ঢাকা, সোমবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৭ জুন ২০১৯
bangla news
উপকূল থেকে উপকূলে

দরিদ্র পরিবারে লেখাপড়ার সংগ্রাম

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৩-১০-১৫ ৮:৩৩:৫৮ পিএম

ওরা কেউ হতে চায় শিক্ষক, কারও আবার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা, কারও প্রত্যাশা পুলিশ বাহিনীর বড় কর্মকর্তা হওয়ার।প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান ওরা।নদীতে বাবা-ভাইয়ের মাছধরায় চলে সংসার। তার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা ওদের।

ভোলার রামদাসপুর দ্বীপচর থেকে: ওরা কেউ হতে চায় শিক্ষক, কারও আবার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা, কারও প্রত্যাশা পুলিশ বাহিনীর বড় কর্মকর্তা হওয়ার।প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান ওরা।নদীতে বাবা-ভাইয়ের মাছধরায় চলে সংসার। তার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা ওদের। ক্লাসের সব পড়া ঠিক করে প্রতিদিন স্কুলে উপস্থিতি তারই প্রমাণ।

হতদরিদ্র পরিবারে বড় হওয়া শিশুদের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কথা জানা গেলো ভোলা সদরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর রামদাসপুরে।চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করলেও স্কুলে ভালো ফলাফল করেই এগিয়ে যাচ্ছে এই শিশুরা। রামদাসপুর দ্বীপটি নদীভাঙণে ছোট হয়ে এলেও এখানে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। সেখানে পড়ছে বহু দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়ে।

এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণির জাফর হোসেন, সোনিয়া আকতার, পঞ্চম শ্রেণির তছির উদ্দিন, নাছির উদ্দিন আর মোছা: সোনিয়াসহ অনেক শিক্ষার্থী অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে।বাবা-ভাই কিংবা পরিবারের কেউই হয়তো স্কুলের চৌকাঠ পার হয়নি, অথচ সেই পরিবার থেকে ওরা লেখাপড়া করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অভিভাবকেরা কষ্ট করে হলেও ওদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চান।

তাছির উদ্দিন আর নাছির উদ্দিন দুই ভাই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে ছোটভাই তাছির উদ্দিনের রোল নম্বর এক, আর বড়ভাই নাছির উদ্দিনের রোল নম্বর দুই্। তছিরের ইচ্ছা শিক্ষক হওয়ার আর নাছির হতে চায় পুলিশের বড় কর্মকর্তা। সব বাঁধা অতিক্রম করে ওরা এগিয়ে যেতে চায়। শিক্ষকেরাও এদের প্রতি নজর রাখেন। ওদের এগিয়ে যাওয়ায় গর্বিত স্কুল কর্তৃপক্ষ।

ওদের বাবা জাহাঙ্গীর মাতবর অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। বড় ভাই রাসেল মাতবরও বাবার কাজে সহায়তা করে। প্রতিদিন মাছধরার টাকা দিয়ে চাল কিনে চলে তাদের সংসার। ঘরে থাকার জায়গা নেই। পড়াশোনার স্থানের সংকট। তারপরও ওরা দুইভাই কুপির বাতির আলোতে রাত দশটা-সাড়ে দশটা পর্যন্ত পড়াশোনা করে। পড়া ঠিক করে স্কুলে আসে ঠিক সময়ে। কোনমতে জোগাড় করেছে স্কুলে আসার কাপড়।  

তাছির বলে, ‘আমাগো তো কিছুই নাই। বাড়িঘর নদীতে নিয়া গেছে। বাবা নৌকায় মাছ ধরে। ভাইও বাবার সাথে গেছে। আমরা লেখাপড়া করে বড় হতে চাই।’

রামদাসপুরের হতদরিদ্র পরিবারের বড় হয়ে ওঠা সোনিয়া কঠিন সংগ্রামে লেখাপড়া ধরে রেখেছে। পঞ্চম শ্রেণিতে তার রোল নম্বর দুই্। বাবা কামাল বেপারি অন্যের নৌকায় মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছেন অতিকষ্টে। সোনিয়া মনে করেন সব বাধা কেটে যাবে। একদিন লেখাপড়া করে ও অনেক বড় হবে। ওর স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার।

নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে সোনিয়া বলে, ‘লেখাপড়া ছাড়া কোন দাম নাই। সংসারে অভাব অনটনের মধ্যেও স্কুলে আসি। পড়াশোনা করে যেতে চাই অনেক দূর।’     

চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সোনিয়া আক্তার। বার্ধক্যে ন্যূয়ে পড়া বাবা বজলু পালোয়ান কোন কাজ করতে পারেন না। ছয় ভাইবোনের মধ্যে কেউই লেখাপড়া করতে পারেনি।দিন আনা দিন খাওয়া সেই পরিবার থেকে সোনিয়া অতিকষ্টে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। বিপণ্ন এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তুলতে সোনিয়া শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। নদীতে বাড়ির জমি ভেঙ্গেছে কয়েকবার, পরিবার ঋণী হয়েছে অনেক, পরিবারের এক একটি দিন কাটছে অতিকষ্টে। তারপরও সোনিয়ার লেখাপড়া থামেনি।

হতদরিদ্র পরিবারের উচ্চাশাধারী আরেক ছাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র জাফর হোসেনের বাবা আবদুল খালেক হাওলাদারও অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। দিন আনা দিন খাওয়া পরিবার।পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে জাফর তৃতীয়। চতুর্থ শ্রেণিতে ওর রোল নম্বর ১৫ হলেও মেধাবী ছাত্র হিসেবেই শিক্ষকদের কাছে পরিচিতি তার। রামদাসপুর চরের ছোট্ট ঝুঁপড়িতে বসবাস করেও স্কুলে আসে নিয়মিত। ওর ইচ্ছা ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে।

রামদাসপুর চর ঘুরে দেখা গেলো, অতিকষ্টে জীবন চললেও অনেকেই সন্তানদের প্রতি নজর রাখেন।টানাটানির সংসারেও সন্তানকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা তাদের। নিজেদের জীবন যেভাবেই হোক পার করেছেন, সন্তানদের জীবনে আর এই বোঝা তুলে দিতে চান না।

রামদাসপুরের একজন অভিভাবক মো. হারুন ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। জমিজমা হারিয়ে এখন মুদি দোকান দিয়েছেন। পাঁচ ছেলে মেয়ে তার। ছেলে ছালেম উদ্দিন এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। মেয়ে রাবেয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

হারুন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কোনভাবে যদি ছেলেমেয়েকে এসএসসি পাস করাতে পারি, তাহলে ওরা ভালো থাকবে। লেখাপড়া জানা থাকলে মেয়ের জন্য ভালো পাত্র পাওয়া যাবে।’

দক্ষিণ মধ্য রামদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘এখানকার শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সুযোগ বাড়াতে সমস্যাগুলো দুর করতে হবে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর তা হলেই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের পথ সহজ হবে।

বাংলাদেশ সময়: ০৬৩৩ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৬, ২০১৩
আরআইএম/এনএস/জিসিপি

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2013-10-15 20:33:58