ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক ১৪২৮, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

সিআরবিতে হাসপাতাল নয়: পিপলস ভয়েস

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৫৯ ঘণ্টা, জুলাই ১৪, ২০২১
সিআরবিতে হাসপাতাল নয়: পিপলস ভয়েস ...

চট্টগ্রাম: নগরের প্রধান জনসমাগমস্থল শতবর্ষী বৃক্ষ, পাহাড়-উপত্যকা বেষ্টিত ও প্রাণিবৈচিত্র্যের কেন্দ্র সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ এলাকার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করবে। কংক্রিটের আগ্রাসন গ্রাস করবে সবুজ।

সাংস্কৃতিক এ সম্মিলন কেন্দ্রটি হারাবে বর্তমান রূপ। তাই সিআরবি এলাকা নয় বরং এমন কোনো স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশের কোনো রূপ ক্ষতি সাধন হবে না।  

বুধবার (১৪ জুলাই) এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরীফ চৌহান ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আতিকুর রহমান।  

তারা বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়- কয়েক বছর আগেই সিআরবি এলাকার বর্তমান রেলওয়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও পাশের ৬ একর এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল, ১০০ আসনের একটি মেডিক্যাল কলেজ ও ৫০ আসনের একটি নার্সিং ইনস্টিটিউটের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ২০২০ সালের মার্চে। সম্প্রতি প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় থাকা রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি স্টাফ কোয়াটারের বেশকিছু ঘর ভাঙা হয়েছে। জমি বুঝিয়ে দিতে রেলওয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।  

সিআরবি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর। ভবনটি রেলওয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। এটি ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীর একটি অনবদ্য নিদর্শন এবং বলা হয়ে থাকে এটিই চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন ভবন। এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছেই একটি বহুতল হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের মতো স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার আগে বিষয়গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়েছিল কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। রেলওয়ে তাদের ‘অব্যবহৃত’ বিভিন্ন জমি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য কয়েক বছর আগেই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পূর্ব রেলের সদর দফতর সংলগ্ন এ মহামূল্যবান জমি কী করে ‘অব্যবহৃত’ হিসেবে পিপিপি প্রকল্পের অধীনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হলো তা আমাদের বোধগম্য নয়। পাশাপাশি একটি সরকারি সংস্থা হিসেবে রেলওয়ে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ এবং রেলওয়ের কর্মচারী ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে এমন প্রকল্পে সম্মতি দিয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা উচিত। কেননা বর্তমান রেলওয়ে হাসপাতালটি রেলের কর্মচারী-শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। সেক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠান হলে সেই ব্যয় বহুল হাসপাতালে রেলের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিশ্রুত স্বাস্থ্যসেবা মিলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।  

অন্যদিকে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ক্রমাগত বাণিজ্যিক আগ্রাসনের কারণে পাহাড়, জলাভূমি ও শতবর্ষী বৃক্ষরাজি হারিয়ে এখন এক চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। নির্বিচারে কাটার কারণে চট্টগ্রাম শহরে পাহাড়ধস প্রতি বর্ষায় ঘটছে। হচ্ছে প্রাণহানি। প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসে নানা প্রক্রিয়া এ শহরে চলমান। এমনকি সরকারি সংস্থার অধীনে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সিআরবি এলাকাটি বর্তমানে অখণ্ড পাহাড়ঘেরা শতবর্ষী বৃক্ষের এক প্রাঙ্গণ। বহুতল হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট নির্মাণ হলে এসব ঘিরে জন ও যানবাহন সমাগম ঘটবে বহুগুণ বেশি। এসব স্থাপনা ঘিরে আরও নতুন নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। একবার গাছ কাটা ও প্রকৃতি ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু হলে তা আশপাশেও সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সিআরবির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ শিরীষতলা ও শতবর্ষী বৃক্ষ না কেটে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু তাতে সিআরবির প্রাকৃতিক সবুজ বলয়ের অখণ্ডতা রক্ষিত হবে বলে আমরা মনে করি না। পাশাপাশি এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, প্রস্তাবিক হাসপাতাল প্রকল্পটির এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট ও পরিবেশ ছাড়পত্র মেলেনি। এসব প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই নিশ্চিতভাবে এর প্রভাব সম্পর্কে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কীভাবে আশ্বস্ত করছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এ প্রকল্পে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদন এখনো মেলেনি। তার আগেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জমি বুঝিয়ে দিতে রেলওয়ের তৎপরতা প্রশ্নের উদ্রেক করে।  

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, বন্দরনগরীর সাংস্কৃতিক আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্র ডিসি হিলে বেশ কয়েক বছর ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ। সিআরবির শিরীষতলায় বাঙালি সংস্কৃতির চিয়ায়ত অনুষঙ্গ পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসব আয়োজিত হয়। পাশাপাশি শিরীষতলায় অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনও হয়ে থাকে। সিআরবি এলাকায় বাণিজ্যিক হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ হলে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনও হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে নগরের একমাত্র উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ হিসেবে নিত্যদিন প্রাতঃ ও বৈকালিক ভ্রমণের জন্য মানুষ সিআরবিতে আসে। এ ছাড়া সাপ্তাহিক ছুটির দিন এমনকি ঈদসহ বিভিন্ন ছুটির সময়ে মানুষ সিআরবির পাহাড় ও বৃক্ষছায়ায় আসে প্রশান্তির খোঁজে। সিআরবি চট্টগ্রামে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে হাসপাতালের মতো স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নয়।  

চট্টগ্রামে ঐতিহ্য ও প্রকৃতি রক্ষায় সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। নগর বা জেলার অন্য কোনো স্থানে রেলওয়ের বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার জমিতে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি সাধন না করে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় পিপলস ভয়েস।  

বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৩ ঘণ্টা, জুলাই ১৪, ২০২১
এআর/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa