ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ মাঘ ১৪২৭, ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জাতীয়

গাজীপুর-ঢাকা-গাজীপুর

বিড়ম্বনার এক নাম তুরাগ এক্সপ্রেস

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১১০৭ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৩
বিড়ম্বনার এক নাম তুরাগ এক্সপ্রেস

mir-sanjidaঢাকা: চাকরির সুবাদে প্রতিদিনই গাজীপুর টু ঢাকা, ঢাকা টু গাজীপুর করতে হয়। প্রতিদিন অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ হয় নতুন নতুন বিষয়।

জানা হয় দেশ সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে মানুষের নানা ভাবনা। প্রাত্যহিকতায় জানি তাদের সমস্যার কথা, কখনো কখনো ব্যক্তিগত কথকতা।

ট্রেন আর বাসই যাওয়া-আসার প্রধান বাহন। সুবিধা বুঝে কোনো দিন বাসে বা ট্রেনে। তবে বাস অথবা ট্রেন যেভাবেই আসি না কেন, বসার জন্য মোটামুটি দরজার কাছাকাছি সিটটাই বেছে নেই নামার সুবিধার্থে।

ট্রেনে যারা গাজীপুর থেকে রোজ ঢাকায় আসেন কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে, তারা জানেন ট্রেনের বিড়ম্বনাটা কতটা। অফিস যাত্রীদের জন্য জয়দেবপুর টু কমলাপুর (যা আগে ছিল জয়দেবপুর টু নারায়ণগঞ্জ) তুরাগ ট্রেনে উঠলে সে ট্রেনে যে বিড়ম্বনা কতখানি পৌঁছে তা তুরাগের যাত্রী মাত্রই জানেন।

তুরাগে (লোকাল) খুব একটা ভ্রমণ করা হয় না, উপচে পড়া যাত্রীর চাপ থাকার কারণে। কিন্তু বিপদে পড়লে সেটিতেই ভ্রমণ করতে হয়। সম্প্রতি একদিন ট্রেনে উঠে দেখি সব সিট ফাঁকা পড়ে আছে। একটাতে বসতে গেলে শোনা গেল ‘আপা এখানে বসবেন না, লোক আছে। ’ পাশের আরেকটায় বসতে গেলে আবারো একই কথা।

এভাবে পুরো বগিতে ঘুরে দেখা গেল একই চিত্র। অবশেষে পাশের বগিতে গেলে সেখানেও একই অবস্থা। তবে সেখানে কোনো মতে দরজার পাশে একটা সিট পেলাম। সময় কাটানোর জন্য বই বের করে পড়তে শুরু করলাম। একটু পরেই দেখি হট্টোগোল। কান খাড়া করতেই বুঝলাম, সিট নিয়ে গোল বেঁধেছে।
Trin-bg
এক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে গাজীপুর-ঢাকা-গাজীপুর রুটে যাত্রীদের আলোচনার বিষয়-বস্তুতে উঠে আসে প্রাত্যহিক যোগাযোগের সমস্যার কথা।

প্রতিদিন কেউ না কেউ অনেক ভোরে এসে হয়ত এক বগির প্রায় অর্ধেকটাই দখল করে ফেলছেন। ফলস্বরূপ সাড়ে ৭টা ট্রেন ধরতে যারা সাড়ে ৬টায়ও স্টেশনে উপস্থিত হচ্ছেন তারাও সিট পাচ্ছেন না।

ট্রেনে সিট রাখা প্রসঙ্গে এক ব্যক্তি তো বলেই ফেললেন, আমাদের নৈতিকতা বলতে কিছু নেই। অবক্ষয় দিনদিন বাড়ছে। এর পরিবর্তন কবে হবে। পরিবর্তন আর হবে বলেও মনে হয় না।  

সত্যি এটা অবাক করার মতো ঘটনা।

কেন একজন প্রতিদিন অন্যের জন্য সিট রাখেন এ প্রসঙ্গে অনেকেই অভিযোগ করছেন, এমনি এমনি না বরং টাকার বিনিময়ে সিট রাখেন অনেকে।

রোজ সকালে উত্তরবঙ্গ-খুলনা-ময়মনসিংহ-জামালপুর রুটের বেশ কয়েকটা ট্রেন গাজীপুর হয়ে কমলাপুর স্টেশনে আসে। একইভাবে ঢাকা থেকেও ছেড়ে যায় বেশ কিছু ট্রেন।   train      

ট্রেনে অথবা বাসে প্রতিদিনই প্রায় হাজার চার-পাঁচেক লোক গাজীপুর থেকে ঢাকা আসেন অফিস করতে। জ্যাম আর সময় বাঁচাতে অনেকেই বেছে নেন ট্রেনকে। এতে টাকাও যে সাশ্রয় হয় না, তা বলা যাবে না।  

এতো গেল একেবারেই ঘরের সমস্যা। এরপর আছে রাষ্ট্রীয় সমস্যাও। বাস বা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ আইনত দণ্ডনীয় হলেও হরহামেশাই ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করতে দেখা যায় ‍অনেককে। তা শুধুই কি জায়গার অভাব না অন্য কিছু!

একদিন ট্রেনে উঠতেই কিছুক্ষণ পর টিটি আসল টিকিট চেক করতে। একজন টিকিট বের করে দিতেই টিটি বলল, এই টিকিটে ‘ফাস্টক্লাসে’ উঠছেন (কমলাপর-জয়দেবপুর পর্যন্ত ট্রেনের ভাড়া ৩৫ টাকা)। লোকটিও দমবার পাত্র নয়। তিনি বলেন, ‘আমি না হয় এই টিকিট কেটে ‘ফাস্টক্লাসে’ উঠছি। আর আপনি যে টাকা নিয়ে অন্যদের এ কামরায় উঠাইছেন’। টিটি থতমত খেয়ে বললেন, ‘এরকম নিয়ম আছে ট্রেনে কেউ টিকিট চাইলে অনুরোধ সাপেক্ষে তাকে টিকিট দেওয়া যায়’। কিন্তু বাস্তবিক টিটি টাকা নিয়েছেন কিন্তু টিকিট দেননি।

টিটি চলে গেলেই কামরায় থাকা এক ব্যক্তি বলে উঠলেন, রেলখাতে নাকি প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। এটা নাকি লস প্রজেক্ট! প্রতিদিন এমন করে করে লোক উঠালে তো লস প্রজেক্টে পড়তেই হবে।

টিকিট না কেটে ট্রেনে ভ্রমণ করেন অনেকেই। ফলে সরকার হারায় রাজস্ব। পকেট ভারী হয় রেল কর্মচারী-কর্মকর্তাদের। প্রতিদিনই দেখা যায় ট্রেনের ভেতর বা গেটে ধরার পর টিটি বা স্টেশনে দায়িত্বে থাকা লোকদের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। যেখানে ভাড়া ১৫০ টাকা সেখানে টিটির হাতে ৫০-৬০ টাকা গুঁজে দিলেই সিট সমেত ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া যায়। তাহলে কেন একজন লোক ডাবলেরও বেশি টাকায় টিকিট কেটে ভ্রমণ করতে যাবেন, প্রশ্ন তোলেন এক যাত্রী।

ঢাকা বা এয়াপোর্ট থেকে গাজীপুরের কথাই ধরা যাক না কেন, যারা আন্তঃনগর ট্রেনে ঢাকা থেকে এয়ারপোর্ট বা এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর ট্রেনের টিকিট ৩৫ টাকার। কিন্তু টিকিট না কেটে ভ্রমণ করলে টিটির হাতে মাত্র ১০ টাকা গুঁজে দিলেই আর কোনো ঝামেলা থাকে না। তাহলে কেন লোকে বেশি পয়সা দিয়ে টিকিট কিনবে! বললেন অন্য এক যাত্রী।
 
অপর এক যাত্রীর কাছ থেকে জানা গেল নতুন এক তথ্য। যদিও আমার সে ট্রেনে ভ্রমণের সুযোগ হয়নি। বেসরকারি ট্রেনে দেখা যায় এর ভিন্ন চিত্র। যেখানে একটাও টিকিট মিস যায় ‍না। অনেকেই অবাক হবেন এটা কি করে সম্ভব! বেসরকারি মালিকানাধীন ট্রেন ঢাকা-গফরগাঁও-ঢাকা।

প্রতিটি বগিতে থাকে দুই থেকে তিন জন করে টিকিট বিক্রেতা। কেউ যদি টিকিট না কেটেও  ট্রেনে ওঠেন তাতেও কোনো সমস্যা নাই। কেননা ট্রেনের ভেতরই আছে টিকিট কাটার ব্যবস্থা। আর ভাড়াও সরকারি ট্রেনের চেয়ে কম। একই ব্যবস্থা যদি সরকারি ট্রেনের ক্ষেত্রে করা যায় তাহলে বোধহয় ট্রেনের ক্ষেত্রে যে লস প্রজেক্টের ধোঁয়া তোলা হয় তার কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। প্রতিটি বগিতে টিকিট কাটার ব্যবস্থা করলে আর টিটি বা ট্রেনে দায়িত্বরত অন্যদের পকেট ভারী হয় না।
Bus
আরও একদিনের ঘটনা। সেদিন অফিস ছিল সন্ধ্যে পর্যন্ত। ট্রেন নেই, যেতে হবে বাসে। বসুন্ধরা থেকে বাসে উত্তরা, সেখান থেকে অন্য বাসে গাজীপুর। রাস্তার জ্যাম ঠেলে উত্তরা থেকে টঙ্গী পার হতেই লেগে গেল এক ঘণ্টা। আর সেদিন ঝুলিতে যোগ হলো আরও কিছু কথা। জ্যামে অতিষ্ট হয়ে নিজেরাই এর নানা সমাধানের কথা বলছিলেন দুই যাত্রী।

তারা বললেন, ভারতের মতো যদি বাংলাদেশে মেট্রো রেলের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে জ্যাম সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর স্টেশন থাকবে। বাসের মতো যেখানে সেখানে থামবে না বলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।

এরপর ডেমো ট্রেন নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন তারা। যে সময়টায় ডেমো ট্রেন ঢাকা থেকে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় বা গাজীপুর থেকে সকাল সাড়ে ১০টা বা ১১টায় ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে তাতে খুব বেশি লোক উপকৃত হয় না বলেই বেশিরভাগ মনে করেন।

তারা মনে করেন, যদি সকালের ট্রেনের পরপরই এ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে তুরাগ ট্রেনের ওপর যেমন চাপ কমত তেমনি যাত্রীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারত।

ডেমো ট্রেন প্রসঙ্গে অন্য এক যাত্রী বলেন, আসলে ডেমো ট্রেন আমাদের দেশের জন্য উপযোগী নয়। এ ট্রেন খুব বেশি দিন কাজ করবে বলে মনে হয় না। এছাড়া এ ট্রেনের যাত্রী ধারণ ক্ষমতাও বেশি নয়। এ ট্রেন কেনার টাকা দিয়ে ইঞ্জিন কেনা যেত। এখনো অনেক বগি কমলাপুরে পড়ে আছে। নতুন ইঞ্জিন কিনে ওই সমস্ত বগি সামান্য মেরামত করে চালানো যেতো। আর অনেক বগি সংযোজন করায় যাত্রী পরিবহনেও সুবিধা হতো অনেকটা। আর পুরাতন ইঞ্জিন পরিবর্তন করে নতুন ইঞ্জিন লাগালে ট্রেনের গতিও বাড়তো। ফলে ট্রেন সিডিউল বিপর্যয় কমতো অনেকখানি।
train
সেসময় আরেক যাত্রী টিপ্পনি কেটে বলেন, ইঞ্জিন আনলে তো আর পয়সা খাওয়া যেতো না!

পরদিন অনেক সকালে অফিস যেতে হবে বলে ট্রেনের অপেক্ষায় না থেকে ব‍াসেই রওনা হলাম। কিন্তু কপাল মন্দ! ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করলে নিশ্চয়তার অভাব আর বাসে আসলে জ্যামের ভোগান্তি।

সকাল সকালই প্রচণ্ড গরমে অস্থির সবাই। তার ওপর চালকদের খামখেয়ালিতো আছেই। গরম এবং জ্যামে অতিষ্ট হয়ে এক যাত্রী বলেন, ঢাকা শহরের যানজট নিরসনের জন্য ফ্লাইওভার, ওভারপাস অনেক কিছুই করছে সরকার। কিন্তু ঢাকার আশপাশের শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তেমন একটা নজর দিচ্ছে না। ট্রেনের সিডিউল যদি ঠিক থাকে তাহলে ঢাকার সঙ্গে আশপাশের শহরগুলোর যোগাযোগ যেমন দ্রুত হবে তেমনি ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপও কমবে। ঢাকার যে অবস্থা তাতে ভূমিকম্প হয়ে ধসে পড়লে তা উদ্ধারেরও উপায় থাকবে না।

শুধু প্রাত্যহিক সমস্যর কথাই নয়। বাদ যায় না রাজনৈতিক আলোচনা-সমালোচনাও। সেদিন রাতেই ফেরার পথে দুই যাত্রীকে দেখা গেল বর্তমান সরকারের আলোচনা সমালোচনা করতে। একজন বললেন, এ সরকার ভালো অনেক কিছু করেছে। কিন্তু তার সবই ঢাকা পড়েছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক, গ্রামীণ ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু কর্মকাণ্ডে। শেষ পর্যন্ত বিলবোর্ড নিয়ে যা করেছে তা দেখে নিজেরই লজ্জা লাগে।  

এভাবেই নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে শেষ হয় আমার প্রতিদিনের বৈচিত্র্যময় জার্নি বাই বাস অ্যান্ড ট্রেন।

বাংলাদেশ সময়: ১১০৩ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৩
এসএটি/এএ/আরআইএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

জাতীয় এর সর্বশেষ

Alexa