bangla news
ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

ব্যানকো [পর্ব--১৫]

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-১২-১৩ ৬:৫০:০৬ এএম

হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের  হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ। এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে। বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ‘ব্যানকো’-এর ধারাবাহিক অনুবাদ।

ব্যানকো[পর্ব--১৪], [পর্ব--১৩], [পর্ব--১২], [র্পব--১১],[র্পব--১০], [পর্ব--৯], [পর্ব--৮], [পর্ব-৭], [পর্ব-৬], [পর্ব-৫], [পর্ব-৪], [পর্ব-৩], [পর্ব-২], [পর্ব-১]

হ্যাঁ, নিশ্চয় আশাই আমাকে বারবার বাঁচিয়ে রেখেছে আর জিতিয়েও দিয়েছে। কিন্তু আমার সত্যিকারের সাফল্য ধরা দেবে ঠিক কখন? চল, আমরা সবগুলো ঘটনার ওপর একবার দৃষ্টি বুলিয়ে আসি, মুক্ত হওয়ার পরের দুটি বছরের ভালো-মন্দ বিষয়গুলো একটু খতিয়ে দেখি। আমি একেবারে কপর্দকহীনও হয়ে যাইনি আবার অনেক টাকার মালিকও বনে যাইনি, আমার হাতে এই মুহূর্তে আছে তিন হাজার বলিভার। এটা আমার দুই বছরের মুক্ত জীবনের আয়-উপার্জনের যোগফল। কি কি ঘটেছে এই সময়কালে?

এক. এল ক্যালাওয়ের স্বর্ণগুদাম : এ নিয়ে মনস্তাপের কোনো কারণ নেই। এখানে তোমার ব্যর্থতার কিছু ছিল না, কারণ বিষয়টা তুমি স্বেচ্ছায় এড়িয়ে গিয়েছিলে সেখানে বসবাসরত তোমার সাবেক স্যাঙ্গাতদের নিরুপদ্রব জীবনের স্বার্থে। এজন্যে কি মন খারাপ হচ্ছে? না। ঠিক হ্যায়, তাহলে গুদামের ওই টন টন সোনার গল্প ভুলে যাও।

দুই. হীরার খনির জুয়ার আড্ডা : দশ হাজার ডলার আয় করতে গিয়ে তুমি অন্তত বিশ বার নিজের জীবনকে বাজিতে লাগিয়েছো, তার ওপর সেই টাকাটা কখনোই তোমার হাতে আসেনি। তোমার জায়গায় জীবন দিয়েছে জোজো আর তুমি ফিরে এসেছো গায়ে একটি আঁচরও না খেয়ে। অন্যদিকে কি এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান ছিল সেটি! তুমি কি কখনো ভুলতে পারবে ওই রাতগুলো, একেবারে বিস্ফোরন্মুখ অবস্থায়, কার্বাইড ল্যাম্পের আলোয় জুয়াড়িদের রহস্যময় সেই মুখগুলোর মাঝে অনড় স্থির জোজো। এসব শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা আর আমেজের কাছে তোমার দশ হাজার ডলার না পাওয়ার আফসোস ধোপে টেকে না।

তিন. ব্যাংকের নিচের সুরঙ্গ : সেখানে আসলে সৌভাগ্যের কোনো ছিটোফোঁটাও ছিল না। তিন মাসের সেই অমানুষিক বেগার শ্রম দেওয়া, ফলাফল শূন্য। তবে তার পরেও এতে তোমাদের দুঃখিত হওয়ার কিছুই নেই। অন্তত ওই তিনটি মাসের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা তোমরা স্বপ্ন দেখেছো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের মালিক হওয়ার, এর কি কোনোই মূল্য নেই! ভাগ্য আর একটু প্রসন্ন হলেই তো হতো। অন্যদিকে এমনও তো হতে পারতো যে টানেলের শেষ প্রান্তে তুমি আছো আর তা ভেঙ্গে পড়লো? সে অবস্থায় গর্তে চাপা পড়া ইঁদুরের মত তোমাকে করুণ মৃত্যুকে বরণ করতে হতো, অথবা ফাঁদে আটক শিয়ালের মত পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হতো।

চার. বন্ধকী দোকান কাণ্ড : পাশের দেশের ওই বন্ধকী দোকান থেকে লুট করা জুয়েলারি আর কোল্ড স্টোরেজের ওই ফ্রিজগুলোর কাহিনী মনে আছে তো? কোনো অভিযোগ নেই কারো বিরুদ্ধে, শুধুমাত্র হতচ্ছারা ওই দেশটির পাবলিক রোড ওয়ার্কস বিভাগ ছাড়া।
 
পাঁচ. অভ্যুত্থান পরিকল্পনা : এই কাজটাতে আসলে কখনোই তোমার মনের সায় ছিল না। সেইসব রাজনৈতিক কর্মকা- আর ওই বোমাগুলো যে কোনো লোকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে, তাই এটা তোমার রাস্তা না। প্রথমত তুমি এতে জড়িয়েছিলে আসলে দু’জন খুবই চমৎকার ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আর দ্বিতীয়তঃ তোমাকে দেওয়া হয়েছিল প্রতিশোধ চরিতার্থের প্রয়োজনীয় অর্থ আর সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তোমার আত্মা এতে সায় দেয়নি। কারণ যে সরকার তোমাকে মুক্তি দিয়েছে বন্দীত্বের শৃঙ্খল থেকে, তার বিরুদ্ধে আক্রমণ করাটা ইনসাফের পর্যায়ে পড়বে বলে কখনোই তুমি মেনে নিতে পারোনি।

