bangla news

কূল নাই, কিনার নাই

|
আপডেট: ২০১৩-১২-২৩ ৩:৩৭:২৫ পিএম

ভাসমান জীবন। আজ এখানে তো কাল সেখানে। থালা-বাটি, হাড়ি-পাতিল, রান্না করার চুলা, বাসা বানানোর জন্য বাঁশের চাক কিংবা পলিথিন সবই থাকে তাদের সঙ্গে। জীবিকার তাগিদে এ ভাসমান ঘর ছুটে চলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ওদের নেই স্থায়ী আবাসন কিংবা ঠিকানা।

বয়ারচর, হাতিয়া, নোয়াখালী থেকে: ভাসমান জীবন। আজ এখানে তো কাল সেখানে। থালা-বাটি, হাড়ি-পাতিল, রান্না করার চুলা, বাসা বানানোর জন্য বাঁশের চাক কিংবা পলিথিন সবই থাকে তাদের সঙ্গে। জীবিকার তাগিদে এ ভাসমান ঘর ছুটে চলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। ওদের নেই স্থায়ী আবাসন কিংবা ঠিকানা।

হাতিয়ার বয়ারচরে হাতিয়া বাজারের কাছে দেখা মেলে এমনই একদল ভাসমান মানুষের। গ্রাম সমাজে বেদে বলে পরিচিত এ হতভাগ্য মানুষগুলো নদী ভাঙনে সব হারিয়ে ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছে। সে কারণেই দলবদ্ধ হয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে জীবিকার খোঁজ করে বলে জানালেন দলটির সদস্যরা।

দলটির সর্দার সুলতান আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, নদী ভাঙনে সর্বহারা মানুষের পরিবার পরিজন নিয়ে বছরের সারা মৌসুমই এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর ভাসমান অবস্থায় থাকে বলে এদের নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিশেষ কোনো কার্যক্রম নেই। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এদের অনেকেই ভোটার হতে পারেনি। নির্বাচন এলে এদের ভোট দেওয়ার চিন্তা নেই। কোনো দল ক্ষমতায় গেলে এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

বেদে বহরের নেতৃস্থানীয় আরেক সদস্য আবদুল বারেক বলেন, আমরা ভাসমান। আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। রোজগার করতে পারলে খাই। না পারলে যা জোটে, তা দিয়েই চালিয়ে নেই। বহরের সবার বাড়ি ছিল চাঁদপুর পুরান বাজার এলাকায়। সেই বাড়িঘরের স্থানটি এখন মেঘনা নদীর মাঝে চলে গেছে। আমরা অনেক আগেই নিঃস্ব হয়েছি। সরকারি সাহায্য আমরা চাই না। আর চাইলেও পাই না।

শীতের ভোরে ব্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে হাতিয়া বাজার। বাড়ছে কর্মব্যস্ততা। পিচঢালা সড়কে চলছে হরেক যানবাহন। বাজারের পাশের মাঠে বেদে বহরটিতেও তখন কাজে যাওয়ার তাড়া। কেউ ঘর বাঁধছে, আবার কেউ কাজ শেষে অন্য এলাকায় ফিরছে। কেউ আবার সকালের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ কাজে যাওয়ার আগে শীতের নরম রোদে পিঠ এলিয়ে বসেছে। এরই মধ্যে কথা হলো বহরের বাসিন্দাদের সঙ্গে।

আলাপে বোঝা গেল, যুগের পর যুগ সব ধরনের সরকারি সুযোগবঞ্চিত এ মানুষগুলোর মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ জমেছে। প্রতিবেদনের জন্য ছবি তোলা আর তথ্য নেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। মানিক মিয়ার স্ত্রী সাবা বেগম চিৎকার করে বলেন, আঙগের বেইচ্যা তোমরা খাও। আমরা কী পাবো। আঙগো কী দিবা। মো. সাগর বলেন, কত তো লিখে নিল। আমাগো কী অইলো।

ভাসমান এ মানুষেরা জানান, সাপ ধরা, সিঙ্গা লাগানো আর দাঁতের পোকা তোলা, এ তিন কাজে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায় বেদে নারী-পুরুষেরা। সাপ ধরার কাজ এবং নারীরা সিঙ্গা লাগানো ও দাঁতের পোকা তোলার কাজ করে পুরুষেরা।

এখানে কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়। এরা বাপদাদার আমল থেকে এ পেশায় আছে। একজন সর্দারের নেতৃত্বে এরা দলবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। উপকূলের অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ এলাকায় এদের বিচরণ। দরিদ্র মানুষের অজ্ঞতা এদের জীবিকার পথ সুগম করে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এসব এলাকার মানুষেরা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরশীল হয়।

ভাসমান এসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা অশিক্ষায় বেড়ে উঠছে। দু-তিন দিন কিংবা এক সপ্তাহ পর পর থাকার স্থান বদল করার ফলে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ছেলেরা ছোটবেলা থেকেই সাপ ধরার প্রশিক্ষণ নেয়, আর মেয়েরা সিঙ্গা লাগানো কিংবা দাঁতের পোকা ওঠানোর কাজ শেখে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ ভাসমান জনগোষ্ঠী চরম অবহেলিত। অস্থায়ীভাবে বসবাসের কারণে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এদের সেবা মেলে খুবই কম। সেখানে তাদের গুরুত্ব অনেক কম। বড়দের কিংবা শিশুদের অসুখ হলে বেসরকারি চিকিৎসকদের কাছে যান। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে ভালো চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এরা ভাসমান বসতি এলাকায় খোলা পায়খানা তৈরি করে। এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় পায়খানার গর্ত মাটি দিয়ে ভরে রেখে যায়।

এ বেদে বহরে বিয়ে হয় মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুসারে। বেদের বহর যেখানে অবস্থান করে, সেখানেই ঘর সাজিয়ে নিজেদের মতো করে বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিয়ে ছাড়াও যেকোনো সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান কিংবা সালিস বিচারে দলের সর্দারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সর্দারের নির্দেশে পরিচালিত হয় পুরো বহর।

হাতিয়া বাজারের এ বেদে বহরে এগারোটি পরিবারে সদস্য ৪৭ জন। পরিবারের প্রধানেরা হচ্ছে সর্দার সুলতান উদ্দিন, আবদুল বারেক, ব্যাকা মিয়া, বেতুয়া, মানিক মিয়া, তাহের, সেলিম, সাগর, নূরনবী, রবু ও শুক্কুর। বহরে পরিবারের সংখ্যা কখনো বাড়ে তো আবার কখনো কমে। পরিবার বাড়লে লোকসংখ্যাও বাড়ে।

শুধু নোয়াখালীর হাতিয়া বাজারে নয়, উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান বেদে বহরের দেখা মেলে। ঘরবাড়ি হারানো এ হতভাগ্য মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে এভাবেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে চলেন। এ যেন এক অনিশ্চিত ভাগ্যযাত্রা।

বাংলাদেশ সময়: ০২৩৬  ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৩
সম্পাদনা: সাব্বিন হাসান, আইসিটি এডিটর

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2013-12-23 15:37:25