ঢাকা, শনিবার, ৭ বৈশাখ ১৪৩১, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ১০ শাওয়াল ১৪৪৫

দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা

ভারতীয় রেলে অরিজিৎ, জেমস আর পাপানের গান!

ভাস্কর সরদার, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮২১ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৪, ২০১৬
ভারতীয় রেলে অরিজিৎ, জেমস আর পাপানের গান!

কোলকাতা: ভারতীয় রেলে উঠে যদি কখনও শুনতে পান কোনো নতুন চলচ্চিত্রের গান, কিংবা ভায়োলিনের সুর অথবা বাঁশিতে ভাটিয়ালি ও লালনের গান! তাতে অবাক হবার কিছু নেই। চলমান ভারতীয় রেল অনেক শিল্পীর কাছেই তাদের প্রতিভা প্রকাশের মঞ্চ এবং রুটি-রুজির একমাত্র জায়গা।

পথের ধুলোয় মঞ্চবানানো এ শিল্পীরা যুগ যুগ ধরে রেল যাত্রীদের সঙ্গে মিশে আছে সুরের মাধ্যমে।

ভারতে রেল এমন একটি পরিবহন, যা দিয়ে গোটা দেশটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে অনায়াসে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।  

স্বাধীনতার পর ভারতীয় রেল ভারতের বুকে একের পর এক নতুন দিগন্ত ছুয়েছে। এ দিগন্ত একদিকে প্রভাবিত করেছে ভারতের অর্থনীতি, অন্যদিকে ভারতের বৈচিত্র্যে ভরা সমাজ জীবনে নতুন নতুন দিশা দেখিয়েছে। রেল এবং রেলের সঙ্গে জড়িত জীবন-জীবিকা বারবার উঠে এসেছে উপমহাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র, শিল্প এবং সঙ্গীতে। একই ভাবে কাছে কিংবা দূরের রেল সফরে সঙ্গী হয়েছে সাহিত্য, সঙ্গীত কিংবা চলমান পথ নাটিকা।

ভারতীয় রেলে যাদের যাত্রা করার অভিজ্ঞতা আছে তারা অবশ্যই প্রত্যক্ষ করেছে রেলের হকারদের। বলা হয় চলমান রেলে হকাররা দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করেন। সেফটিপিন, কপালের টিপ থেকে শুরু করে আয়ুর্বেদিক মলম, নানা ধরনের খাবার, ফল,শিশুদের শিক্ষার বই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ থেকে শেক্সস্পিয়ার সব কিছুই।

রেলের হকারদের নানা ধরণ এবং বিক্রির নানা কৌশলের দিকে লক্ষ্য রাখলে সেখানে প্রচুর বৈচিত্র্যের সন্ধান মেলে। রেলের হকারদের সঙ্গে বলতেই হয় চলমান শিল্পীদের কথা। এরা যাত্রীদের কাছ থেকে গান শুনিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে পয়সা সংগ্রহ করেন। নিজেদের শিল্পগুণকে প্রকাশ করার মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন চলমান রেলকে।

চলমান মঞ্চের এই শিল্পীদের মধ্যে গায়করা অন্যতম। সস্তা দামের মাইক আর ছোট সাধারণ একটি সাউন্ড বক্স। সঙ্গে সহজেই বহন কর যায় এমন কিছু যন্ত্র নিয়ে চলে এদের সঙ্গীত পরিবেশন। এর মধ্যে কেউ কেউ শুধু ব্যবহার করেন একটি সাধারণ হারমোনিয়াম। কেউ ছোট মাপের সিন্থেসাইজার, কেউ শুধু মাত্র গানের সঙ্গে ব্যবহার করেন মাউথঅরগান। কোনো কোনো শিশুশিল্পী খালি গলার গানের সঙ্গে দু’টি পাথর ঠুকে নিখুঁত তাল রাখে।

ভারতীয় রেলে বিভিন্ন বয়সের গায়কদের সঙ্গে একাধিক বার কথা বলার ফলে তাদের জীবন সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেকেই এদের পরিবারের এক মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অনেকে আবার গানের সঙ্গে কৃষিকাজ বা ব্যবসা করে থাকেন। তবে তারা সবাই গায়ক হিসেবে বড়বড় মঞ্চ মাতাতে চেয়েছিলেন। কারো স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্রে গান করা বা অ্যালবাম বের করা। কিন্তু ইঁদুর দৌড়ে না পেরে যোগাযোগের অভাবে মঞ্চ খুঁজে পাননি এরা। তাই পেটের তাগিদ আর গানের প্রতি ভালবাসায় পথকেই মঞ্চ করে নিয়েছেন।

এসব গায়কদের কাছে মোহম্মদ রফি কিংবা কিশোর কুমারেরর গান অন্যতম প্রিয়। দশকের পর দশক একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ছিল। কিন্তু বর্তমান সেই ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন এসেছে। গানের তালিকায় পছন্দের জায়গা করে নিয়েছে অরিজিৎ সিং, পাপন, কিংবা জেমসের মতো শিল্পীরা। গায়করা জানাচ্ছেন নিত্য যাত্রীদের থেকে অনুরোধ বেশি আসছে অরিজিৎ, পাপন এবং জেমসের গানের। ফলে তারা বেশি করে গাইছেন গানগুলি। তবে মোহম্মদ রফি, কিশোর কুমারের গানে চিরকালীন আবেদন আছে বলে মত এই শিল্পীদের।

অরিজিতের গানের সঙ্গে অনুরোধ আসছে পাপনের ‘হামারি আধুরি কাহানি’, সুলতান চলচ্চিত্রের ‘ভুলেয়া...’ ইত্যাদির। লক্ষণীয় ভাবে অনুরোধ আসছে জেমসের ‘আলবিদা...’, ‘রিস্তে তো নেহি রিস্তো কি’, ‘ভিগি ভিগি সি রাতে’ প্রভৃতি গানের।

সঙ্গীত সীমানা মানে না। সেই সীমা ভাঙার গান নিয়েই জেমসের গান কলকাতা থেকে বনগা চলে যায় রেলে করে কোনো নাম না জানা শিল্পীর মধ্যে দিয়ে। সুদূর আসামের বাসিন্দা পাপনের গানে পথিকদের ক্লান্তি দূর করে এ ধরনের মঞ্চহীন গায়ক। পথের ধুলো, সাধারণ হারমোনিয়াম আর সস্তা মাইক্রোফোন বা খালি গলায় সুরের মাধ্যমে দেশ, সীমানার বন্ধনকে নিমেষে ছাড়িয়ে যাচ্ছে এ অখ্যাতরা। প্রতিদিন এদের মাধ্যমেই মিলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া অরিজিৎ সিং, আসামের নওগাঁয়ের পাপনের সঙ্গে বাংলাদেশের নওগাঁর জেমসের কণ্ঠীরা। পথের মাঝে মঞ্চ গড়া শিল্পীদের কাছ থেকে এটাই সবথেকে বড় প্রাপ্তি।

বাংলাদেশ সময়: ১৮১২ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৪, ২০১৬
ভিএস/এসএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।