ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ বৈশাখ ১৪৩১, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫

অর্থনীতি-ব্যবসা

শুল্ক কমানোর পরও ফের বাড়ল খেজুরের দাম 

গৌতম ঘোষ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭৩৮ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৪
শুল্ক কমানোর পরও ফের বাড়ল খেজুরের দাম 

ঢাকা: শবে বরাতের রাত ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর পর এবার মুসলিম ধর্মপ্রাণরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক মাস সিয়াম সাধনার। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১১ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান।

 

আর রোজাদারদের খাদ্যতালিকায় অন্যতম অনুষঙ্গ হলো খেজুর। আমদানি নির্ভর এই পণ্যটির দামে উত্তাপ ছড়াচ্ছে রোজার আগেই।  

গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম বেড়েছে প্রকারভেদে কেজিতে ৮০ থেকে ১৫০ টাকা।  

দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত শুল্ক, ডলার সংকট, এলসি না পাওয়া ও সরবরাহে ঘাটতিকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা।  
একই সঙ্গে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীকে আমদানির অনুমতি দেওয়াকেও দায়ী করছেন তারা।

এদিকে রমজান উপলক্ষে খেজুরে ১০ শতাংশ শুল্ক ছাড় দিলেও খুশি হননি ব্যবসায়ীরা।  

কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ আসার পর লোড ও আনলোডে অনেক সময় লেগে যায়, এতে গুণতে হয় বিলম্ব মাশুল। ফলে শুল্ক যা কমিয়েছে তার থেকেও বেশি দিতে হচ্ছে বিলম্ব মাশুল।  

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, খেজুরের চাহিদার পুরোটাই আমদানি করে মেটাতে হয়। সরবরাহ ভালো থাকলেও অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে আমদানি করায় বাড়তি মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। একইসঙ্গে টাকার মান পড়ে যাওয়ায় এমনিতেই দাম বেশি পড়ছে।  

আগামী মার্চে যে রোজা শুরু হতে যাচ্ছে, সে মাসের পণ্যমূল্য নিয়ে এখনই কথা হচ্ছে। খেজুরের ওপর আরোপ করা আমদানি শুল্ক যা কমানো হয়েছে সেটা পর্যাপ্ত নয়। আরো কমানো দরকার ছিল।  

বিশ্বের খেজুর রপ্তানি করা কোনো দেশে দাম বাড়ায়নি, তারপরও আমাদের দেশে বাড়ছে কারণ শুল্ক বেশি দিতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ডলারের দাম বেশি, সংকটও রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে পারছে না। এতে করে বাজারে সরবরাহেও একটু ঘাটতি রয়েছে।  

এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে যদি লোড- আনলোড দ্রুত হয় তাহলে সরবরাহে ঘাটতি থাকবে না। কিন্তু খেজুরের দাম যা আছে সেটাই থাকবে। দাম কমাতে হলে শুল্ক আরো কমাতে হবে।  

উল্লেখ্য, গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক প্রজ্ঞাপনে রোজার অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেয়। বর্তমানে খেজুর আমদানিতে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ।  

রমজানকে সামনে রেখে সেটি কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। খেজুর আমদানিকারকেরা ১০ শতাংশ কম শুল্কে আমদানির এ সুবিধা পাবেন আগামী ৩০ মার্চ পর্যন্ত।

রোববার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দেশের সবচেয়ে বড় ফলের আড়ত বাদামতলি ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে এখন যেসব খেজুর প্রচলিত সেগুলোর মধ্যে মেডজুয়েল ৫ কেজির প্রতিকার্টুনের দাম প্রকারভেদে সাড়ে ৫ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। মাবরুম ৩ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার টাকা।  

মরিয়ম ৩ তিন হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা। আজোয়া সাড়ে ৪ হাজার ৭ হাজার টাকা। কালমি ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। মাসরুক এক হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা।

দাবাস ৩ হাজার ৮০০ টাকা। আলজেরিয়ার ফিট ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। ছড়া খেজুর ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা, লুলু/ বড়ই ছিল ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা

এছাড়া খেজুরের রাণী ৩ কেজি ছুক্কারি ৩ কেজির কার্টুন এক হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। খালাস ১০ কেজি প্রকি কার্টুন ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা এবং বস্তাখেজুর প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৫২ টাকা।

গত এক সপ্তাহ আগেও এসব খেজুরের দাম ছিল মেডজুয়েল ৫ কেজির প্রতিকার্টুনের দাম প্রকারভেদে ৬৬০০ টাকা থেকে ৭ হাজার টাকা, মাবরুম প্রকার ভেদে ৫৫০০ থেকে ৬০০০ টাকা, মরিয়ম ৪২০০ টাকা, আজোয়া ৪২০০ টাকা, কালমি ৩২০০ টাকা,মাসরুক ২৪০০ টাকা, দাবাস ২১০০ টাকা, আলজেরিয়ার ফিট ১৮০০ টাকা, ছড়া খেজুর ২৪০০ টাকা, লুলু/ বড়ই ২০০০ টাকা।  

এছাড়া খেজুরের রানি ছুক্কারি ৩ কেজির প্রতি কার্টুন বিক্রি হচ্ছে ২১০০ টাকা। খালাস ১০ কেজির প্রতিকার্টুন বিক্রি হচ্ছে ১৯০০ টাকা।  

গত সপ্তাহে বস্তাখেজুর ছিল প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা।  

এদিকে, রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মেডজুয়েল বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, মাবরুম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, মরিয়ম এক হাজার ১০০ টাকা,আজোয়া ৯০০ টাকা, ছুক্কারি ৮০০ টাকা, মাসরুক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, দাবাস ৫০০ টাকা, ছড়া খেজুর ৭০০ টাকা, লুলু/ বড়ই ৫০০ টাকা এবং বস্তাখেজুর ১৭০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।  

এ বিষয়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম. এম. এন্টারপ্রাইজের হাজী মো: মাঈন উদ্দিন মিয়া বাংলানিউজকে বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে নতুন মাল ঢুকছে। তারপর থেকেই দাম বাড়তি। এতোদিন পুরানো মাল বিক্রি হয়েছে। এবছর বাজারে খেজুরের সরবরাহ কম৷ ডিউটি বেশির কারণে ব্যবসায়ীরা কম আমদানি করেছে। আবার এলসি ও ডলার সংকটতো রয়েছে। সব মিলিয়ে দাম বেড়েছে৷

তিনি বলেন, সরকার ডিউটি কমিয়েছে সত্য কিন্তু বাড়িয়েছিল কত আর কমিয়েছে কত সেটা দেখতে হবে। আগে এক কন্টিনার ২৫ টন খেজুরে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা ডিউটি ছিল। সেটা বেড়ে হয়েছিল মাঝারি মানের খেজুর এক কন্টেইনারে ডিউটি আসে ৬৪ লাখ টাকা। আর যেটা নিম্নমানের সেটার ডিউটি ৩৩ লাখ টাকা৷ আগে সব একই রকম ছিল। সেখান থেকে বর্তমানে সরকার মাত্র ১০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে। ফলে ৬৪ লাখ টাকা শুল্ক কমেছে মাত্র ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এটাকে কমানো বলে না।  

তিনি আরও বলেন, এছাড়া পোর্ট ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। লোড- আনলোডে সময় লাগছে বেশি। এতে বিলম্ব মাশুল দিতে হচ্ছে৷ যে শুল্কটা কমেছে তার থেকে বেশি মাশুল দিকে হচ্ছে তাহলে দাম কমাবো কীভাবে। এটা বলতে পারি খেজুরের যে দাম বেড়ে গেছে এর থেকে আর বাড়ার কোনো সুযোগ নাই। তাই বলতে পারি রোজায় খেজুরের দাম আর বাড়বে না।  

পাইকারি খেজুর ব্যবসায়ী মেসার্স রওজা এন্টারপ্রাইজের সেলসম্যান কৌশিক সরকার বাংলানিউজকে বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে খেজুরের দাম বাড়ছে। প্রতিকার্টুনে প্রকার ভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ পর্যন্ত টাকা বেড়েছে। এছাড়া নতুন খেজুর বাজারে আসা শুরু করেছে। দাম বাড়ার মূল কারণ হলো ডিউটি ফি বেড়েছে। সরকার ২৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে ১০ শতাংশ কমালে দাম কমবে কীভাবে? আরও আগে ট্যাক্স কমানো উচিত ছিল। তাহলে ব্যবসায়ীরা আমদানির সুযোগ পেত। এছাড়া বন্দরে ওয়েটিং চার্জ দিতে হচ্ছে৷ ফলে শুল্ক কমলেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

তিনি বলেন, রমজান উপলক্ষে বাজারে খেজুরের চাহিদা বেড়েছে পাশাপাশি আমাদের বেচাকেনাও বেড়ে গেছে। কিন্তু শুল্ক বেশির কারণে অনেক ব্যবসায়ী এবছর খেজুর কম আমদানি করেছে। এছাড়া নিদিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীকে এলসি দেওয়া হচ্ছে।  

সদরঘাটের খুচরা খেজুর ব্যবসায়ী মো. কাওসার ৪/৫ বছর ধরে খেজুর বিক্রি করেন।  

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে পাইকারি বাজারে খেজুরের দাম কার্টুনে প্রকার ভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা বেড়েছে। আমরা বেশি দামে কিনি বিক্রিও করি বেশি দামে। তবে সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে এতে দাম কমার কথা কিন্তু উল্টো দাম বেড়েছে।  

কারণ হিসেবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেন, বাজারে সরবরাহ কম, ডলার সমস্যা, এজন্য দাম বেড়েছে।

আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু রমজান মাসেই দেশের মানুষের চাহিদা মেটাতে ৬০ হাজার টনের বেশি খেজুর প্রয়োজন হয়। যেখানে অন্য সব মাস মিলে খেজুরের চাহিদা ২০ হাজার টনের মতো। আর চাহিদানুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় দেশে প্রতিবছর ১৩-১৪ লাখ টন ডাল ও ডালজাতীয় শস্য আমদানি করতে হয়।

বাংলাদেশ সময়: ০৭২৯ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪
জিসিজি/এসএএইচ 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।