ঢাকা, সোমবার, ৩ আষাঢ় ১৪৩১, ১৭ জুন ২০২৪, ০৯ জিলহজ ১৪৪৫

অর্থনীতি-ব্যবসা

সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ কমলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা বাড়বে

জাফর আহমদ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫৪৮ ঘণ্টা, মে ২৯, ২০২৪
সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ কমলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা বাড়বে

ঢাকা: অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে আগামী বছরের বাজেট পরিধি খুব বেশি বাড়াতে পারছে না সরকার। সেক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দও বাড়ছে না।

বরং চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ কিছুটা কমছে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংকুচিত হতে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতি চাপে থাকলেও যেভাবেই হোক না কেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতিসহ অন্যান্য কারণে নিম্ন আয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বয়স্ক, বিধবা নারী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংকুচিত হলে এ বিরাট জনগোষ্ঠীর সমস্যা বাড়বে।

চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ তিন হাজার ৩১৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ থাকছে তিন হাজার ৩০৮ কোটি ৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ কমছে ১০ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য এডিপি ধরা হচ্ছে দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে এক লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। আর বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে এক লাখ কোটি টাকা। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপি দুই লাখ ৬৩ হাজার ‍কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এডিপি দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

সাধারণত প্রতি বছরই নির্দিষ্ট হারে বাজেটের আকার বাড়ে। কিন্তু দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মূল্যস্ফীতি, প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায় করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে সম্প্রসারণমুখী বাজেটের পরিবর্তে সংকোচনমুখী বাজেটের দিকে যেতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে।

বরাদ্দে কম্প্রোমাইজ করলে সামাজিক অবস্থা ইমব্যালেন্সড থেকে যাবে

- ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী, সাবেক মহাপরিচালক, বিআইবিএম

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, অর্থনৈতিক সংকট চেপে ধরে রেখেছে। সরকারের হাতে সম্পদও কম। সরকার এখন আগের অর্থনৈতিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে। আগের আর্থিক অবস্থা যদি ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে তো  আগের জায়গা অন্তত ধরে রাখতে হবে। এসব জায়গায় (সামাজিক নিরাপত্তা খাত) কম্প্রোমাইজ (আপস) করলে সামাজিক অবস্থা ইমব্যালেন্সড (ভারসাম্যহীন) থেকে যাবে।

তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ শুরু ‍হয়ে গেছে। এখন ডলারের দামের উচ্চ অবস্থা। চলতি বছরের চেয়ে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না হলেও সাম্যাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য আগে যে পরিমাণ ব্যয় করা হতো, তা অন্তত অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা আশা করি, তা অব্যাহত থাকবে। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরের বছর বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানো যাবে।

বরাদ্দ যাদের জন্য, তারা পাচ্ছে  কি না, লক্ষ্য রাখতে হবে

ড. আশিকুর রহমান, মুখ্য অর্থনীতিবিদ, পিআরআই

দেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার বড় করার সুযোগ নেই। তবে এ-ও সত্য যে, দেশে ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমস্যায় আছে। গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কম দামে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বয়স্ক, দুস্থ মা, বিধবা নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে। এ কর্মসূচি অব্যহত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।  

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আগামী বছরের বাজেটের আকারে বড় ধরনের বৃদ্ধি সম্ভব নয়। সে কারণে কোনো খাতেই বেশি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও মূল্যস্ফীতি যেহেতু সাড়ে ৯ শতাংশের ঘরে, দরিদ্র জনঘোষ্ঠীর জন্য কিছুটা তো বরাদ্দ রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। কোনো জায়গায় যদি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থাকে, সেখানে কমিয়ে সেই অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দেওয়া যেতে পারে।  

তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা কোথায় যাচ্ছে, লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, সামাজিক নিরাপত্তার নামে এমন কোনো খাতে যদি খরচ বাড়ানো হয় যে, যে খাতের অর্থ পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে যাচ্ছে না, বরং প্রতিষ্ঠিতদের কাছেই ঘুরে ফিরে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ দিতে হবে এবং তা সঠিক মানুষের কাছে যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বিভিন্ন সময়ে টিসিবির মাধ্যমে যে খাদ্যপণ্য অল্প দামে মানুষের মাঝে দেওয়া হয়, সে জায়গায় বরাদ্দ বাড়ানোর দরকার। কারণ হলো, নিত্যপণ্যের দাম আসলে তো বেড়েছে। টিসিবিসহ যেসব মাধ্যমে মানুষের কাছে কম দামে খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে, তা অব্যাহত রাখলে মানুষ স্বস্তি পাবে। সরকার যেভাবে খাদ্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিতে চায়, আসলে তা পারা যায় না। যেহেতু যায় না, সেহেতু টিসিবি বা ওএমএসের মাধ্যমে কম দামে পণ্য বাজারে ছাড়া হলে কম আয়ের মানুষসহ পিছিয়ে পড়া মানুষ একটু সুবিধা পাবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৫১৪ ঘণ্টা, মে ২৯, ২০২৪
জেডএ/আরএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।