bangla news
ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

ব্যানকো [পর্ব-১]

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৯-২৫ ৭:০০:০৭ এএম

দুনিয়াজুড়ে সাড়া জাগানো এবং দীর্ঘদিন ধরে বেস্ট সেলার, ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী হেনরি শ্যারিয়ারের ‘প্যাপিলন’। এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ‘ব্যানকো’ তে।

দুনিয়াজুড়ে সাড়া জাগানো এবং দীর্ঘদিন ধরে বেস্ট সেলার, জেলপালানো কয়েদির মনোমুগ্ধকর আর শিহরণ জাগানিয়া কাহিনী ‘প্যাপিলন’। ফ্রান্সে জন্ম নেয়া হেনরি শ্যারিয়ার ওরফে প্যাপিলন লিখিত বাস্তব এই ঘটনা নিয়ে একই নামে হলিউডে সিনেমাও হয়েছে।  

১৯৩১ সালের অক্টোবরে ফরাসি আদালত কর্তৃক বিনা অপরাধে (প্যাপিলনের দাবি মতে) খুনের আসামি হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৪ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত পরবর্তী ১৩টি বছর হেনরি শ্যারিয়ারের জীবন কেটেছে জেল পালানো এবং আবারো জেলে ফেরার মধ্যে দিয়ে। তবে সত্যিকারার্থে প্যাপিলন জেলমুক্ত হন ১৯৪৫ সালের ১৯ অক্টোবর। এদিন এল ডোরাডো কারাগার থেকে প্যারালাইসিস আক্রান্ত আরেকজন প্রতিবন্ধী কয়েদি পিকোলিনোসহ মুক্ত হন প্যাপিলন।

হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের  হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ।

এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে। স্পেনীয় দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে জন্মভূমির মুক্তি আনয়নকারী মহান নেতা সিমন বলিভারের দেশ এবং বর্তমান সময়ের আলোচিত নেতা হুগো শ্যাভেজের দেশ ভেনিজুয়েলা’র একজন নাগরিক হিসেবে শুরু হয় তার নয়া জীবন। প্যাপিলনের শেষ পৃষ্ঠায় ছিল এল ডোরাডো পেনাল সেটলমেন্টের অফিসার প্যাপিলনকে ‘গুড লাক’ বলে বিদায় জানাচ্ছেন।

আর ব্যানকো’র কাহিনী শুরু ঠিক এর পর থেকে। প্যাপিলনের মতই ব্যানকো-ও উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনায় জমজমাট, শ্বাসরুদ্ধকর আর এক নিঃশ্বাসে পড়ার মত। যারা প্যাপিলন পড়েননি তাদেরও নিরাশ করবে না এই কাহিনী। এখানে প্যাট্রিক ও’ব্রায়ান-এর করা ব্যানকো’র ইংরেজি অনুবাদের সংক্ষেপিত বাংলা রূপান্তর করা হয়েছে। বিভিন্ন নামের উচ্চারণের ক্ষেত্রে ইংরেজিকেই অনুসরণ করা হয়েছে, যেমন- ফরাসী শব্দ ‘পাপিলঁ’-কে করা হয়েছে প্যাপিলন, আবার লেখক অঁরি শারিয়ারকে করা হয়েছে হেনরি শ্যারিয়ার।


(প্রথম পরিচ্ছদ)

মুক্তির পথে

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/Charrire-banco 22220110925164527.jpg‘গুডলাক ফ্রেঞ্চম্যান! এ মুহূর্ত থেকে তুমি মুক্ত, স্বাধীন। অ্যাডিয়স!’
কথা ক’টি শেষ করেই এল ডোরাডো পেনাল সেটেলমেন্টের অফিসার দ্রুত একটি পাক খেয়ে আমার দিকে পেছন ঘুরে দাঁড়ালো।

বিগত তেরটি বছর আমি বন্দিত্বের যে কঠিন শৃঙ্খল বয়ে বেড়াচ্ছিলাম, কাঁধ থেকে তা ঝেড়ে ফেলার পথে এখন আর কোন বাঁধাই রইলো না। পিকোলিনোকে জড়িয়ে ধরে নদীর পাড় থেকে (যেখান থেকে অফিসার আমাদের বিদায় জানায়) ওপর দিকে কয়েক কদম হেঁটে চললাম। জায়গাটা এল ডোরাডো গ্রামের পথে। এখন ১৯৭১ সালের ১৮ আগস্ট ঠিক মধ্যরাতে  আমার পুরনো স্প্যানিস বাড়িতে বসে থেকেও আমি আশ্চর্য রকম স্বচ্ছভাবে সেদিনের ওই পাথুরে পথে নিজেকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। সেদিনকার সেই অফিসারের গম্ভীর অথচ স্পষ্ট বিদায় সম্ভাষণটি এখনো আমার কানে বাজছে। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে সেই সাতাশ বছর আগে ওই অফিসারের বিদায় সম্ভাষণের উত্তরে যেভাবে সৌজন্যসূচক মাথা ঝাঁকিয়েছিলাম, নিজের অগোচরে আজো অবিকল ঠিক সেভাবেই মাথা নাড়িয়ে উঠি।

এখন মধ্যরাত। গভীর নিশুতি। অথচ আমার কাছে মোটেই তা নয়। আমার জন্য, শুধুমাত্র আমারই জন্য, সূর্য এখনো ঝলমল করছে দিনের প্রখর দীপ্তি নিয়ে। আমার চোখে এখন সকাল দশটা। আমি আবেগময় বিস্ফারিত দৃষ্টি নিয়ে এখনো বিহ্বল হয়ে দেখছি কারারক্ষকের ধীরে ধীরে অপসৃয়মান কাঁধ, নিতম্বের শিল্পিত দুলুনি- যা বিগত তের বছরব্যাপী বিরামহীন ক্লেদাক্ত পর্যবেক্ষণ, গুপ্তচরবৃত্তি, অনুসরণের (যা দীর্ঘতর ওই বছরগুলোর প্রতিটি দিন, রাত, ঘণ্টা, মিনিট পর্যন্ত কখনো থেমে থাকেনি) সব- সব কিছুর যবনিকাপাতের ইঙ্গিত বহন করছে। সেদিনকার কারা রক্ষকের ওই নিতম্ব, ওই কাঁধ আমার জীবনব্যাপী দেখা সবচে’ আকর্ষণীয় নিতম্ব আর কাঁধ ছিল- এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ।

নদীতে শেষবারের মত একবার তাকালাম। কারারক্ষীকে ছাড়িয়ে দ্বীপের মধ্যখানে অবস্থিত ভেনেজুয়েলান পেনাল সেটলমেন্টের দিকেও শেষদৃষ্টি বুলালাম। সেখানে মিশে আছে দ্রুত অপসৃয়মান আমার নিকট অতীত, যা মাত্র (!) তের বছর স্থায়ী ছিল, যাতে আমি মর্মান্তিকভাবে হয়েছি নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, ক্ষতবিক্ষত আর অধঃপতিত- তার শেষ দিনগুলোর স্মৃতি।
গ্রীষ্মের প্রখর সূর্যতাপে নদী থেকে উঠে আসা জলীয় বাষ্পে যেন সহসাই আমার রক্তাক্ত অতীতের একের পর এক ছবি ভেসে উঠতে লাগলো। জীবন থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া তেরটি বছরের সুদীর্ঘ পথচারণার কষ্টকর স্মৃতিবহ শ্বাসরুদ্ধকর ছবিগুলো ঠিক যেন চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মত মনে হচ্ছে আমার কাছে। আমি এই হতশ্রী চিত্রকল্প আর দেখতে চাই না! পিকোলিনোকে জড়িয়ে ধরে জলীয় বাষ্পে ফুটে ওঠা ওই ঘৃণ্য ছবিগুলোর দিকে পশ্চাদ্দেশ ঘুরিয়ে তাড়াতাড়ি পথে উঠে এলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রথমেই নিজের শরীরে সজোরে একটা ঝাঁকি দিলাম, যেন আক্ষরিক অর্থেই আমার ঘিনঘিনে অতীতকে চিরদিনের জন্য ঝেড়ে ফেলতে চাইছি আমি।

মুক্তি? হ্যাঁ, কিন্তু কোথায়? আমার জানাশোনা পৃথিবীর একেবারে শেষপ্রান্তে, ভেনেজুয়েলান গায়েনার বিস্তীর্ণ মালভূমিতে, মানুষের কল্পনায় পৃথিবীর খাঁটি নৈসর্গিক শোভাময় বনভূমির মধ্যকার ছোট্ট একটি গ্রামে। জায়গাটা ভেনেজুয়েলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, ব্রাজিলীয় সীমান্তের কাছাকাছি। পুরো এলাকাটাই সবুজের এক বিশাল সমুদ্র যেন। বিরামহীন সবুজের সমারোহের মাঝে এখানে সেখানে প্রায়ই যেন চাঁদের কলঙ্ক এঁকে দিয়েছে এর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া অসংখ্য নদী কর্তৃক সৃষ্ট মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত আর ঝরণার সমষ্টি। এর বাইরে বিরামহীন এই সবুজের মাঝে কোন ছেদ নেই। সুপ্রাচীন এক সবুজের মহাসমুদ্রের এদিক সেদিক ছড়ানো ছিটানো ছোট ছোট গ্রাম, এঁকেবেঁকে চলা মেঠোপথ। আর এসবের মাঝখানে ছোট্ট এক গীর্জা, যেখানে এযাবত কোন ধর্মযাজকই গ্রামবাসীদের সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর সরলতা বিষয়ে কোন গুরুগম্ভীর ধর্মীয় নিগূঢ়বাণী শোনাননি- যেহেতু এখানে এযাবতকাল সেসবের কোন প্রয়োজনই পড়েনি। কারণ যুগ যুগ ধরে এখানকার সাধারণ মানুষগুলো ঠিক ওইভাবেই জীবন যাপন করে এসেছে। স্রেফ একটা বা দু’টো বিচ্ছিন্ন আর নিরালা পায়েচলা পথই এদের একের সঙ্গে অন্যকে জুড়ে রেখেছে পরমাত্মীয়ের মত।

এই পথগুলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হতে হয় যে কিভাবে এগুলো এমন অবিরাম দীর্ঘতর আকার পেয়েছে! চলার পথে এ পথ যেন কোথাও শেষ হয় নাই। এই আত্মসমাহিত প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই এখানকার অতি সাধারণ কাব্যিক মানুষগুলো শত শত বছর যাবত তাদের দৈনন্দিন জীবন উপভোগ করে যাচ্ছে সভ্য জগতে প্রচলিত জীবন ধারণের সব ধরনের বাহুল্যজনক অনুষঙ্গের শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে।

ইতিমধ্যে আমরা মালভূমির প্রান্তে উঠে এসেছি, যেখান থেকে এলডোরাডো গ্রামের শুরু হয়েছে। আমাদের চলার গতি একেবারে শ্লথ হয়ে এসেছে। এখন খুব ধীরে, খুবই আস্তে আস্তে আমরা হেঁটে চলেছি। আমি পিকোলিনোর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম। তারই মত আমিও খুবই গভীরভাবে শ্বাস নিচ্ছি। বাতাসটাকে প্রথমে ফুসফুসের একেবারে তলা পর্যন্ত টেনে নেই, তারপর ধীর ও শান্তভাবে ছাড়ছি বাইরে। আমি ভালোলাগার এই আশ্চর্য মুহূর্তগুলোকে খুব তাড়াতাড়ি শেষ হতে দিতে ভয় পাচ্ছিলাম- মুক্তির এই প্রথম মুহূর্তগুলোকে।

অচিরেই বিশাল বিস্তৃত মালভূমির প্রায় সবটুকু সম্মুখে উন্মুক্ত হল। আমাদের ডাইনে বাঁয়ে ছড়ানো ছিটানো ছোট ছোট অথচ পরিচ্ছন্ন আর ঝকঝকে বেশকিছু বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে । প্রতিটি বাড়িই ফুলে ফুলে ঘেরা।

এক দঙ্গল শিশুর উদয় হল। তারা জানতো আমরা কোথা থেকে এসেছি। গুটিগুটি পায়ে শিশুদঙ্গলটি আমাদের কাছাকাছি এগিয়ে এলো। তবে তাদের আচরণে জেলখাটা দাগী বলে আমাদের প্রতি বৈরী কোন ভাব নেই। বাচ্চাগুলো মনে হলো খুবই সদাশয়। তারা কোন শব্দ না করে পাশেপাশে চলতে লাগলো। মনে হচ্ছে তারা বুঝতে পেরেছে আমাদের জন্য এই সময়টা কতটা গুরুত্ববহ আর মর্যাদাপূর্ণ। তারা ‘আমাদের এই সময়’টাকে আন্তরিক সম্মান দেখালো।
সামনে পড়া প্রথম বাড়িটার মুখেই ছোট্ট একটা কাঠের টেবিল নিয়ে মোটাসোটা কালোপানা এক মহিলা কফি আর অ্যারিপাস বিক্রি করছিলো, সাথে মেইজের তৈরি কেক।

: গুড মর্নিং, লেডি।
: বুয়েনস দিয়াস, হোমরে!
: দু’কাপ কফি প্লিজ।
: সি সির্ন্স।
মোটাসোটা সদাশয় জীবটি সুস্বাদু দু’কাপ কফি ঢেলে দিল। কোন আনুষ্ঠানিকতার ধারে কাছে দিয়ে না গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পান করলাম আমরা।
‘কত দিতে হবে?’
‘কিছুই না।’
‘তা কি করে সম্ভব!’
‘মুক্তির এই শুভলগ্নে তোমাদের প্রথম কফিটুকু গেলাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’
‘ধন্যবাদ। এখান থেকে বাস কখন ছাড়বে?’
‘আজ ছুটির দিন, তাই কোন বাস নেই। তবে এগারটার দিকে একটা ট্রাক যাবে।’
‘সত্যি? আবারো ধন্যবাদ তোমাকে।’
http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/healthy-tea20110925190854.jpgএসময় পাশের একটি বাড়ি থেকে কালো চোখ আর উজ্জ্বল ত্বকের এক তরুণী বেরিয়ে এলো। আন্তরিক হাসিতে সম্ভাষণ জানাল: ভেতরে এসে বসুন আপনারা।
ঘরের ভেতরে গেলাম। জনা বারো লোক বসে রাম টানছে। পাশে গিয়ে বসলাম।
‘আপনার সঙ্গীর মুখ দিয়ে লালা ঝরছে কেন?’
‘ও অসুস্থ।’
‘আমরা কি তার জন্য কিছু করতে পারি?’
‘না, দরকার নেই। ও প্যারালাইসিস আক্রান্ত। ওকে হাসপাতালে যেতে হবে।’
‘তার দেখাশোনা করবে কে?’
‘আমিই।’
‘সে কি আপনার ভাই?’
‘না, আমার বন্ধু।’
‘সঙ্গে কি পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা আছে, ফ্রেঞ্চম্যান?’
‘খুবই সামান্য। আপনারা কি করে জানলেন আমি ফরাসী?’
‘এখানে সব কিছুই খুব দ্রুত জানাজানি হয়ে যায়। আমরা জানতাম আপনারা গতকাল ছাড়া পাচ্ছেন। আপনি ডেভিলস আইল্যান্ড থেকে পালিয়েছেন এবং ফরাসি পুলিশ আপনাকে খুঁজছে। কিন্তু তারা আর এদেশে এসে খোঁজাখুজি করতে পারবে না, এখানে তাদের আইন চলে না। আমরা সবাই আপনাদের দেখাশোনা করবো।’
‘কেন?’
‘কারণ...’ কথা সম্পূর্ণ হলো না।
আমি অবাক হয়ে বক্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আসলে কি বোঝাতে চাইছেন?
: আগে একপাত্র রাম নিন এবং একটা আপনার বন্ধুকেও দিন। তারপর শুনুন আসলে আমরা কী বলতে চাই।
এবার কথা বলে উঠলেন বছর তিরিশেক বয়সের প্রায় কালো এক মহিলা। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি বিবাহিত কী না।
: হ্যাঁ। ফ্রান্সে।
‘বাবা-মা জীবিত?’
: শুধু বাবা।
‘তিনি জেনে সুখী হবেন যে আপনি ভেনেজুয়েলায় আছেন।’
: তা ঠিক।
লম্বা শুকনোমত এক লোক এবার কথা বলে উঠলেন। বড় বড় বিস্ফারিত এক জোড়া চোখ তার। তবে খুবই দয়ার্দ্র সেগুলো।
‘আপনাদের আমরা কেন দেখাশোনা করতে চাই- এই কথাটা কিভাবে বলতে হবে সে আসলে তা জানে না। যাক, সে ক্ষেত্রে আমিই বলছি।
একজন মানুষ অতীতে যা করেছে তার জন্য অনুতপ্ত হতে পারে এবং তারপর সে আবার ভালোমানুষে পরিণত হতে পারে, যদি উপযুক্ত সহযোগীতা পায়- যদি না লোকটা উন্মাদ, অপ্রকৃতিস্থ হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্য কারোই করার কিছু নেই। ভেনেজুয়েলাবাসী ঠিক এ কারণেই আপনাদের দেখাশোনার ভার নেবে। কারণ আমরা অচেনা লোকদের ভালোবাসি, আর ঈশ্বরের কৃপায় তাদেরকে বিশ্বাসও করি।’
: ডেভিলস আইল্যান্ডে কি অপরাধে আমি সাজা খাটছিলাম, সে ব্যাপারে আপনাদের কী ধারণা?
‘নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু। হয়তো বা কাউকে খুন করার জন্যে, অথবা বড় ধরনের কোন চৌর্যবৃত্তির জন্যে। আপনার কি সাজা হয়েছিল?’
: যাবজ্জীবন।
‘এখানকার সর্বোচ্চ শাস্তি ত্রিশ বছর। আপনি কত বছর খেটেছেন?’
: তের। কিন্তু এখন আমি মুক্ত।
‘সবকিছু ভুলে যাও, বন্ধু!’
আবারো শুরু করলো সে- ‘ফরাসী কারাগারে আর এখানে এল ডোরাডোয় আপনার যে ভোগান্তি হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব তা ভুলে যান। স্রেফ ভুলে যান! কারণ যদি এ বিষয়ে খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা শুরু করে দেন তাহলে এটা আপনাকে অন্যের প্রতি অশুভ প্রবৃত্তির দিকে ঠেলে দেবে। এবং হতে পারে এর থেকেই আপনি আবার আশ-পাশের সবাইকে ঘৃণা করা শুরু করে দিবেন। শুধুমাত্র ভুলে যাওয়ার মাধ্যমেই আপনি আবার সবাইকে ভালোবাসতে পারেন এবং সবার মাঝে মিলেমিশে বসবাস করতে পারেন। যত শিগগির সম্ভব বিয়ে করে ফেলুন। এই দেশের মেয়েদের রক্ত ভালোবাসার আবেগে উষ্ণ। আর যে মেয়েকেই এখানে স্ত্রীর মর্যাদা দেবেন, বিনিময়ে সে আপনাকে দেবে সন্তান এবং সুখ। ব্যাপারটা একই সঙ্গে আপনার যন্ত্রণাময় অতীতকে ভুলে যেতে সাহায্য করবে।’

ইতিমধ্যে ট্রাক পৌঁছে গিয়েছিল। আমি পিকোলিনোকে একহাতে ধরে এই হৃদয়বান লোকগুলোকে বিদায় জানিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। ট্রাকের পেছনের অংশে পাতা বেঞ্চিতে প্রায় দশজন বসে আছে। এই মার্জিত লোকগুলোও তাদের উষ্ণ আন্তরিকতা থেকে আমাদের বঞ্চিত করলো না। তারা ড্রাইভারের পাশের সেরা দুটো আসন আমাদের জন্য ছেড়ে দিল।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/BancoReparo2-20522-1220110925164424.jpgভাঙ্গাচোরা এবড়ো-থেবড়ো পথে টালমাটাল অবস্থায় এগিয়ে চললো ট্রাক। আমি চুপচাপ বসে এই আশ্চর্য ভেনেজুয়েলান জাতি সম্পর্কে ভাবতে লাগলাম। এল ডোরাডোর সাধারণ সৈনিকরা বা পারিয়া উপসাগরের সেই জেলেরা কিংবা ওই মাটির কুঁড়ে ঘরে বসা শ্রমিক শ্রেণীর লোকগুলো- তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই ছিল না, কষ্টেসৃষ্টে কোনমতে হয়তো পড়তে-লিখতে পারে। অথচ কোত্থেকে তারা এ ধরনের খৃস্টানসুলভ পরোপকারী আর সদাচরণ রপ্ত করলো, হৃদয়ের এই সুবিশাল মহত্বই বা কোথা থেকে অর্জন করলো যা মানুষের অতীত অপরাধের জন্য তাকে এমন অবলীলায় ক্ষমা করে দেয়? কিভাবে তারা অমন দক্ষতার সঙ্গে ঠিক উপযুক্ত আর প্রয়োজনীয় উৎসাহব্যঞ্জক শব্দগুলো বাছাই করলো একজন প্রাক্তন দাগী আসামীকে সৎ-পরামর্শ দিয়ে নতুন জীবন শুরুর তাগিদ দেওয়ার অভিপ্রায়ে! অথচ তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সহায়-সম্বল আর ক্ষমতাই বা কতটুকু? আবার এল ডোরাডো জেলখানার অফিসার আর গভর্নর- যারা শিক্ষিত আর আধুনিক মানুষ, আশ্চর্যজনকভাবে তারাও ওই সাধারণ মানুষগুলোর মত একই মতবাদে বিশ্বাসী। যে মতবাদে, যে বিশ্বাসে একজন পতিত মানুষকে আবার উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তা সে যে-ই হোক না কেন কিংবা যে ধরনের গুরুতর অপরাধই করে থাকুক না কেন। এগুলি এমনই এক সদগুণ যা কোন মতেই একজন ইউরোপীয়ানের কাছে আশা করা যায় না। সুতরাং আমি নিশ্চিত ভেনেজুয়েলানরা এই গুণ ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকেই রপ্ত করেছে।

                               ***

এল ক্যালাও-এ এসে পৌঁছলাম। বিরাট এক স্কয়ার। পরিপাটি। আজ ৫ জুলাই, ভেনেজুয়েলার জাতীয় দিবস। ছুটির দিন। মানুষজন তাদের সবচে’ ভাল কাপড়-চোপড় পড়েছে। চারদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অধিবাসীদের বহুবর্ণের চামড়ার অপরূপ সমাবেশ। কালো, হলদে, সাদা, আর ইন্ডিয়ান তামাটে বর্ণের যাদের চোখ ঈষৎ তীর্যক আর ত্বক উজ্জ্বল- হরেক জাত-পাতের এক অপরূপ মিশেল। দুনিয়ার প্রায় সব বর্ণের মানুষের রং মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এখানে। পেছনের কিছু যাত্রীর মত আমি আর পিকোলিনো নেমে আসলাম ট্রাক থেকে। সহযাত্রীদের মধ্য থেকে এক তরুণী আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো- পয়সা দিতে হবে না। আপনাদের ভাড়া দেওয়া হয়ে গেছে।

