[x]
[x]
ঢাকা, সোমবার, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
bangla news

অপারেশন মুকুন্দপুর: অশ্রুসিক্ত জেনারেল

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-১১-১৮ ৮:২০:০৯ পিএম

তাজুল ইসলাম তাজু ছিল চোরাকারবারী। মানে ছোটখাটো চোরাকারবারী, নিজে মাথায় করে এটা-ওটা মালামাল সীমান্তের ওপার থেকে এনে বিক্রি করতো। তাজুল ইসলাম এলুর পেশা ছিল সোজা বাংলায় যাকে বলে- চৌর্যবৃত্তি।

মকুন্দপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে): তাজুল ইসলাম তাজু ছিল চোরাকারবারী। মানে ছোটখাটো চোরাকারবারী, নিজে মাথায় করে এটা-ওটা মালামাল সীমান্তের ওপার থেকে এনে বিক্রি করতো। তাজুল ইসলাম এলুর পেশা ছিল সোজা বাংলায় যাকে বলে- চৌর্যবৃত্তি। রফিকুল ইসলাম ছিল সাধারণ গেরস্ত পরিবারের সন্তান। এরকম আরো ছিল মোতালেব, মোজাম্মেলসহ মোট ৩২ জন।

এদের বাইরে ছিলেন আরো এক অসাধারণ চরিত্র সায়রা। তিনি ছিলেন স্থানীয় রাজাকার চৌকিদার আজিজের কন্যা। এরা সবাই ঐতিহাসিক মুকুন্দপুর যুদ্ধের বীর সেনানী। নিজেদের সীমিত ক্ষমতাকে সীমাহীন উচ্চতায় উজার করে দিয়েছিলেন তারা বিষাক্ত হানাদার পাকিদের বিষনি:শ্বাস থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করতে।

মুক্তিযুদ্ধকালে ফার্স্ট বাংলাদেশ ওয়ার কোর্সের বিশেষ কমিশন পাওয়া এক তরুণ সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সায়ীদ আহমেদ বীরপ্রতীক) অধীনে সজল শ্যামল বাংলার এই সাধারণ চরিত্রগুলোই হয়ে উঠেছিল অসাধারণ একেকটি চরিত্র। এ মাটিরই সন্তান গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহিদ, সাইদী, কামারুজ্জামান, আব্দুল আলীমসহ অপরাপর কুশীলবরা দেশ-মাতৃকার চরম সর্বনাশে আক্ষরিক আর মনস্তাত্ত্বিক ধর্ষণে লিপ্ত হয় বাংলা মাকে; তখন তাজু, এলু, রফিক, মোতালেব, মোজাম্মেলরা তাদের নিঃস্ব জীবনের সবটুকু পণ করেছিলেন প্রবল পরাক্রম পাকিদের পরাভূত করতে। বর্বর-হার্মাদ হানাদার পাকি বাহিনী আর তাদের পদলেহী দালাল-রাজাকার-আলবদর-আল শামসদের এ কথাটি বুঝিয়ে দিতে: `বাংলার মটি দুর্জয় ঘাঁটি/বুঝে নাও দুর্বৃত্ত!`

ওই সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের অধীনে যুদ্ধ করা তখনকার টগবগে ওই তরুণদের অনেকেই সেই কবে মিশে গিয়েছেন মাটির সঙ্গে। কিন্তু সজল শ্যামল বাংলামায়ের সেই অকুতোভয় দামাল সন্তানদের অসম সাহসী বীরত্ব আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসাধারণ এক বিজয়ের স্বপ্নগাঁথা রচনা করেছিল সেদিন।
 
এ বিজয়স্থলের নাম মুকুন্দপুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মুকুন্দপুর গ্রামে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান তছনছ করে দিয়েছিল সুপরিকল্পিত রণকৌশলে প্রণীত এক সর্বাত্মক আক্রমণ। সফল ওই যুদ্ধের কৌশল অনুসরণ করে পরবর্তী সময়ে মুক্তিবাহিনী তথা যৌথবাহিনী পেয়েছিল একের পর এক ধারাবহিক সাফল্য।

ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সময়োপযোগী অংশগ্রহণ `ব্যাটল অব মুকুন্দপুর` জয়ে বিশেষ অবদান রাখে। তবে আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়- সেদিনের সেই যুদ্ধজয়ের সমর পরিকল্পনা করেছিলেন এ মাটির সন্তান সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সায়ীদ।    

দিনটি ছিল ১৯৭১ এর আজকের দিন- ১৯ নভেম্বর। ৪০ বছর আগের সেই হীরকের ন্যায় জ্বলজ্বলে দিনটিকে স্বরণ করতে আজ মুকুন্দপুরে আসছেন সেদিনের সেই বিজয়ী যোদ্ধাদের মধ্যে বেঁচে থাকাদের অনেকে। আসছেন মুক্তুযুদ্ধে ৩ নং সেক্টর কমান্ডার ও এস ফোর্স কমান্ডার পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) শফিউল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম, মুকুন্দপুর যুদ্ধে অংশ নেয়া ভারতীয় মিত্র বাহিনীর তৎকালীন লে. কর্নেল পরবর্তীতে মেজর জেনারেল (অব.) অশোক কল্যাণ ভার্মা, লেফটেন্যান্ট পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার অভিন চন্দ্র চোপরাসহ অন্যান্যরা।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মে. জে. সায়ীদ বাংলানিউজকে বলেন, `মুক্তযুদ্ধ আর মুকুন্দপুরের ইতিহাসে ১৯ নভেম্বর একটি বিশেষ দিন। এ দিনটি আমার জীবনের বিশেষ করে আমার সৈনিক জীবনেরও একটি উল্লেখযোগ্য দিন। এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের দু`টি কোম্পনিকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং লে. কর্নেল ভার্মার নেতৃত্বে ১৮ রাজপুত ব্যাটালিয়নের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে মুকুন্দপুরকে মুক্ত করতে সক্ষম হই।`

তিনি জানান, এর আগে মৌলভীবাজারের ধর্মনগর, শ্রীমঙ্গলের ধলই, জামালপরের কামালপুরসহ অন্যান্য শত্রু অবস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কিংবা মিত্রবাহিনীর কিংবা যৌথবাহিনীর প্রথাগত আক্রমণগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ওইসব আক্রমণ পরিকল্নায় হয়তো যথাযথ ছক ছিল না। এর বিপরীতে মুকুন্দপুর অপারেশনের ছকটি ছিল ভূমির বিন্যাস, শত্রুসংখ্যা ও অবস্থানের প্রেক্ষাপটে একটি অভিনবপন্থায় উদ্ভাবিত ছক। বলা চলে বাংলাদেশের মাটি থেকে জেগে ওঠা ব্যাটল-প্ল্যান ছিল এটি। মুকুন্দপুর ছাড়া ওপরে উল্লেখিত অপারেশনগুলো করা হয়েছিল কনভেনশনাল ওয়ারফেয়ারের প্রচলিত কৌশলে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিতেই সাফল্য আসেনি। উল্টো প্রতিটি অপারেশনেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হতে হয়েছিল।

জেনারেল সায়ীদ বলেন, `আসলে ওই যুদ্ধের আগে মুকুন্দপুরের জমিনই যেন বলে দিয়েছিল আমাদের যোদ্ধাদের বিস্তার, বিন্যাস আর অবস্থান কোথায় কোথায় হবে। সেই অনুযায়ীই অপারেশন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর সেদিনের সে সফল অপারেশনের ছক পবর্তীতে মুক্তযুদ্ধে অন্যান্য বড় অপারেশনগুলোতে প্রয়োগ করে যৌথবাহিনী অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিল। এরমধ্যে আখাউড়া অপারেশন উল্লখযোগ্য। দীর্ঘ ৪০ বছর পর হলেও জাতির আমাদের আজ সে বীরত্ব গাঁথা উপস্থাপন করতে চাই। সেদিনের সহযোদ্ধা লে. মনসুরুল ইসলাম মজুমদার, সুবেদার মান্নাফসহ মোজাম্মেল হক, তাজুল ইসলাম তাজু, তাজুল ইসলাম এলু, মোতালেব- সবাইকে মনে পড়ছে।`

তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় ১৮ ডিসেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউজের একটি রুমে বসে। সঙ্গে আসা সিনিয়র ফটোগ্রাফার জীবন আমীর তার মত করে মুকুন্দপুর যুদ্ধের বীর সেনানী জেনারেল সায়ীদের বেশ কয়কটি ছবি তুলে নিয়ে চুপচাপ মনোযোগী শ্রোতা হয়ে বসেছিলেন আমাদের কথোপকথনে।

হঠাৎ জীবন পাশেই অলস পড়ে থাকা ক্যামেরাটা চট করে হাতে তুলে নিয়ে বেশ তৎপর হয়ে উঠলেন। কয়েকজন সহযোদ্ধার কথা বলত গিয়ে সহসাই জেনারেল সায়ীদের গলা ধরে এসেছে। এবং দেথা গেল সঙ্গে তার চোখ বেয়ে নামছে লোনা জল। সুতরাং একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে জীবন আমীরের এভাবে হঠাৎ তৎপর হয়ে ওঠাটা খুবই স্বাভাবিক।

রীতিমত একজন জেনারেল (হোক না রিটায়ার্ড)কাঁদছেন!

আমিও মনোযোগী হয়ে উঠলাম আরো বেশিমাত্রায়। মনে পড়লো ১৯৯২ সালের আগস্ট মাসের এক রাতের কথা। সেদিনও আমি এক জেনারেলের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম। ১৫ আগস্ট উপলক্ষে সাপ্তাহিক আকর্ষণ পত্রিকার (ছড়াকার সৈয়দ আল ফারুকের মালিকানাধীন উইল্স গ্রুপের এ পত্রিকাটি পরে বন্ধ হয়ে যায়) বিশেষ সংখ্যার জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) শফিউল্লার সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। নির্বাহী সম্পাদক (বর্তমানে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিউজ এডিটর) কবি কামাল মাহমুদের নির্দেশ ছিল ভাল একটা ইন্টারভিউ করতে হবে। আমার সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক আনোয়ার কবির শিপন (ফাঁসির মঞ্চ ১২ জন বইয়র লেখক)। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে আমার এক বেকায়দা প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় শান্তশিষ্ট আর মিষ্টভাষী জেনারেল শফিউল্লাহ হঠাৎ বসা থেকে চরম উত্তজনায় দাঁড়িয়ে পড়েন। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে তিনি আমাকে বলেছিলেন- তুমি, তুমি আস্পর্ধা দেখাচ্ছা!

বিষয়টা এখানে উপস্থাপন করা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক। তবে এতদিন পর ঘটনাটা (এ প্রসঙ্গে পরে লেখার ইচ্ছা আছে) আমার আজ ফের মনে পড়ে গেল প্রায় ২০ বছর পর আরো একজন জেনারেলের (দু`জনই মুক্তিযোদ্ধা) ভাবাবেগের বিস্ফোরণ দেখে।
তবে সায়ীদের প্রতিক্রিয়াটা অন্যরকম। আমি কোনো বেমক্কা প্রশ্ন করিনি তাকে (সে ধরনের উপলক্ষও নেই)। আর আজকের ইন্টারভিউটার বিষয়ে খোদ বাংলানিউজের এডিটর-ইন-চিফ আলমগীর ভাইয়ের নির্দেশ আছে- আহ্সান, ভাল কিছু চাই!

ভাল কিছু এখন আর কই পাই। বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল তা কাঁদছেন! ইন্টারভিউ মনে হচ্ছে এখানেই...            

তারপরও সাংবাদিকসুলভ সহজাত প্রশ্ন করি, `সহযোদ্ধা দুই তাজুল, অর্থাৎ এলু আর তাজুর কথা বলতে গিয়ে আপনার চোখে পানি এসে গেল, কেন?`

জেনারেল সায়ীদ নিরব। তিনি চুপ করে আছেন। রুমাল বের করে চোখের পানি মুছছেন।

স্যার দুই তাজুল কি ওই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন?

`না। মুকুন্দপুরের যুদ্ধে আমাদের কোনো ক্যাজুয়ালি-ই হনি। শত্রুর গুলি শরীরের আশপাশ দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু শেষতক আমাদের কারো গায়ে আঁচরটিও লাগেনি। অপরদিকে শত্রুপক্ষে ১৯জন নিহত হয়। বাকিরা লেজ গুটিয়ে পালায়।

কারণ, আক্রমণের পরিকল্পনাটা করা হয়েছিল অনেক হিসবা-নিকাশ, পরিশ্রম আর দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডর ভেতর দিয়ে।যুদ্ধক্ষেত্র তখন আমার চাকরির মেয়াদ জুম্মায় জুম্মায় সাতদিন। কিন্তু লড়াইয়ের জন্য সদা উদগ্রীব আর অস্থির মন নিয়ে অপেক্ষায় থাকি। হানাদার পাকিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য হাত নিশপিশ করে। যুদ্ধ চলাকালে সাড়ে ৩ মাস মেয়াদী ফার্স্ট বাংলাদেশ ওয়ার কোর্স শেষ করে পাসিং আউট করেই রণক্ষেত্র পোস্টিং। আমি তখন মুমুন্দপুরেরর কলকলিয়া সাব সেক্টরে প্রতিরক্ষা অবস্থান এবং বামটিয়া সাব সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের দায়িত্বে।`

সায়ীদ ৬২ জন ক্যাডেটের ওই কোর্সে সেরা চৌকস ক্যাডেট হয়েছিলেন।

`ওই সময়ে এ অঞ্চলে পাকিস্তানি ৫টি শক্তিশালী ক্যাম্প ছিল। এগুলো হলো- হরেশপুর, লতিফপুর, চান্দপুর, মুকুন্দপুর ও রূপা। আমার ওপর নির্দেশ আসে শত্রুর এই শক্তিশালী অবস্থানগুলোর ওপর অপারেশন চালানোর। হরেশপুর আর রূপা ছিল সর্ব উত্তর আর সর্ব দিক্ষণে। আর বাকি ৩টির মধ্যে মুকুন্দপুর ছিল অপক্ষাকৃত কঠিন টার্গেট। তবুও আমি মুকুন্দপুরকেই বেছে নেই। কারণ ছিল আমার অধীন দু`টি প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মুকুন্দপুরেরর ৩২ জন ছিলেন। তাই আমি চাইলাম এক্কেবারে নিজ গ্রামের ওই ৩২ জন তাদের এলাকায় সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দে আক্রমণ চালাতে পারবে। আর হানাদার পাকিরা যে বাড়ি ও জমিটিতে অবস্থান করছিল সেটি ছিল- রফিকুল ইসলামদের (পরবর্তী সোনালী ব্যাংকের অফিসার হিসেবে অবসর নেন)। ওই ৩২ জনের একজন রফিকের চোখ দিয়ে অদৃশ্য আগুনের হলকা বের হতে দেখতাম নিজের পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি উদ্ধারেরর সংকল্পে। আর ছিল তাজুল ইসলাম তাজু, তাজুল ইসলাম এলু, মোজাম্মেল হক, মোতালেবসহ অন্যরা। এরা যে কী ভয়াবহ সাহসী আর বেপরোয়া যোদ্ধা ছিল তা ঘটনা চাক্ষুষ না দেখাদের বোঝানো মুস্কিল। যে কোনো কঠিন কাজে তারা না বলতে জানতো না।

যেহেতু শত্রুর প্রতিরক্ষা অবস্থান কঠিন, আর তারা সংখ্যায় বেশি এবং অত্যাধুনিক অস্তশস্ত্রে সজ্জিত, তাই আমরা ওই অভিযানের রাতের পর রাত টার্গেটের আশাপাশে রেকি করেছি। আর দিনের বেলার তথ্য সংগ্রহ আর পর্যবেক্ষণ তো ছিলই।

তাজুল ইসলাম তাজুর সঙ্গে রেকি করতে গিয়ে এক রাতে শত্রু ক্যাম্পের এত কাছে চলে গিয়েছলাম যে তাদের সেন্ট্রির টর্চের আলো ঠিক আমাদের বুকের ওপর পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ আসে `হল্ট, হ্যান্ডস আপ!` বিদু্ৎ গতিতে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্রল করে সে যাত্রা আমরা নিশ্চত মৃতু্যর হাত থেকে রক্ষা পাই। এসময় শত্রুর উদ্দেশ্যে কঠিণ শপথে মোড়ানো তাজুর রাগত স্বরে বলা বাক্যটি এখনো আমার কানে বাজে: `শালা আইতাছি, দু`দিন বাদে টেরটা পাইবি!`

এছাড়া স্থানীয় চৌকিদার রাজাকার আজিজের কন্যা সায়রা তার বাবার কাছ থেকে শত্রুর গতিবিধি, সংখ্যা, অধিনায়কদের নাম-পরিচিতি, অস্ত্র, গোলা-বারুদ আর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দিত আমাদেরকে। মুকুন্দপুর অপারেশনের ৫দিন আগের এক রাতে সায়রা তার সৎ মাকে নিয়ে আমাদের ক্যাম্পে হাজির। ওই গুরুত্বপূর্ণ সময়টায় তার দেওয়অ তথ্যগুলি আমার চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দারুণ কাজে দিয়েছে।অপারেশন শেষে প্রমাণ হয় তার দেয়া তথ্যগুলেরা নির্ভুল ছিল। এখানে আমি ক্ষোভের সঙ্গে বলতে চাই- আজ পর্যন্ত আমাদের এই অসম্ভব দেশপ্রেমিক সাহসী বোনটির কোনো মূল্যায়ন হয়নি।বীর নারী সায়রার নামিটো মুক্তেযাদ্ধা তালিকায় নেই। অথচ অনেক রাজাকারই আজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেটধারী। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সাংসদ বীর মুক্তেযাদ্ধা র আ ম উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ও বিজয়নগর কমান্ড কাউন্সিলের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।`

তাজু আর এলু যাদের কথা মনে করে আপনার চোখ জলে ভিজে এসেছিল- তাদের কথা...

১৯৭৯ সালে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় একটি এক্সারসাইজে গিয়ে তাজুর খোঁজ করি।তাজুকে পাওয়া যায়। ভগ্ন স্বাস্থ তাজু সামনে এসে দাঁড়ায় উদাস দৃষ্টি নিয়ে।

আমি জিজ্ঞেস করি- এখন কি কর?

নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে- পুরান কামই করি!

অর্থাৎ চোরাকারবারি।

সামরিক মহড়ায় ছিলাম। সেঙ্গ টাকা-পয়সা ছিলনা। আমি পকেটে থাকা ৫০ টাকার নোটটি তাকে দিলাম কিন্ত সে কিছুতেই নিল না।

তার সেই নিরব পাথুরে চোখ যেন আমাকে বলছিল- তুমি তো অহন বড় অফিসার  হইয়া গেছ। আর আমরা তো কিছুই...

তাজু আমাকে কিছু বলেনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস- ঠিক এই কথায় সে বলতে চেয়েছিল।`

জেনারেল সায়ীদের অসাধারণ এ বয়ান শুনে আমার মনে হলো দেশের সব তাজুরাই বুকে এমন অসংখ্য অর্থহীন কথা লুকিয়ে রেখেছে। তবে তারা আত্মসম্মানবোধ বজায় রেখে মুখ খুলছে না। কারণ তারা যুদ্ধ করেছিলেন স্রেফ দেশের জন্য। এ পর্যায়ে আমি জে. সায়ীদেক প্রশ্ন করি- তাজুর জন্য আপনি কিছু...

পরে আমি তাকে একটি রিক্সা কিনে দিয়েছিলাম। এছাড়া মাঝেমধ্যে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী যৎসামান্য সাহায্য করতে পেরেছি। কিন্তু সেগুলেরা আসলে... তাদেরকে আসলে মূল্যায়ন করা হয়নি।

আমি সাভারে জিওসি থাকাকালে তাজুল আসলাম এলুর দেখা পাই। যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে যেন-তেন অবস্থা। তােক ঢাকা সিএমইচে রেখে পূর্ণ চিকিৎসা করাই।

তার ছেলেকে এমইএস-এ চাকরির ব্যবস্থা করেছিলাম।

কিন্তু আসলে এভাবে হয় না। অন্য কিছু করা দরকার ছিল আমাদের সেসব দুঃসাহসী সহযোদ্ধাদের জন্য। আমরা আসলে...

এবার দ্বিতীয়বারের মত চোখ ভিজে এল মুকুন্দপুর বিজয়ী এ বীর সেনাপতির। আমার সাধারণ চোখ আর মন যদি ভুল বুঝয়ে না থাকে- তাহলে আমি নিশ্চিত- এ অশ্রুজল একেবারে নিখাদ। অক্ষকোটরের পেছনের কোনো গ্ল্যান্ড থেকে আসছে- শরীরতত্ত্ববিদ আর জ্ঞানীরা যাই বলুন না কেন-আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি জানি ওই পবিত্র অশ্রুজলের উৎস মানুষের অলিন্দ-নিলয় ভেদ করা হৃদয় প্রকোষ্ঠের গভীরতম স্থল থেকে উৎসারিত।

জানা-অজানা লাখ লাখ সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তে এমনই অদৃশ্য ক্ষমতা বিদ্যমান- তারা আমাদেরকে তাদের প্রতি করা ক্ষমাহীন অপরাধের অনুশোচনায় একদিন কাঁদাবেই।

তবে জেনারেল সায়ীদ সাধারণের আবরণে ঢাকা অসাধারণ সহযোদ্ধাদের কথা স্মরণ করে আজ চোখের পানি ফেলছেন(এবং তার ক্ষমতা অনুযায়ী তিনি সহযোদ্ধাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন)- কিন্তু যাদের অনেক কিছু করার দায় এবং ক্ষমতা দু`টোই রয়েছে- সেইসব ক্ষমতাবান, মর্য্যাদাবান, সুবিধাপ্রাপ্ত আর খেতাপ্রাপ্তদের চোখে কিন্তু আবেগের সেই অশ্রু নেই।

এরকম মানুষদের দেশে রাজাকার উল্লাস করবে না তো কী করবে?

আসুন, মুকুন্দপুর মুক্তির এই দিনে আমরা খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসি। স্বার্থর কানাগলিতে পথ হারানো আমাদের প্রস্তরিভূত পশুহৃদয়টিকে আবার ভালোবাসা আর দায়িত্বে পূর্ণ মানুষের সতেজ-সজীব হৃদয়ে পরিণত করি।

১৬ ডিসম্বর যেদিন পুরো দেশ স্বাধীন হয়েছিল- এবারের সেই দিনটি আমরা এই চেষ্টাটি বোধ হয় করতে পারি- কী বলেন!

বাংলাদেশ সময়: ০৯০০ ঘণ্টা, ১৯ নভেম্বর, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14