ঢাকা, রবিবার, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ১২ জুলাই ২০২০, ২০ জিলকদ ১৪৪১

শিল্প-সাহিত্য

পৌর্ণমাসীর চর

স্বকৃত নোমান | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-০৪-০৯ ০৩:৩৬:৪৯ পিএম
পৌর্ণমাসীর চর

সেই কখন থেকে অনর্গল গেজিয়ে যাচ্ছে জসিম মিয়া ওরফে ঠাটা জসিম।

বাড়িতে অতিথি আসবে কাল, তাই বিকেলে জালটা নিয়ে গাঙে নেমেছিল দোদেল হামজা।

খেপ দিতে দিতে স্রোত ঠেলে ক্রোশখানেক উজানে চলে গিয়েছিল। বেলা তখন অস্তরাগে। গরমকালের মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো হঠাৎ উদয় হলো জসিম মিয়া। সেও খেপ দিতে দিতে ভাটির দিকে যাচ্ছিল। সেই যে কাঁঠালের আঠার মতো দোদেল হামজার পাছায় লাগল আর সরতেই চাচ্ছে না। কতক্ষণ পরপরই অহেতুক প্যাঁচাল পাড়ার তিয়াস লাগে তার, শুরু করলে আর শেষ করার কথা মনে থাকে না। খানিকটা বেহায়া আলাপি মানুষ জসিম মিয়া। ভুলে চক্করে কখনো বাড়ির ঘাটায় গুলনাহারের সঙ্গে দেখা হলেই হলো, গেজাতে গেজাতে কষে একেবারে ফেনা ধরিয়ে ছাড়ে। রাজ্যের নানা খবরাখবর সে মাথায় নিয়ে ঘোরে। দুপুরে একবার দেখা হয়েছিল গুলনাহারের সঙ্গে। হায়াত তালুকদারের প্রসঙ্গ ধরে শুরু করল কথার বুনন। মুখে হাসি ঝুলিয়ে কতক্ষণই-বা সায় দেওয়া যায়! কথার এক ফাঁকে গুলনাহার যখন খানিকটা রসিকতার সুরে বলল-- আচ্ছা জসিম ভাই, তোমারে সবাই ঠাটা জসিম বলে কেন? কই ছোটকালে তো আমরা তোমারে এই নামে ডাকতাম না!

এই সেরেছে! যারা তাকে ঠাটা জসিম বলে, শুরু হলো তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী ধুয়ে দেওয়ার পালা। বাপ-মা তুলে বিশ্রী ধরনের গালাগাল শুরু করল। গুলনাহার ভেবেছিল কথাটা বললে হয়ত জসিম মিয়া লজ্জা পেয়ে নিজের পথ ধরবে। অথচ ফল হলো উল্টো। শেষে গুলনাহার বলতে বাধ্য হলো-- মনে রাগ নিও না জসিম ভাই, ঠাট্টা করেই কথাটা বলেছি।
জসিম মিয়া বলে-- না, ঠাট্টা তুমি করতেই পারো নাহার। আমি বলি ওই বেজন্মাদের কথা। শুয়োরের বাচ্চারা, সাহস থাকে তো আমার সামনে বল, পেছনে ইয়ার্কি-ফাজলামি করস কেন? তুমি আমার ছোডকালের খেলার সাথী। তোমার কথায় মনে রাগ নিবো কেন?

মনে রাগ না নিলেও এসব গালাগালের এক-আধটু ছটা যে গুলনাহারের গায়েও পড়েছে-- তা বেশ বুঝতে পারে গুলনাহার। ঠাট্টা হোক আর যা-ই হোক, ঠাটা শব্দটা তো সে মুখে এনেছে। তবে আর সন্দেহ কী? ছোটকালে সে আদৌ তার খেলার সাথী ছিল কিনা সে কথা মনে নেই গুলনাহারের। দেখা হলেই কেবল ছোটবেলার কথা খুঁচিয়ে তোলে জসিম মিয়া। এখন যে ছোটকালের খেলার সাথীর দোহাই দিয়ে কিছু মনে না নেওয়ার কথাটা বলল, সেটা হয়ত গুলনাহারকে সান্ত¡না দেওয়ারই একটা উসিলা। অন্যের মাথায় বন্দুক রেখে আসলে সে গুলনাহারের দিকেই গুলিটা ছুুড়েছে।

বেচারার নামের শুরুতে এ অদ্ভুত বিশেষণটা কে প্রথম জুড়ে দিয়েছিল তার কোনো পাত্তা নেই। পাত্তা না থাকুক, যে দিয়েছে কাজটা সে খারাপ করেনি বলেই ধারণা লোকজনের। কারণ, জসিম মিয়া যেসব আজগুবি কথাবার্তা বলে তাতে এ বিশেষণের যথার্থতা মেলে। লোকে বলে, ঠাটা জসিমের গল্প ঠাটার মতোই ভারি। তা ঠাটা আদৌ ওজন করা যায় কিনা, করলেও তার ওজন কতটুকু, সেই ওজনের সঙ্গে ঠাটা জসিমের ঠাটামার্কা গল্পের ওজন দেওয়া গেছে কিনা-- সেই বিচারটা কেউ করে না। সবার মুখেই এক নাম-- ঠাটা জসিম। হায়াত তালুকদারও মাঝেমধ্যে তাকে এ নামে ডাকে। সামনে কিছু বলে না বটে, পেছনে তালুকদারের গালে পচা গোবর ছুড়ে মারার ইচ্ছে হয় তার। -- শালার ব্যাটা শালা, মানুষকে ইজ্জত দিতে জানে না।

কথা কিছু বেশি বলে জসিম মিয়া, কিন্তু মনটা তার খুব সরল। সারাক্ষণ ঠাট্টা-রসিকতায় মেতে থাকে। চোখ লাল করে কেউ কখনো ধমক দিলে কাঁচুমাচু শুরু করে দেয়, হে হে করে বোকার মতো হাসে। এত বয়স হলো, তবু বিয়েশাদি করেনি। গাঙের পারে একটা ঝুপড়িতে একলা থাকে। সৎ ভাই-বোনদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই রাখে না। দিন-রাত পড়ে থাকে গাঙে। সকাল-বিকাল জাল কাঁধে কলাপাতা মুড়িয়ে মাছ নিয়ে যে লোকটা গঞ্জের দিকে ছোটে-- সে জসিম মিয়া।

দোদেল হামজা হাঁক দিয়ে বলল-- এবার থামো না জসিম ভাই! তোমার কথার চোটে তো একটা মাছও থাকবে না গাঙে।
উঁহু, থামে না জসিম মিয়া। দোদেল হামজার সঙ্গে না হোক, নিজের সঙ্গেই যেন সে কথা চালিয়ে যায়। অনেকে বলে, তার সঙ্গে নাকি খারাপ কিছু আছে। কদিন আগেও ঝুপড়িতে বসে রাতভর আবোল-তাবোল বকল, শেষ রাতেও থামল না মুখটা। সকালে লোকজন তাকে নিয়ে গেল মোক্তার মৌলবির কাছে। -- দ্যাখেন হুজুর, জইস্যারে জিন-পরিতে নি আসর করছে। ঝাড়-ফুঁ দিয়া তাবিজ-তুরমান একটা দিয়া দ্যান।

হুজুরের সামনে বসেও জসিমের বকা থামে না। মোক্তার মৌলবি ধমক দেয়-- থামো জসিম মিয়া, বেশি কথা আল্লার পছন্দ না।

মৌলবির ধমক খেয়ে গলার আওয়াজ খানিকটা খাদে নামিয়ে আনে, কিন্তু ঠোঁটজোড়ার নড়াচড়া বন্ধ হলো না। আন্দাজি এক দিকে তাকিয়ে ফুসুর-ফাসুর কী সব বকেই যায়। মোক্তার মৌলবিও কম যায় না, রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে মক্তব-ঘরের চাটাইর ওপর বসিয়ে বাইরে থেকে দরজার শেকল আটকে দিল। এটা সকালের ঘটনা। মক্তব ছুটি দিয়ে মোক্তার মৌলবি একবার বাড়ি থেকে ঢুঁ মেরে এল। ভেবেছিল, এবার ছেড়ে দিবে বেচারাকে। মক্তব-ঘরের দরজা খুলে দেখে জসিম মিয়া নেই, রশিটা পড়ে আছে ঘরের এক কোণে। কি আজগুবি কাণ্ড! দ্বন্দ্বে পড়ে গেল মোক্তার মৌলবি। এটা কি জসিম মিয়ার কারামতি নাকি তার সঙ্গে থাকা কোনো ইবলিস-খান্নাসের কারসাজি! দ্বিতীয়টাকেই প্রধান্য দেয় মোক্তার মৌলবি। জাহেল ঠাটা জইস্যার কী সাধ্য কারামতি দেখাবে! তওবা-এস্তেগফার পড়ে মরদুদ শয়তানের কাছ থেকে ফানা চায় মৌলবি। জিনে পাওয়া বহু মানুষ সে দেখেছে জীবনে, কিন্তু এরকম দুষ্টু জিন সে কখনো দেখেনি।

হাঁক দিল জসিম মিয়া-- শোনো হামজা ভাই, গেরামে তুমি নতুন মানুষ, হায়াত তালুকদারের ফন্দি-ফিকিরের কিছুই জানো না। ক্যামনে চুপ থাকি কও, এ দ্যাখো এবার সে গাঙ দখল শুরু করেছে।
: হুঁ, তাই তো দেখছি। -- সায় দিল দোদেল হামজা।

ঘাটের খানিকটা পশ্চিমে বিশাল জায়গাজুড়ে মুলি বাঁশের লগি, কাঁটাবাইরার কঞ্চিঅলা আগা আর বাদি গাছের ডালপালা পুঁতে জাঁক দিয়েছে হায়াত তালুকদার। কদিন ধরে ব্যাপারটা খেয়াল করছে দোদেল হামজা, তবে জাঁক কে দিয়েছে তা জানা ছিল না।

তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ। পৌর্ণমাসীর পুরট চাঁদ বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে। খেপ দিতে দিতে কখন রাত হয়ে গেল তা খেয়ালই ছিল না হামজার। জাল মারতে এলে প্রায়ই এমন হয় তার। বিকেলে হাতে কোনো কাজ না থাকলে আজকাল সে তৌড়া জালটা কাঁধে নিয়ে বের হয়ে পড়ে। কলাগাছের ভেলায় চড়ে একবার উজানে আবার ভাটিতে খেপ দিতে দিতে বেলা ডুবে সাঁঝ হয়। আঁধার ঘন হয়ে এলে তারপর বাড়িমুখী হয়। মাছ তেমন একটা ওঠে না জালে। দু-এক খেপ পর পর দু-চারটা টেংরা বাইলা কি পাবদার বাচ্চা উঠে হয়ত। তাই বলে হাল ছাড়ে না সে। প্রতিবার খেপ দেওয়ার সময় ভাবে এটাই তার শেষ খেপ, আর না, এবার বাড়ি ফিরে যাবে। যেই না একটা বড় পুঁটি উঠে এল জালে, অমনি সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়। না, আরেকটা খেপ দিয়েই যাক, রাত আর কতই-বা হলো! এই করতে করতে শেষ খেপ আর শেষ হয় না তার। তবে আজকে তার কপাল ভালো। সন্ধ্যার পর থেকেই দু-একটা করে মাছ জালে উঠছে। খানিক আগে এক হাতের চেয়ে কিছুটা কম লম্বা একটা আইড়ও পাওয়া গেছে। তাতে লোভ আরো বেড়ে গেছে। কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে সেদিকে মোটেই খেয়াল নেই তার।

তখন হায়াত তালুকদারের ঘের ছাড়িয়ে তারা আরো ভাটিতে চলে এসেছে। জসিম মিয়া বলল-- এক কাম করা যায় না হামজা ভাই?
: কী?
: চল যাই নিকারিপাড়ায়।
: কেন?
: সায়দল মাঝিরে খবর দিয়া আনি।
: তারে দিয়া কী হবে?
: বেড় জাল নিয়ে আসুক সে।
: তো?
: তালুকদারের ঘের বেড় দিমু।
: আরে ধুর, এত মাছ দিয়ে কী করব আমি। ধরা খেলে ইজ্জতের ব্যাপার।
: সব মাছ আমরা নিমু নাকি? সমান সমান ভাগ হবে। আমাদের ভাগেরটা বেচে দিমু সায়দল মাঝির কাছে, কি কও?
: যদি তালুকদারের কানে যায়?
: কেমন করে? দেখছো না কেমন নিরালা জায়গা। রাতে কেউ ভুলেও আসে না এদিকে।
: না রে ভাই, পরের ধনে আমার লালচ নাই।

শুরু হলো আবার জসিম মিয়ার গেজানি-- কথাটা তুমি ঠিক বলনি হামজা ভাই। পরের ধন হলো কেমন করে? তারে জাঁক দিতে বলেছে কোন শালায়? গাঙটাও পত্তনি নিয়েছে নাকি ওই শালার বেটা শালা! গাঙ তার বাপের সম্পত্তি! গাঙের মালিক আমি-তুমি-সবাই। তালুকদার শালার বেটা শালা কোন সাহসে এখানে ঘের দিল?

জসিম মিয়ার খিস্তি-খেউড় উজিয়ে উত্তর তীরের বাঁশঝাড় লাগোয়া ছোট কুমটার কাছে চলে এল দোদেল হামজা। স্রোত এখানে এসে একটা চক্কর দিয়ে আবার ভাটির দিকে ছোটে। এখানে খেপ দিয়ে প্রথমবারেই একটা বড় কালিবাউস উঠেছিল তার জালে। সেই লালসে আর এখান থেকে সরতেই চাচ্ছে না, চক্কর দিতে দিতে কেবল খেপের পর খেপ দিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে ব্যাকুলতা বাড়ে গুলনাহারের। এত রাত হয়ে গেল তবু দোদেল হামজার ফেরার নাম নেই। বারবার দলিজের দিকে তাকিয়ে বাতির আলো জ্বলছে কিনা ঠাহর করে। না, কেউ নেই। দরজা বন্ধ। দাওয়ায় বসা কুত্তাটা কতক্ষণ পরপরই কুঁ-ই কুঁ-ই করতে থাকে। কুত্তার ডাক শুনে হাক দেয় গুলনাহার-- হামজা ভাই, আসলা নাকি?
কুঁ-ই কুঁ-ই করে কুত্তাটা যেন হামজার হয়েই জবাব দেয়--  না গো বু, এখনো আসে নাই।

গাঙে যাবার আগে ঠাট্টা-রসিকতায় বাড়িটা সরগরম করে তুলেছিল হামজা। দুপুরে খেয়ে-দেয়ে নতুন কেনা জুগিদীয়ার শাড়িটা পরেছিল গুলনাহার। আঁচলটা গলায় পেঁছিয়ে তার ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছিল রুপোর হাঁসুলিটা। কপালে দিয়েছিল আলতার টিপ, হাতে পরেছিল বাহারি চুড়ি আর চন্দনের সুবাস মেখেছিল গলায় আর বগলে। দেখে দোদেল হামজা বেশ গম্ভীর গলায় বলেছিল-- ঘর থেকে বের হইও না আইজ।
চুড়িতে রিনঝিন শব্দ তুলে গুলনাহার হেসে বলেছিল-- কেন?
: জিন-পরিতে আসর করতে পারে। -- বলেই হা হা স্বরে হেসে উঠল হামজা। বাঁশের একটা কঞ্চি নিয়ে তাকে তাড়া করল গুলনাহার। তাদের কা- দেখে হাসিনাসহ কয়েকজন ঝি জড়ো হলো উঠোনে। সে কি হাসাহাসি দাপাদাপি তাদের। গৃহকর্ত্রীর মনের আনন্দ দেখে তাদের আনন্দও যেন উথলে উঠল।

সে কথা মনে করে হাসি পায় গুলনাহারের। ধীর কদমে জোছনায় নেমে আসে। জোছনার রাত তার মনে কী এক অব্যক্ত বেদনা জাগিয়ে দেয়। তারকার জলসায় পুরট চাঁদের দিকে তাকালে বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস আসে। কী যেন নেই, কাকে যেন কী বলার ছিল, কোথায় যেন যাবার ছিল, কী যেন করার ছিল-- স্মৃতি ও বিস্মৃতির এসব ঘেরাটোপে পড়ে যায় যেন। তবে আজকের রাতটা যেন একেবারেই আলাদা। বেদনার বদলে এখন ফুরফুরে আনন্দ তার মনে। সমগ্র বিশ্বজুড়ে যেন আনন্দ-লহরী বয়ে চলেছে। ইচ্ছে হয় গাঙের ধারে পৌর্ণমাসীর ওই চিকচিকে চরের দিকে দৌড় দিতে, প্রাণ খুলে হাসতে, কারো সঙ্গে কানামাছি গোল্লাছুট খেলতে। এত সব ইচ্ছার পূরণ যেন সুরের মাধ্যমেই করল সে। বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে গাইতে থাকে :
সহে না সখি, দুরন্ত বসন্ত জ্বালা
চল সখি কুল ত্যাজি, অকূলে দিই প্রেমমালা
বিলায়ে যৌবন ডালা, ঘুচাব মনের জ্বালা
করিব আজ প্রেম খেলা, প্রেম তুফানে ভাসিয়ে ভেলা।
ওদিকের রাস্তায় মুখে শিঁ-ই-শিঁ-ই শব্দ তুলে কে যেন হেঁটে যাচ্ছে। কে আবার? হাঁটার সময় মুখে এরকম শব্দ তো একজনই করে এ গাঁয়ে-- জসিম মিয়া। সামনের দিকে এগিয়ে যায় গুলনাহার। জসিম মিয়ার কাঁধে তৌড়া জাল, হাতে ডুলা।
: জসিম ভাই নাকি?
: উঁ। কে?
: আমি, নাহার?
: আরে নাহার! রাতের বেলা বাইরে কেন?
: তোমার ভাইটারে দেখছনি ভাই, এখনো যে বাড়ি ফিরল না। কত করে বললাম রাতের বেলায় মাছ ধরার দরকার নাই, কানেই তোলে না কথা।
: ও, সে তো এখনো কুমে। এসে পড়বে এখুনি, তুমি বাড়ি যাও।
বাড়ি যায় না গুলনাহার, গাঙের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কুমের কাছাকাছি চলে আসে। ধবধবে জোছনামাখা ফুরফুরে বাতাসে বালুচরে ধুলিঝড় উঠে। বাতাসে দোদেল হামজার গামছা উড়তে দেখা যায়। খানিকটা ঝুঁকে সে জালের রশি গুটাচ্ছে। দেখে মায়া হয় গুলনাহারের। কোমল স্বরে হাঁক দেয়-- কই, শুনছো!
: কে, নাহার নাকি?
: কী, বাড়ি যাবে না নাকি? বালিশ একটা এনে দিই-- ভেলার ওপর জালটা বিছিয়ে শুয়ে পড়।
হা হা শব্দে হাসে দোদেল হামজা। বলে, কুমটা কালিবাউসে ভরা। বড় বড় তিনটা উঠল জালে।

ভেলায় খুঁটি গেঁড়ে তীরে উঠে এল হামজা। ডুলাটা রেখে জালটা সাফ করে নেয়। বালুচরে উবু হয়ে বসে ডুলার মুখে ঝুঁকে মাছ দেখে গুলনাহার। বলে, কই তোমার কালিবাউস, সব তো দেখি নলা?
‘দূর বোকা’ বলে দোদেল হামজা জাল রেখে ডুলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে দেয়। মাছ বের করতে করতে, কালিবাউস ও নলা চেনার উপায় বাতলে দিতে দিতে তার নাক গুলনাহার খোঁপার উপর গিয়ে ঠেকল। হঠাৎ কথা হারিয়ে যায় তার। যে সুবাসের কথা সে কখনো শোনেনি, যে সুবাস জীবনে তার নাকে লাগেনি, সেই অজানা অচেনা উন্মাতাল সুবাস এসে লাগে তার নাকে। তন্ময় হয়ে খোপার উপর ঝুঁকে থাকে কিছুক্ষণ। ডুলা থেকে মাছ বের করে আনার কথা সে ভুলে যায়। এক অদৃশ্য জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় সে যেন ধীরে ধীরে পাথর হয়ে যাচ্ছে। না, ঠিক পাথর নয়-- যেন লোহার শাবল। কোনো এক কামার হাঁপরের কাঠকয়লার আগুনে ঢুকিয়ে দিয়েছে শাবলটা। আগুনের তাপে উষ্ণ হয়ে উঠে শাবল, তারপর ধীরে ধীরে অঙ্গার হতে শুরু করে। জগত আলো করা চাঁদিমায় দোদেল হামজার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথার দিক থেকে একটা হালকা শিরশিরানি নিচের দিকে নেমে যায় গুলনাহারের। ডুলার জায়গায় ডুলা, মাছের জায়গায় মাছ-- সেসব ভুলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে দুই জোৎস্না-মানব।
: কী!-- মৃদু শব্দ করে গুলনাহার।
শব্দটা ঠিক চিনতে পারে না হামজা। এ যেন অন্য কারো গলার আওয়াজ। নির্বিকার দাঁড়িয়ে তাকে সে। মনমাতানো অপার্থিব ঘ্রাণ তাকে যেন বধির করে দিয়েছে। বাতাসের ঝাপটা এসে গুলনাহারের খোলা চুল উড়িয়ে তার বাহু ঢেকে দেয়। হায়াত তালুকদারের ঘেরের দিকে বড় মাছের ঘাই উঠে। দখিনা বাতাস শব্দটাকে ঠেলে নিয়ে এসেছে এদিকে। গুলনাহারের খোঁপার সুবাসটা মিলায় না। গাঙের চরে একবার পাক খেয়ে সারা পৃথিবী সুবাসিত করতে দিকে দিকে ছুটে যাচ্ছে। ডুলার ভিতর  মাছেদের দাপাদাপি শুরু হয়। পশ্চিম আকাশে একটা তারা শাঁই করে উড়ে গিয়ে আরেকটা তারার সঙ্গে ধাক্কা খায়। সেটিকে আর দেখা যায় না। একটার ভেতর আরেকটা সেঁধিয়ে গেল নাকি ছুটে আসা তারাটি ফের ছুটে চলল-- ঝাপসা চোখে তা ঠাহর করা গেল না।

বাংলাদেশ স্থানীয় সময় ১৫০৫, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১০

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa