ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৯ শাবান ১৪৪৫

অর্থনীতি-ব্যবসা

রোজার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে স্থিতিশীল, সংকটে নিম্নবিত্তরা

এস এম এ কালাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৫৬ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০২৩
রোজার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে স্থিতিশীল, সংকটে নিম্নবিত্তরা

ঢাকা: রমজান শুরু হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে রমজানকে কেন্দ্র করে নিত্য প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়ে স্থিতিশীল হয়েছে।

পণ্যের লাগামহীন দাম বাড়ায় চরম সংকটে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। রোজগার না বাড়ায় পরিবার নিয়ে শহরে টিকে থাকাটাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। পরিবারে একাধিক লোক আয় করেও খরচ মিটাতে সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বলতার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন বলেও মনে করছেন ভোক্তারা। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন ডলার সংকট ও এলসি করতে না পারায় পণ্যের দাম বেড়েছে।

শুক্রবার (১৭ মার্চ) রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, তালতলাসহ একাধিক বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এমন তথ্য।

এসব বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্য ছোলা, খেসারির ডাল, মশুর ডাল, অ্যাংকর, বেসন, ডাবলি, সয়াবিন তেল, পাম ওয়েল, চিনিসহ সব পণ্যই গত সপ্তাহের দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে মাংসের দামও অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদা তুলনায় পর‌্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও প্রতিবছর রমজানের এক থেকে দুই সপ্তাহ আগেই এসব পণ্য দাম বেড়ে যায়। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। রমজানের আগে প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে স্থিতিশীল রয়েছে। রমজানে ছোলার চাহিদা থাকায় কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে ছোলার কেজি ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। মানভেদে এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা, অ্যাংকর ডাল কেজিতে ১০ টাকার মতো বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা, বেসনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা, খেসারির ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, সয়াবিন লুজ তেল কেজি ১৯০ টাকা, পাম ওয়েল ১৫০ টাকা এবং চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে।

এ ব্যাপারে শেওড়াপাড়া অলিমিয়ার টেক বাজারের ইকরা জেনারেল স্টোরের মামুন বলেন, রমজানের পণ্যগুলো গত দুই সপ্তাহ আগে থেকেই দাম বেড়েছে। আমরা বাড়তি দামে পণ্য কিনেছি তাই বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

বাজারে রমজানকে কেন্দ্র করে শাক-সবজি, মাছ, মাংস সবকিছু দাম এখন আকাশচুম্বি। বাজারে ক্রেতারা তাদের চাহিদা মত পণ্য কিনতে না পেরে দিশেহারা। একই দোকানে বার বার ভিড় করে পণ্যের দরদাম কষছেন। কম দামে পণ্য কিনতে না পেরে হতাশাও প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।

রহিমা বেগম চুক্তিভিত্তিক রান্না করা খাবার সরবরাহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পণ্যে দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন না। এভাবে চলতে থাকলেও পেশা বদলাতে হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, কয়েকজন ছাত্রকে রান্না করে খাওয়াই মাস শেষে খরচ বাদ দিয়ে যা থাকতো এতে করে দিন ভালো ভাবে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় বেড়ে গেছে। লোক খাইয়ে লাভ হচ্ছে না, এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মরতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে গত ১২ ফেব্রুয়ারি এফবিসিসিআই নিত্যপণ্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে ভোক্তা অধিদপ্তর। দুটি সভায় ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, পর্যাপ্ত পণ্য মজুত আছে। রমজানে দাম বাড়বে না। শুধু তাই নয় রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধে নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাতেও বাজারে কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

এদিকে শুক্রবার (১৭ মার্চ) আসন্ন রমজান উপলক্ষে এক বিশেষ তদারকিমূলক অভিযানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, সামনে রোজা। দয়া করে আপনারা এক মাসের বাজার একসঙ্গে কিনতে যাবেন না। আপনারা ১০ দিনের বা এক সপ্তাহের বাজার করেন। হঠাৎ করে বেশি পণ্য কিনলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়। তখন কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। এই কারণে অনুরোধ করব আপনারা একসঙ্গে পুরো মাসের বাজার করবেন না।

তিনি আরও বলেন, পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছে। আমরা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের বাজার, বিশেষ করে রমজান কেন্দ্রিক পণ্যের মূল্য এবং সরবরাহ ঠিক আছে কিনা তা দেশব্যাপী যাচাই করছি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, রোজাদারদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের।

এক বিবৃতিতে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, দ্রব্যমূল্য ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশের মানুষের মাঝে চাপা হাহাকার বিরাজ করছে। ইতোমধ্যেই নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বি হয়ে আছে। দেশের মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে অনেক। তাই সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা অনেক কমেছে। অর্থের অভাবে সাধারণ মানুষ বাজার করতে পারছে না, শিশুখাদ্য কিনতে পারছে না। এমনকি অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না এবং ওষুধ কিনতে পারছে না সাধারণ মানুষ। এমন বাস্তবতায়, পবিত্র মাহে রমজান আমাদের সামনে। তাই, রোজাদারদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে মাহে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখার দাবি করেন তিনি।

অপরদিকে সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, সামনে রমজান মাস আসছে। ধর্ম বলেছে সংযমী হতে, নিজেকে কন্ট্রোল করতে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে একটাই কথা সেটি আবারও বলতে চাই, অন্তত এই মাসটাতে একটুখানি সংযমী হওয়া দরকার। আপনারা দয়া করে যেটি ন্যায্য হওয়া উচিত সেটাই করবেন।

টিপু মুনশি বলেন, আমরা আপনাদের (ব্যবসায়িদের) সারা দিন ধরে পাহারা দিয়ে রাখতে পারব না। তারপরও আমরা চেষ্টা করব। আপনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন দিয়ে গেলাম, আপনার যেটা ন্যায্য হয় সেটা করবেন।

তবে ভোক্তারা মনে করেন, সরকারে উচিত হবে এখনো রমজান শুরু হতে সপ্তাহখানিক বাকি রয়েছে। এরই মধ্যে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা। যাতে করে রমজানে দু’বেলা একটু ভালো খেয়ে গরিব মানুষ সংযম সাধনা করতে পারে।

বাংলাদেশ সময়:  ১৯৫৪ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০২৩
এসএমএকে/এমএমজেড

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।