এসবের বাইরে এতে তোমার লাভ হয়েছে যে তুমি চার চারটি মাস ‘মাস্কেটিয়ার্স’দের সঙ্গে, তাদের স্ত্রী আর সন্তানদের সঙ্গে এক পরিবার হয়ে সুখে আর আনন্দে, মৌজ-মাস্তিতে কাটিয়েছো।জীবনের পরিপূর্ণ আনন্দে টইটম্বুর ওই দিনগুলো তো তুমি অন্তত কখনো ভুলতে পারবে না।

উপসংহার : অন্যায়ভাবে তেরটি বছর আমায় বন্দিত্বের শিকল বয়ে বেড়াতে হয়েছে এবং এসময়ে আমার যৌবনের প্রায় সবটাই ছিনতাই করে নেওয়া হয়েছে। তারপরেও আমি ঘুমাই, খাই-দাই, পানাহার করি, ফুর্তি আর আনন্দে মেতে উঠি, সবই ঠিক আছে---  কিন্তু আমি একবারের তরেও যে বিষয়টা ভুলি না তা হলো, প্রতিশোধ আমাকে নিতেই হবে।

গত দুটি বছরের মুক্ত জীবনে তুমি একের পর নানান পদের এক অজস্র সব অভিজ্ঞতা আর অসাধারন সব অভিযানের ভেতর দিয়ে গিয়েছো। তারচেয়েও বড় কথা হলো তুমি কখনোই এসবের পেছনে ছুটে বেড়াওনি, নিজে থেকেই এসব এসেছে তোমার পদমূলে। তুমি পেয়েছো অসাধারণ ভালোবাসা, তুমি জেনেছো সব পদের মানুষকে যারা তোমাকে বন্ধুত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে--- পরিচয় ঘটেছে এমন সব মানুষের সঙ্গে যাদের সঙ্গে তুমি জীবনের ঝুঁকি নিয়েছো বারবার। আর এতসব কিছুর পরেও তুমি কি আক্ষেপ করবে জীবন নিয়ে? তুমি ভেঙ্গে পড়েছো, কিংবা ভেঙ্গে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছো? কি এমন ক্ষতি হয়েছে এতে করে? দারিদ্র নিরাময় অযোগ্য এমন কোনো অসুখ নয়।

সুতরাং কৃতজ্ঞতা জানাই খোদাকে, অভিযান দীর্ঘজীবী হোক, মহিমান্বিত হোক আমার নেওয়া সেইসব ঝুঁকি যা আমাকে প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত এমন বর্ণিলভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে। জীবনের সেইসব ঝুঁকিগুলোকে তুমি সানুগ্রহচিত্তে এমনভাবে গলাধঃকরণ করেছো যেন সেগুলো স্বর্গীয় স্বাদের দুর্লভ কোনো পানীয় যা সরাসরি তোমার হৃদয়ের জমিনে গিয়ে চুমু খায়। আর তুমি তো এখনো পুরো সুস্থ সবল আছো, এটাই হচ্ছে প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভদ্র মহোদয়, চল আমরা অতীতের ব্যর্থতাগুলো মুছে ফেলে আবারো নতুনভাবে শুরু করি। আখেরি বাজী হয়ে যাক আরেকটা। এক বাজী হারলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা লাগাও; আবারো বাজী এবং আবারো বাজী, এবং আবারো বাজীই চলতে থাক, নিখুঁত হিসেবে শুধু দান লাগিয়ে যাও। তবে তোমার সমস্ত অন্তরাত্মাকে শিহরিত আর উত্তেজনায় থরো  থরো কাঁপতেও দাও, গাইতে দাও আশার জয়গান; তাহলেই এখনি তুমি শুনবে, ‘মঁশিয়ে প্যাপিলন! আপনি বাজী জিতে গেছেন!’

সূর্য অস্তাচলে চলে গেছে। পশ্চিমাকাশে ছড়িয়ে থাকা লালিমাটুকু আশার বাণীই শোনাচ্ছে আমাকে। এটা দেখে আমি ভবিষ্যতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসে প্রচ-ভাবে উদ্বেলিত হলাম। ফুরফুরে বিশুদ্ধ বায়ুতে আমি শান্ত-স্থির মন নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম বেঁচে থাকা এবং মুক্ত থাকার আনন্দ নিয়ে।

বাড়ির পথে হাঁটা ধরলাম যেখানে অন্যরা অপেক্ষা করছে নৈশাহারের জন্য আমি কি সংগ্রহ করলাম তা দেখার জন্য। কিন্তু প্রকৃতিজুড়ে এই যে রঙের খেলা, ছোটো ছোটো ঢেউয়ের মাথায় অন্তহীন আলোকচ্ছটা আর ছায়ার স্পর্শের খেলা অবলোকনে আমি এতটাই আলোড়িত হলাম যে অতীতের দুঃখ-জ্বালা সব বিস্মৃত হলাম প্রায়। আমি এর সবকিছুর জন্যে সদাশয় সৃষ্টিকর্তার স্মরণ না নিয়ে পারলাম না। ‘শুভরাত্রি, হে বিরাট, শুভরাত্রি! জীবনের এতসব ব্যর্থতার গ্লানি সত্ত্বেও আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে মুক্ত স্বাধীনভাবে এরকম রৌদ্রকরোজ্জ্বল আনন্দে উদ্ভাসিত একটি দিন এবং এর শেষে অসাধারণ এই সূর্যাস্ত উপহার দেওয়ার জন্য!’


নবম পরিচ্ছদ
ম্যারাকাইবো : ইন্ডিয়ানদের মাঝে

রিও শিকোয় মাস কয়েক কাটাবার পর আমি ক্যারাকাস থেকে ছয় শ’ মাইল দূরের ম্যারাকাইবো লেক এলাকায় প্যারিস থেকে ভেনেজুয়েলায় সেটেল করতে আসা এক সাবেক মডেলের অধীনে চাকরি নিয়ে চলে গেলাম। যাক বাবা, এবার ক্যারাকসে পুলিশ অভ্যুত্থান কাণ্ডের ফাইল আবার ওপেন করলে করুক, আমার তাতে তেমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। লরেন্স নামে আমার এই মালকিন এখানে বিলাসবহুল ষোলো কামড়ার একটি হোটেল পরিচালনায় নামে। আমার সর্বাঙ্গীন সহায়তায় সে শেষতক নানান ঝামেলা আর ধার-দেনা কাটিয়ে ব্যবসা জমিয়ে বসে। এটা দেখে আমি নয়া ধারণা পেলাম। যদি লরেন্স পারে তাহলে আমিও পারবো না কেন এমন কিছুর মালিক হতে, শূন্য থেকে শুরু করে বড় কিছু হয়ে উঠতে। ফ্রান্সে আমি দেখেছি একজন শ্রমিক সারা জীবন শ্রমিকই থেকে যায়। কিন্তু এখানে ভেনেজুয়েলায় সেই সুযোগ আছে যাতে একজন মানুষ ইচ্ছা থাকলে আর একটু চেষ্টা করলে বদলে ফেলতে পারে নিজেকে।
ম্যারাকাইবো ছিল বর্ধিষ্ণু তেল খনি এলাকা। আমি লরেন্স আর তার বাবুর্চীর সঙ্গে থেকে রান্নাটা শিখে ফেলেছিলাম। একিদন স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলাম, ‘দক্ষ ফরাসি রাঁধুনি। তেল কোম্পানিতে চাকরি চাই। কাক্সিক্ষত বেতন : কমপক্ষে ৮ শ’ ডলার।’

এক সপ্তাহ পরে রিচমন্ড এক্সপ্লোরেশন কোম্পানিতে কুকের চাকরি পেয়ে গেলাম। অতিশয় ভারাক্রান্ত মনে মালকিন লরেন্সকে বিদায় জানালাম। কারণ তিনি কোনোমতেই আমার চাহিদা ৮০০ ডলার বেতন দিতে সক্ষম নন। নয়া কর্মস্থলে প্রথমে ভয়ে ছিলাম অন্য কুকদের কাছে আমার জারিজুরি ফাঁস হয়ে না যায় আবার। কিন্তু দেখলাম এদের বেশিরভাগই আমার চেয়ে অধম বই নয়, প্রায় সবাই ডিশ-ওয়াশার লেভেলের। উপরন্ত আমার কাছে ছিল এক বারবনিতার দেওয়া চমৎকার এক উপহার---  একটি ফ্রেঞ্চ রান্নার বই। অচিরেই আমি প্রধান কুকের দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। সেখান থেকে কোম্পানির বসদের জন্য পরিচালিত বিশেষ ক্যান্টিনের দায়িত্ব পাই। বাজার-সওদা আমার নিজের হাতে করার দায়িত্ব পেলাম। আমার কাজে সাবাই সন্তুষ্ট। বাজার করতে গিয়ে আমার নিজের পকেটও সুস্থ সবল হতে থাকলো। এক পর্যায়ে বেতন বাড়িয়ে ১২ শ’ ডলার করতে বললাম, কারণ আমার মত একজন দক্ষ লোকের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে বেতনটা মানানসই হচ্ছে না। তারা আমার বেতন ১ হাজার ডলার করে দিল।

এখানে বেশ ভালই ছিলাম। অন্য যে কেউ-ই থাকতো। কিন্তু আমার অভিযানপ্রিয় মন। আমি কোম্পানির জিওলজিক্যাল সার্ভে অভিযানে যেতে চাইলাম। এতে ঝুঁকি থাকলেও সুবিধা অনেক, বেতন দ্বিগুণেরও বেশি, আছে উত্তেজনাপূর্ণ আর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ আর আছে এই লাইনে জ্ঞানার্জনের সুযোগ। ম্যারাকাইবোর পশ্চিমে অবস্থিত পর্বতশ্রেণীর সিয়েরা পেরিজা এলাকার দুর্গম সব স্থানে তেলের সন্ধানে এসব অভিযান চলতো। জায়গাটা ভেনেজুয়েলা কলম্বিয়ান সীমান্তে। এটা দুর্ধর্ষ মোটিলোন ইন্ডিয়ানদের এলাকা। তিন সপ্তাহব্যাপী একেকটা অভিযানের শেষে অনেক সময়েই দেখা যেত দলের অনেকেই জীবন নিয়ে ফিরতে পারেনি, ইন্ডিয়ানদের বিষাক্ত তীরে অথবা অন্য হামলায় জঙ্গলেই চিরনিদ্রায় শায়িত হতে হতো তাদের। আমি বেশ কয়েকটি অভিযানে অংশ নিয়ে ভালো অর্থ আয় করি। আমি অভিযানকারীদের ওপর ইন্ডিয়ানদের বিরাগের কারণ উদঘটন করে (অভিযানকারীরা ইন্ডিয়ানদের জীবিকার একমাত্র অনুসঙ্গ বনের পশুপাখি নির্বিচারে হত্যা করতো যা তাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিত) উভয় পক্ষের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে বেশ সাফল্য পাই। এসময়ে আমার জীবনে ঘটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি।

দশম পরিচ্ছদ
রিটা- দ্য ভেরা ক্রুজ   

banco সেন্ট জোসেফের নির্জন কারাবাসে থাকতে আমি কল্পনায় যে নারীকে আরাধনা করেছি তার দেখা পেলাম। জীবন শক্তিতে ভরপুর, বুদ্ধিমতি, নিখুঁত ছাঁচে গড়া মুখাবয়ব আর দেহতনু, সোনালী চুলের বাদামী চোখে ঘোর কৃষ্ণ কালো মণি--- এই নারীকে আমি মনে মনে পূজো করেছি, আর বিশ্বাস করেছি একদিন সে আমার হবেই।

সিয়েরা পেরিজায় আবারো একটি অভিযান শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম যে এবার থেকে আর রিচমন্ড কোম্পানির ক্যাম্পে থাকবো না, চলে আসবো ম্যারাকাইবো শহরে। উপযুক্ত আশ্রয়ের সন্ধান করতে করতেই হোটেল ভেরা ক্রুজে এসে উপস্থিত হলাম। হালকা নীল রঙের বাড়িটা দেখেই আমার ভাল লেগে গেল। ঠাণ্ডা ছিমছাম এক প্যাসেজ বেয়ে আমি হোটেলের ভেতরের আঙিনায় পৌঁছতেই দেখা পেলাম তার। এই সে, আমার মোটেই ভুল হয়নি, কল্পনার মানসচক্ষে আমি তাকে হাজারো বার দেখেছি, আমার রাজকুমারী আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমার খোয়াবে দেখা শাহজাদী বাস্তবে আমার সম্মুখে এখন, আমারই অপেক্ষা করছে।

‘বুয়েন্স ডায়াস, সেনোরা। ভাড়া দেওয়ার মত রুম কি খালি আছে?’ আমি শুধু তাকে দেখছিলাম না, দু’চোখ দিয়ে গোগ্রাসে গিলছিলাম হা-ভাতের মত। অচেনা অজানা কারো দৃষ্টিতে এভাবে নিজেকে শুষে নিতে দেখে তার চমকানোর কথা ছিল, কিন্তু না, তিনি উঠে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে এলেন আমার কাছে।
‘হ্যাঁ, মঁশিয়ে। আপনার জন্যে একটি রুম আছে আমার কাছে।’ আমার স্বপ্নকন্যা বললেন ফরাসীতে।
‘কিভাবে জানলেন আমি ফরাসি?’
‘আপনার স্প্যানিশ বলার ধরণ দেখে। দয়া করে আসুন আমার সঙ্গে।’
আমার আর তর সইছিল না স্বপ্নরাণীকে আমার মনের কথাটি বলার জন্যে। সে আমার পাশে কয়েক গজ দূরেই থাকে। তবে মনকে সাবধান করে রাখলাম কোনো হ্যাংলামো করে বিষয়টা কাঁচিয়ে না ফেলতে।

এরপর গ্রীষ্মের এক রাতে, হোটেলের আঙিনার ছোট্ট চমৎকার বাগানে, রিটা দেবীর বেদীমূলে নিবেদন করলাম আমার প্রেমের অর্ঘ্য। অনেক কথা বললাম। ফ্রান্সে যে আমি বিবাহিত তাও বললাম। তবে আমি প্রাক্তন দাগী এটা জানাইনি। কারণ আমি কোনোভাবেই চাচ্ছিলাম না তাকে হারাতে। সে কিছু বলছিল না, শুধু তার মোহময়ী আঁখিপদ্ম দিয়ে আমাকে নির্নিমেষে নিরিখ করে যাচ্ছিল। আকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারার মত উজ্জ্বল লাগছিল তার দু’চোখ।

কিন্তু কোনো জবাব দিল না। সে এতটা সহজ পাত্রী না আমি জানতাম। তার ওপরে ছিল খুবই লাজুক।
তবে তিনদিন পর আমার আহ্বানে সারা দিল। তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে না গিয়ে, খুবই স্বাভাবিকভাবে আমরা আমাদের ভালোবাসার সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিলাম। শুরু করলাম সংসার। আমি হোটেলে বসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলাম।

নয়া এক জীবনের দ্বার খুলে গেল আমার সামনে। পারিবারিক জীবন শুরু হলো। আমি, ফ্রেঞ্চ পেনাল সেটেলমেন্ট থেকে পালানো একজন দাগী জীবনের পঙ্কিল পিচ্ছিল পথ থেকে ফিরে আসতে পেরেছি। এখন আমার একটা বাড়ি আছে, আছে একজন নারী যে শরীর এবং মন দু’দিক থেকেই অতুলনীয়া, মোহময়ী। আমাদের জীবনে কালো মেঘের ছায়া বলতে একটা বিষয়ই ছিল, তা হলো ফ্রান্সে আমার একজন স্ত্রী আছে, তাই রিটাকে আমি আইনসম্মতভাবে বিয়ে করতে পারছিলাম না এ মুহূর্তে।

কাউকে ভালোবাসা, বিনিময়ে ভালোবাসা পাওয়া, নিজের করে একটি বাড়ির মালিক হওয়া---  খোদা, তুমি কত মহান, আমার মত অধমকে তুমি এত সব দিয়ে দিলে!

রিটা তানজিয়ার থেকে একটি মাছ ধরার নৌকায় আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ভেনেজুয়েলায় এসেছে মাস ছয়েকে আগে তার স্বামীর সঙ্গে। তিন মাস আগে স্বামী তাকে ছেড়ে গেছে ম্যারাকাইবো থেকে দুই শ’ মাইল দূরের কোনো এক অভিযানে।

দিনকাল ভালোই কাটছিল। তিনমাস কেটে গেল নির্বিঘ্ন সুখে-শান্তিতে। কিন্তু এরপরই দেখা দিল ভেজাল। রিচমন্ড কোম্পানির সিন্দুক সাফ করে দিল কেউ। আমি তখনো তাদের অধীনে জিওলজিক্যাল অভিযান আয়োজন করে যাচ্ছিলাম। আমি এখনো জানি না স্থানীয় শুকর শাবক ঠোলার দল কি করে আমার অতীত জানলো। আমাকে এ ঘটনায় এক নম্বর সন্দেহভাজন হিসেবে ম্যারাকাইবো জেলখানায় বন্দি করা হলো। রিটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সূত্রে সে জেনে গেল আমার অতীত যা আমি তার কাছে লুকিয়েছিলাম। সব শেষ। এবার বুঝি তাকেও হারালাম! ইন্টারপোলে আমার ব্যাপারে খোঁজ করে সব তথ্য জেনে নেয় ম্যারকাইবো পুলিশ।

তবে রিটা কিন্তু আমাকে ওই অবস্থায় ছেড়ে পালালো না। সে উকিল লাগিয়ে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে আমাকে বের করে আনলো। আমি নির্দোষ সাব্যস্ত হলাম।

রিটা যখন আমাকে জেল থেকে নিতে এলো, তখন আর সে আগের মত আমার দিকে তাকাচ্ছিল না। সে স্বাভাবিক হতে পারছিল না। মনে হলো ভীত সে আমাকে নিয়ে। হঠাৎ সরাসরি প্রশ্ন করলো---  ‘কেন মিথ্যা বলেছিলে আমাকে?’  
‘আমি তোমাকে এত ভালোবেসে ফেলেছি যে তোমাকে কোনোভাবেই হারাতে চাইনি। তাই তুমি যা শুনতে পছন্দ করবে তাই বলেছিলাম।’
‘তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যাচার করেছো...মিথ্যাচার করেছো...’  বারবার সে একই কথা বলতে থাকলো। ‘আমি কী বোকা যে তোমাকে একজন ভদ্রলোক বলে ভেবেছিলাম।’
ক্ষোভ আর ভয়ে সে উন্মাদপ্রায় হয়ে গেল। মনে হলো সে একটা দুঃস্বপ্নের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, সে আমাকে ভয় পাচ্ছে!

‘কে বলে আমি একজন স্বাভাবিক ভালোমনুষ হতে পারি না! আমি বিশ্বাস করি অন্য সবার মত আমারও সুযোগ আছে একজন সৎ, সভ্য এবং সুখী মানুষ হওয়ার। তোমার এ বিষয়টা মনে রাখতে হবে দীর্ঘ তেরটা বছর আমাকে বিশ্বের ভয়াবহতম এক কারা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে নিজের মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। রিটা, আমি তোমাকে আমার সর্বান্তকরনে ভালোবেসেছি, আর যখন বেসেছি তখন আমার অতীত নিয়ে নয়, তোমাকে ভালোবেসেছি আমার বর্তমান দিয়ে। আর সামনের দিনগুলো আমরা কাটাবো হাতে হাত দিয়ে, আমাদের সঙ্গী হচ্ছে বর্তমান আর ভবিষ্যত- অতীতের কোনো স্থান নেই এখানে। আমি আমার বাপের মাথা-খেয়ে বলছি, যে বাপকে আমি অনেক ভুগিয়েছি, সেই বাপের নামে শপথ করে বলছি, আমি যা বলছি তা সত্য।’ আমি আর পারছিলাম না, বসে পড়লাম হাঁটু গেড়ে, চোখের পানি আটকাতে পারলাম না।

‘তুমি সত্যি বলছো, হেনরি? তোমার মনের কথা তো এগুলো? রিটা আমাকে দুই বাহুতে আঁকড়ে ধরলো, ‘হেনরি আর কেঁদো না। দেখ, বাইরে কি সুন্দর বাতাস বইছে। কথা দাও ভবিষ্যতে আর বেপথু হবে না। প্রতিজ্ঞা কর কোনো কিছু গোপন করবে না আমার কাছে। কথা দাও এমন কিছু নোংরা থাকবে না আমাদের মাঝে যা গোপন করতে হয়, লুকিয়ে রাখতে হয়!’

আমরা দুজন দুজনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলাম। আমি বুঝতে পারছি এই মহৎ নারীর কাছে আমি যে সাজাপ্রাপ্ত একজন অপারাধী ছিলাম তা গোপন করা কোনোমতেই ঠিক কাজ হয়নি।

এরপর রিটা আমাকে দিয়ে আমার বাবাকে চিঠি লেখালো। চিঠি ফেরত এলো ফ্রান্স থেকে, কারণ প্রাপক নেই ঠিকানায়। আমি ভেঙ্গে পড়লাম হতাশায়। রিটা হঠাৎ করে ঠিক করলো আমার পক্ষে সম্ভব নয় যেহেতু, তাই সে নিজেই ফ্রান্সে যাবে বাবাকে খুঁজে বের করতে। জাহাজে দীর্ঘ কয়েক মাসের কষ্টকর সফর শেষে হতাশায় মুষড়ে পড়া এক রিটা এসে আমাকে জানালো, বাবা সে ফ্রান্সে পৌঁছানোর মাস তিনেক আগে মারা গেছেন। আমার মায়ের মৃত্যুর প্রায় বিশ বছর পরে বাবা আবার বিয়ে করেছিলেন, তাঁতে জ্যু নামে এক স্কুল শিক্ষয়িত্রীকে। আমার সৎ মা তাঁতে খুবই সমাদর করে রিটাকে, তার বাড়িতে দেখা গেছে আমার বাবা-মার ছবি খুব যতেœ টাঙ্গানো আছে দেওয়ালে। তবে আমার দু বোনের কোনো খবর রিটাকে জানাতে পারেনি তাঁতে। মনে হয় তারা আমার ব্যাপারে আর আগ্রহী না বুঝতে পেরে এই মহিয়সী নারী সেই বাস্তবতা আমাদের জানিয়ে আর দুঃখিত করতে চাননি, তাই তিনি তাদের ঠিকানা দেননি।


একাদশ পরিচ্ছদ
আমি ভেনেজুয়েলান হলাম

bancoএদিকে ভেনেজুয়েলায় আবারো ক্ষমতার পালাবদল এবং স্বৈরশাসন নেমে আসে। ১৯৫০ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্লেমেরিখের শিখন্ডিকে সামনে রেখে ক্ষমতা দখল করেন পেরেজ জিমেনেজ। বাক স্বাধীনতা হরণ করা হলো, সেন্সরশীপ নেমে এলো সংবাদপত্র আর রেডিওর ওপর, বিরোধীদের ওপর দলন-নির্যাতন শুরু হলো পুরোদমে। কমিউনিস্ট আর বেতানকোর্তের দল অ্যাকশন ডেমোক্রেসিয়া চলে যায় আন্ডারগ্রাউন্ডে।

এখানে পাঠকদের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি মাঝেমধ্যেই ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রসঙ্গে চলে আসার জন্য। আমি জানি আপনারা আমার অভিযানের বয়ান শুনতে চান, ভেনেজুয়েলার ইতিহাস না। তবে এসব ঘটনা আমার সমসাময়িক এবং আমার বিভিন্ন কর্মকা- আর সিদ্ধান্তকে ব্যাপক প্রভাবিত করেছে, তাই প্রসঙ্গগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে আসে। ওই সময়টায় অন্যান্য দেশের মানুষ জানতো ভেনেজুয়েলা একটি দেশ মাত্র (অনেকেই এমনকি এটাও জানতো না যে দেশটার অবস্থান কোথায়) যে তেল রপ্তানি করে এবং এমন একটি দেশ যে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা শোষিত হয় যেন এটা তাদের কলোনি। তবে বাস্তব ছিল এরচেয়েও রূঢ়।

কিন্তু ভেনেজুয়েলা সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে এগিয়ে চলছে। তেল কোম্পনিগুলোর ব্যাপক প্রভাব সত্ত্বেও দেশটির বুদ্ধিজীবীরা মাতৃভূমিকে আমেরিকার সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত করে এনেছেন প্রায়। এখন ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি স্বাধীন। ভেনেজুয়েলার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তরুণরা, এদেশের পরিশ্রমী মানুষ তাদের প্রিয় জন্মভূমিকে যে কোন ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব বা চাপ থেকে মুক্ত রাখার মানসে সামনে এগোচ্ছে। ভেনেজুয়েলা আসলে প্রাকৃতিক সম্পদে খুবই সমৃদ্ধ একটি দেশ যার দরকার একজন যোগ্য রাজনৈতিক নেতা যিনি দক্ষ হিসাবরক্ষকের মত একদল কুশলী সহকর্মীকে নিয়ে এর তেল সম্পদ ও অন্যান্য খাত থেকে অর্জিত অর্থকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবে দেশকে।

ওদিকে রিটা ফ্রান্স ছেড়ে আসার পরপরই আমার সৎ মা তাঁতে আমার দুই বোনকে চিঠি লিখে আমার কথা জানায়। এতে তারা দু’জন, তাদের স্বামী আর সন্তানরা আবেগে খুবই আপ্লুত হয়।

রিটা ভেনেজুয়েলায় এসে পৌঁছানোর কিছুদিন পরেই ফ্রান্স থেকে চিঠি আসে তাঁতে জ্যু’র। একই সঙ্গে চিঠি এবং ফটোগ্রাফ পাঠায় আমার বোনেরা। বড়বোনের তিন মেয়ে আর এক ছেলে। তার স্মামীও চিঠি লিখেছে, জানিয়েছে তারা কিভাবে কাটিয়েছে এতদিন, যুদ্ধের সময়ে কি রকম ছিল, সব কিছু। ‘প্রিয় রিরি..’ বড়বোনের চিঠির সম্বোধনে আমি আমার মায়ের কণ্ঠ যেন শুনতে পেলাম।

আমার অপর বোন প্যারিসের বাসিন্দা, কর্সিকান এক আইনজীবীর স্ত্রী, তার দুই ছেলে আর এক মেয়ে, বেশ ভালই আছে। তার চিঠিতেও একই আবেগ ‘... আমি, আমার স্বামী আর সন্তান সবাই খোদাকে ধন্যবাদ জানাই তোমাকে ওই ভয়াবহ কয়েদখানার সমস্ত প্রতিকুলতা কাটিয়ে বিজয়ী হতে সাহায্য করার জন্য।’ বিশ বছর পর বোনদের সঙ্গে, আমার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক আবার পুনঃস্থাপিত হলো। এই আনন্দধারার মধ্যেই আমি ঠিকানা খুঁজে বের করলাম সেই মহতি চিকিৎসক আমার বন্ধু ডা. জার্মেইন গুইবার্তের।

ইনি সেই ব্যক্তি যিনি আমাকে রয়েল কারাগারের ভয়াবহ দিনগুলোতে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে গেছেন নিজের চাকরির ওপরে মারাত্মক সব ঝুঁকি নিয়ে। তিনি আমাকে কারাগার থেকে প্রায়ই তার বাসায় নিয়ে যেতেন, মর্যাদা দিয়েছিলেন পরিবারের একজন সদস্যের। সেইন্ট জোসেফের নির্জন কারাবাস থেকেও তার উদ্যোগে আমি পরিত্রাণ পেয়েছিলাম, এরপর তারই চেষ্টায় আমি ডেভিল্স আইল্যান্ডে বদলি হই এবং চূড়ান্ত ও সফলভাবে পলায়নের সুযোগ পাই।

লিয়ন্স থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে লেখা ডা. গুইবার্তের চিঠি পেয়ে আমি আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। তিনি অনেক কথা লিখেছেন, চিঠি লিখেছেন তার স্ত্রীও। আমার সাফল্যে এবং আমার স্ত্রী রিটাকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন তারা। পাঠিয়েছেন তাদের ছবিও। তিনি আশা করেছিলেন আমাদের আবার দেখা হবে। ১৯৫১ সালের অক্টোবরে চাকরিসূত্রে ইন্দো-চায়নায় বদলি হয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল স্ত্রীকে কিছুদিন পরই সেখানে নিয়ে যাবেন। কিন্তু  ১৯৫২ সালে তিনি খুন হন সেখানে। কিন্তু মহৎ হৃদয়, আপনার তালে নেচে যাওয়া মানবতাবাদী ওই চিকিৎসক তার স্ত্রীকেও আর কাছে নিয়ে যেতে পারেননি কিংবা দেখা করতে পারেননি আমার সঙ্গে আর কখনো।

১৯৫৩। আমরা খবর পেলাম ভেনেজুয়েলার গায়েনায় বিশাল এক লৌহ খনি আবিষ্কৃত হয়েছে, শোনা যাচ্ছে খাঁটি লৌহের বিরাট এক পাহাড়ই নাকি পাওয়া গেছে। এদিকে আমি আর রিটা দুজনই জন্মগতভাবে অভিযানপ্রিয়, আমারাও আর চাইছিলাম না বাদবাকি জীবনটা এই ম্যারাকইবোতেই কাটিয়ে দিতে। এখান থেকে ভেনেজুয়েলান গায়েনা দেশের ঠিক অপর পিঠে। আমরা হোটেল বিক্রি করে দিয়ে এক সকালে আমার বিশাল সবুজ ডি সটো গাড়িতে মালপত্তর বোঝাই করে আবার অভিযানে নেমে পড়লাম, যাবো সেখানে। যাওয়ার পথে ক্যারাকাস থামলাম, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এখানে থামার আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল পিকোলিনোর খোঁজ-খবর করা। এদিকে ক্যারাকাসকে দেখে থমকে গেলাম। এই ক্যারাকাস আর আগের ক্যারাকাস এক নয়। পেরেজ জিমেনেজ এর চেহারা পুরো পাল্টে দিয়েছেন। বিশাল বিশাল ছয় লেনের রাস্তা-ঘাট, বিল্ডিং, এয়ারপোর্ট, অফিস-কারখানা সবকিছু তার স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে আমি নিয়মিত লোক পাঠিয়েছি পিকোলিনোকে দেখে যাওয়ার জন্য, পাঠিয়েছি অল্প-বিস্তর টাকাও। ১৯৫২ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে কিছু টাকা পাঠিয়েছিলাম পিকোলিনোকে, টাকাটা সে চেয়েছিল বন্দরের নিকটবর্তী লা গুয়েরা এলকায় গিয়ে আবাস গড়ার জন্য। ওই বন্ধুর ওখানে গেলাম। কিন্তু খোঁজ নেই পিকোলিনোর। আমি তাকে হর-হামেশাই পীড়াপিড়ি করে এসেছি ম্যারাকাইবোতে এসে আমাদের সঙ্গে বসবাসের জন্য। কিন্তু প্রতিবারই সে তার বন্ধুর মাধ্যমে জানিয়েছে যে ভেনেজুয়েলায় ক্যারাকাস হচ্ছে একমাত্র জায়গা যেখানে তার চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত ডাক্তাররা থাকেন। খোঁজ-খবর করে জানলাম যে সে কথা বলার মত প্রায় পুরো সুস্থ হয়ে গিয়েছিল এবং তার ডান  হাতটিও মোটামুটি কর্মক্ষমতা ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু এখন তার ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে পারছে না। তাকে লা গুয়েরা বন্দর এলাকায় চলাফেরা করতে দেখা গেছে এক সময়ে কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। সম্ভবত বন্দর থেকে সে ফ্রান্সগামী কোনো জাহাজে চেপে বসেছিল। তবে আসল ঘটনা কি আমি আর কখনোই জানতে পারিনি, তবে তার কথা মনে পড়লে সব সময়েই আমি মনে মনে নিজের পাছায় চাবকেছি এই অনুতাপে---  কেন আমি আরো আগে ক্যারাকাসে এলাম না তাকে জোর করে ম্যারাকাইবোতে নিয়ে যাওয়ার জন্য!

এদিকে আমরা ঠিক করেছিলাম ভেনেজুয়েলান গায়েনায় আমাদের মনোবাসনা পূর্ণ না হলে গাট্টি-বোচকা বেঁধে ক্যারাকাসে চলে আসবো এবং সেখানেই থিতু হবো। শেষ পর্যন্ত আমার ডি সোটেতে মালামাল বোঝাই করে আমি আর রিটা চলে এলাম এই রাজ্যের রাজধানী ওরিনোকো নদীর তীরবর্তী সিউদাদ বলিভারে।

দীর্ঘ আট বছর পরে আমি এই চমৎকার শহরের সদাশয় অতিথিপরায়ণ মানুষগুলোর মাঝে উপস্থিত হলাম।   
এদিকে ১৯৫৬ সালের ৬ জুন ভেনেজুয়েলার জাতীয় দিবসে আমাকে এদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। এদিন আমি আবেগে রীতিমত আপ্লুত হয়ে যাই।  

এরপর আমরা স্পেনে গিয়ে আবাস গড়তে চেয়েছি। সেখানে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি ভেনেজুয়েলায়। তারপর ১৯৬১ সালে ক্যারাকাসে এসে আবারো হোটেল ব্যবসা শুরু করি। সেখানে বিফল মনোরথ হয়ে আবার ফিরে যাই ম্যারাকইবোর কাছে, সাগরে বিশাল এক চিংড়ি খনি আবিষ্কার করে ব্যস্ত হয়ে যাই জেলেদের নিয়ে। টন টন চিংড়ি ধরে আমেরিকা পাঠিয়ে রাতারাতি দিন বদলে ফেলতে থাকি। কিন্তু এবার এক আমেরিকান পার্টনার সর্বস্ব নিয়ে পালিয়ে গেলে আবারো পথের ফকির হয়ে যাই প্রায়।

এরপর এল ডোরাডোয় পরিচিত কর্নেল বোলাগনোর আর্থিক সহায়তায় আবারো ব্যবসা শুরু করি। সেই বোলাগনো যে ছিল একজন কর্পোরাল মাত্র, এখন কর্নেল। এই বোলাগনো আমি এল ডোরাডো থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন তার একমাত্র স্যুটটি আমাকে দিয়ে দেয়।

যাহোক বোলাগনোর বন্ধুত্বের আশীর্বাদে আমাদের ব্যবসা আবার দাঁড়িয়ে গেল। মধ্য কারাকাসের শ্যাকাইতো এলাকায় কিনে নেই স্কচ ক্লাব, চালাই অল নাইট বার। অবস্থা দিন দিন উন্নত হতে থাকে।
এরপর আসে আমার ফ্রান্সে যাওয়ার সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত দিন।

বাংলাদেশ সময় : ১৬৫৫, ডিসেম্বর ১৩, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2011-12-13 06:50:06