বোনের সন্তান এরাম নাহিদ।

মনোকষ্টে কর্মচারীরা:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোম্পানির কর্মচারীরা বর্তমান ম্যানেজমেন্টের কাজে অসন্তুষ্ট। তারা চাকরি বাঁচাতে মানসিক কষ্ট নিয়ে কাজ করছেন। গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রহিম অত্যন্ত সৎ ও নরম মনের মানুষ ছিলেন। তার পরিচালনায় কোম্পানি কোন দুর্নাম অর্জন করেনি। এখন কোম্পানির নানা রকম দুর্নাম। ফলে জীবিকার জন্য কোম্পানিতে কাজ করলেও তারা মানসিকভাবে খুবই কষ্টে আছেন।

পুরনো এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রায় শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করছি। কিন্ত বর্তমান ম্যানেজমেন্ট কাজের মূল্যায়ণ না করে অন্যদিকে দৃষ্টি দিচ্ছে। অনেক জুনিয়র বা সুন্দরী নারীরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে। ফলে মনোকষ্ট ও যাতনা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আর নানা রকম দলাদলি ও গ্রুপিংয়ে কাজের ভালো পরিবেশ নেই। এখানে কাজের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ’

তিনি আফসোস করে বলেন, ‘আমাদের হাত দিয়েই কোম্পানির উন্নতি হয়েছে। এখন আমাদের মূল্য নেই। তাই কষ্ট নিয়ে কাজ করি আর প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রহিম সাহেবের কথা ভাবি। তিনি কি চেয়েছিলেন আর এখন চলছে কি?’

খারাপ ব্র্যান্ডিং:
রহিমআফরোজ কোম্পানি বাজারের দিন দিন খারাপ ব্র্যান্ডিং অর্জন করেছে। এ ব্যপারে বর্তমান কর্তৃপক্ষ ততটা মনোযোগি না হওয়াতে কোম্পানির ইমেজ উত্তরোত্তর খারাপ হচ্ছে। সব মিলিয়ে রহিমআফরোজ গ্রুপ আর আগের সেই দিনে নেই। উন্নতির চেয়ে নেগেটিভ ইমেজ অর্জন করেছে বেশি। এভাবে চলতে থাকলে কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশংকা প্রকাশ করেন অনেক কর্মী। কোম্পানির কর্মীদের দীর্ঘশ্বাসে ভারি হচ্ছে রহিফআফরোজ কোম্পানির অফিসের বাতাস।

রহিমআফরোজ নিয়ে বাংলানিউজের ধারাবাহিক অনুসন্ধান রিপোর্টে আগামীতে পড়বেন ‘ব্যাটারি নিয়ে মহা প্রতারণা’।

বাংলাদেশ সময়: ০৮২০ ঘণ্টা, জুলাই ২৯, ২০১৩
এমআইআর/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa