bangla news
উপকূল থেকে উপকূলে

দুর্গম চর গাঙচিল, মন্ত্রীর দেখাও দুরাকাঙ্ক্ষা

|
আপডেট: ২০১৩-১২-১১ ৩:৪০:৫৫ পিএম

ভোটের আগে সেখানে একবার করে ভোট চাইতে যান সব প্রার্থী। ভোট পাওয়ার আশায় ওয়াদা করে আসেন, এ করবো, সেই করবো। প্রতিশ্রুতি দেন, ভোট দিলে কোনো সমস্যাই থাকবে না। কিন্তু ভোটের পরে কারও দেখা মেলে না।

Rafiqulচর গাঙচিল (চর এলাহী, কোম্পানীগঞ্জ) নোয়াখালী থেকে: ভোটের আগে সেখানে একবার করে ভোট চাইতে যান সব প্রার্থী। ভোট পাওয়ার আশায় ওয়াদা করে আসেন, এ করবো, সেই করবো। প্রতিশ্রুতি দেন, ভোট দিলে কোনো সমস্যাই থাকবে না। কিন্তু ভোটের পরে কারও দেখা মেলে না।

মন্ত্রী-এমপি এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদেরও পা পড়ে না সেখানে। আর তাই তো অবস্থা বদলায় না মানুষের, সমাধান হয় না কোনো সমস্যার। যুগের পর যুগ ডুবে থাকে অন্ধকারে।

এ গল্প চর গাঙচিলের। নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের দুর্গম এ চরটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। কাঁচা-পাকা রাস্তা পেরিয়ে চর এলাহী ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন ভূখন্ড দক্ষিণ চর গাঙচিলে পৌঁছাতেই চরবাসীর মুখে নানা অভিযোগ।

বেড়িবাঁধের বাইরে এ চরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। একদিকে ঝড়-জলোচ্ছাস। অন্যদিকে দস্যুদের ভয়। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি সব ক্ষেত্রেই এখানকার মানুষ সংকটে থাকে সারা মৌসুম। বর্ষা আর দুর্যোগে কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
upkul

সৌর বিদ্যুতের সুবাদে এখানকার মানুষ হয়তো কাঁচের ভেতর দিয়ে আলোর ঝলকানি দেখেছে কিন্তু আধুনিক সেবা ব্যবস্থার কিছুই পৌঁছায়নি সেখানে। কিছু মানুষের টেলিভিশন দেখার সৌভাগ্য হলেও এখানকার অনেকেই জানে না খবরের কাগজ কাকে বলে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার যখন কম্পিউটার শিক্ষা পৌঁছাচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকায় তখন চর গাঙচিলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কম্পিউটারের নামই শোনেনি।

চর গাঙচিলের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলতেই তাদের কণ্ঠে ক্ষোভ ঝরে পড়ে। চরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিন বলেন, এলাকার বর্তমান সংসদ সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচনের আগে ভোট চাইতে এসে কথা দিয়েছিলেন রাস্তা হবে, ভূমিহীনেরা জমি পাবে, বেড়িবাঁধ হবে। কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর দেখলাম কিছুই হয়নি। এমনকি নির্বাচনের পর তার দেখাও পাইনি এ এলাকায়।

upkulচরবাসী নিজামউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, সব নেতাদের অবস্থাই এক রকম। সবাই নির্বাচনের আগে এসে কথা দিয়ে যায়। তাদের কথায় আমরা অনেক আশা নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেই। কিন্তু এখানকার মানুষের সমস্যা সমাধানে কেউই এগিয়ে আসে না।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, চরের ভেতরে আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা। বিচ্ছিন্ন বাড়িঘর। বহু ছিন্নমূল মানুষ রাস্তার পাশের ঝুপড়িতে থাকে। পথে যেতে চোখে পড়ে দু-একটি বাজার। কিছু দোকানপাট সাজিয়ে বসেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বেচাকেনা খুব কম। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেমন ভালো নেই, তেমনি নানামুখী সংকটে আছে দিন মজুরেরা। কখনো সামান্য মজুরিতে কিছু কাজ জোটে, কাজ না পেলে সংসার চলে ধারদেনা করে। অনেকে আবার কাজের জন্য বাইরে যায়।

চরের দিনমজুর নূরউদ্দিন বলেন, সব সময় কাজ মেলে না। তাই ধারদেনায় চলতে হয়। চার জনের সংসার চালাতে কষ্ট হয়। সরকারি কোনো সাহায্য এখানে আসে না। ২০-২৫ হাজার টাকা দেনায় আছি। কাজ না করলেই দেনার পরিমাণ বেড়ে যায়।

চর গাঙচিলের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা যাতায়াত। নদী পেরিয়ে একটি সোজা পথ থাকলেও সেপথে যাতায়াতে ঝুঁকি আছে। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর নদী পারাপার হতে হয়। দুর্যোগের সময় দুর্ঘটনা। এ কারণে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে এ এলাকার মানুষ হাটবাজার কিংবা বিশেষ কাজে শহরে যাতায়াত করে। ইউনিয়ন সদরের বাজারে যেতেও পাড়ি দিতে হয় প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ।

ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পেলে এখানকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ এলাকায় কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় চরবাসী পাশের সদর উপজেলা কিংবা সুবর্নচরে ছুটে। বেড়িবাঁধ না থাকায় এখানে ঝড়ের আতঙ্ক বেশি। চিকিৎসার জন্য এখানে কোনো সুব্যবস্থা নেই। গ্রাম্য ডাক্তার আছে এখান থেকে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে সুবর্নচরে। সেই ডাক্তারই এখানকার মানুষের একমাত্র ভরসা।upkulm

সূত্র বলছে, চর গাঙচিল একসময় ছিল বনাঞ্চল। আর সেই বন ছিল দস্যুদের অভয়ারণ্য। ২০০৫ সালের দিকে দস্যুরা বন কেটে জমি বিক্রি করতে শুরু করে। নিঃস্ব-অসহায় মানুষেরা মাথা গোঁজার একটু সুযোগ পেতে কমমূল্যে এ জমি কেনে। এভাবেই এ এলাকায় বসতি গড়ে ওঠে। এক সময় দস্যুরা এ চর ছেড়ে চলে যায়। তবে এখনো তাদের আনাগোনা আছে। মাঝেমধ্যে দলবেঁধে এসে চরবাসীর ওপর আক্রমণ করে।

চাষিরা জানান, চর গাঙচিলে নদীর পলিবেষ্টিত উর্বর ফসলি ক্ষেত থাকলেও তাতে ফসল হয় না। শ্রম আর অর্থের বিনিময়ে আবাদ করা জমির ফসল নোনা পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। মার খায় অন্যান্য ফসলও। কার্তিক থেকে আষাঢ় অবধি নদী থেকে আসা লবন পানি গাঙচিলের জমিতে ঢুকে। বছরের পর বছর এভাবে পানি আসতে থাকায় জমি উর্বরতা হারিয়ে ফেলে।

চর এলাহী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন তোতা বাংলানিউজকে বলেন, বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানে সব ক্ষেত্রেই সমস্যা আছে। আর তা সমাধানে ইউনিয়ন পরিষদের সামর্থ্য নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নজর দিতে হবে। সবার আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ সময় ০২১৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১২, ২০১৩
আরআইএম/ সম্পাদনা: সাব্বিন হাসান, আইসিটি এডিটর

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2013-12-11 15:40:55