ঢাকা, সোমবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৮, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ সফর ১৪৪৩

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

সিআরবি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৪ ঘণ্টা, জুলাই ২৮, ২০২১
সিআরবি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা সিআরবি। ছবি: সোহেল সরওয়ার

চট্টগ্রাম: প্রাচ্যের রানি খ্যাত চট্টগ্রাম শহরের শেষ প্রকৃতি-ঋদ্ধ স্থান সিআরবি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রামের ২৫ বিশিষ্টজন। বুধবার (২৮ জুলাই) পাঠানো চিঠিতে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এ নগরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক সিআরবি এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) প্রস্তাবিত ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ শয্যার মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের জন্য সবিনয় আবেদন জানানো হয়েছে।

 
 
চিঠিতে বলা হয়েছে-
         
‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
প্রাচ্যের রানি খ্যাত চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।

আপনার অবিদিত নেই চট্টগ্রাম বিশ্বের প্রাচীনতম একটি নগরবন্দর। প্রখ্যাত পরিব্রাজক মার্কো পোলো, ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম ভ্রমণ করে এই নগরের গৌরবগাথা বর্ণনা করে গেছেন। পাহাড়, সমুদ্র ও নদী বেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি চট্টগ্রাম মহানগরী বহুকাল ধরে প্রাচ্যের রানি হিসেবে খ্যাত। দুঃখের ব্যাপার, এ নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ শহরে একসময় অনেক পাহাড়, দীঘি ও পুকুর ছিল, ছিল শাল, রেইনট্রি ইত্যাদি বৃক্ষ আচ্ছাদিত রাস্তা, ছিল বাটালি হিল এবং ফেয়ারি হিল বা কাছারি পাহাড়। বাটালি হিল পাকিস্তান আমলেই ধ্বংস করা হয়েছে। কাছারি পাহাড়ের ওপরও আঘাত হেনেছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার যখন এই পাহাড়ের পাদদেশের বিশাল অংশ কেটে তৈরি করা হয় নিউ মার্কেট, জেনারেল পোস্ট অফিস ও স্টেট ব্যাংক। এক সময় কাছারি পাহাড় এবং কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত সদরঘাট ব্রিজ ছিল প্রকৃতিপ্রেমী চট্টগ্রামবাসীর বেড়ানোর জায়গা, ক্লান্তি অপসারণের জায়গা। আজ সদরঘাট ব্রিজের কথা দূষিত কর্ণফুলীর কারণে মানুষ ভুলে গেছে। দুই দশক আগেও কাছারি পাহাড়ে ভ্রমণ পিয়াসীরা বেড়াতে গেলে দেখতে পেতেন কর্ণফুলী নদী কি অবর্ণনীয় সুন্দরভাবে চট্টগ্রাম শহরকে ‘মেখলা’ বা ‘মালা’র মতো বেষ্টন করে রয়েছে। সভ্যতার অগ্রগতি এবং মানুষের লোভের আঘাতে আজ প্রকৃতির অপরূপ এসব দান তিরোহিত। কেবল অবশিষ্ট রয়েছে মহানগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি। শতবর্ষী বৃক্ষরাজি পাহাড়, টিলা ও উপত্যকায় ঘেরা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত একটি অনন্য প্রাকৃতিক স্থান এই সিআরবি।

বর্তমানে প্রকৃতির অসীমদানে-ঋদ্ধ এরকম বড় উন্মুক্ত স্থান চট্টগ্রামে আর নেই, যেখানে ঢাকায় রয়েছে রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাহাদুর পার্কসহ বৃক্ষ-শোভিত বহু উন্মুক্ত অঞ্চল ও বহু খেলার মাঠ। চট্টগ্রামের এ সিআরবির উন্মুক্ত স্থানেই এখন আয়োজিত হয় বাংলা নববর্ষ বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী, নজরুল জন্মবার্ষিকী ও বাঙালির অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একসময় বাঙালির প্রাণের এ অনুষ্ঠানগুলো উদযাপিত হতো ডিসি হিলে, সার্কিট হাউজের সামনের উন্মুক্ত স্থানে যা এখন জিয়া শিশুপার্ক এবং আউটার স্টেডিয়ামে যা এখন একটি বিশাল কংক্রিট আচ্ছাদিত সুইমিংপুল ও বিপণিকেন্দ্র।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আপনার প্রকৃতি প্রেম, প্রকৃতি বান্ধবতা বিশ্ববিদিত। ২০২১ সালের ২২ এপ্রিল ‘লিডার্স সামিট অন ক্লাইমেট’এ প্রকৃতি নিয়ে যে ৪০ জন বিশ্বনেতা বক্তব্য রেখেছেন সেখানে আপনি কার্বণ নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে বিশ্বের প্রাকৃতিক উষ্ণতা যেন বর্তমান পর্যায় থেকে দেড় শতাংশের বেশি না বাড়ে তা দাবি করে যে আহ্বান জানিয়েছেন তা বিশ্বনন্দিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, আপনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দীর্ঘকাল ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে আপনার নেতৃত্বে আজ যেখানে বাংলাদেশজুড়ে বিপুলভাবে বৃক্ষরোপণের বিরাট উদ্যোগ শুরু হয়েছে, সেখানে বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য শতবর্ষী বৃক্ষরাজি শোভিত চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় যদি বিত্তবানদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য একটি মুনাফাভিত্তিক বেসরকারি হাসপাতাল নির্মিত হয় তার চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আর কি হতে পারে!

তাই, চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের আপনার কাছে ঐকান্তিক আবেদন, চট্টগ্রামের এ অপরূপ প্রকৃতি-ঋদ্ধ সিআরবি এলাকাটিকে রক্ষা করুন। পরম সম্মানিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা আরো জেনেছি, এই উপরে উল্লেখিত হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার জন্য ২০১৭ সালে আহূত ইনভাইটেশন ফর বিড (আইএফবি) নোটিশে প্রকল্পের স্থান হিসেবে সিআরবির নাম ছিল না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমণ্ডিত স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। এছাড়াও মাস্টার প্ল্যানের আলোকে ২০০৯ সালে সিডিএ কর্তৃক প্রণীত ‘ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান’ বা ড্যাপে সিআরবিকে ‘সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য’ হিসেবে সংরক্ষণের কথা উল্লেখ আছে। সুতরাং আমাদের বক্তব্য, সিআরবি অথবা রেলওয়ের বৃক্ষ আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত অন্যান্য জায়গা ব্যতিরেকে রেলওয়ের মালিকানাধীন বিশাল বিস্তৃত সমতল ভূমির অন্য যেকোনো একটি জায়গায় যেমন; বিজিএমই ভবনের কাছে, ইউএসটিসি এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের পাশে এ হাসপাতালটি নির্মাণ করা যেতে পারে। অবশ্য আমরা আশা করি, সরকারি জায়গায় যদি কোনো বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ করা হয় তা যেন প্রকৃত অর্থেই জনকল্যাণমূলক হয়, মুনাফাভিত্তিক নয়।

 মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এ মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদ হিসেবে আত্মোৎসর্গ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১ সালের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শহীদ আব্দুর রব। তাঁর এবং আরো ৮ জন শহীদের সমাধিস্থল এ সিআরবি এলাকা। বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান এসব বীর শহীদদের গৌরব স্মৃতি এখানে অম্লান ও অক্ষুণ্ন থাকুক এই আমাদের কামনা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

আপনার অসাধারণ নেতৃত্বে চট্টগ্রাম আজ ভৌত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিপুলভাবে এগিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নির্মিত হয়েছে ফ্লাইওভার, কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে মিরসরাই পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে বে ভিউ হাইওয়ে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে তৈরি করা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল; বঙ্গবন্ধু টানেল। কিন্তু এসব মহতী অর্জন সত্ত্বেও চট্টগ্রাম শহর আজ পরিণত হয়েছে ‘ইটের পরে ইট’ বিশিষ্ট একটি নগরীতে। এখানে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য কোনো মাঠ নেই, প্রৌঢ় ও বৃদ্ধদের জন্য নেই কোনো হাঁটার জায়গা; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্য নেই কোনো বেড়ানোর উন্মুক্ত স্থান, কেবল সিআরবি ছাড়া। অসংখ্য বৃক্ষরাজি শোভিত এই নগরটি আজ প্রায় বৃক্ষহীন। সভ্যতার অগ্রগতি একদিকে এ শহরকে করেছে চাকচিক্যময়, অন্যদিকে প্রকৃতির দাক্ষিণ্যহীন প্রাণহীন নগর।

আপনার কাছে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে আমরা আকুল আবেদন জানাচ্ছি, চট্টগ্রামের শেষ প্রকৃতি-ঋদ্ধ স্থান সিআরবিকে রক্ষা করুন। আপনার মহতী নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি মানবিক, পরিবেশ সমৃদ্ধ উন্নত দেশে পরিণত হোক, এই কামনা করি। আপনার জয় হোক। ’’

চিঠিতে সই করেছেন- আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন, শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক, দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী আবুল মনসুর, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান, চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক ও নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মফিজুর রহমান, নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম, কথাসাহিত্যিক অধ্যাপিকা ফেরদৌস আরা আলীম, শিক্ষাবিদ আনোয়ারা আলম, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সভাপতি আলী আব্বাস, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ, দৈনিক পূর্বদেশ সম্পাদক মুজিবুর রহমান সিআইপি, দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুক, চট্টগ্রাম মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোজাফফর আহমেদ, বিজয় মেলা পরিষদের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুস, কবি-সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়াউদ্দিন।

বাংলাদেশ সময়: ২০১৫ ঘণ্টা, জুলাই ২৮,২০২১
এআর/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa