[x]
[x]
ঢাকা, শুক্রবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
bangla news
রেহেনা পারভীন

দ্রুততম মানবী থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা

মো.মহিউদ্দিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৮-০৩-০৮ ৫:২৭:২১ এএম
রেহেনা পারভীন । ছবি: সোহেল সরওয়ার, বাংলানিউজ

রেহেনা পারভীন । ছবি: সোহেল সরওয়ার, বাংলানিউজ

চট্টগ্রাম: বাড়ির উঠোনে ডাংগুলি, মারবেল আর ফুটবল খেলায় মত্ত থাকলেও পরিবারের কেউ কখনো বাধা দেয়নি। রাজশাহী কোর্টের সেরেস্তাদার বাবা অবসরপ্রাপ্ত দাদা তাকে বুঝতে দেননি ছেলে-মেয়ের পার্থক্য। একজন মেয়ের চেয়ে একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছেন তারা। ফলে ছোটকাল থেকেই শিখেছেন তিনি একজন মানুষ।

বাবা-দাদা থেকে পাওয়া শিক্ষা নিজের জীবনেও প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। সন্তানদের ইচ্ছে মতোই কাজ করতে দিয়েছেন।এমনকি একজন মা হিসেবে কখনো পড়তে বলারও প্রয়োজন মনে করেননি। কারণ তিনি মনে করেন, বাচ্চারা নিজের ইচ্ছায় যতটুকু পড়ে ততটুকুই লাভ। তারা হেসে খেলে বড় হবে। পীঠে বইয়ের বোঝা আর মাথায় পড়ার চাপ নিয়ে নয়।

বলছিলাম বাংলাদেশের একাধিকবারের দ্রুততম মানবী রেহেনা পারভীনের কথা। যিনি খেলাধুলায় স্কুলে বিশেষ কৃতিত্ব দেখানোর কারণে ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামে আসার সুযোগ হয়েছিল। নিজের ইচ্ছে না থাকলেও অনেকটা জোর করে এ সুযোগটা করে দিয়েছিলেন তারই সহপাঠী বিথি। তখনই স্কুল পর্যায়ে ছয়টি ইভেন্টে প্রথম স্থান অধিকার করে চট্টগ্রাম জয় করে নিয়েছিলেন।

সেই থেকে চট্টগ্রাম। রাজশাহী বোয়ালিয়া থানার হড়গ্রামের বাসিন্দা সেরেস্তাদার আবদুর রহমানের মেয়ে রেহেনা এখনো আছেন বন্দর নগরীতে। খেলাধুলায় বিশেষ কৃতিত্ব দেখানোর ফল পেয়েছিলেন ছোট বেলাতেই। চট্টগ্রাম কাস্টমসে খেলোয়াড় কোটায় নিয়োগ পাওয়া রেহেনা পারভীন এখন ঢাকা কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তা (সুপারিনটেন্ডেন্ট)।

কাস্টমসে খেলোয়াড় কোটায় যোগ দেওয়ার পর ন্যাশনাল গেইমসে অংশ নেওয়া রেহেনা জাতীয় পর্যায়ে সিনথেটিকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। রাজশাহী মিশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাসের পর রাজশাহী মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তার পরই বসতে হয় বিয়ে পিঁড়িতে।

তবে বিয়ে বা সংসারের কারণে চাকরি বা খেলাধুলা কোনটাই থামেনি। পরিবারের সবার সহযোগিতার পাশাপাশি যাকে বর হিসেবে পেয়েছিলেন তিনিও সেই মাঠের মানুষ। এশিয়ান জুনিয়র গেইমসে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো কেউ তার সেই রেকর্ড অতিক্রম করতে পারেনি। এশিয়ান গেইমসে চতুর্থ হয়েছিলেন। বাংলাদেশের জন্য এটিই সর্বোচ্চ ফল।

রেহেনা পারভীন ছবি: সোহেল সরওয়ার, বাংলানিউজ

আমীন জুট মিলের ম্যানেজার (উৎপাদন) মিলজার হোসেন পাশে না থাকলে হয়তো এতদূর আসা সম্ভব হতো না বলে মনে করেন রেহেনা পারভীন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, বিয়ের পরই কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। মাস্টার্স শেষ করেছি। পাশাপাশি খেলাধুলাও চালিয়ে গেছি। এটা সম্ভব হয়েছে স্বামীর সহযোগিতার জন্য।

‘আমি কোথা থেকে কোথায় এসেছি তা ভাবলে অবাক লাগে। প্রথম চাকরিতে ঢুকলাম ক্যাজুয়াল ভিত্তিতে। তারপর এমএলএস হিসেবে কাজ করলাম। তাপর পরীক্ষা দিয়ে কেরানি, অফিস সহকারী, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এখন সুপারিনটেন্ডেন্ট হলাম।’

চাকরিজীবী নারীদের পোস্টিং সমস্যা:

কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট একাডেমিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন রেহেনা পারভীন। সম্প্রতি রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। পদোন্নতি আনন্দের হলেও তার মনের ভেতরটা ভাল নেই। কারণ স্বামী, ছেলে-মেয়ে চট্টগ্রাম থাকলেও তাকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে ঢাকায়। সংসার ফেলে সেখানে কিভাবে থাকবেন সেই চিন্তা এখন নিত্যদিনের।

রেহেনা পারভীন এবং স্বামী মিলজার হোসেন।

চাকরিজীবী নারীদের পোস্টিং তাদের চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকারি নিয়ম আছে স্বামী যেখানে থাকে স্ত্রী সেখানেই থাকবে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই হচ্ছে না। যেমন আমার ক্ষেত্রে হয়নি। আমার বাচ্চারা এখানে পড়ালেখা করে, স্বামীর চাকরি এখানে। সেক্ষেত্রে আমি ঢাকায় গিয়ে মাথা ঠান্ডা করে কাজ করতে পারবো না। দেশের ও সরকারের কাজও সঠিকভাবে করতে পারছি না, সন্তানদেরও সময় দিতে পারছি না। আবার ঢাকায় আমার একা থাকাও কঠিন। এসব কঠিন মুহূর্ত পার করতে হয়। এ দু’টানার মধ্যে থেকে নারীদের কাজ করা কষ্ট। তাই নারীদের পোস্টিংয়ের বিষয়টা যেন শীতিলভাবে দেখা হয়। সন্তানদের সময় দিতে না পারলে তারা ভুল পথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নারীদের নানা সংকটের কথা তুলে ধরে রেহেনা পারভীন বলেন, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার শক্তি যোগাতে নারীদের সুশিক্ষিত হওয়া দরকার। প্রেমে ভাঙন কিংবা বিয়ের কারণে যেন জীবনটা থেমে না যায়। মানসীক শক্তি তৈরি হলে মেয়েরা যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবে।

বিকেলটা তাদের হোক:

সাধারণ জীবন যাপনের চিন্তা করলে সমস্যা হয়না বলে মনে করেন রেহেনা পারভীন। তাই ছেলে-মেয়েদের কেবল পড়া-লেখায় ব্যস্ত না রেখে তাদের মতো চলতে দেওয়া, খেলতে দেওয়া উচিত।

‘এখন দেখি মায়েরা বাচ্চাদের স্কুল থেকে বের হওয়ার পরই মারতে থাকে। এটা পারনি, ওটা পারনি। অথচ তারা খেলার সময় পাচ্ছে না। খোলা মনে চলতে পারছে না। আমি বিকেলে কোন টিচার দেইনি। বিকেলে তারা খেলবে। বিকেলটা তাদের।’

বাচ্চারা নিজে নিজে পড়ে যতটুকু অর্জন করবে ততটাই লাভ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে মায়েদের আরও খোলামেলা হওয়া উচিত। তাদের সময় দেওয়া দরকার। না হলে ভুল পথে যেতে পারে। এই যে সমাজে নানা অবক্ষয় হচ্ছে তার জন্য তো পরিবার দায়ী।

বাংলাদেশ সময়: ১৬২৬ঘণ্টা, মার্চ ০৮, ২০১৮

এমইউ/টিসি

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa