ঢাকা, বুধবার, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

ইউআইটিএস’র কাছে চাঁদা দাবির সত্যতা পেয়েছে পুলিশ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০২০-০৭-১২ ১০:২৫:২০ পিএম
ইউআইটিএস’র কাছে চাঁদা দাবির সত্যতা পেয়েছে পুলিশ শওকত হাসান মিয়া

চট্টগ্রাম: ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)’র উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির ঘটনার সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। আসামি আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

জানা যায়, এদিকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির ঘটনায় গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় শওকতকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন ইউআইটিএসের উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী মো. মোস্তফা কামাল। মামলা নম্বর-২(১)২০।

চাঁদাবাজির এ মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েই লাপাত্তা শওকত হাসান। আদালত তাকে ৬ সপ্তাহের জামিন দেন; যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অদ্যাবধি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি তিনি। পুলিশ বলছে, জামিন নিয়েই পালিয়েছেন শওকত। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে একই মামলার আসামী শওকতের অন্যতম ক্যাডার এসএম মাহমুদ হাসান ৬ মাসেরও বেশি সময় কারাগারে থেকে সম্প্রতি নিম্ন আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। চাঁদাবাজির ঘটনায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী স্থানীয় দুইজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। পাশাপাশি অন্যান্য সাক্ষী ও ভুক্তভোগী ইউআইটিএসের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মানের ঘটনা সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্য ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এ তথ্য জানান ইউআইটিএস’র আইনজীবী আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া।

ভাটারা থানার ওসি মোক্তারুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, ইউআইটিএস’র উপাচার্যকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি চাঁদা দাবির ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এই মামলায় জামিন নিয়ে পালিয়েছেন আসামি শওকত হাসান মিয়া। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, জালিয়াতির আরেকটি মামলার অভিযোগ তদন্ত করে এসার্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জামালপুর টুইন টাওয়ারের স্বত্ত্বাধিকারী শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

অভিযোগ তদন্ত করে সম্প্রতি ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের গুলশান আমলী আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এসআইএন্ডও (অর্গানাইজড ক্রাইম)’র পরিদর্শক মো. ফারুক হোসেন অভিযোগ তদন্ত করে আদালতে এ প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসার্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জামালপুর টুইন টাওয়ারের স্বত্ত্বাধিকারী শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস’র উপাচার্যকে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির সত্যতা পাওয়া গেছে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এসআইএন্ডও (অর্গানাইজড ক্রাইম)’র পরিদর্শক মো. ফারুক হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, এসার্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রাজধানীর বারিধারায় অবস্থিত জামালপুর টুইন টাওয়ারের স্বত্ত্বাধিকারী শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে দলিল জালিয়াতি ও পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান এবং ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস’র বোর্ড অব ট্রাস্ট্রিজ চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছি।

৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে দায়ের মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, শওকত হাসানের মালিকানাধীন গুলশানের বারিধারা এলাকায় অবস্থিত ‘জামালপুর টুইন টাওয়ার-২’ ভাড়া নিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে ইউআইটিএস। এরইমধ্যে ভাটারা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ শেষ হলে ২০১৯ সালের মে মাস থেকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর শুরু হয়। একই সঙ্গে ইউআইটিএস’র উপাচার্যও স্থায়ী ক্যাম্পাসে অফিস শুরু করেন।

গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শওকত হাসান ও তার ক্যাডাররা উপাচার্যের কাছে বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা ছাড়াও মালামাল স্থানান্তরে বাধা দেন। এ বিষয়ে ২০ নভেম্বর ২০১৯ ভাটারা থানায় একটি জিডি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ সন্ধ্যায় ৫-৬ জন সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে এসে ইউআইটিএস’র উপাচার্যের গাড়ি আটকে ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন শওকত হাসান। চাঁদা না পেয়ে পিস্তল উঁচিয়ে হুমকি ও প্রাণনাশের ভয়ভীতিও দেখান তিনি।

শুধু এই চাঁদাবাজির ঘটনাই নয়, এর আগেও ভাড়াটিয়াকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন শওকত। প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে গত বছরের ২০ নভেম্বর রাজধানীর গুলশান থানায় শওকত হাসান মিয়ার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর-১৪৫২) করেন ইউআইটিএসের রেজিস্ট্রার মো. কামরুল হাসান। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ।

আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে গত ১৫ জানুয়ারি গুলশান এলাকা থেকে শওকত হাসানকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে সেদিন বিকালেই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫০০ টাকা বন্ডে তার জামিন মঞ্জুর হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার সিএমএম আদালতে বিচারাধীন বলে জানান অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া।

চাঁদাবাজির নেপথ্যে

গুলশানের বারিধারা এলাকায় অবস্থিত ‘জামালপুর টুইন টাওয়ার’টি শওকত হাসান মিয়ার। ২০১০ সাল থেকে সুউচ্চ এ ভবনের কয়েকটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষ। বাড়ি ভাড়ার চুক্তি অনুযায়ী এককালীন ১০ বছরের ভাড়াসহ যাবতীয় পাওনাও ভবন মালিককে পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতেই বাগড়া বাধায় ভবন কর্তৃপক্ষ। শওকত হাসানের নির্দেশে গত ৩ নভেম্বর ২০১৯ তার ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা মালামাল সরানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কাজে শুধু বাধাই দেয়নি, সন্ত্রাসীরা তাদের প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।

হামলার কারণ জানতে চেয়ে শওকত হাসান মিয়ার কাছে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রের অনুলিপি চেয়ে চিঠি দেয় ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শওকত হাসান পত্রের উত্তরে মূল বাড়ি ভাড়া চুক্তি গোপন করে সাক্ষীবিহীন এবং ইউআইটিএসের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান একুশে পদকপ্রাপ্ত সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে একটি জাল চুক্তি সরবরাহ করে ৫৭ কোটিরও বেশি টাকা দাবি করা হয়।

এরপর মালামাল স্থানান্তরে বাধা প্রদান এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকেন। এরপর ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর শওকত হাসান তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ফের একই কাজ করেন। ২০ নভেম্বর শওকত তার স্টাফ আবুল কাশেম, এসএম মাহমুদ হাসান এবং সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য পনির, জুয়েল, সোহেলসহ অচেনা আরও কয়েকজন সরাসরি ও মোবাইল ফোনে ইউআইটিএস কর্তৃপক্ষের অনেককেই মালামাল স্থানান্তরে বাধা দেওয়াসহ প্রাণনাশের হুমকি দেয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সার্বিক বিষয় জানিয়ে ওই দিনই গুলশান থানায় জিডি (নম্বর-১৪৫২) করেন ইউআইটিএসের রেজিস্ট্রার মো. কামরুল হাসান।

বাংলাদেশ সময়: ২২১৫ ঘণ্টা, জুলাই ১২, ২০২০
এসকে/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa