ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ কার্তিক ১৪২৮, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

হালদার কান্না, দরকার সমন্বিত দফতর

সৈয়দ বাইজিদ ইমন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪০৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২১
হালদার কান্না, দরকার সমন্বিত দফতর ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম: দেশের কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। এই নদী জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে বহুকাল আগে থেকেই।

হালদাকে নিয়ে অনেকেই বিক্ষিপ্তভাবে গবেষণা করছেন। এ নদীকে কেন্দ্র করেই মা মাছ শিকার, নদী দূষণ, মাছের প্রজজন ক্ষেত্র ধ্বংসে লিপ্ত অসাধুরা।

কোনও ঘটনা ঘটলেই বিক্ষিপ্ত অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন। আর অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের যেন দায় নেই। ৯৮ কিলোমিটারের এ নদী পরিচালনা করার জন্য আলাদা কোনও দফতর নেই। নেই স্বতন্ত্র কতৃর্পক্ষও। ফলে অনেকেই নিজ দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন ছাড়া কাউকে মাঠে দেখা যায় না। যার কারণে বিভিন্ন সময়ে এ নদী নিয়ে হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।  

হালদা গবেষকরা বলছেন, জেলা প্রশাসন যেমন জেলার সব দফতরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে, ঠিক তেমনি হালদা নদী রক্ষায় কাজের সমন্বয় দরকার। এজন্যে আলাদা দফতর স্থাপন জরুরি। তাহলেই হালদা নদী রক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।

হালদা নদীর মৎস্য সম্পদ রক্ষা, অভিযান পরিচালনা, হালদা থেকে ডিম সংগ্রহ, পোনা সংরক্ষণ, মা মাছ রক্ষাসহ নানান কাজে নিয়োজিত রয়েছে মৎস্য অধিদফতর। ডলফিন রক্ষা বিষয়ক কাজ দেখার জন্য আছে বন বিভাগের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ বিভাগ। নদীর পানির লবণাক্ততা, দূষণ রোধ, পরিবেশগত দিকগুলো দেখভাল করে পরিবেশ অধিদফতর। অনাকাঙ্খিতভাবে হালদায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে যুক্ত হয়েছে নৌ-পুলিশ। যখন কাউকে পাওয়া যায় না, তখন হালদা রক্ষার দায়িত্ব নেন স্থানীয় প্রশাসন।

হালদায় যারা কাজ করেন

মৎস্য অধিদফতর, বন বিভাগ (বন্য প্রাণি ও সংরক্ষণ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আইন অনুযায়ী হালদা রক্ষায় কাজ করেন। এসব সংস্থার কাজ সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের দফতর থেকে বিভাগীয় কমিশনারের। এছাড়া মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয় কমিটির সভাপতিও বিভাগীয় কমিশনার।  

হালদা গবেষকরা বলছেন, হালদা শুধুমাত্র একটির নদীর নাম নয়। এখানে রয়েছে ডলফিন, মাছ, কৃষি ও পানিসম্পদ। হালদা মানে ‘মাছ’ এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, এ নদী জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে অবদান রেখে চলেছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ হালদা নদী থেকে প্রতিদিন ১৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করছে। এই পানি চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।  

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বাংলানিউজকে বলেন, হালদাকে রক্ষায় আমরা বহুমাত্রিক কাজ করে যাচ্ছি। নদী ভাঙ্গন রোধে কাজ করছি, নদী পাড়ের মানুষদের মাঝে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তারা সচেতন হলে প্রশাসনকে হালদা রক্ষায় রাত-বিরাতে পাহারা দিতে হবে না। হালদার প্রায় সব কটি অংশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছি। জলোচ্ছ্বাস এবং নদী ভাঙ্গন থেকে হালদা পাড়ের মানুষকে রক্ষা করাই আমাদের কাজ।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলি বাংলানিউজকে বলেন, হালদা নদীর মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমরা কাজ করি। সেখানে যদি কেউ মা মাছ শিকার করে, জাল ফেলে- তাহলে আমরা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করি। এছাড়াও ভরা মৌসুমে হালদা নদীতে যখন মা মাছ ডিম ছাড়ে তখন ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে হ্যাচারি তৈরি, নৌকা তৈরি, পোনা সংরক্ষণের যাবতীয় কাজ আমরা করে থাকি। তবে, এসব কাজ করতে গিয়ে হালদা নদী রক্ষায় একটি সমন্বিত দফতরের প্রয়োজনীতা অনুভব করেছি।  

পরিবেশ অধিদফতরের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে হালদায় একটি স্বতন্ত্র দফতরের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে চলতি বছরের ৫ মে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বিভাগীয় কমিশনার বরাবর একটি চিঠিও দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, হালদা সুরক্ষায় একটি পৃথক কর্তৃপক্ষ/দফতর সৃষ্টি করা যেতে পারে; যারা এক্সক্লুসিভলি হালদা নদী নিয়ে কাজ করবে। উক্ত কর্তৃপক্ষকে সবাই সহায়তা করবে, তাহলে হালদা রক্ষার সকল উদ্যোগ টেকসই রূপ পাবে।  

হালদা নদীর মা মাছ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষা, নদীতে পাহারা কার্যক্রম জোরদার করা, প্রাকৃতিক প্রজননে বাধা দূরীকরণ, ড্রেজিং এর মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং যত্রতত্র বালু উত্তোলন বন্ধকরণ, ইঞ্জিনচালিত নৌ-যান চলাচল বন্ধকরণ কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির লক্ষ্যে হাটহাজারী অংশে একটি ফাঁড়ি স্থাপন করা হলে হালদা সুরক্ষা সহজ হবে।

এরপর হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় হালদা পাড়ে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয় নৌ-পুলিশ চট্টগ্রাম অঞ্চল। জানা গেছে, সদরঘাট নৌ-থানার অধীনে পরিচালিত হবে এ অস্থায়ী ক্যাম্প। একজন উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্বে হালদা পাহারায় থাকবেন নৌ-পুলিশ সদস্যরা।

নৌ-পুলিশ সূত্র জানায়, নৌ-পুলিশের অর্গানোগ্রামে হালদা নদী সংলগ্ন এলাকায় কোনো থানা বা ফাঁড়ি নেই। হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সেখানে নৌ-পুলিশের একটি ফাঁড়ি স্থাপনের বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়ে সদর দফতরে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু সদর দফতর থেকে এ বিষয়ে এখনও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত সেখানে অস্থায়ী নৌ-পুলিশ ক্যাম্প করা হবে। ক্যাম্পের জন্য বাসা ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শিঘ্রই এ ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হবে।

নৌ-পুলিশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) মো. মর্তুজা আলী খান বাংলানিউজকে বলেন, হালদা প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। দেশের অর্থনীতিতে হালদার অবদান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হালদার জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, নৌ-পুলিশের অর্গানোগ্রামে হালদা এলাকায় কোনো থানা বা ফাঁড়ি নেই। একটি ফাঁড়ির প্রস্তাবনা আমরা সদর দফতরে পাঠিয়েছি। আপাতত আমরা হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি নৌ-পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প করেছি।  

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। সবার সঙ্গে কথা বলে, সমন্বয় করে হালদাকে কিভাবে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়ে প্রচেষ্টা থাকবে। হালদা নদী দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য অনেক বড় সম্পদ। এ সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। হালদার সমৃদ্ধির জন্য সবার সঙ্গে সমন্বয় করে যা করার দরকার, তা-ই করবো।  

বাংলাদেশ সময়: ১৪০০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২১ 
বিই/এসি/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa