ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৭ আগস্ট ২০২০, ১৬ জিলহজ ১৪৪১

জলবায়ু ও পরিবেশ

বিশ্ব পরিবেশ দিবস

গাছের জন্য পাখি, পাখির জন্য গাছ

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন, স্পেশালিস্ট এনভায়রনমেন্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০০২৭ ঘণ্টা, জুন ৫, ২০১৪
গাছের জন্য পাখি, পাখির জন্য গাছ ছবি: কিরণ খান/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

শ্রীমঙ্গল: প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টিগুলোর একটি হলো পাখি। পাখি কে না ভালোবাসে? আমরা অনেকেই পাখিপ্রেমী।

চোখ মেলে প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা প্রথম যে পাখির দেখা পাই– সে-ই আমাদের প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বন্ধু।

তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরিয়ে খাওয়া ফলের বীজ আপনাথেকেই একসময় পড়ে মাটিতে। আমাদের উর্বর মাটির জাদুর স্পর্শে তা থেকে জন্ম নেয় একেকটি বৃক্ষ। তারাও আবার পূর্ণতা লাভ করে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্পে। এভাবেই বনায়ন তৈরিতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে আমাদের বাসার গাছে এসে বসা ছোট্ট পাখিটিও।

কিন্তু আমাদের দেশের অবশিষ্ট বন ও সংরক্ষিত পাহাড়ি অঞ্চলগুলোও আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আক্রমণ, সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, দুর্নীতি আর সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে উজাড় হচ্ছে এর মূল্যবান বৃক্ষসম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।



বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, ষাটের দশকে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ ছিল ২৪ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৭ শতাংশ। আর বেসরকারি হিসাব মতে, তা রয়েছে ১০ দশমিক ১০ শতাংশ।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ও পাখি পর্যবেক্ষক এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বাংলানিউজকে বলেন, গাছ দু’রকমের রয়েছে। একটি গৃহপালিত, অন্যটি বন্যগাছ। অর্থাৎ, প্রাকৃতিকভাবে যে গাছগুলো জন্মায়। গৃহপালিত গাছের মধ্যে আম, জাম, কাঠাল প্রভৃতি। অনেক অনেক বছর আগে এগুলোও প্রাকৃতিক ছিল। আমরাই এগুলোকে গৃহপালিত গাছে রূপান্তিত করেছি। তবে শুধু গৃহপালিত গাছ থাকলেই চলবে না। প্রাকৃতিক গাছও থাকতে হবে।



তিনি বলেন, ‌আমরা যদি প্রাকৃতিক গাছ সরিয়ে শুধু গৃহপালিত গাছগুলোই লাগাতে থাকি তবু এটা যথাযথ হবে না। প্রাকৃতিক গাছ ফেলে গৃহপালিত গাছ রোপণের বিষয়টি অনেকে সঠিক বলে মনে করেন। আসলে তা মোটেই সঠিক নয়।

ইনাম আল হক বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য আমাদের প্রাকৃতিক গাছ অনেক অনেক প্রয়োজনীয়। প্রাকৃতিক গাছকে প্রাধান্য দিতে হবে। বন বিভাগ যদি প্রাকৃতিক গাছ কেটে সেখানে বেত, সেগুন, আগর, রাবার প্রভৃতি গাছ লাগায় সেগুলো অর্থকরী হবে ঠিকই; কিন্তু প্রাকৃতিক বনের জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হবে। প্রাকৃতিক গাছের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক- এ কথাটি জানতে হবে সবার। অনেকে মনে করে আম, জাম, সেগুন, কাঁঠাল গাছ লাগানো তো ভালোই। কিন্তু মোটেই তা নয়।



তিনি আরও বলেন, যেখানে কোনো গাছই নেই, সেখানে গৃহপালিত গাছই ভালো। গৃহপালিত গাছের অভাব রয়েছে আমাদের দেশে। আবার প্রাকৃতিক গাছ বা বুনোগাছ কেটে গৃহপালিত গাছ লাগানো চরম ক্ষতিকর। কিছুতেই সেটা করা যাবে না। বন বিভাগ সে জন্য দায়ী। প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে সেখানে তারা আগর গাছ লাগিয়ে ফেললো। সামাজিক বনায়ন করে ফেললো। যে বনভূমিতে প্রাকৃতিক বন রয়েছে যেটা নষ্ট করে এমন বনায়ন সৃষ্টি করা কখনোই উচিত নয়। এই প্রথা বন্ধ করতে হবে। যদিও নব্বই ভাগ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এখনো কিছু কিছু চলছে। জীববৈচিত্র্যের জন্য প্রাকৃতিক গাছ লাগবে। আম-জাম-কাঠাল নয়।  

পাখির প্রজনন সম্পর্কে ইনাম আল হক বলেন, পৃথিবীর যত পাখি রয়েছে অথবা আমাদের দেশের যত পাখি আছে তার একটি বড় অংশ গাছেই বসবাস করে। গাছেই থাকে, গাছেই খাওয়া-দাওয়া করে এবং গাছেই বাসা বাঁধে। গাছের অভাব দেখা দিলেই পাখির অভাবও দেখা দেবে। গাছ নেই, তাই পাখি নেই। যেমন ধরুন, বালিহাঁসের কথা। যারা গাছের কোটরে বাসা করে থাকে। গাছের কোটরে যেখানে হাঁস প্রবেশ করতে পারে এমন গাছ হতে পুরোনো গাছ লাগে। দেড়শ’-দুশ’ বছরের পুরোনো গাছ। সেরকম গাছ এখন আর নেই। আমরা যেহেতু ওই রকম পুরোনো সব গাছই ধ্বংস করে ফেলেছি। যেগুলো লাগানো হয়েছে তা ত্রিশ-চল্লিশ বছরের পুরোনো গাছ। ফলে বালিহাঁস প্রজনন করতে পারে না। এ কারণেই তারা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।  



ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দেশের ২ লাখ ৭০ হাজার একর বনভূমি ইতোমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খোদ বন বিভাগের লোকজন। বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই বন ধ্বংসকারী সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বন উজাড়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের নানা বিপর্যয় ঘটছে। জনবসতির সম্প্রসারণ, আবাসস্থল নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, আসবাবপত্র তৈরি, অপরিকল্পিত ইটভাটা, রাস্তাঘাট তৈরি, শিল্প-কারখানারবিকাশসহ নানা কারণে আমাদের সবুজের লালিত বনভূমিকে আজ ধ্বংস করা হচ্ছে।

ছবিগুলো তুলেছেন পাখি পর্যবেক্ষক, সংরক্ষক ও আলোকচিত্রী কিরণ খান। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, প্রকৃতির এই অপূর্ব সুন্দর প্রাণীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।  

বাংলাদেশ সময়: ০০৩০ ঘণ্টা, জুন ০৫, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa