ঢাকা, সোমবার, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭, ১০ আগস্ট ২০২০, ১৯ জিলহজ ১৪৪১

উপকূল থেকে উপকূল

উচু ও শক্ত বাঁধের দাবিটা পূরণ হবে তো!

রফিকুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯০৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২০, ২০১৪
উচু ও শক্ত বাঁধের দাবিটা পূরণ হবে তো! ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

উপকূলীয় জনপদ ঘুরে: উপকূলের বিপন্ন মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি উচু ও শক্ত বাঁধ। প্রতিনিয়ত দুর্যোগের আতঙ্কে থাকা মানুষেরা বেঁচে থাকার তাগিদেই এই দাবি জানিয়ে আসছে।

অতি সম্প্রতি উপকূলীয় বাঁধ তিন ফুট উচু করতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই খবরে উপকূলের সেই বিপন্ন মানুষেরা সন্তুষ্ট। দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়নে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন দেখছেন তারা। তবে এই বাঁধ শক্ত করে নির্মাণের জোরালো দাবি তাদের।

সূত্র বলছে, উপকূলীয় বাঁধের এই অবস্থা বিবেচনায় রেখে বেড়িবাঁধ তিনফুট উচু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পে ৩২৮০ কোটি অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত কয়েক বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় রেখে বাঁধ উচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র বলছে, গত কয়েক বছরে দেশের উপকূল এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা অস্বাভাবিক বেড়েছে। বর্ষাকালে মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে বাড়িঘর। অনেকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। পেশায় পরিবর্তন আসায় জীবন-জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।  

উপকূলের বেড়িবাঁধের নানামুখী সমস্যা নিয়ে বাংলানিউজে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বেড়িবাঁধের দুর্বলতার কারণেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রবল চাপের মুখে পড়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষ। নাজুক বাঁধ ভেঙে প্রতিবছর উপকূলে হাজারো মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যায়। মানুষগুলো তখন পথে বসে। অথচ এই বাঁধ পূনঃনির্মাণে, বাঁধ উচু করতে কিংবা প্রশস্থতা বাড়াতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়।  
 

বাগেরহাটের শরণখোলার সিডর বিধ্বস্ত সাউথখালী গ্রাম সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, যেখানে সিডর বড় ধাক্কাটা দিয়েছিল, কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে যে জায়গাটি দিয়ে পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়তো, সেই জায়গাটি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। জোয়ারের পানি বাঁধ ছুঁই ছুঁই করছে। এই বাঁধ কোথাও ছয় ফুট, কোথাও আট ফুট আবার কোথাও দশ ফুট। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তত কুড়ি ফুট উচু বাঁধের দাবি এলাকাবাসীর। প্রতিটি ঝড়ের পর একই দাবি উঠলেও সে দাবি কাগজেই থেকে যায়।

একই উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের তাফালবাড়ি বাজারের ছোট্ট চায়ের দোকানে কথা হচ্ছিল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহজাহান বাদল জোমাদ্দার, স্থানীয় বাসিন্দা জামাল হোসেন জোমাদ্দার, মিন্টু মিয়া সহ আরও অনেকের সঙ্গে। সিডরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারা জানান, ওই দুর্যোগে অন্তত ১৫ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছাস এসেছিল। কিন্তু বাঁধ আছে মাত্র ১০ ফুট উচু। সিডরের পর বাঁধের বিভিন্ন এলাকায় কাজ হলেও তাতে উচ্চতা সর্বোচ্চ তিন ফুট বাড়তে পারে।

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার কিরণপাড়া এলাকার চিত্র। এখানে সমুদ্রের পানি বাঁধ উপচে বাড়িঘরে ঢুকে। তাই বাঁধের ওপরে সারিবদ্ধ ব্লক ফেলেছে সমুদ্রপাড়ের বাসিন্দারা। আবার কোথাও বিধ্বস্ত বাঁধের ফাঁকফোকর দিয়ে আসা পানি ঠেকাতে ফেলা হয়েছে বালুর বস্তা। যেখানে কোন বাঁধ নেই, সেখানকার মানুষ সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে। বর্ষার কয়েকটি মাস তাদের জীবন একেবারেই বদলে যায়। কুতুবদিয়ার দক্ষিণপ্রান্ত তাবালর চর, কিরণ পাড়া, হায়দারপাড়া, বড়ঘোপ, ধুরুংসহ বাঁধের পাড়ের বিপন্ন বসতিতে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ।

সূত্র বলছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বেড়িবাঁধ উচুকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশের ছয়টি উপকূলীয় জেলার ১৬টি পোল্ডারে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী মার্চ মাস নাগাদ এসব এলাকায় কাজ শুরু হবে। প্রকল্পের আওতায় বেড়িবাঁধ তিন ফুট করা হবে এবং বাঁধ সংশ্লিষ্ট স্লুইজ গেটগুলো পুনঃনির্মাণ করা হবে। এই পকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেয় সরকার। বিশ্বব্যাংক প্রাথমিকভাবে তিন হাজার ২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।


প্রাথমিকভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার ১৭টি উপজেলার বেড়িবাঁধগুলোর কাজ শুরু হবে। চলতি অর্থবছরে খুলনা জেলার ৩২ ও ৩৩ এবং বাগেরহাট জেলার ৩৫/১ ও ৩৫/৩ এ চারটি পোল্ডারে পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাগেরহাট জেলার দুটি পোল্ডারের জন্য ১০৩ দশমিক ৮৫ হেক্টর জমি ও খুলনা জেলায় ১৯৩ দশমিক ০৫৪ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

বাঁধ উচুকরণের সরকারি এই উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করে উপকূলের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলেছেন, বাঁধ উচু করার দাবি দীর্ঘদিনের। শুধু বাঁধ উচু করলে হবে না। শক্ত করে বাঁধ তৈরি করতে হবে। ব্লক ফেলে বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে হবে।

তারা বলেন, উপকূলের মানুষদের বাঁচাতে সরকার অনেক পরিকল্পনাই নেয়; কিন্তু কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন খুবই সামান্য। যথাযথ নজরদারির অভাবে বরাদ্দ অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
 
[পশ্চিমে সাতক্ষীরা, পূর্বে টেকনাফ, উপকূলের এই ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা বেষ্টিত অঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে পিছিয়ে থাকা জনপদের খবরাখবর তুলে আনছে বাংলানিউজ। প্রকাশিত হচ্ছে ‘উপকূল থেকে উপকূল’ নামের বিশেষ বিভাগে। আপনি উপকূলের কোনো খবর বাংলানিউজে দেখতে চাইলে মেইল করুন এই ঠিকানায়: [email protected] ]

বাংলাদেশ সময়: ২০৪৯ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa