bangla news

সাগর পাড়ের বিপন্ন জীবন, জলোচ্ছ্বাসে ভাঙন

|
আপডেট: ২০১৪-০১-০২ ৮:০০:৩১ পিএম

জলোচ্ছ্বাসের পানি বাড়ির উঠান অবধি এলে মানুষগুলো মাচা পেতে আশ্রয় নেয়। সে সুযোগটুকু না থাকলে তারা চলে যায় উঁচু বাঁধে। সেখানেও আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হলে হাড়িপাতিলসহ বহনযোগ্য সম্পদটুকু নিয়ে অসহায় মানুষেরা ছুটে গ্রামের ওই প্রান্তে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে।

Rafiqulকালিরচর (বুড়িরচর), হাতিয়া, নোয়াখালী থেকে: জলোচ্ছ্বাসের পানি বাড়ির উঠান অবধি এলে মানুষগুলো মাচা পেতে আশ্রয় নেয়। সে সুযোগটুকু না থাকলে তারা চলে যায় উঁচু বাঁধে। সেখানেও আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হলে হাড়িপাতিলসহ বহনযোগ্য সম্পদটুকু নিয়ে অসহায় মানুষেরা ছুটে গ্রামের ওই প্রান্তে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে।

মাথায়-হাতে-কাঁধে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিসিনপত্রের বোঝা নিয়ে সামলাতে হয় পরিবারের নারী-শিশু ও বৃদ্ধ সদস্যদের। সমুদ্রপাড়ের মানুষদের জীবনে এ দুর্ভোগ ঘুরেফিরেই আসে।



উপকূল জেলা নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া সদর ওছখালী থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের এ এলাকার নাম কালিরচর। বাঁধের বাইরে বাড়িঘর, এরপর কিছু খোলা জায়গা পেরিয়ে প্রায় ফাঁকা হয়ে যাওয়া সংরক্ষিত বন, আর তারপরেই বঙ্গোপসাগর। বনের ভেতরের সরু পথ দিয়ে সমুদ্রপাড়ে যাওয়া যায় অনায়াসেই।

স্থানীয়রা জানালেন, প্রায় ৩০ বছর আগে গড়ে ওঠা সংরক্ষিত বন প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে জনবসতিকে ঝড়-ঝাপটা থেকে কিছুটা রক্ষা করতে পারলেও জলোচ্ছ্বাসের তান্ডব থেকে রেহাই পায় না তারা। আছে আরও নানা সংকট।

দেশের কেন্দ্রবিন্দু রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরের এ জনপদে পৌঁছাচ্ছে না সরকারি-বেসরকারি সব সুযোগ-সুবিধা। কালিরচরের আলাদিবাজারে কথা বলার সময় অনেকজনের ভিড় ঠেলে বিপন্ন মানুষেরা সেই আকুতির কথাই জানালেন।

আলাদিবাজারের জাবের হোসেনের ছেলে সুমন মিয়া মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন ভাটা পড়েছে রোজগারে। জীবিকার অন্য কোনো বিকল্প অবলম্বন নেই বলে জানালেন, জীবিকার এ সংকটের মাঝেও নানামুখী প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবন লন্ডভন্ড করে দেয়। জোয়ারের সময় বাড়িতে পানি উঠে যায়। তখন আশ্রয় নিতে হয় বেড়িবাঁধে। আর মহাবিপদ সংকেত পেলে ছুটে গ্রামের শেষপ্রান্তে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে।

সত্তর বছরের মাহে আলম এ এলাকায় বসবাস করছেন দীর্ঘদিন। এ এলাকাটি বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে ওঠা চর। ২০০১ সালের আগে বিশাল এলাকা বাঁধের বাইরে ছিল। বাঁধ হওয়ায় কিছু লোক জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পেলেও এখনো বাঁধের বাইরে আছে অনেক মানুষ। তাদের জীবন বছরের সারা মৌসুমই বিপন্নতার মধ্যেই থাকে।

কালিরচরের বাসিন্দারা জানান, এ গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও তাতে ধারণ ক্ষমতা অনেক কম। মহাবিপদসংকেতের সময় প্রায় সাত হাজার মানুষ এ কেন্দ্রে আশ্রয় নিলেও ধারণ ক্ষমতা মাত্র দুই হাজার। জায়গা কম থাকায় দুর্যোগের সময় কার আগে কে যাবে, এ নিয়ে হুড়োহুড়ি লেগে যায়।

তবে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নিয়ত চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করলেও মহাবিপদের সংকেত না পেলে এখানকার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যায় না। চরম বিপদের মুখে না পড়লে এরা শেষ সম্বল ছেড়ে অন্যত্র যেতে চায় না।

হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের এ এলাকাটিতে বেড়িবাঁধের বাইরে বনের গা ঘেঁসে গড়ে উঠেছে বসতি। বাঁধের ঢালে, মাটির কিল্লায় এমনকি বনের ফাঁকা জায়গায়ও বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভূমিহীন মানুষ বসতি বানিয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় কারো ঘরে টিনের চালা উঠেছে। তবে অনেকেই বসবাস করছে ছন-পাতা-কাঠ দিয়ে কোনোমতে বানানো ঝুঁপড়িতে। ঘরের পাশেই খোলা পায়খানা। আবার আরেক পাশ ঘেঁসে চলে গেছে হাঁটার পথ। এসব মানুষদের জীবনে সর্বত্রই বিপন্নতা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি ছাড়াও বেশির ভাগ নাগরিক সেবা থেকেই এরা বঞ্চিত।

বিপন্ন বাঁধ-বসতির বাসিন্দারা বাংলানিউজকে জানালেন, বর্ষায় বিরূপ আবহাওয়ায় বসতিতে পানি ওঠে। পাঁচ ফুট পানি উঠলেই বাঁধের পাশে মানুষের বসবাসের সুযোগ থাকে না। জোয়ারের পানির উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে শুকনো মৌসুমে পানিতে লবনের মাত্রাও বেড়েছে। আগে বাঁধের পাশের ঘন বন ঝড়-ঝাপটা মোকাবেলা করতো। এখন বন অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। এলাকার মানুষের ঝুঁকিও বেড়েছে।

বাঁধের বাইরের দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। স্কুলে পাঠানোর চেয়ে কাজে পাঠানোকেই অগ্রাধিকার দেন অভিভাবকেরা। অতিকষ্টে কেউ প্রাথমিক বিদ্যালয় উত্তীর্ণ হলে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পড়তে যেতে হয় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এ কারণে প্রাথমিকেই ঝরে পড়ে অনেক শিশু।

এ বিপন্ন বসতিতে অসুখ হলে চিকিৎসা মেলে না। ওয়ার্ডে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও তা এ এলাকা থেকে অনেক দূরে। ফলে গ্রাম্য হাতুরে ডাক্তার-কবিরাজের ওপরই ভরসা অনেকের। কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা সময় সার্বক্ষণিক করা হলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে বলে জানালেন বাসিন্দারা।

ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ এলাকাটি বুড়িরচর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। এ ওয়ার্ডে লোকসংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। আর পরিবার সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। ওয়ার্ডের আয়তন আর লোকসংখ্যা একটি ইউনিয়নের সমান।

অথচ বরাদ্দ আসে একটি ওয়ার্ডের। ফলে সরকারি অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় এলাকার মানুষ। গত তিন বছরে এ ওয়ার্ডে বিধবা, বয়স্ক কিংবা প্রতিবন্ধি ব্যক্তির জন্য কোনো কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি ভিজিডি সহায়তাও পায়নি কোনো দুঃস্থ নারী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জলদস্যুদের উৎপাতে গোটা ওয়ার্ডের জীবন বিপন্ন। সাগরে জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারে না দস্যুদের ভয়ে। আর জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারে না বলে এখানকার দোকানপাটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে। বেচাকেনা কমে গেছে। অনেকে আবার জেলেদের মতো পেশা ছেড়ে জীবিকার অন্যপথ খুঁজছেন।

আলাদিবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমীর হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারলে দোকানে বেচাকেনা হয়। তারা ৭ দিনস থেকে ১৫ দিনের চালডাল ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিসিনপত্রসহ অন্যান্য মালালাল একসঙ্গে কিনে সাগরে যায়। কিন্তু দস্যুদের কারণে তো অনেক জেলে সাগরে যেতে পারছে না। ফলে বেচাকেনা নেই।

এলাকাবাসীর সমস্যা প্রসঙ্গে বুড়িরচর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য নিজামউদ্দিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে এ প্রান্তের মানুষ সব সুযোগ থেকেই বঞ্চিত। এতোবড় ওয়ার্ডের এতগুলো মানুষের জন্য যে সামান্য পরিমাণ বরাদ্দ আসে, তা দেওয়া যায় খুব কম সংখ্যক মানুষকে। ফলে অনেকেই বঞ্চিত থেকে যান। এর ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জলদস্যুদের ভয় তো আছেই।

এখানকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি, আর নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে এ ওয়ার্ডকে অচিরেই ইউনিয়নের মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন নিজামউদ্দিন চৌধুরী।

বাংলাদেশ সময়: ০৬৪০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৩, ২০১৪
সম্পাদনা: সাব্বিন হাসান, আইসিটি এডিটর

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

জলবায়ু ও পরিবেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2014-01-02 20:00:31