ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৭, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩ সফর ১৪৪২

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

করোনাকাল: শবযাত্রায় সঙ্গী তারা

নিউজরুম এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২০৬ ঘণ্টা, জুন ৭, ২০২০
করোনাকাল: শবযাত্রায় সঙ্গী তারা ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম: করোনাকালে শবযাত্রায় প্রিয়জনদের অনেকেই দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কেউ ভয়ে আসছেন না মরদেহের পাশে। তাই বলে সৎকার কার্যক্রম থেমে নেই। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীরা সঙ্গী হচ্ছেন এই শবযাত্রায়।

নগরের উত্তর কাট্টলী সনদ দত্ত সর্বজনীন মহাশ্মশান এখন ব্যবহৃত হচ্ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সৎকারের জন্য। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্ধারিত এই শ্মশানে এখন পর্যন্ত ২৮টি মরদেহ সৎকার করা হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীতজানা গেছে, মরদেহ সৎকারের জন্য গঠিত কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব পালন করছেন চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। সৎকারের আনুষ্ঠানিকতায় চসিক থেকে লোকবল, গাড়িসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহায়তাও করছেন মেয়র।

শ্মশান পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী বাংলানিউজকে বলেন, জোয়ারের সময় মরদেহ নিয়ে ওই শ্মশানে কাদা-পানি মাড়িয়ে যেতে হয়। বেড়িবাঁধ থেকে শ্মশান পর্যন্ত ৬শ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৫ ফুট প্রস্থ ও ১০ ফুট উচ্চতায় রাস্তাটি সংস্কার করে দিচ্ছেন মোস্তফা-হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। এছাড়া শ্মশানে বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের সমস্যা আছে। দাহ করার ঘরটির অবকাঠামোও ঠিক নয়। পাকা ঘরে লাকড়ির ওপর মরদেহ রেখে দাহ করতে হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীততিনি বলেন, চসিক থেকে ১০ জন স্বেচ্ছাসেবক চেয়ে আবেদন করা হয়। মিলেছে ৪ জন। এদের মধ্যে ২ জন কাজ করছে। মরদেহ সৎকারের জন্য গঠিত কমিটিতে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, শ্মশান কমিটি, চসিক কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত আছেন। তবে এখনও সরকারি কোনও পৃষ্ঠপোষকতা মিলেনি। মরদেহ পরিবহনের গাড়ি, স্বেচ্ছাসেবকদের পিপিই, কভার ব্যাগসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের সংকট আছে। কখনও মৃত ব্যক্তির স্বজনের কাছ থেকে জ্বালানি কাঠ মেলে আবার কখনও নিজেদের উদ্যোগে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট চট্টগ্রাম জেলার নেতারা করোনাকালীন সময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মরদেহ সৎকারে নগরীর মহাশ্মশানগুলো সার্বক্ষণিক উন্মুক্ত রাখা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, মরদেহ পরিবহন ব্যবস্থা ও সৎকারকারীদের জন্য পিপিই সরবরাহের দাবিতে সম্প্রতি চসিক মেয়রকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। মেয়র তাদের দাবি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন।

ছবি: সংগৃহীতকোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের সৎকার কার্যক্রমের আহ্বায়ক দেবাশীষ পাল দেবু বাংলানিউজকে বলেন, রোববার (৭ জুন) পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২০টি মরদেহ সৎকার করা হয়েছে। এর বাইরে চান্দগাঁও শ্মশানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ৮ জনের শব দাহ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নিজেরাই মরদেহ স্নান করানো, প্লাস্টিকের কভার দিয়ে মুড়িয়ে ব্যাগে নিয়ে শ্মশান যাত্রা এবং সৎকার করছি। ফাউন্ডেশনের ৬০ জন সদস্য, ১২ জন মহিলা সদস্য ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার শেযযাত্রায় সঙ্গী হচ্ছেন। চট্টগ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্যও রয়েছে স্ব-অর্থায়নে স্বেচ্ছাসেবায় পরিচালিত কোয়ান্টামের বিশেষ দল। সৎকার শেষে শ্মশানেই নিজেদের ব্যবহৃত পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, নেক কভার, বডি ব্যাগসহ সবকিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়। মৃত ব্যক্তিকে শেষ সম্মান জানানোর মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা এ সেবাকাজে নেমেছি।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের সদস্যরা। এছাড়া চট্টগ্রামে করোনায় মারা যাওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মরদেহ সৎকারে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘করোনায় মৃতদেহ সৎকার স্বেচ্ছাসেবক সংঘ’। সংগঠনের উপদেষ্টা ডা. যিশু দেব বাংলানিউজকে জানান, ‘করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার সৎকার নিয়ে নানা ধরনের ভয় প্রচলিত আছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত কেউ মারা গেলে তাকে স্বাস্থ্যবিধি ও নির্দেশনা মেনে সৎকার করা যাবে। মৃতদেহ থেকে ভাইরাসটি ছড়ানোর কোনও আশঙ্কা নেই। সৎকার করতে তিন-চার ঘণ্টা সময় লেগেই যায়। তিন ঘণ্টা পরে আর মৃতদেহে করোনা ভাইরাসের কার্যকারিতা থাকে না’।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীর শেষ যাত্রায় অংশগ্রহণ ও সৎকারে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন নারীনেত্রী রুমকি সেনগুপ্ত ও সামাজিক সংগঠন পূর্বা’র সাংগঠনিক সম্পাদক প্রান্তি ভট্টাচার্য। স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে হাসপাতাল থেকে মরদেহ বহন করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া সহ সব কাজে তারা এগিয়ে এসেছেন।

চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত সংরক্ষিত-৭ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী রুমকি সেনগুপ্ত বাংলানিউজকে বলেন, শবযাত্রায় প্রিয়জনদের অনেকেই করোনার কারণে দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। মরদেহে ওষুধ দিয়ে বিশেষভাবে বডি ব্যাগে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। সৎকার শেষে ব্যবহৃত পিপিই শ্মশানেই পুড়িয়ে ফেলা হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেবক হিসেবে আমি কাজ করে যাচ্ছি।

মরদেহ নেওয়া হচ্ছে শ্মশানে। সনদ দত্ত সর্বজনীন মহাশ্মশান পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কংকন দাশ শর্মা বাংলানিউজকে বলেন, শ্মশানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় রাতে মরদেহ সৎকার করা যাচ্ছে না। ২০০৩ সালে শ্মশানে অস্থায়ী দাহ ঘর তৈরি করে দেন এম মনজুর আলম। দুই বছর আগে সংসদ সদস্য দিদারুল আলম জিনিষপত্র রাখার জন্য পাকা শেড নির্মাণ করে দেন। মরদেহ দাহ করতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেলে বেকায়দায় পড়তে হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় মরদেহের ধর্মীয় আচার অনুসরণ ও পরিবারের সম্মতি নেওয়ার বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য বিষয়ক উল্লেখযোগ্য যেসব নির্দেশনা রয়েছে সেগুলো হচ্ছে-

শুধু কোভিড-১৯ রোগী ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি সুরক্ষা পোশাক পরে মরদেহ স্পর্শ বা দাফন ও সৎকার করতে হবে। মরদেহ স্পর্শ ন্যূনতম রাখতে হবে। কোভিড-১৯ রোগীর মরদেহ ময়না তদন্ত করা যাবে না। মরদেহ সৎকারের আগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি সুরক্ষা পোশাক পরে এবং জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া মেনে মুখের লালার নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। চার সদস্যের একটি দল যথার্থ সুরক্ষা পোশাক পরে মরদেহ প্রস্তুত ও বহন করবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে মরদেহ পরিষ্কার বা ধোয়া যাবে না। মরদেহ প্লাস্টিকের কভার দিয়ে এমনভাবে মুড়িয়ে রাখতে হবে যেন তা কভারের বাইরের সংস্পর্শে না আসে। মরদেহ বহনকারী ব্যাগটি কখনো খোলা যাবে না। সৎকারের প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে। মরদেহ অপসারণের পর রোগীর ঘরটি পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এছাড়া মরদেহ পরিবহন, পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

এদিকে মরদেহ সৎকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) তত্ত্বাবধানে মরদেহ সৎকারে প্রতি উপজেলায় তিনজন নারীসহ ১০ জন করে স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ সময়: ১২০০ ঘণ্টা, জুন ০৭, ২০২০
এসি/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa