ঢাকা, বুধবার, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

`বাংলাদেশের প্রকৃত সাফারি পার্ক চবি`

সাজিদুল হক সাজু, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১২-০৪-২২ ০৯:২১:০২ পিএম
`বাংলাদেশের প্রকৃত সাফারি পার্ক চবি`

চবি থেকে: নিভৃতচারী প্রাণীবিদ ড. গাজী সৈয়দ আসমত। অধ্যাপনা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগে।

দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করছেন ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণী ব্যাঙ নিয়ে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী-বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলেছেন বাংলানিউজের সঙ্গে।

বাংলানিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি তুলে ধরেছেন চবির প্রাণী বৈচিত্র্যের বহুবিদ সম্ভাবনা ও সমস্যার কথা।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চবিতে আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন একটি ব্যাঙের প্রজাতি ‘ফ্যাজারভেরিয়া আসমতি’। যার বাংলা নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘বাংলাদেশি ঝিঁঝিঁ ব্যাঙ’। তারই ছাত্র সাজিদ আলী হাওলাদার ব্যাঙটি আবিষ্কার করে আলোড়ন ফেলে দেন জীব বিজ্ঞানিদের মধ্যে। ব্যাঙটির নামকরণও করা হয়েছে গাজী আসমতের নামে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব-বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার বিষয়টি তুলে ধরেন প্রথমে। তিনি বলেন, ‘অনেক ধরণের প্রতিকূলতার মধ্যেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণা করছেন। এরই মধ্যে প্রাণী ও উদ্ভিদের বেশকিছু বিরল প্রজাতি আবিষ্কার হয়েছে চবিতে। ’

তিনি বলেন, ‘একটি প্রজাতি সবগুলো বৈশিষ্ট্য বুঝতে গেলে একজন গবেষকের প্রায় ৩ বছর সময় লাগে। এর সঙ্গে জড়িত অর্থ ও জনবল। কিন্তু চবিতে গবেষণা খাতে বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগেও এখানে তেমন কোনো গবেষণাই হচ্ছে না। যেটুকু হচ্ছে তা ব্যক্তি উদ্যোগে। ’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব-বৈচিত্র্য সম্পর্কে গাজী আসমত বলেন, ‘চবি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী নিয়ে গবেষণার একটি আকর স্থল। ইন্দো-বার্মা বায়োডাইভারসিটি হট স্পটের মধ্যে চবি একটি সুপার হট স্পট। ’

তিনি আরো বলেন, ‘চবিতে পাখিই রয়েছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির। স্তন্যপায়ী রয়েছে ১৫ থেকে ১৬ প্রজাতির। এগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণা হয় না। আর সরিসৃপ নিয়ে সার্ভেই করা হয়নি। একসময় এখানে চিতাবাঘ, উল্লুক ইত্যাদি দেখা যেতো। এখন আর সেগুলো দেখা যায়না। ’

‘জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর জন্য বিদেশ থেকে অনেক ফান্ড আসছে। সেই ফান্ডের একটা অংশও যদি চবির প্রাণী সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয় তবে অনেক উপকার হবে’ যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি শিক্ষার্থীদের বলি তোমরা প্রাণী রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়কে সাহায্য করো, তারা কি করবে না? অবশ্যই করবে। ’

চবির প্রাণী বৈচিত্র্য নিয়ে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কিছু হতাশার চিত্রও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘আমার ছাত্র সাজিদ আলী হাওলাদার বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের কাছে চবিকে প্রাণীদের অভয়ারণ্য করার একটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলো ২০০৭ এ। কিন্তু সেটি নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। ’

প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে এগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। শুধু কিছু সাইবোর্ড টাঙিয়ে সচেতন করার কাজ করছে। ওই সাইনবোর্ডে দেওয়া হয়েছে চিত্রা হরিণের ছবি। যা এখানে পাওয়া যায় না। ’

তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে বিদেশি গাছ লাগানো হচ্ছে। এসব গাছে ঠিকমতো পাখি বসতে পারে না। ফলে অনেক পাখিই এখন ক্যাম্পাসে আর দেখা যায় না। ফলজ গাছ বাদ দিয়ে ইউক্যালিপটাস, অ্যাকেশিয়ার মতো গাছ লাগানো হচ্ছে। এসব গাছের সঙ্গে আমাদের পাখিরা পরিচিত নয়। ফলে তাদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগে ক্যাম্পনের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যেতো প্রায় সবধরণের পাখি। অথচ এখন শুধুমাত্র কর্মচারীদের আবাসিক এলাকায় পাখির আনাগোনা বেশি দেখা যায়। কারণ সেখানে কিছু ফলজ গাছ ব্যক্তি উদ্যোগে লাগানো হয়। ’

গাজী আসমতের গবেষণার বিষয় ব্যাঙ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাইপে (তাইওয়ানে আবিষ্কৃত ব্যাঙের প্রজাতি) ব্যাঙ যখন আমরা এখানে (চবিতে) খুঁজে পেয়ছিলাম তখন পৃথিবীর অন্যদেশের বিজ্ঞানীরাদের কাছে এটা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। আমার শিক্ষার্থীদের ক্রমাগত প্রচেষ্টায় তারা মেনে নিয়েছে ওই ব্যাঙ চবিতেও রয়েছে। ’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কত প্রজাতির ব্যাঙ আছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশের ৩৫ প্রজাতির ব্যাঙের মধ্যে চবিতে রয়েছে ২৫ প্রকারের। আরো ২-৩টি প্রজাতি এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের আর কোথাও এত প্রজাতির ব্যাঙ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে বিরল প্রজাতির ব্যাঙ আছে কি-না বলা মুশকিল। কারণ বাংলাদেশে কোনো প্রাণী বা প্রাণীগোষ্ঠীর ওপর সঠিক জরিপ চালানো হয়নি। গবেষকরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করলে আরো অনেক নতুন প্রজাতির দেখা পাব বলে মনে করি। ’

ব্যাঙের সুপার সুপার হট স্পট কাঁটা পাহাড় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ ক্যাম্পাসের সুপার সুপার হটস্পট হচ্ছে কাটাপাহাড় এলাকা । পাহাড়টির তিন-চার জায়গা কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। তারপরও অধিকাংশ ব্যাঙের প্রজাতি এ পাহাড়ের আশপাশেই পাওয়া গেছে। এ অংশটি সুরক্ষিত হলে নিঃসন্দেহে চবি হতে পারে দেশের প্রধান ব্যাঙ সংরক্ষণাগার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এখনই কাঁটা পাহাড়কে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা। ’

ব্যাঙ রক্ষায় অনুকূল পরিবেশ কিভাবে সৃষ্টি করা যায়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যাঙ রক্ষায় অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির একটিই উপায়, তা হলো ব্যাঙের শঙ্কিত হওয়ার কারণগুলোকে নিবারণ করা। অতিবেগুণি রশ্মির বিকিরণ, আবহাওয়ার পরিবর্তন, পানি ও মাটিতে বিভিন্ন এসিড সঞ্চয় ও নানা ধরনের কীটনাশকের সংস্পর্শে নষ্ট হচ্ছে ভৌত পরিবেশ। জৈবিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হচ্ছে বসতি ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, ভিন্ন প্রজাতির অনুপ্রবেশ ঘটানো ইত্যাদি। ধ্বংসের কারণ প্রতিহত করতে পারলে ব্যাঙ বিলুপ্ত হবে না। চবি ক্যাম্পাসে আছে এমন ব্যাঙাচি যদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া যায় তাহলে ব্যাঙের বৈচিত্র্য রক্ষা পেতে পারে। ’

চবিকে প্রকৃত অর্থে সাফারি পার্ক উল্লেখ করে আসমত বলেন, ‘আসলে বাংলাদেশের প্রকৃত সাফারি পার্ক হচ্ছে চবি। এখানে প্রাণীরা তাদের পরিবেশে বড় হয়। গবেষকদের জন্য এ এলাকা একটি বড় গবেষণাগার। এক জায়গায় এত প্রাণের মেলা পৃথিবীর আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগী হলে চবিকে একটি ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে তৈরি করা যাবে উল্লেখ করে আসমত বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণীরা বেড়ে উঠছে। এটা দেখতে সবারই ভালো লাগে। এর থেকে চবির জন্য আয়ও করা সম্ভব। তাছাড়া প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে চবি গড়ে উঠলে এখানে গবেষকরাও গবেষণা করতে আসবে। ’

সাক্লোমিস ডেনটাটা নামের একটি কাছিমের স্টাফ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কাছিমটি ২০০৩ সালে আমারই এক ছাত্র সুপ্রিয় চাকমা এটি আমাকে দেয়। এ প্রজাতির কাছিমটি দেশে এখন বিরল। চবিতে যদি ঠিকমতো গবেষণা করা যায় তবে আরো বিভিন্ন বিরল প্রজাতির প্রাণী পাওয়া যাবে। ’

সকল বিভাগের শিক্ষার্থীদের চবির প্রাণী সংরক্ষণে এগিয়ে আসার কথা বলে অধ্যাপক আসমত বলেন, ‘প্রাণী সম্পদ কোনো বিভাগের সম্পত্তি নয়। এটি দেশের সম্পদ। তেমনি চবির প্রাণী সম্পদ সকল শিক্ষার্থীদের। সব বিভাগের সমন্বয়ে একটি পরিবেশ পরিষদ গঠন করা হলে প্রাণী সংরক্ষণ সহজ হবে। শিক্ষার্থীদের সম্পদ তারাই রক্ষা করবে এটাই হওয়া উচিত। ’

সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার সহযোগিতা করেছেন চবির যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী স্মরণিকা ধর

বাংলাদেশ সময়: ২১০৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ২২, ২০১২
এসএইচ/সম্পাদনা : আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa