ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

বাংলানিউজের সঙ্গে তিন করোনাযোদ্ধার আলাপচারিতা

দেশকে ভালোবেসে জনগণের পাশে থেকেছি

নিউজরুম এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩৪৬ ঘণ্টা, অক্টোবর ২২, ২০২০
দেশকে ভালোবেসে জনগণের পাশে থেকেছি বাংলানিউজের সঙ্গে তিন করোনাযোদ্ধার আলাপচারিতা

চট্টগ্রাম: করোনাকালীন সময়ের শুরু থেকে চট্টগ্রামের তিন ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা নেমেছিলেন যুদ্ধে। হাসপাতাল-আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠায় শামিল হয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবায় পাশে থেকেছেন।

 

বাংলানিউজ চট্টগ্রাম অফিসের আমন্ত্রণে এসে এই তিন যোদ্ধা শুনিয়েছেন নিজেদের কথা, দিয়েছেন নানান পরামর্শও। তারা হলেন- চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া, বন্দর এলাকায় ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টারের উদ্যোক্তা ডা. হোসেন আহম্মদ এবং হালিশহর করোনা আইসোলেশন সেন্টারের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট জিনাত সোহানা চৌধুরী। সঙ্গে ছিলেন বাংলানিউজের ডেপুটি এডিটর তপন চক্রবর্তী।

ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, ভালোবাসা এবং যত্ন ফিল্ড হাসপাতালের মূলমন্ত্র' এমন স্লোগান নিয়ে ২১ এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিল চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল। মাত্র ২১ দিনে হাসপাতালটি প্রস্তুত করে শুরু হয় চিকিৎসাসেবা। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এমন উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন একদল যুবক, যারা রাজি হয়েছিলেন স্বেচ্ছায় শ্রম দিতে। পরিবার পরিজন রেখে দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় নিয়োজিত ছিলাম রোগীদের সেবায়।  

তিনি বলেন, নাভানা গ্রুপের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি চলতো সম্পূর্ণ জনগণের আর্থিক সহায়তায়। এই হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সরা কাজ করেছেন স্বেচ্ছায়। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং ডাক্তার-রোগীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সুনাম কুড়ায় হাসপাতালটি। দীর্ঘ চার মাসে এই হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়েছেন প্রায় ১৬শ রোগী। এর মধ্যে ভর্তি ছিলেন ২৮৩ জন। যার ৯০ শতাংশ রোগীই ছিল করোনা আক্রান্ত। এই সেবার মান ভালো হওয়ায় চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন বাংলাদেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও।  
.শীতকালে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম কতটুকু প্রস্তুত এমন প্রশ্নে ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশে যখন করোনার ঢেউ আসে, তখন মানুষ বেশ আতঙ্কিত ছিল। আক্রান্ত হলেই মৃত্যু হবে-এমন ধারণা ছিল। এপ্রিল-মে মাসে করোনাভাইরাসে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ গরীব দেশ, স্বাস্থ্যখাতে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালেও ছিল রোগীর চাপ। স্বাস্থ্যকর্মীদের অক্লান্ত চেষ্টায় রোগীদের সুস্থ করা সম্ভব হয়েছে। ২৪ ঘন্টা মানুষ যাতে সেবা পায়, সেই চেষ্টাই ছিল আমাদের। পরে চট্টগ্রামে কয়েকটি আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হলে এখানে রোগীর চাপ কমে যায়।

তিনি বলেন, শীতকালে ধুলা-বালিজনিত কারণে এবং তাপমাত্রা হ্রাস হওয়ার কারণে প্রকোপ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এসময় ষাটোর্ধ্বরা বেশি আক্রান্ত হতে পারে। আমরা দেখছি, মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার গরজ নেই। ভ্যাকসিন এলে ভ্যাকসিন দেবো-এমন মনোভাব অনেকের। অথচ করোনাভাইরাস প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে-মাস্ক ব্যবহার করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং দূরত্ব রেখে চলাচল করা।  

প্রয়োজনে আবারও চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল চালু করার আশাবাদ ব্যক্ত করে ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে সাময়িক বন্ধ থাকলেও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসক-নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকরা প্রস্তুত আছেন। হাসপাতালের ১৫টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা, ৬৩টি অক্সিজেন সিলিন্ডার সহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।  

বন্দর ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টারের উদ্যোক্তা সাউদার্ন মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. হোসেন আহম্মদ বলেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই আইসোলেশন সেন্টার চালু করেছিলাম। আমরা আউটডোরে সেবা দিয়েছি। ইনডোরেও রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
.তিনি বলেন, করোনা নিয়ে পুরো বিশ্বে যে ভীতি সৃষ্টি হয়-তার বাইরে ছিল না বাংলাদেশও। শুরুতে দেখেছি এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের আহাজারি। হাসপাতালে মেলেনি পর্যাপ্ত অক্সিজেন সেবা। আমি এ অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে অনেক রোগীকে এখানে এনে সেবা দিয়েছি। এখনও সব ইন্সট্রুমেন্ট আছে, প্রয়োজনে আবারও কার্যক্রম শুরু করা যাবে। পতেঙ্গা এলাকায় একটি হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনাও আমার আছে। একজন টেক্সিচালক-যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন, তার থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর্মী, করোনা সচেতনতায় কাজ করে যাওয়া সংবাদকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যসহ সবাই করোনাযোদ্ধা।

এক প্রশ্নের জবাবে এই মানবিক চিকিৎসক বলেন, শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ বা ‘সেকেন্ড ওয়েভের’ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটা স্বীকার করতে হবে, আমাদের স্বাস্থ্যখাত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় এরই মধ্যে সক্ষমতা দেখিয়েছে।  

তিনি বলেন, ঠাণ্ডা পরিবেশে এর বিস্তার বেশি হয়। বাংলাদেশ থেকে করোনা চলে গেছে-এটা মনে করার কারণ নেই। যতক্ষণ নিজের ঘরের কেউ আক্রান্ত না হচ্ছে-ততক্ষণ মানুষ এই সংক্রমণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে না। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও অ্যাজমা আছে-তাদের সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের অপেক্ষাকৃত কমবয়সী যারা বাইরে উন্মুক্তভাবে ঘুরছে, তাদের মাধ্যমে ঘরের বয়স্করা বেশি সংক্রমিত হতে পারে। এজন্য বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। কারণ এটি ভ্যাকসিনের পরিপূরক।  

‘কারো জ্বর-সর্দি-কাশি হলে অবশ্যই নিজেকে আলাদা রেখে পরিবারের সুরক্ষায় চিকিৎসা নিতে হবে। জনসমাগম এড়িয়ে চলা খুবই জরুরী। প্রথমে নিজেকে সচেতন হতে হবে। নিজে সচেতন হলে পরিবারকে সচেতন করা যাবে। গ্রামে-শহরে মসজিদ ও মন্দিরে যারা যাচ্ছেন, তাদের কাছে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন ইমাম-পুরোহিতরা। এককথায় নিজের সুরক্ষা নিজেরই হাতে’ বলেন ডা. হোসেন আহম্মদ।
.
হালিশহরের করোনা আইসোলেশন সেন্টারে মুখপাত্র অ্যাডভোকেট জিনাত সোহানা চৌধুরী বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠনিকভাবে আইসোলেশন সেন্টারটি বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। শুরুতে করোনা পজিটিভ এবং উপসর্গ থাকা রোগীদের যখন হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখন ১৩ জুন প্রিন্স অব চিটাগাং কমিউনিটি সেন্টারে এই আইসোলেশন সেন্টার চালু করেছিলাম আমরা কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা। শুরুর দিন থেকে এ পর্যন্ত ৭৬৫ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত এবং উপসর্গ থাকা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। অনুদানের টাকায় চিকিৎসক-নার্সদের বেতন দেওয়া হতো। এই আইসোলেশন সেন্টারে রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং খাবার দেওয়া হতো। ১২ জন চিকিৎসক, ৯ জন নার্স এবং ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমেই রোগীদের সেবা দেওয়া হতো। আমাদের সঙ্গে কমিউনিটি সেন্টার মালিকের তিনমাস ব্যবহার করার চুক্তি ছিল। এছাড়া সেন্টারটি সম্পূর্ণ অনুদানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছিলো।

‘শুরুতে আমরা অনেক বাধা পেয়েছি। সাবেক পুলিশ কমিশনারের সহায়তায় অবশেষে আইসোলেশন সেন্টারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। করোনা অনেক অমানবিকতার নজিরও রেখে গেছে। করোনাযোদ্ধাদের কেউ বাসা ভাড়া দেয়নি, কেউবা হয়েছেন ঘরছাড়া। তরুণদের অদম্য মনোবল ছিল। শূন্য হাতে কাজ শুরু করেছিলাম। দেশকে ভালোবেসে আমরা জনগণের পাশে থেকেছি। ঘরে শিশু সন্তান রেখে দিন-রাত থেকেছি করোনা আক্রান্তদের সেবায়’ বলেন জিনাত সোহানা চৌধুরী।

তিনি বলেন, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে মহামারী আকারে দেখা দিতে পারেনি। যদিও এই অবস্থা মোকাবেলায় আমাদের অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবুও সবার প্রচেষ্টায় করোনাকে এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে।

তিনি বলেন, করোনা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতাই মুখ্য। বল প্রয়োগ করে, আইন করে এটা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। পাবলিক প্লেসে সচেতনতা সৃষ্টিতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ করা যেতে পারে। গণপরিবহন ফিরেছে পুরনো রূপে। এটা উদ্বেগজনক।  ফার্মেসীতে ওষুধের চড়া দাম রাখা হচ্ছে। নকল মাস্ক-স্যানিটাইজারে বাজার সয়লাব। আইন প্রয়োগ করতে হবে সেখানে। ‘নো মাস্ক-নো সেল’ রীতি মানতে হবে। তখন যারা নিয়ম মানছে না, তারা সচেতন হবে।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বাংলানিউজের ডেপুটি এডিটর তপন চক্রবর্তী তিন করোনাযোদ্ধাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যার উদ্যোগে দেশের চিকিৎসাসেবা আগের চেয়ে এখন অনেক উন্নত ও আধুনিক হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে দেওয়া হয়েছে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। বাংলানিউজ সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে শুরু থেকেই করোনার সংক্রমণ রোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে। করোনাভাইরাসের ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ আমরা আশা করি না। তবে যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবেলায় সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে নিজের পরিবার থেকেই।

বাংলাদেশ সময়: ১৩৩০ ঘণ্টা, অক্টোবর ২২, ২০২০
এসি/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa