bangla news

মুক্তির গানের মুক্তি

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-১২-১২ ৬:৫৯:৩১ এএম

`মুক্তির গান` সিনেমাটি মুক্তি দেয়ার আগে সেন্সরবোর্ডের কাছ থেকে যেসব দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল তারেক মাসুদ ২০০৭ সালে তা-ই লিখেছিলেন ‘মুক্তির গানের মুক্তি’ শিরোনামে একটি সাহিত্য পাতায়। ১৬ ডিসেম্বর আসন্ন বিজয় দিবসকে সামনে রেখে বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো লেখাটি।

[তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য চিত্র ‘মুক্তির গান’ । ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে।

তারেক মাসুদ আমাদের চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল এক পরিচালক। মুক্তির গান, মুক্তির কথা, আদম সুরত, মাটির ময়না, অন্তর্যাত্রা, রানওয়ে বা নরসুন্দরের মত ভিন্ন ধরণের চলচ্চিত্রের নির্মাতা তিনি। ১৩ আগস্ট ২০১১ দুপুরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের উপর একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণের অভিপ্রায়ে এদেশের একদল সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গ নেন। `বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা` নামের দলের এই  সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন। এই শিল্পীদের সাথে থেকে লেভিন প্রায় ২০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। যুদ্ধের শেষ দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তিনি ডকুমেন্টারি তৈরি করতে পারেননি।

দীর্ঘ দুই দশক পর ১৯৯০ সালে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ নিউইয়র্কে লেভিনের কাছ থেকে এই ফুটেজ সংগ্রহ করেন। এ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তারা আরো বিভিন্ন উৎস থেকে মুক্তিযুদ্ধের নানা সংরক্ষিত উপাদান সংগ্রহ করেন, বিশ বছর আগের সেই শিল্পীদের সাথে যোগাযোগ করেন। লেভিনের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফুটেজের সাথে সংগৃহীত অন্যান্য উপাদান যোগ করে ছবিটি নির্মিত হয়।

সিনেমাটি মুক্তি দেয়ার আগে সেন্সরবোর্ডের কাছ থেকে যেসব দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল তারেক মাসুদ ২০০৭ সালে তা-ই লিখেছিলেন ‘মুক্তির গানের মুক্তি’ শিরোনামে একটি সাহিত্য পাতায়। ১৬ ডিসেম্বর আসন্ন বিজয় দিবসকে সামনে রেখে বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো লেখাটি।]

Muktir১৯৯০ সালে নিউইয়র্কের এক অভিজাত এলাকার বাড়ির বেসমেন্টে বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ উদ্ধার করে তা থেকে ৪ বছর ধরে ‘মুক্তির গান’ নির্মাণ করে যখন দেশে ফিরলাম তখন ভাবিনি নিজের দেশের সেন্সর বোর্ডে ৪ মাসের জন্য আবার বাক্সবন্দি হয়ে পড়বে। ‘৯৫ সালের গোড়ার দিকে আমরা ৪৩৫ মিলিমিটারের প্রিন্ট নিয়ে দেশে ফিরি। মাথায় দুশ্চিন্তা-প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি দিতে সিনেমা হলগুলো রাজি হবে তো? সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী হাবিব খান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। আশ্বস্ত করলেন এই ছবি দেখতে সিনেমা হলে মানুষ আসবে।

শ্রদ্ধাভাজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল্লাহ খান বাদল ও নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আগে থেকেই ছবিটি শেষ করার ক্ষেত্রে আর্থিক সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন। কথা হয়েছিল তাদেরই পরিবেশনা সংস্থা ‘সম্ভারে’র মাধ্যমে মুক্তির গান পরিবেশিত হবে। ধারদেনা, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত চাঁদার মাধ্যমে ছবিটি নির্মাণ শেষ হলেও ‘সম্ভারে’র সহয়তায়ই চার চারটি প্রিন্ট করা সম্ভব হয়েছিল। ছবিটি সেন্সর বোর্ডে যখন জমা দিলাম তখন দুই বছর ধরে ক্রেডিট কার্ডের সুদ পরিশোধ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি। যথারীতি সেন্সর বোর্ডে ছবি প্রদর্শনীর দিন-তারিখ ঠিক হলো। নিউইয়র্কের দামি ফিল্ম ল্যাবের প্রিন্ট সেন্সর বোর্ডের মধ্যযুগীয় প্রজেক্টরে যাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার জন্য নিজেরাই প্রজেক্টর মেরামত করে নিজেরাই চালালাম।

বোর্ডের সদস্যরা আমাদের চার বছরের সীমাহীন কষ্ট, বেদনা আর পরিশ্রমের ফসল ছবিটি কি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখতে শুরু করল তা প্রজেকশন রুম থেকে দেখে আমাদের মনটা আরও দমে গেল। বোর্ডের সদস্যদের জন্য পর্যায়ক্রমে কেক, কলা, কোকাকোলা ও চা আসতে থাকল। পিযন বেযারার কাপ, গ্লাস, ট্রে নিয়ে অনবরত যাওয়া-আসা আর আওয়াজের মধ্য দিয়ে প্রথম ১০-১৫ মিনিট কেটে গেল। কিন্তু চা পর্ব শেষ হলে এবং বয়-বেয়ারাদের আতিথেয়তা থিতিয়ে এলে বোর্ড সদস্যদের বিরামহীন বকবকানিও আস্তে আস্তে থেমে আসতে শুরু করল। ততক্ষণে ছবিটি বিপুল ভট্টাচার্যের ‘এই না সোনার বাংলা’ গানটিতে এসে পৌঁছেছে। এক পর্যায়ে লক্ষ্য করলাম পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে সবাই ছবিটি দেখছে। বুঝতে পারলাম সমাজের তথাকথিত অভিভাবকদের ওপর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সূচিত হয়েছে। কিছুক্ষণ পর অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করলাম যারা মুক্তির গানকে আর দশটা ধুম-ধাড়াক্কা ছবি হিসেবে গণ্য করে খাওয়া-দাওয়া আর গল্পগুজব করে যাচ্ছিল তারা ছবির দেশাত্মবোধক গানগুলোর সঙ্গে তাল দিতে শুরু করেছে। প্রায় নিশ্চিত হলাম ছাড়পত্র পেয়ে যাব। সদস্যরা ছবি দেখে আমাকে ও ক্যাথরিনকে ডাকলেন। সবাই জানালেন তাদের কোনো আপত্তি নেই, তবে এক সদস্যের দুটি ছোট প্রশ্ন আছে। একটি কলেজের শিক্ষিকা মাননীয় সদস্য বললেন মুক্তিযোদ্ধারা যখন রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনছেন তখন আমরা কেন জিয়াউর রহমানের ছবি ব্যবহার করিনি।উত্তরে আমি বললাম, এটি একটি প্রামাণ্য দৃশ্য। এখানে তো জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি ছিল না এবং থাকারও কথা না। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা জিয়াউর রহমান দেখতে কেমন, বা তার চেহারার সঙ্গেও পরিচিত না। আর যদি এটা কাহিনীচিত্র হতো তাহলে ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করে জিয়াউর রহমানের পোট্রেট  ব্যবহার করতে পারতাম, যেন জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের মনের মুকুরে তাদের নেতার ছবি ভেসে এলো। তখন তিনি বললেন, এটা না হয় বুঝলাম; কিন্ত আপনি জিয়াউর রহমানের মূল ঘোষণাটি কেন ব্যবহার করেননি? উত্তরে আমি বললাম, এটা শুধু মূল ঘোষণাই নয়, এটি জিয়াউর রহমানের ঘোষণার একমাত্র এভেইলেবল রেকর্ডিং। অন্য কোনো ঘোষণার অস্তিত্ব কোথাও নেই। এটি আমি জার্মানের ডয়েসে ভ্যালির রেডিও আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ করেছি। তখন তিনি বলেন, এটা তো ইংরেজি ঘোষণা, উনি বাংলায় আরেকটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। আপনি সেটা বিদেশে নয়, দেশে খোঁজ লাগিয়ে দিন।

অবশেষে আমি বললাম, আমি আড়াই বছর গবেষণা করে এটাই পেয়েছি।তারপরও আমি দেশের সংশ্লিষ্ট যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে খুঁজে দেখব। আমি আরও বললাম, ছবিতে আপনাদের কি আর কোথাও কোনো আপত্তি আছে?

সবাই বললেন, না। আমি বললাম, তাহলে মূল ঘোষণাটি সংযোজন সাপেক্ষে আপনাদের আর কোনো আপত্তি নেই, সেটা জানিয়ে আমাকে একটি চিঠি লিখবেন। তারা আমাকে সেই চিঠি দিলেন।এরপরে আমি বাংলাদেশ রেডিও, বাংলাদেশ টেলিভিশন, চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদফতর, জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভ, জাতীয় মহাফেজখানাসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে জিয়াউর রহমানের মূল ঘোষণাটি তাদের সংরক্ষনে আছে কি না জানিয়ে আমি তাকে চিঠি দিতে অনুরোধ জানালাম। প্রায এক-দেড় মাস লাগিয়ে সবগুলো প্রতিষ্ঠানই অবশেষে আমাকে চিঠি দিলেন যে ঘোষণাটি আমার ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে তা থেকে ভিন্ন কোনো রেকর্ডিং তাদের কাছে নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর এই চিঠিগুলো আমি সেন্সরবোর্ডে জমা দেই। তারপরও চার মাস সেন্সরবোর্ড আমাকে বিভিন্ন অজুহাতে ঘোরাতে থাকে।অবশেষে ১৪ জুন, ১৯৯৫ সালে সংবাদ সম্মেলন করে সংবাদপত্রের মাধ্যমে পুরো ব্যাপারটা জানানোর ঘোষণা দিলে সেন্সরবোর্ড তড়িঘড়ি করে আমাকে ছবিটি আনকার্ড সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়।

এভাবেই ‘মুক্তির গান’ ছবিটি দ্বিতীয়বারের মতো বাক্সবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করে। তবে, সাধারণ মানুষের কাছে ছবিটি মুক্তি দিতে আরও ৬ মাস লেগে যায়।পরিশেষে পরিবেশকহীন এক বিচিত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ‘৯৫ সালের ডিসেম্বরের ১ তারিখে মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তীর প্রাক্কালে ‘মুক্তির গান’ মুক্তির আলো দেখলো।

সংগ্রহ : ফেরদৌস মাহমুদ

বাংলাদেশ সময় : ১৬৩০, ডিসেম্বর ১২, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2011-12-12 06:59:31