ড্রাইভার আমাদের শুভ কামনা জানিয়ে ট্রাকসহ বিদায় নিল।
আমার এক হাতে ছোট্ট পুটুলি আর অন্য হাতটি পিকোলিনো তার এক হাতের অবশিষ্ট তিনটি আঙ্গুল দিয়ে ধরে আছে। এ অবস্থায় আমি কিছুটা হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইলাম এখন কী করবো তা ঠিক করতে না পেরে। সঙ্গে পুঁজিবাট্টা বলতে আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে সংগ্রহ করা কিছু ইংলিশ পাউন্ড আর ১ শ’ বলিভারের কয়েকটি নোট (সমসাময়িক মুদ্রাবাজারের হিসাবে ১ বলিভার সমান দশ নয়া পেন্সের মত)। এগুলো পেনাল সেটেলমেন্টে আমার অংকের ছাত্ররা দিয়েছিল। এর বাইরে ছিল কিছু হীরক খণ্ড যা আমার করা টমেটো বাগানের মাটি খুঁড়ে পেয়েছিলাম।

ভাড়া দিতে বারণ করেছিল যে মেয়েটি সে কাছে এসে এবার জানতে চাইলো আমরা কোথায় যাচ্ছি।
: আমার ইচ্ছা একটা ছোটখাটো বোর্ডিং হাউজে উঠবো।
‘আগে আমার জায়গায় চলুন। পরে ইচ্ছেমত খুঁজে দেখতে পারবেন।’
মেয়েটির সঙ্গে স্কয়ার পার হয়ে শ’ দুয়েক গজ যেতেই একটা কাঁচা রাস্তায় এসে পড়লাম যার দু’পাশ নিচু ধাঁচের কিছু বাড়ি-ঘরের সঙ্গে মিশে আছে। সবগুলো বাড়িই কাদামাটির দেয়াল দিয়ে তৈরি। ছাদগুলো কোনটির শনের আবার কোনটির ঢেউটিনের। এরকমই একটি বাড়ির সামনে আমরা থামলাম। মেয়েটি ভেতরে ঢুকে গেল।

: আসুন। এ বাড়ি আপনাদেরই।
ভেতর থেকে বললো সে। খুব সম্ভব অষ্টাদশী।
সে আমাদেরকে অনেকটা যেন তাড়িয়েই বাড়ির  ভেতরে নিয়ে গেল। একটি ঘরে প্রবেশ করলাম। পরিচ্ছন্ন, মাটি পিটিয়ে মেঝে তৈরি করা হয়েছে। গোলাকার একটি টেবিল আর গুটিকয় চেয়ার রাখা আছে। মাঝারি উচ্চতার একজন পুরুষ, বয়স প্রায় চল্লিশ, কালো কোমল চুল মাথায়, গায়ের রং মেয়েটির মতই, চোখ দু’টোয় ইন্ডিয়ান ছাপ- বসে আছে।  ঘরে এছাড়া আরো তিনটি মেয়ে বয়স যথাক্রমে চোদ্দ, পনের এবং ষোল, বসে আছে।
‘আমার বাবা এবং বোনেরা,’ বললো সে। বাবা আর বোনদের দিকে ফিরে বললো, আমি দু’জন অপরিচিত ভদ্রলোক বাসায় নিয়ে এসেছি। তারা এল ডোরাডো জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে এবং এখন কোথায় যাবে জানে না। আমি তোমাদের অনুরোধ করছি, ওদের গ্রহণ কর।

‘তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি,’ মারিয়ার বাবা বললো। এবং সেই সনাতন, উদাত্ত আর উষ্ণ পংক্তির পুনরাবৃত্তি হলো আবারো- ‘এটা আপনাদেরই ঘর!’
এই টেবিলটার সামনে বসুন। আপনারা কি ক্ষুধার্ত? কফি অথবা রাম চলবে?
আমি ‘না’ বলে তার কাছে অপরাধী হতে চাইলাম না। বললাম, কফি পেলে খুশি হবো।
বাড়িটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তবে ঘরের সাধারণ আসবাব দেখে বুঝলাম তারা গরীব।
ওদিকে মারিয়ার বাবা বলছিল, ‘মারিয়া, যে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছে সে আমার মেয়েদের মধ্যে সবার বড়। সে এখন পরিবারে তার মায়ের ভূমিকা পালন করছে। ওর মা পাঁচ বছর আগে এক স্বর্ণখনি সন্ধানীর সঙ্গে চলে গেছে। আপনাকে অন্য কেউ শোনানোর আগে আমিই সে কাহিনী জানিয়ে দেব।’

মারিয়া আমাদের জন্য কফি ঢাললো। সে তার বাবার পাশে এসে বসেছে। আমার ঠিক মুখোমুখি। ফলে তাকে এখন আরো কাছ থেকে এবং ভালোমত দেখতে পেলাম। বাকি তিন বোন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তারাও আমাকে খুব কাছ থেকে দেখছে।
মারিয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের মেয়ে। টানা টানা বিশাল চোখ। মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি করে দু’ভাগ করা ঘোর কৃষ্ণ কোঁকড়ানো চুল দুই কাঁধে ছড়িয়ে পড়েছে। দেহ-কাঠামো আকর্ষণীয়। যদিও গায়ের রং থেকে ইন্ডিয়ান রক্তের মিশেল খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু চেহারায় মঙ্গোলিয়ান কোন ছাপ নেই। ঠোঁট দুটো উত্তেজনার উদ্রেককারী: তার ভেতরে সারিবদ্ধ পরিপাটি ঝকঝকে দাঁতের সমাবেশ। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে বারবার ওর অতি গোলাপী জিভের অগ্রভাগ দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। ফুলের ছাপাওয়ালা সাদা একটা ব্লাউজ পড়েছিল মারিয়া। গলাটা একটু বেশিই খোলা। ফলে বক্ষবন্ধনীর খবরদারীতে থাকা স্তনজোড়ার সূচনাভাগ ও উন্মুক্ত কাঁধ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। এই ব্লাউজটি, একটি ছোট কালো স্কার্ট, ফ্লাট হিল্ জুতো- এগুলোই সে পরেছিল উৎসবের দিনে। তার সবচেয়ে ভালো পোশাক বলতে যা বোঝায় এগুলো তাই।
মারিয়ার ঠোঁটজোড়া টুকটুকে লাল। বিশাল চোখ দু’টোর দু’কোনায় পেন্সিলের দু’টো টান ওগুলোকে আরো আয়ত করে তুলেছে।
http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/guyana20110925182637.jpg
‘এ হচ্ছে এসমারেল্ডা (এমারেল্ড থেকে এসমারেল্ডা)’, সবচে’ ছোট বোনটিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে মারিয়া। আমরা ওর সবুজ চোখের জন্য ওকে এ নামে ডাকি। এর নাম কনচিটা। আর ওটা হচ্ছে রোজিটা- কারণ ওকে দেখতে গোলাপের মত লাগে। আমাদের অন্য সবার চেয়ে ওর রং পরিষ্কার এবং তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়েও সে লাজরাঙা হয়ে পড়ে। এখন আপনি পুরো পরিবারকে চেনেন। আমার বাবার নাম জোসে। আমাদের এই পাঁচ জনের আত্মা একসূত্রে গাঁথা। কারণ আমাদের সবগুলো হৃদয় একই ছন্দে স্পন্দিত হয়। এবার বলুন আপনার নাম কি?
: এনরিক (হেনরিকে স্প্যানিশে এনরিক বলা হয়)।
আপনি কি দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন?
: তের বছর।
দুঃখজনক ব্যাপার। খুব কষ্টে কেটেছে নিশ্চয়!
: হ্যাঁ। বিরাট এক কাহিনী।
বাবা, এনরিক এখানে কী ধরনের কাজ করতে পারবে বলে মনে কর?
‘আমি জানি না। তোমার কি কোনো কাজ জানা আছে?’
: না।
অসুবিধা নেই। স্বর্ণখনিতে চলে যাও। তারা তোমাকে কাজ দেবে।
: তোমার কি অবস্থা জোসে? কি কাজ কর?
‘আমি? কিছুই না। আমি কাজ করি না- কারণ এখানে কাজের মজুরি খুবই কম।’
বেশ, বেশ, বেশ। নিশ্চিতভাবে বলা চলে তারা বেশ গরীব। তারপরেও প্রত্যেকে ভালো পোশাক-আশাক পড়ে আছে। তবে আমি জোসেকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না যে তার উপার্জন তাহলে কোন পথে আসে। কাজই যদি না করে তাহলে তার পেশা কি চৌর্যবৃত্তি? ‘অপেক্ষা কর এবং দেখ’- নিজেকে সাজেশন দিলাম।

‘এনরিক, আজ রাতে আপনারা এখানেই থাকবেন।’ মারিয়া বললো। ‘আমাদের আরেকটা ঘর আছে যেখানে আমার চাচা থাকতেন। উনি চলে গেছেন, তাই আপনারা তার জায়গাটা নিতে পারেন। যে সময়টুকু আপনি কাজে থাকবেন ততক্ষণ আমরা বোনেরা আপনার অসুস্থ বন্ধুর দেখাশোনা করবো। আমাদের ধন্যবাদ দিতে যাবেন না আবার এজন্যে। আসলে আমরা আপনাকে আদপে কিছুই দিচ্ছি না- ঘরটা এমনিতে খালি পড়ে আছে।’

এর উত্তরে কি বলবো আমার জানা ছিল না। তারা আমার ছোট্ট পুটুলিটা উঠিয়ে নিল- আমি বাধা দিলাম না। মারিয়া উঠে দাঁড়াতেই বোনেরা তাকে অনুসরণ করল। সে আসলে মিথ্যা বলেছিল আমাকে। চাচার খালি করে যাওয়া ঘরটা আসলে তারা ব্যবহার করছিল। দেখলাম তারা ওই ঘরটা থেকে মেয়েলি জিনিসপত্র বের করছে। আমি ভান করলাম যেন এসব দেখছি না। ঘরটিতে কোন বিছানা ছিল না, তবে ছিল তারচেয়ে ভাল কিছু। হ্যামক, উলের তৈরি দু’টো ঝুলন্ত বিছানা। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় এ বিছানা। ঘরে একটা বড় জানালা; ঝাঁপওয়ালা- কাঁচ বা অন্য কিছু নেই, কলা আর পাম গাছে ভর্তি একটি বাগানের দিকে মুখ করা এটি।

হ্যামকে শুয়ে দোল খেতে খেতে ভাবছিলাম ঘটনার পরম্পরা। কি থেকে কী হচ্ছে! আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। মুক্তির এই প্রথম দিনটি কী সহজভাবেই না কেটে গেল! খুব বেশি সহজ। আমার এখন একটা নির্ঝঞ্ঝাট আশ্রয় আছে আর পিকোলিনোকে দেখাশোনার জন্যে চারজন চমৎকার মিষ্টি মেয়ে রয়েছে। আচ্ছা, আমি কেন নিজকে অন্যের হাতে এমন শিশুর মত পরিচালিত হতে দিচ্ছি? আমি কি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি- ঘটনা কি এতদূর?
কিন্তু না, আমার মনে হচ্ছে যেহেতু দীর্ঘদিন কয়েদী হিসেবে জীবন-যাপন করেছি এবং আদেশ পালন করাটাই সবচে’ ভাল বুঝতাম, তাই এখনো নিজেকে এভাবে অন্যের হাতে সহজে পরিচালিত হতে দিচ্ছি। এটাই সত্য। অথচ এটাও ঠিক যে আমি এখন মুক্ত মানুষ এবং এখন থেকে আমার নিজের সিদ্ধান্ত নিজেরই নেওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তারপরেও আমি নিজেকে অন্যের রা পরিচালিত হতে দিচ্ছি। ব্যাপারটা দীর্ঘদিন খাঁচাবন্দি থাকা পাখির মত, দরজা খুলে দেওয়ার পরও সে সহসাই বেরিয়ে আসে না, কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে স্থানুর মত। কারণ দীর্ঘ অনভ্যাসে, কিভাবে উড়তে হয় বোধ করি  সে ভুলেই গেছে। এক্ষেত্রে তাকে একেবারে শুরু থেকে আবার ওড়া শিখতে হবে।

অতীত সম্পর্কে আর কোন চিন্তাভাবনা করা বাদ দিয়ে শুতে গেলাম। ঠিক যেমনটি এল ডোরাডোর সেই সদাশয় লোকটি আমাকে উপদেশ দিয়েছিল। নিদ্রার অতলে ডুবে যাওয়ার আগে শুধুমাত্র একটা চিন্তা আমাকে ভাবিত করেছিল: এই লোকগুলোর আতিথেয়তার ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্য ধরনের, অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। এ ভাবনার রেশ ধরেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে নাস্তা সারলাম শুধুমাত্র দু’টো ভাজা ডিম, মার্জারিন মোড়ানো দু’টো ভাজা কলা আর কালো রুটি দিয়ে। মারিয়া শোওয়ার ঘরে পিকোলিনোকে ধুয়েমুছে দিচ্ছিলো। দরজার মুখে এসময় একজন আগন্তুককে দেখা গেল: কোমড়ের বেল্টে ম্যাশেটে নামক বড়সর ছোরা ঝোলানো।

‘জেন্টেস ডি পাজ!’ আগন্তুক উচ্চারণ করলো। এর অর্থ আমি একজন বন্ধু।
: কি চাও তুমি? জোসে জিজ্ঞেস করলো। আমার সঙ্গে সেও নাস্তা শেষ করেছে মাত্র।
‘পুলিশ প্রধান জেল ফেরৎ লোক দু’টোকে দেখতে চেয়েছেন। ’
: এভাবে বলো না! ওদের নাম আছে- নাম ধরে সম্বোধন কর।
‘ঠিক আছে জোসে। তাদের নামগুলো যেন কি?’
: এনরিক আর পিকোলিনো।
‘সিনর এনরিক, আমার সঙ্গে চল। আমি একজন পুলিশ, চিফ পাঠিয়েছেন।’
‘তারা ওর কাছে কি চায়?’ ঘর থেকে বের হয়ে মারিয়া শুধালো। ‘আমিও যাবো। একটু অপেক্ষা কর, কাপড় পাল্টে নেই।’
অল্পক্ষণেই সে তৈরি হয়ে এল। রাস্তায় নামামাত্রই মারিয়া আমার বাহু আঁকড়ে ধরে চলতে লাগলো। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। জবাবে মুচকি হাসলো সে।
শিগগিরই ছোট্ট প্রশাসনিক ভবনটিতে পৌঁছে গেলাম। বেশ কিছু পুলিশ দেখা গেল। দু’জন বাদে সবাই সাধারণ পোশাকে । এ দু’জন ইউনিফর্ম পরে আছে এবং যথারীতি কোমরে ম্যাশেটে ঝোলানো। একটি ঘর দেখলাম রাইফেল ভর্তি। সেখানে বসা সোনালী ফিতা জড়ানো ক্যাপ পড়া কালোমত একজন মানুষ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই সেই ফ্রেঞ্চম্যান?
: হ্যাঁ।
‘আরেকজন কোথায়?’
: সে অসুস্থ। মারিয়া জবাব দিল।
‘এখানকার পুলিশকে আমি কমান্ড করি। অফিসিয়ালি তোমাকে সাহায্য করতে চাই আমি এখানে। এবং এর বাইরে অন্য কোন ধরনের উপকারও যদি তোমার প্রয়োজন হয়, আমাকে বলতে পার। আমার নাম আলফনসো।’ সে তার হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে।
: ধন্যবাদ। আমি এনরিক।
‘এনরিক, প্রধান প্রশাসক তোমাকে দেখতে চেয়েছেন।’ মারিয়া উঠে আমাকে অনুসরণে উদ্যত হতেই পুলিশকর্তা বললেন, ‘মারিয়া, তুমি ভেতরে যেতে পারো না।’ আমি একা পাশের রুমে প্রবেশ করলাম।
‘সুপ্রভাত ফ্রেঞ্চম্যান। আমি এখানকার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। বসে পড়। যেহেতু তুমি এখানে, এল ক্যালাও-এ একজন বাধ্যতমূলক অধিবাসী এখন, তাই আমাকে পাঠানো হয়েছে তোমাকে জেনে রাখার জন্যে: কারণ তোমার ভালোমন্দ কাজের আর আচার-আচরণের জন্য আমিই দায়বদ্ধ থাকবো।’ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি এখন আসলে কি করতে যাচ্ছি। একটু পায়চারী করে আবার বললেন, ‘কোথাও কোনো ব্যাপারে প্রয়োজন পড়লে আমার সঙ্গে এসে দেখা করবে। আমি তোমাকে সম্ভবমত একটি সুন্দর জীবনের ব্যবস্থা করে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।’
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
‘আর হ্যাঁ, অন্য আরেকটা ব্যাপার। তোমাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য বলছি, তুমি খুবই সতী আর মমতাময়ী কিছু মেয়ের সঙ্গে বাস করছো; কিন্তু তাদের বাবা জোসে, সে একজন জলদস্যু।
আশা করছি আমাদের আবারো দেখা হবে।’
মারিয়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেকটা ইন্ডিয়ান নারীরা যেমন প্রিয়জনের জন্যে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, তেমনি। কোন নড়াচড়া নেই, কারও সঙ্গে কথাও বলছেনা। সে আদপে ইন্ডিয়ান নয়, তা সত্ত্বেও তার শরীরে ইন্ডিয়ান রক্তের সামান্যতম যে ছোঁয়া ছিল বুঝিবা সে কারণেই ভারতীয়সুলভ এই আচরণগুলো মাঝেমধ্যেই ফুটে উঠতো ওর মাঝে। বাড়ি ফেরার পথে আমরা অন্য রাস্তা ধরলাম। পুরোপথ ও আমার হাত ধরে থাকলো।
‘চিফ তোমার কাছে কি চায়?’
এই প্রথম সে আমাকে ‘তু’ মানে ‘তুমি’ সম্ভোধন করলো।

: তেমন কিছুই না। কোন কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অথবা অন্য কোন সমস্যায় পড়লে যেন তার শরণ নেই, তাই বললেন।
‘এনরিক তোমার এখন কারও প্রয়োজন নেই। তোমার বন্ধুর জন্যও কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’
: অসংখ্য ধন্যবাদ, মারিয়া।
এক ফেরিওয়ালার স্টলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দোকানটি মেয়েদের অল্পদামী অলংকারেভর্তি নেকলেস, ব্রেসলেট, কানের দুল, ব্রুচেস ইত্যাদি।
‘এ্যাই, দেখ তো এগুলো কেমন?’
: ওহ, কী সুন্দর!

আমি মারিয়াকে কানের দুলের সঙ্গে ম্যাচ করে দোকানে থাকা সেরা হারটি কিনে দিলাম। ওর ছোট বোনদের জন্যেও তিনটি সেট নিলাম। এক শ’ বলিভারের একটি নোট ভাঙ্গিয়ে ত্রিশ বলিভারে মূল্য পরিশোধ করলাম এই তুচ্ছ-খেলো জিনিসগুলোর জন্য। ওদিকে খুশিতে ডগমগ  মারিয়া দুল জোড়া আর হারটি সঙ্গে সঙ্গে পড়ে ফেলেছে। ওর বিশাল কালো চোখ দু’টো আনন্দে চক চক করছিল।  আমাকে সে এমনভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে থাকলো যেন ওগুলো সত্যিকারের দামী অলংকার।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011September/gangtok220110925183937.jpgআমরা বাড়িতে ফিরলাম। ছোট তিন বোন উপহার পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলো। ওদেরকে ছেড়ে আমার ঘরে চলে এলাম। কিছু ভাবনা-চিন্তার জন্য আমার এখন একটু একা থাকা দরকার। এ পরিবারটি আমাকে তাদের আতিথেয়তার স্বর্ণপাত্র উজার করে দিয়েছে। কিন্তু এভাবে অবলীলায় আমার কি এসব গ্রহণ করা উচিৎ হচ্ছে? সম্পদ বলতে আমার আছে ভেনেজুয়েলান কিছু মুদ্রা আর ক’টা ইংলিশ পাউন্ড, হীরকগুলোর কথা না ভাবাই ভালো। এ অর্থ ব্যয়ে আমি চার মাসের কিছু বেশি দিন খেয়ে-পড়ে চলতে পারি এবং পিকোলিনোরও দেখাশোনা চালানো যেতে পারে এতে করেই।

এ বাড়ির মেয়েগুলোর প্রত্যেকেই মোহময়ী এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পুষ্পের মত ভালোলাগার উষ্ণতায় পূর্ণ, লাস্যময়ী, অতি সহজেই নিজেকে উজার করে দিতে প্রস্তুত- কোন সাত-পাঁচ না ভেবেই। আমি লক্ষ্য করেছি মারিয়া আজ আমার দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিলো তাতে মনে হয় ও ইতিমধ্যেই আমার প্রেমে পড়ে গেছে। এত শত প্রলোভন কি আমি উপেক্ষা করে থাকতে পারবো? বরঞ্চ এই অতি অতিথিপরায়ণ উদার গৃহটি ত্যাগ করাই আমার জন্যে সমীচীন হবে। কারণ আমি নিজের দুর্বলতায় জড়িয়ে আর কোন ভোগান্তি, কোন যন্ত্রণা পোহাতে চাই না। অন্যদিকে আমার বয়স এখন সাঁইত্রিশ। যদিও বয়সের তুলনায় কিছুটা তরুণ দেখায়- তবুও তা আমার সত্যিকার বয়সকে তো মুছে দিতে পারবে না। মারিয়ার বয়স পুরো আঠারোও না এবং তার বোনেরা এখনো অপ্রাপ্ত বয়স্কা।

এই গৃহ আমাকে ত্যাগ করতেই হবে- আমি ঠিক করলাম। সবচে’ ভালো হয় পিকোলিনোকে ওদের হেফাজতে রেখে যাওয়া। তবে অবশ্যই এজন্যে প্রয়োজনীয় মাসোহারা দিয়ে যেতে হবে আমাকে।

‘সিনর জোসে, তোমার সঙ্গে আমি একটু একা কথা বলতে চাই। আমরা কি ওই স্কয়ারের কাফেতে গিয়ে একপাত্র রাম টানতে পারি না?’
: তথাস্ত। কিন্তু আমাকে ‘সিনর’ ডাকবে না। তুমি আমাকে জোসে বলবে আর আমি তোমাকে এনরিক। চল যাই। মারিয়া, আমরা একটু স্কয়ারে যাচ্ছি।
‘এনরিক তোমার শার্টটা পাল্টে নাও।’ মারিয়া আদেশ করলো আমাকে। শোওয়ার ঘরে ঢুকে শার্ট বদল করলাম। বের হওয়ার আগে মারিয়া শেষ নির্দেশনা জারি করলো, এনরিক বেশিক্ষণ থেকো না ওখানে। আর খবরদার বেশি মদ গিলবে না।
আমি চলে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই সে আমার গালে আচমকা এক চুমু এঁকে দিল। জোসের চোখে ব্যাপারটা পড়তেই সে হাসিতে ফেটে পড়লো। হাসতে হাসতেই বললো, বেচারা মারিয়া! সে ইতিমধ্যেই তোমার প্রেমে পড়ে গেছে।

[চলবে]

বাংলাদেশ সময় ১৬৩০, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2011-09-25 07:00:07