bangla news

চট্টগ্রামের শুঁটকির কদর সারাদেশে

উজ্জ্বল ধর, সিনিয়র ফটো করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৯-০৮-৩১ ১২:৫০:২৬ পিএম
বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজ

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজ

চট্টগ্রাম: খদিজা বেগম, বয়স ৩৫ ছুঁই ছুঁই। কড়া রোদে পুড়ে কালচে তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে চেহারা। শুধু খদিজা নন- সালেহা, মরিয়ম বিবি ও তাদের পরিবারের ছোট-বড় সদস্যরাও কাজ করছেন রোদে পুড়ে। তারা সবাই মাছকে শুঁটকিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত।

কর্ণফুলী নদীর উত্তর প্রান্তে বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লীতে কাজ করছেন কয়েক শ’ শ্রমিক, যাদের অধিকাংশের বাড়ি বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকায়।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুকানোয় ব্যস্ত থাকতে হয় এসব শ্রমজীবীকে। তবে হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েও মিলে না ন্যায্য পারিশ্রমিক। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, দিন শেষে মজুরি মেলে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা। নারীসহ প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছেন শুঁটকি তৈরিতে।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজ৫ বছর ধরে শুঁটকি তৈরির কাজ করছেন খদিজা বেগম। তার স্বামী অটোরিকশা চালান। দুই ছেলে-মেয়ে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। স্বামীর আয়ে সংসার ও ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিন কাজ করলে দুইশ টাকা পান। এতে পরিবারে কিছুটা স্বচ্ছলতা এসেছে তার।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ভিটেহারা সাগর উপকূলের দরিদ্র মানুষগুলো বাকলিয়ায় কর্ণফুলী সেতুর উত্তর প্রান্তে নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে তুলেছে এই শুঁটকি পল্লী। কয়েকজন শুঁটকি ব্যবসায়ী নিজেরাই মাচাঙ বানিয়ে কাঁচা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি শুরু করেন। তাদের দেখাদেখি অনেকে মাচাঙ-এ শুঁটকি তৈরি করে। বর্তমানে এখান থেকে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক টন শুঁটকি নগরসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজনদীর তীরবর্তী হওয়ায় এখানে শুঁটকি তৈরিতে তুলনামূলক খরচ কম পড়ে। নদী ও সাগর থেকে মাছ সরাসরি এখানে নিয়ে আসা হয়। বাকলিয়া ছাড়াও পশ্চিম পটিয়ার কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে ইছানগর, ডাঙারচর, জুলধা ও কর্ণফুলী মিলে মোট ৯টি স্থানে গড়ে উঠেছে শুঁটকি পল্লী। প্রতি মৌসুমে অন্তত কয়েক কোটি টাকার শুঁটকি সরবরাহ করা হয় কর্ণফুলীর তীর থেকে। তবে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় এসব এলাকা। কাদামাটির ওপর গড়ে ওঠা পল্লিতে অনেকটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই উৎপাদিত হচ্ছে শুঁটকি।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজশুঁটকি পল্লীতে রোদের তাপে মাছ শুকানো হয়। তবে এখানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শুঁটকি তৈরিতে ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাই ক্লোরাইথেন (ডিডিটি) নামক পাউডার ব্যবহার করে। এই পাউডার ব্যবহারের ফলে মাছে সহজে পচন ধরে না, পোকামাকড় বা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে না এবং শুঁটকি দীর্ঘদিন ভাল থাকে। এর কম মূল্য এবং সহজলভ্যতা শুঁটকি ব্যবসায়ীদের কাছে একে অধিক জনপ্রিয় করে তুলেছে।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজএছাড়া সবিক্রন ৪২৫ নামে আরেকটি রাসায়নিকও শুঁটকিতে স্প্রে করা হয়। জেলেদের মতে, এই ওষুধ মাছে দিলে তাতে ব্যাকটেরিয়া হয় না, শুঁটকি হয় চকচকে ও দীর্ঘস্থায়ী। জানা গেছে, এ ওষুধ একপ্রকার কীটনাশক, যা ফসল বা গাছের পোকামাকড় দমন করতে ব্যবহৃত হয়। যা মানুষের শরীরে প্রবেশে হতে পারে জটিল রোগ।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নগরের মাছের বড় আড়ত ফিশারীঘাট ও বোট মালিক-মাঝিদের থেকে কাঁচা মাছ কিনে শুঁটকি বানানো হয়। সাগরের মাছ পাওয়ার ওপর নির্ভর করে এখানকার শুঁটকি উৎপাদন। সাগরে মাছ কম পাওয়া গেলে শুঁটকির পরিমাণও কমে আসে।

নদীর তীরবর্তী জায়গাগুলো সরকারি খাস জমি হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা জায়গা দখল করে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকারীদের কাছে বাৎসরিক জায়গার পরিসীমা ভেদে ২০-৩০ হাজার টাকায় ভাড়া দেয়। ভাদ্র মাস থেকে শুঁটকির মৌসুম শুরু হয়। প্রায় ৬-৭ মাস মৌসুম থাকে। এখানে ছুরি, সাবিলা, ফাইস্যা, লটিয়া, হাঙরসহ বিভিন্ন রকমের ছোট-বড় ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছকে শুঁটকি রূপান্তরিত করা হয়।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজব্যবসায়ীরা জানান, বাজার থেকে কাঁচা ছুরি মাছ কেনা হয় ২০ টাকা দরে। তা শুকিয়ে শুঁটকি করে বিক্রি করা হয় দুইশ থেকে পাঁচশ টাকায়। হাঙ্গর মাছ কেনা হয় ৬০ টাকায়। শুঁটকি বানিয়ে বিক্রি হয় দুই থেকে পাঁচশ টাকা। লটিয়া মাছ কেনা হয় ৫০ টাকায়। শুঁটকি বিক্রি করা হয় ২৩০-২৪০ টাকায়। পোপা মাছ কেনা হয় ৪০ টাকায়। বিক্রি হয় ১২০ টাকায়।

আছাদগঞ্জ এলাকার খুচরা শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও রাঙ্গাবালির চর (সুন্দরবন এলাকা), বাঁশখালী এলাকার শুঁটকি উন্নতমানের। তবে এখানকার শুঁটকিও খারাপ নয়। এখানকার শুঁটকির ক্রেতারা বেশিরভাগ নিম্ন আয়ের।

বাকলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লী। ছবি: বাংলানিউজব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি মৌসুমে চট্টগ্রামের এসব আড়তে মাছের গুঁড়াসহ ১৫ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি তৈরি হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। উৎপাদিত এসব শুঁটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

আমিষ, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, ক্যালরি, খনিজ লবণ ও ভিটামিনের প্রকৃষ্ট উৎস এই শুঁটকি। চট্টগ্রামসহ সারাদেশে শুঁটকির রয়েছে আলাদা কদর। দেশ-বিদেশে বিপুল চাহিদার এই শুঁটকির মান নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১২৫০ ঘণ্টা, আগস্ট ৩১, ২০১৯
ইউডি/এসি/টিসি

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন :   চট্টগ্রাম
        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2019-08-31 12:50:26