ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২২ জিলহজ ১৪৪১

গল্প

অব্যক্ত চোখের ভাষা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬১১ ঘণ্টা, মে ২৪, ২০২০
অব্যক্ত চোখের ভাষা .

রমেন্দ্র কুমার দাস ওরফে রমা তার নাম। বয়স একুশের চেয়ে কম। এলোমেলো লম্বা চুল। গায়ের রং ফর্সা হলেও এই ক’দিনে তামাটে বর্ণ ধরেছে। শরণার্থী ক্যাম্পের কয়েক দিনের অভিজ্ঞতায় বৃদ্ধা মাকে ওখানে রেখে আসা ছাড়া উপায় ছিল না। এটা অবশ্য পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা। সংসার বলতে রমা, নববিবাহিত স্ত্রী কবরী আর তার মা। বাবাকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে। কবরীকে ধরে নিয়ে গেছে পাকবাহিনী। গায়ে দিয়েছে আগুন। নারী-পুরুষ-বউ-ঝি-শিশু-কিশোর সবাই পালিয়েছে।

এসব ঘটনার পর সুনামগঞ্জের ভাঙ্গাডহর থেকে পূর্বপুরুষের ভিটা ছেড়ে ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে এসে থামতে হয়েছে। পুরো ছয়দিন রাস্তায় কেটেছে, নৌকা, পায়ে হাঁটা পথ, মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ।

মায়ের ঠিকানা এখন মৈলাম ক্যাম্প। তাকে তো  ট্রেনিংয়ে যেতেই হচ্ছে। কিন্তু বউ, বউকে ভুলে যাবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করার পরও বারবার মুখখানি উঁকি মারছে চোখে। মায়াময় সেই দুটো ছলছল চোখ। মেয়েদের পোড়া প্রাণে স্বামী শাসক হলেও তার এখন যেন উল্টোটা হচ্ছে। রমার জীবন ও যৌবনরাজ্যে কবরীর স্থান অতি উচ্চে।     

শীতকাল চলছে। ঘুম থেকে জেগে ওঠে রমা। শব্দহীন চুপচাপ ঘর থেকে বেরোয়। মা জেগে গেলে যাত্রা হবে না, বাধা আসবে। মাকে ফাঁকি দিতে ভোররাতেই রওয়ানা। ঘড়ির কাটা সাড়ে চারটে। এখনই সঠিক সময়— হিসেব করে রমা। মায়ের জন্য ভীষণ কষ্ট হতে থাকে। অনেক রাত অব্দি ঘুম আসেনি। ব্যথা আর কষ্ট বুকে চেপে রাখতে হয়েছে।

ঝুপড়ি শিবিরে কনকনে রাত পেরিয়ে যখন ভোরের আলো ফোটে, তখনই রওনা দেওয়ার কথা তার। শীতবস্ত্রের বদলে আগুনই এখানে শীত নিবারণের একমাত্র ভরসা। দু’চারজনের থাকলেও, অধিকাংশ শরণার্থীর ঘরেই নেই শীত ঠেকানোর ব্যবস্থা। তাই দিনের বেলায় কুড়ানো লাকড়ির পরিত্যক্ত অংশ জ্বালিয়ে কোনো রকমে শীত থেকে বাঁচার উপায় খোঁজার চেষ্টা অসহায় মানুষগুলোর।  

রমাকে ভাবায়। কবরীর জন্য মন উচাটন করে, কখনো দু’চোখ পানি ভরে উঠে। বিয়ের কয়েকদিন পরই যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠেছিল। অধিক উজ্জ্বল হয়েছিল গাত্রবর্ণ। টানাটানা চোখ দুটো যেন আরো পরিষ্কার, আরো আকর্ষণীয়। পরনে দামি শাদা-নীল ফুলে আঁকা লালপেড়ে শাড়ি পরার পর চোখ সরাতে ইচ্ছে করতো না রমার। সম্ভবত সৌন্দর্য এমন একটি জিনিস যা হাতে ধরা যায় না। কনে দেখার মুহূর্তটি কোনোভাবেই চোখ থেকে সরতে চায়না এখনও।  

কবরীদের বাড়ি ছিল অতি সুন্দর। চারদিকে কী সবুজ, আম, জাম-কাঁঠাল তো আছেই এর বাইরে নাম জানা না জানা অসংখ্য গাছ-গাছালি। কী স্নিগ্ধ। চোখ জুড়িয়ে যায় এ গ্রামের দৃশ্য।  

বাড়িতে  পৌঁছবার মুহূর্তে  রমা দেখলো—  ছোট সরু রাস্তা। মাঝে মাঝে কচুরিপানা ভর্তি খাল। ছোট ছোট পানাপুকুর, সরু সরু গ্রাম্য রাস্তা।  
এরপর পাত্রী দেখার বড় রকমের আয়োজন বাড়িময়। টিনের ছাউনি, কাঠের বাড়িঘর, ফুললতা-পাতা আঁকা দরজা। বৈঠক ঘরের জানালায় নারীদের উৎসাহী, উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত মুখ। পাত্রী দেখা ও আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়েছে এখানেই।  

সারবাঁধা চেয়ার, জলচৌকি আর বেঞ্চ পাতা ঘরে।  

চেয়ার টেনে বসতে বসতে প্রতিবেশি ষাটোর্ধ্ব বয়সী ছালাম মাতবর বললেন, ‘দিনের অবস্থা ভাল নয়। আকাশে মেঘে জমেছে। যা করবার তাড়াতাড়ি। ’ 

রমার  চেনাজানা বন্ধুবান্ধব এসেছে। বিবাহের প্রথম পর্ব এটি। জীবনের এই অধ্যায়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ছেলের পাত্রী দেখতে এসেছেন রমার বাবা। তিনিও সায় দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ,আকাশে কয়দিন থেকে যেন মেঘ বাসা বেঁধেছে। ’

পাত্রী পক্ষের অভিভাবকমণ্ডলীর একজন বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘আপনারা যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে। সবকিছু  তৈরি। ’

ঝাঁকবাঁধা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ঠেলে ফাঁকা করা হলো ঘরে ঢোকার জায়গা। এরপর লালশাড়ি পরিয়ে বউবউ ধরনের সাজগোজ করে পাত্রীকে সামনে আনা হলো।

‘নাম। ’

‘কবরী। ’

পাত্রীর গড়ন দেখেই তৃপ্তির হাসি খেলল প্রধানসঙ্গী ছালাম মুরুব্বির মুখে।  

‘দাঁড়াতে হবে, আমাদের দাঁড়িয়ে দেখাতে হবে। ’

কবরী দাঁড়াল।

ছালাম মুরুব্বির মন্তব্য, ‘দারুণ ফিগার। ’

কবরী বসল।  

‘উঁহু, মুখচোখের গড়ন দেখতে হবে। কপাল-মুখ এতো ঢাকাঢাকি কেন?’

অভিভাবকণ্ডলীর দিকে তাকাল কবরী। আড়াল থেকে কেউ হাঁ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। কবরী কপাল-মুখ খুলে দেখাল।  

‘খুব সুন্দর। অবশ্য মেয়ের বয়স কম। ’ 
অভিভাবকমণ্ডলীর মধ্যে থেকে প্যান্ট পরা এক  প্রৌঢ়  উচ্চারণ করলেন, ‘সতেরো। কলেজে ভর্তি হইছিল। ’

ছালাম মাতব্বর বললেন, ‘হাঁটাচলা দেখি। ’ 

কবরী ঘরেই দুটি চক্কর দিয়ে হাঁটল।

সড়কের কিনারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে অতীতে ডুবে গিয়েছিল রমা। এমন গভীর ভাবনা থেকে হঠাৎ কারো ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেল সে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে রমা দেখল একটি লোক সামনে দাঁড়িয়ে। ভোরের আবছা আলোয় অনুমান করা যায়— বয়স্ক লোক, বৃদ্ধ। গায়ে শীত নিবারণের জন্য মাথাসমেত হাঁটুঅব্দি লম্বাকোট।  

অচেনা লোকটি কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি রমা?’

হ্যাঁ শব্দটি মুখে উচ্চারণ না করেও আস্তে মাথা নেড়ে বোঝাল, সঠিক।

‘মুক্তিযোদ্ধা সুধা দিয়েছে। ’

রমা ভাল করে তাকাল চেহারার দিকে। রং ফর্সা, গোলমুখ। সত্তরোর্ধ্ব লোকটি একটি কাপড়ের পুটলি দিয়ে বলল, ‘এগুলো তোমার। ’ 

বস্ত্র বলতে পরনের একখানি লুঙ্গি আর গায়ের হাফ হাতাওয়ালা শার্ট রমার । প্রচণ্ড শীত, শরীর কাঁপছে; তবু ট্রেনিংয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়ায় লম্বা সড়কের কিনারে।  

গায়ের চাদর আর গরম কাপড় পেয়ে প্রাণ ফিরে পেলো শীতবস্ত্রহীন রমা। খুশি হলো। প্রশ্ন-উত্তর করল না রমা। কথা বলতেই কি ভুলে গেছে? নিজেকেই জিজ্ঞাসা—  লোকটি কে? কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকল লোকটির দিকে। নীরবে চলে যাচ্ছে কোটপরা কুঁজো লোকটি।  

বিরাটাকৃতির পাথরটি পাশেই আছে দাঁড়ানো। জায়গাটির নাম মনে পড়ছে না, শনাক্ত করার একমাত্র উপায় পাথর আর কিছু কিছু পাহাড়ি গাছ। এখানেই আসার কথা সুধার। কিছু একটা ভেবে স্বগতোক্তির মতো রমা উচ্চারণ করল, এখানেই।

সঙ্গী সুধার জন্য অপেক্ষা।  

সড়কের অপাশের খালি জায়গায় নতুন করে গড়ে ওঠা সারি সারি শরণার্থী শিবিরের দিকে তাকাচ্ছিল রমা। মাটি দেখে বোঝা যায় এক সপ্তাহ আগে উঠেছে বাড়িঘর। খুব কাছ থেকেই এসব রমার দেখা। মানুষের কী কষ্ট। কয়েক দিন ধরে ঠাণ্ডায় খুব কষ্ট হচ্ছে। কয়েকটি ঘরে ছাউনি থাকলেও নিচে বালিমাটিতে বসবাস করছে অনেকে। নারী-শিশুরা সবচেয়ে বেশি জমে গেছে।  
রমা অপেক্ষা করছে সুধার। ভোরের আলো ফুটে এখন দিন শুরু হতে যাচ্ছে। দেখা গেল, তরুণ এক যুবতীর কোলে দু’বছরের শিশু। অপরটি পাঁচ বছর বয়সের কন্যাশিশু, প্রস্রাব করছে রাস্তার অপাশে, পিঠছেঁড়া জামা। কোলের শিশুটি সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত। নিশ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছে, চোখ-মুখ দেখেই অনুমান করা যায়। সড়কের পাশে বসে অপক্ষা সুধারামের। কয়েক মিনিট পর রমা আবারো হাতঘড়ি দেখে, সাড়ে ছটা। সময় যেন দ্রুত যাচ্ছে।  

সঙ্গী সুধারাম এলো আচমকা। যাতে শীত স্পর্শ না করতে পারে পোশাক  সেভাবেই পরা। ত্রিশ বছরের তরুণ। মাথা-গলায়  হলুদ-লাল রঙের মাফলার দিয়ে পেঁচানো। মুক্তিযুদ্ধে নাম ঠিকানা লেখানোর সকল রাস্তাঘাট মুখস্থ। এসেই তাড়া দিয়ে বলল, ‘চল, বেলা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের তো সাতটায় পৌঁছাতে হবে।  মৈলাম ক্যাম্পেই বাইজা গেল সাড়ে পাঁচটা। ’ 

রমা বলল, ‘আমি যথাসময় এসেছি। কখন থেকে অপেক্ষায় আছি। ’ 

‘দেরি হয়ে গেল, মায়ের জন্যি। তাকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারি না। আমি ফিরে আসব বিশ্বাস নেই তার। বুঝলে রমা, মা তো? নরম মন। নারী জাতি বলে কথা?’

‘হু’। উত্তর দেয় রমা। হাঁটা শুরুর একটু পর রমা জানতে চাইল, ‘আমরা কই যাব পয়লা’।  

‘হাঁটো জোরে জোরে, এখন কোনো কথা না। ’

রমা উত্তর করে না। হাঁটতেই থাকে। রাস্তা শেষ হয় না। নববিবাহিত স্ত্রীর মুখটি আবার ভেসে ওঠে। দুই সপ্তাহ কেটেছিল কবরীর সুখ-সংসার। এর মধ্যেই কত কী। পিঠে হাত রেখে শ্বশুর বলেছিলেন, ‘বাবা, হগ্গল বাপের কাছেই তার কন্যা ভালো, উত্তম। আমি বেশি কিছু বলব না, খালি বলব, তুমি ঠকবা না। যদি কখনো-সখনো ভুল করেই ফেলে ক্ষমার চোখে দেখবা। মাইয়া আমার মিশুক, সহজ-সরল, হাসি-খুশির। ’

রমা মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল, ‘কষ্ট দেব না। ’
শ্বশুর বললেন, ‘যুদ্ধ বাজছে বইলা কাজটা তাড়াহুড়ো করে করছি। কওন তো যায় না। ’

রমা এবারো মাথা ঝাঁকিয়েছিল হ্যাঁ ভঙ্গিতে।  

‘আমার আচানক মেয়ের দিকে খারাপ মাইনষের চোখ পড়েছে। ’ 

রমার জবাব ছিল, ‘আপনি ভাববেন না, ওরে সুখে রাখব। কমতি হবে না। ’

‘বাবা-রে ভাবতে চাই না কিন্তু মনটা ভাবে, কান্দে। এই আর কি। তুমি আমার ভরসা। ’

রমা এদিনই ভালো করে তাকিয়ে দেখেছিল শ্বশুরকে। বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন। চোখে পুরু চশমা। ভরা বর্ষাকাল। বিদায়বেলা। নৌকায় দাঁড়িয়ে দুজন। একে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে দুজনেরই অনিশ্চয়তার ছায়া। নৌকা ছাড়ার আগমুহূর্তে অর্থাৎ বিদায়কালে রমা শেষ কথা বলেছিল, ‘এত চিন্তা করবেন না। আমি আছি না?’ 

সুধার কাশির শব্দে রমা সম্বিৎ ফিরে পেল।

‘ঘন কুয়াশা পড়ছেরে রমা। ’ 

সুধার এমন কণ্ঠে হোঁচট খেল রমা। হাঁ-না মন্তব্য না করে রমা জানতে চাইল, ‘আর কত দূর?’ 

‘আইসা পড়ছি, ওই তো দেখা যায়। ’ আশ^স্ত করে সুধা।  

রমা সামনে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না, বুঝলও না। শুধু শরণার্থী শিবিরের লম্বা সারি সারি ঘর চোখের সামনে।  

সড়কে বসে আছে কম বয়সী দুটি নারী। ওরা একে ওপরের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প করে। কীভাবে পালিয়ে এসেছিল এর বিবরণ দেয়। অতিক্রম করার সময় ওদের মুখের ভাষা ও কথা স্পষ্ট শুনতে পায় রমা।  বোঝা যায় দেশের ঘরবাড়ি ছেড়ে জীবন নিয়ে এসেছে।  যেন বিরামহীনভাবে কেঁদে চলেছে তারা। পাশে থাকা চারটি সন্তান। গায়েও গরম কাপড় নেই। ওরা গুটিসুটি মেরে আছে মায়ের পাশে। এ ক্যাম্পেও বেশির ভাগ নারী-শিশু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত, ওদের দেখেই বোঝা যায়।  

রমা জানতে চাইল, ‘এটা কত নম্বর ক্যাম্প?’

হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দেয় সুধা, ‘পাঁচ নম্বর। ’ 

প্রচণ্ড শীত। রমার মনে পড়ে, এক কাপড়ে মাকে নিয়ে গ্রাম ছেড়েছিল সে। গরম কাপড় তো দূরের কথা, কোনো কিছুই মাকে দিয়ে আসতে পারেনি। বাড়ি থেকে প্রাণ নিয়ে আসাটাও ছিল দুরূহ। তিন দিন অনাহারে কেটেছে। ছিল, প্রতিমুহূর্তে যমদূতের আতঙ্ক।

সুধাকে অনুসরণ করতে করতে বিরক্ত হয় রমা। তবু প্রকাশ করে না ক্ষোভ, কষ্ট, দুঃখ। ঈপ্সিত লক্ষে পৌঁছাতে হলে কোনোটিই নয়।  

নতুন রাস্তার অদূরে ত্রিপলের ছাউনিঘেরা ত্রাণকেন্দ্রের পাশে ধানি জমিতে নতুন করে ঘর তৈরি করতে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি পরিবারকে। শুধু ঘরের ছাউনি দিতে পেরেছে তারা। দাঁড়িয়ে-বসে থাকা নারী-শিশুরা শীতে কাঁপছে। বাঁশের বেড়া ও দুটি ত্রিপল মাটিতে পড়ে আছে। বোঝা যায় খাদ্য, বস্ত্র,বাসস্থান সবকিছুই অনিশ্চিত।  

রমা জানতে চায়, ‘সুধাদা ওরাও মনে হয় রাইতে আসছে। তাই না?’

‘হু, খুব কষ্টে আছে বাচ্চারা?’ মুখ ঘুরিয়ে শরাণার্থীদের ওপর চোখ বুলিয়ে নেয় সুধা।  

‘আর কত দূর?’

‘অত অস্থির হইলে চলব?’ সুধারামের জিজ্ঞাসা।

‘শীতে পা হিম হয়ে আছে। ’ 

কয়েক মিনিটের মাথায় সুধা থেমে গেল। শরণার্থী শিবিরের মাঝখানে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানের পাশে বেঞ্চ। বসে পড়ল সুধারাম। পাশের খালি জায়গাটি দেখিয়ে বলল, ‘বসো রমা। চা খাই আমরা, লোকটি এখানে আসবে। ’ 

দোকানটি শরণার্থীদের মধ্য থেকেই  কেউ বানিয়ে দিয়েছে এটি চা-অলার আলাপে বুঝে  নেয় রমা।
চা কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে রমা বলল, ‘মুক্তিযুদ্ধে যাব, মুক্তিযুদ্ধ করব, মিলিটারিদের শক্তি শ্যাষ হবে, আর এইটাও সত্য— আমরা স্বাধীন হব একদিন। ’

‘হ্যা, মনের জোর রাখতে হবে। ’

‘এরপর আমার কবরীরে কি পাব, সুধাদা?’

মাঝারি কণ্ঠে সুধা বলল, ‘রমা, তুমি কবরীরে নিয়া ভাবতেছ এখনো? কত কবরী প্রাণ দিয়েছে, মান দিয়েছে, শরীর দিয়েছে পাকিস্তানি মিলিটারিরে—এর সংখ্যা জানো? জানবা না কোনো দিন?’ সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ওপরের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে সুধা বলল, ‘বিড়াল ইঁদুর ধরে খেলায়, নিজেই খেলে, আমাদের মা-বৈইনরে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ইঁদুর খেলা শুরু করছে,  বুঝলা?’ 

অত্যন্ত আগ্রহ ও ভীতির সঙ্গে কথাগুলো শুনছিল রমা। সুধার চোখের দিকে তাকিয়ে সন্দেহ মাখা প্রশ্ন করল, ‘আমরা পারব, দাদা?’  

‘শহরে ছিলাম, আমি তো ছাত্ররাজনীতি করেছি, মিটিং-মিছিল কম করি নাই। বহু বই পড়েছি, পৃথিবীর স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস জেনেছি। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ভিন্ন?’ ভেঙে ভেঙে কথাগুলো বলে সুধারাম।  

‘আমরা পারব তো?’ রমা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আবারো প্রশ্নের জবাব জানতে চায়।

সুধারাম উত্তর দেয়, ‘আরেক বলব তোমারে। ’ 

রমা চোখ ঘুরিয়ে দেখে বহু শরণার্থী খোলা আকাশের নিচে। চায়ের দোকানি জানাল, ‘অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ত্রিপল সংগ্রহ করেছে। পাশেই দেখা যাচ্ছে, কেউ কেউ ঘরে ছাউনিও দিতে পারেনি। দড়ি নাই, আলপিন নাই। ’
সকাল সাড়ে সাতটা হলেও রোদের দেখা নেই। সাদা কাপড় পরা এক বৃদ্ধা চা-দোকানির কাছে এসে জানতে চাইল, ‘পানি বসাইছ?’

বোঝা যায়, চায়ের অভ্যাস ওই বৃদ্ধার। তিনি চা পান করতে এসেছেন। ঠাণ্ডায় কাঁপছিলেন। সাদা কাপড়ের ওপর তার শরীরে মোড়ানো একটি ছেঁড়া কাঁথা। সুধারাম একটু দূরে গিয়ে আরেকটি সিগারেট  জ্বালাল। মাথা উঁচিয়ে আছে দূরের দিকে। কাউকে যেন সে খুঁজছে।

‘দেখা যায়?’ 

পেছন দিকে না তাকিয়ে সুধা না ইঙ্গিতে হাত নাড়ল।  

রমা আগ্রহ নিয়ে শুনছিল চায়ের দোকানি আর বৃদ্ধার কথা। এবার নিজেই কথা শুরু করে বৃদ্ধার সঙ্গে।  

‘আপনারা কবে আসছেন এইখানে?’

বৃদ্ধা বললেন, ‘বাইশ দিন হইল। কোনো গরমকাপড় নেই, একটা ঝুপড়ি ঘরে পরিবারের এগারো নারী ও শিশু নিয়া গাদাগাদি করে থাকছি। লগে পুরুষ মানুষ নাই একটাও। এইখানে, আসবার পথে তাদের ধরে নিয়ে গেছে পাঞ্জাবি-মিলিটারিরা। রেজাকারেরা ঘর-বাড়ি জ্বালাইয়া দিছে। ওগোরে আমি বাংলাদেশি জানোয়ার বলি। ’

শব্দটি রমার পছন্দ হলো। ‘বাংলাদেশি জানোয়ার?’

‘রেডিও দেই নাই। লুকাইয়া রাখছিলাম। পোলাডা মুক্তিযুদ্ধে গেছে। রাইতে আকাশ বাণী শুনির খবর শুনি। ’

বৃদ্ধার সামনে দোকানি গরম চায়ের পেয়ালা বাড়িয়ে দিল। কাপটি হাতে নিতে নিতে বৃদ্ধা বললেন, ‘অনেক বাচ্চার শইলে কাপড় নাই। আমরা কেউ  কি স্বইচ্ছায় এইখানে পালিয়ে আসছি। আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল সবকিছু হারাইয়া আসছি। ’

কথা শেষে বৃদ্ধা কাপড়ের আঁচল চোখে ধরে কান্না মোছেন, তাকিয়ে থাকেন আনমনা, আকাশের দিকে। এরপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়েন।  

রমা জানে এর জবাব নেই। শুধু বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো আশ্বাস দিতে পারে না সে। কী করা যায় এখন? কীই-বা ক্ষমতা। চোখ যায় অদূরে, মেডিকেল ক্যাম্পের দিকে। চিকিৎসা নিতে এসেছেন কয়েকজন নারী। দুয়েকজনের কোলে ফুটফুটে শিশু। তাদের নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন তারা। দুই মাসের একটি ছেলেশিশুর অস্বাভাবিক কান্না। চিৎকারের সঙ্গে মায়ের কোল থেকে নেমে যাবার চেষ্টা করছে। রমা অনুমান করতে পারে বাচ্চাটি অসুস্থ। মায়া জাগে। এগিয়ে যায় রমা।  

‘কী হয়েছে বাচ্চার?’
কাঁচাবয়সী এক নারী কয়েক পলক তাকান রমার দিকে। এরপর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জবাব দেন, ‘পাকসেনারা স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। স্বামীর কোনো খবর জানা নাই। বাপ নাই বাচ্চাদের। বাচ্চারা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কলেজে লেকচারার ছিলাম। এখন এতিমের মতো আমি। ’

কোলের শিশুটি কেঁদে ওঠে। হাতে বিস্কিট জাতীয় খাবার তুলে দেন মা। নারী আবার কথা শুরু করেন, ‘কোলের বাচ্চাটার ঠাণ্ডা। জ্বর আর কাশিতে ভুগছে, চিকিৎসা দিতে আসছি। মেডিকেল ক্যাম্পে ডাক্তার নেই, আছে খালি নার্স। ’ কথা শেষ করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নারী অন্যদিকে মুখ ফেরান।

শিশুদের কান্নাকাটি আর হইচইয়ের শব্দ পাশের মেডিকেল ক্যাম্পে। হঠাৎ রমার চোখ থেমে গেল মেডিকেল ক্যাম্পের প্রবেশ পথের দিকে। একটি মেয়েমুখ তার দিকে চেয়ে আছে, বিস্ময়ে ভরা চোখ। অসুস্থ হলেও হঠাৎ যেন  দেহের সকল শক্তি নিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা ওর। রমা এগিয়ে যায় মেয়েটির দিকে। চোখজোড়া সে রকমই। যে চোখজোড়া দেখে রমা আকর্ষিত হয়েছিল। তবে কী করবীর চোখ? একদার প্রিয় স্ত্রী কবরী এখানে এলো কীভাবে? ওর এমন দশা কেন? অসংখ্য প্রশ্ন, জবাব নেই। আরো কাছাকাছি হয় রমা। চিনতে ভুল হয় না।

‘তুমি কি কবরী, না?’

রমার এ প্রশ্নের জবাব নেই নারী মুখটিতে। মায়াময় মুখচোখে অব্যক্ত যন্ত্রণা। মনে হয় এ যেন শত জনমের পরিচিত কেউ।  

মধ্যবয়স্কা নার্স জবাব দেন, ‘পাকিস্তানি মিলিটারা এ নারীর ওপর এতটাই অত্যাচার করেছে যে, কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে কবরী। ’ 

‘মানে?’ 

‘মানে, লিখতে পারে, বলতে পারে না। ’

লিখে জানাল ওর নাম কবরী। বাড়ি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের দিরাই।

রমাকে খুঁজতে খুঁজতে সুধারাম মেডিকেল ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে আসে। চোখাচোখি হতেই সুধা রমাকে তাড়া দিয়ে বলে, ‘সময় হয়ে গেছে। লোকটি এসে গেছে, আসো তুমি। ’

‘কোথায়?’

‘কেন? যুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধে। ’

‘আমার কবরীকে রেখে? স্ত্রীকে রেখে?’  রমার প্রশ্ন।

কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ নেই সুধারামের। একমাত্র জবাব তার, ‘হাজার হাজার, লাখ লাখ কবরীকে বাঁচাতে হবে, দেশকে রক্ষা করতে হবে। মাটিকে রক্ষা করতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব, রমা!’

‘না, আমি যাব না, সুধাদা। ’

উচ্চকণ্ঠে সুধারামের জবাব, ‘ছাবালের মতো কথা বলবা না। দেরি করা যাবে না। ’ 

বাংলাদেশ সময়: ১৬১১
ইউবি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa