ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৩ জুলাই ২০১৯
bangla news

অপাঙ্ক্তেয়

|
আপডেট: ২০১১-০৮-১০ ৭:৫১:৩০ এএম

রাত হয়েছে ভালোই। অনেক দোকানেরই ঝাপ বন্ধ। কেউ কেউ যাবার আগে শাটারের তালা টেনে টেনে পরখ করছে। দু’একটা খুপরি দোকানে এখনও আলো দেখা যায়। বুয়ারা আঁচলের তলে একটু ভাত-তরকারি নিয়ে পরিজনের উদ্দেশ্যে।

রাত হয়েছে ভালোই। অনেক দোকানেরই ঝাপ বন্ধ। কেউ কেউ যাবার আগে শাটারের তালা টেনে টেনে পরখ করছে। দু’একটা খুপরি দোকানে এখনও আলো দেখা যায়। বুয়ারা আঁচলের তলে একটু ভাত-তরকারি নিয়ে পরিজনের উদ্দেশ্যে। সুখ-দুঃখ বোঝাই বড় বড় ট্রাকগুলো ঢাকা শহরে ঢুকছে। একটু পরেই হয়তো টহল পুলিশ নামবে। ক’দিন ধরে আকাশ খুব ভার। বৃষ্টি হবে হবে করেও হচ্ছে না। মেঘেরা মুখ কালো করে আছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের হাসি। পাগলি হাঁটছে, তার কোনো তাড়া নেই। গন্তব্য উজ্জ্বল ভাতের হোটেল। জায়গাটা খুব খারাপ না। ওখানে একটা কুকুর তার অপেক্ষায়। এই দুনিয়ায় কুকুরটার মতো আপন আর তার কেউ নেই। কেউ অপেক্ষা করছে, ভাবতে ভালোই লাগে- সে মানুষই হোক আর কুকুরই হোক। মাঝে মাঝে কুকুরটা তার সাথে হাঁটে। আজ আসেনি। কে জানে, কেন আসেনি? কুকরটার সাথে একটা জরুরি আলাপ আছে। একদিন নিরিবিলিতে সারতে হবে। খুবই গোপনীয়। আর কাউকেই বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কীভাবে বলবে। কিছুতেই ঠিক করা যাচ্ছে না। তাছাড়া রাস্তাঘাটে তো সব আলাপ করাও যায় না!

এই কুকুরটার সাথেই পাগলির ওঠা-বসা। কুকুর-সঙ্গ জীবন পাগলির খুব একটা খারাপ লাগে না। বরং কুকুরটা না থাকলেই খুব একা একা লাগে। মানুষ কি একা থাকতে পারে? গত সাত-আট মাস ধরে এই শহরে পাগলি শুধু হাঁটছে আর হাঁটছে। কেন হাঁটে সে নিজেই জানে না। পাগলের কোনো ঠিক আছে? প্রায়ই একা একা হাসে। একা একা কাঁদেও। প্রতিদিন কত কিছু দেখে। নতুন নতুন জিনিস দেখতে কার না ভালো লাগে? নতুন কিছু দেখলে বুদ্ধিমান মানুষের মতো খেয়াল করে। মাঝে মাঝে ভয়ও লাগে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে একই রংয়ের মোটা মোটা জামা-প্যান্ট-বুট পরা লোকজন বন্দুক হাতে বসে থাকে। মানুষকে তাড়া করে, মারে, ট্রাকে করে ধরে নিয়ে যায়। ওদের দেখলেই কেমন জানি ভয়ে তার শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে জিদ চাপে। মনে হয়, বড় বড় পাথর দিয়ে ওদের গাড়িটাকে চাপা দিয়ে দেয়।  আর একটা জিনিস তার কাছে খুবই আশ্চর্য লাগে। রাস্তায় অনেক পাগলের সাথে দেখা হয়। কিন্তু কখনও কথা হয় না। পাগলদের নিজেদের মধ্যে কখনও কথা বলতে দেখে না। অথচ ভিক্ষুকেরা দল বেঁধে নানান কৌশলে ভিক্ষা করে। কিন্তু তার চোখে তো এসব পড়ার কথা না। সে একটা পাগলি। তারপরও চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে অন্য পাগলিদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে। জানতে ইচ্ছা করে, কীভাবে পাগল হলো? আরো কত কিছু যে মাথায় আসে!  

এইতো সেদিন নিউ ঢাকা সেলুনের সামনে একটু দাঁড়িয়েছিল, মাথা আচড়াতে। নিজের চেহারাটা দেখতে ইচ্ছা করেছিল। খুব। পাগলের ইচ্ছা আর কি! মাথার চুল সব জটা, সেই খবর নাই। আর থাকবেই কীভাবে, কোথায় আয়না? আয়না-চিরুনি তো সংসারী মানুষের জিনিস। সোয়ামী নাকি বিয়েতে আয়না-চিরুনি দেয়। একসময় স্বপ্ন দেখত, তারও বিয়ে হবে। সোয়ামী আনবে সনু, পাউডার, আলতা-চিরুনি। সেই সঙ্গে শাড়ি, পেটিকোট, ব্লাউজও। তারপর মা’র গলা ধরে কিছুক্ষণ কেঁদে, ছোট্ট ট্রাংকটি নিয়ে রওয়ানা দেবে নতুন সংসারে। সোয়ামীকে নিয়ে সিনেমায় যাবে। রিকশায় ঘুরবে, বাদাম কিনবে। খোসা ছিলে বরকে দেবে। সোয়ামীর কণ্ঠে গদগদে ভালোবাসা।
‘না।’ লক্ষ্মীটি তুমি আগে খাও।’ কী লজ্জা!  
‘মাইয়া মাইনসে কখনও আগে খায়?’

groblicka-lidia-mad-womanপাগলির ইচ্ছার কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। সারাদিন হাঁটে আর নানান কিছু ভাবে। আজও পাগলি শহরময় হেঁটে ক্লান্ত শরীরে ফিরেছে। শরীরটা কেমন কেমন জানি করে। কুকুরটা লেজ নাড়াচ্ছে। কাছে এসে কুঁই...কুঁই করছে। পাগলির পায়ের সাথে গাল ঘষে, আদর চায়।
‘তুই যে আমার কাছে এত আদর চাস, আমারে আদর করে কে?’ আবার মনে হয়-‘থাক। আহারে! অবুঝ পশু!’

পাগলি হাত বুলিয়ে আদর করে। আরামে আবারও কুঁই...কুঁই করে। পশু হলেও সুখ-দুঃখ তো আছেই। মাত্র দেড় মাসের চেনাজানা, তারপরেও কী আপন হয়ে গেছে! তার প্রতি কুকুরটার টান দেখে মাঝে মাঝে চোখে পানি এসে যায়। এতখানি টান জীবনে কারো মধ্যে দেখেছে কি না মনে করতে পারে না। শরীরটা আজ কাঁচা কাঁচা লাগছে- ‘কেউ যদি তার গায়েও একটু হাত বুলাইয়া দিত!’ শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। রাত প্রায় মাঝামাঝি। ইঁদুর, তেলাপোকা খাবার খুঁজতে এদিক-ওদিক ছুটছে। ক্ষুধায় তারও পেট চোঁ চোঁ করছে। এখনও কেন উজ্জ্বল হোটেলের ঝুটা ফালায় না, কে জানে! এখনই হয়তো ফেলবে। হঠাৎ হোটেলের মালিকের গলা শোনা গেল-‘আইছে! বুবি পাগলি আইছে রে। খাওন দে।’

একটা প্লাস্টিকের ভাঙ্গা থালায় খাবার দিয়েছে। পাগলির বিষ্ময়ের সীমা নাই। আজ কোনো বিশেষ দিন কি না কে জানে? কত দিন ভাতের থালায় খায় না! মানুষের মধ্যে যে কোনো দয়ামায়া থাকতে পারে, তা বহুদিন দেখে নাই! হঠাৎ এই করুণাটুকু দেখে মুহূতের্ই চোখে পানি এসে গেল। এতদিন ড্রেনের পাশে খাবার ফেলত। কুকুরটার সাথে ওখান থেকেই খেত। একটু নাড়া দিলেই হাড়ের সাথে মাংস, কাঁটার সাথে মাছ পাওয়া যেত! মাঝে মাঝে আঁধ-খাওয়া সিঙ্গারা-সমুচাও! খুশিতে ইচ্ছে করত কুকুরটাকে বলে- ‘কিরে! মজা না? জম্মের মজা। ভাজা-পোড়ার স্বাদই আলাদা।’
 
খাওয়া শেষে পাগলির খুব ঘুম পাচ্ছে। বসে থাকতে পারছে না। কিন্তু শোবার জায়গা? দেয়ালের মাঝখানে চিপা একটু জায়গা, পাশে ড্রেন। বসলে পা টান করা যায় কিন্তু শুইতে হয় কুকুরের মতো কু-লী পাকিয়ে। আজ পাগলির পা টান করে একটু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে! ‘কতদিন পা টান করে ঘুমায় না!’ তারপরেও পাগলির ঘুম ভালো হয়। শুইলেই ঘুম আসে। মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নে ঘুম ভাঙ্গে, ঘুমের মধ্যে গোঙানীর মতো শব্দ করে, কাঁদে। কুকুরটা তখন ঘেউ ঘেউ করে। সেই শব্দও ভালো লাগে, মন শান্ত হয়। পাগলি ভাবে- ‘যাক, যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছি। আপাতত কোনো ঝামেলা হয়নি।’

দুনিয়াতে তো ঝামেলার কোনো শেষ নেই। এর মধ্যে একদিন তার ঘুম ভেঙ্গেছে মা’র চার নম্বর সোয়ামীকে স্বপ্নে দেখে। ঐ হারামীটা প্রায়ই চোখ দিত। নানারকমের কু-ইঙ্গিত করত। কোনো কাজকর্ম তো করতই না শুধু বসে বসে বিড়ি ফুঁকত। লুঙ্গি ফাঁকা করে বসে থাকত। ভিতরে ঘাঁ-ওয়ালা একটা কিছু দু’একবার চোখে পড়েছে। গ্রামে তার নাকি আরো দুইটা সংসার ছিল। ঐ ব্যাটা যখন তখন গায়ে হাত দিত। পাগলির বয়স তখন কত আর হবে? এগারো-বারোর বেশি না। রাগে, ঘৃণায় শুধু কান্না পেত। কতবার যে একা একা কেঁদেছে! ‘মা’র কাছে কইয়া দিমু...’ ধরনের ঈশারা-ইঙ্গিত করলে একটু নিরস্ত হত। কত রকমের কত যে দুঃসহ স্মৃতি আছে! সেইসব স্মৃতিই মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখে। কিন্তু বাস্তবে পাগলি কোনো স্মৃতিই ঠিকমতো মনে করতে পারে না।

আজ এটা মনে পড়ে তো কাল ওটা বেমালুম ভুলে যায়। সারাদিন ঘোরাঘুরিতেই সময় কাটে। ঘোরাঘুরিতে মনটা একটু হালকা লাগে। তবে রিকশায় যাত্রীদের পায়ের কাছে বসা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের দেখলে তার খারাপ লাগে। রাস্তায় বুয়াদের দেখলে তার মা’র কথা মনে পড়ে। ঘুমানোর সময়ও মনে পড়ে। একবার রাস্তায় তার মা’র সাথে দেখা হয়েছিল। হাত ধরে বস্তিতে নিয়ে গেল। তার মা তখন অন্য একটা বস্তিতে নতুন সোয়ামী নিয়ে থাকে। যাওয়ামাত্র ঐ ব্যাটা ঝগড়া শুরু করে দিল। অবস্থা এরকম যে- ‘এই পাগলি বিদায় না করলে এক মুহূর্তও সে থাকবে না।’   

তিন দিনের মাথায় পাগলিকেই বিদায় করে দিল। পাগলিও তাতে দোষের কিছু দেখেনি। বিদায় করবে না কী করবে? একে তো ‘বোবা’ তার উপরে হয়েছে আবার পাগলি। এই জিনিস কেউ ঘরে রাখে? মায়েও রাখে না। তবে পাগলির যে খারাপ লাগেনি তা না। খুব খারাপ লেগেছে। কিন্তু কী আর করা!

কয়েকদিন পর পাগলির শরীরটা আরো খারাপ হয়ে গেল। সারাক্ষণ বুকের মধ্যে কেমন জানি ধড়ফড় করত। খুব ক্লান্ত লাগত। পাগলি জীবনে তো দুঃখ-কষ্ট কম পায়নি! কিন্তু আগে খুব একটা কান্না পেত না। এখন প্রায়ই খালি কান্না পায়। কেমন জানি মনটা নরম হয়ে গেছে। সকালের দিকে শরীরটা এত খারাপ লাগে যে উঠতে ইচ্ছে করে না। শরীরে আজ এই সমস্যা তো কাল ঐ সমস্যা। কী যে কষ্ট! কিন্তু সেই কষ্টের কথা কাকে বলবে? সেই মানুষ কি তার আছে? মানুষের কষ্টের কথাই কেউ শোনে না, আর পাগলিরটা!  

পাগলের কষ্ট আর মানুষের কষ্ট কি এক? এক না। যেমন কষ্ট পানির, তেমন কষ্ট পিসাবের। মানুষের কাছে মানুষ পানি চাইলে নাস্তাও দেয়, কিন্তু পাগলের বেলায়? ভিন্ন। পাগলির খুব খটকা লাগে। তার খটকা লাগলেই কী, না লাগলেই কী? তাতে কারো কিছু আসে যায় না। সেই কবে থেকে পাগলির খালি ঘন ঘন পিসাব চাপে! রাতের বেলা না হয় একটা কথা। কিন্তু দিনের বেলা? যেখানে সেখানে পিসাব করলে তো মানুষে মারবে।

মানুষের মেজাজের তো আবার ঠিক নাই। কেন যে তারা যখন তখন রেগে যায়! পাগলি বুঝতেই পারে না। একদিন এক ফলের দোকানের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। কত রকমের কত ফল! একটা পেয়ারা খেতে খুব ইচ্ছা করেছিল।
দোকানওয়ালার কড়া ধমকে সংবিত ফিরে পায়-
‘এ্যাই পাগলি যা। সর এহেন থেইক্যা। যা...।’

পাগলির নড়াচড়া না দেখে দোকানওয়ালার মেজাজ হঠাৎ চরমে উঠে গেল। প্রচ- জোরে কিছু একটা ছুড়ে মারল। পাগলির বিষ্ময় কাটে না। কিছুতেই মাথায় ঢোকে না- কেন তারে মারল? সে কি মার খাওয়ার মতো কিছু করেছে? কী জানি, হয়তো বিরাট কোনো অন্যায় করেছে। তা না হলে এত রাগ করবে কেন? ব্যথা লেগেছে খুউব। কিন্তু পাগলদের অত ব্যথা লাগলে চলে না। মানুষেরা মারবে, ঢিল ছুড়বে, গাছের সাথে বেঁধে রাখবে, পানিতে চুবাবে। জগতে সব কিছুরই একটা নিয়ম আছে। পাগলদের ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম।

crazy_woman_with_cats_picassoপাগলের জন্য মানুষের যে আরো কত নিয়ম আছে কে জানে? নিয়মের শেষ নেই। পশুই ভালো, তাদেরও নিয়ম আছে কিন্তু সেগুলো মানুষের উপর চাপিয়ে দেয় না। কুকুরটাই মনে হয় ঢের ভালো আছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ওটাও জানি কেমন কেমন করে। খালি আদর চায়। অনেকক্ষণ আদর না করলে সরে না। পাগলিও আর আগের মতো পারে না। কুকুরটা আজকাল অত দৌড়াদৌড়িও করে না। একটু অলস অলস ভাব, শুয়ে বসে থাকে। একটু মনে হয় মোটাও হয়েছে। আজকাল রাতেও ঘুমায়। কখন যেন পাশে এসে শুয়ে পড়ে। কুকুরটার শরীর গরম গরম লাগে। একদিন হঠাৎ পাগলির অন্যরকম কিছু একটা ঠেকল। কুকুরটার পেটে কী যেন নড়াচড়া করছে। বাচ্চা নাকি? পাগলির মাথায় খটকা লাগে- ‘কুকুরদের মধ্যেও কি ইজ্জত মারামারি আছে?’
আবার ভাবে- ‘থাকলেই কী আর না থাকলেই কী?’

সপ্তাহ দুয়েক পরে ফজরের নামাজের আযানের আগে আগে কুকুরটার চারটা বাচ্চা হলো। চারটাই মেয়ে। পাগলির হায় আফসোসের শেষ নাই- ‘আহা রে! এর তো সীতার দুঃখ অইবো। চাইর চাইরটা মাইয়া অইছে।’
কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতেই কুকুরটা কন্যাদের নিয়ে বেশ আনন্দিত। একটা কোলের মধ্যে ঢোকে তো আরেকটা ওঠে পিঠে। যে পারছে সে সমানে মায়ের দুধ খাচ্ছে। কত রকমের কত খেলা করছে! বেশিরভাগই লাফাঝাপা ধরনের খেলা। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বাচ্চাগুলো পাগলিকেও চিনে ফেলেছে। প্রতিদিনই মনে হচ্ছে বাচ্চাগুলো সুন্দর হচ্ছে। কী তুলতুলে নরম! দেখলেই আদর করতে ইচ্ছা করে। পাগলির খুব ভালো লাগে। কিন্তু তোগো বাপে কই? বাপের কুনো খবর নাই।

পাগলিও জীবনে বাপ দেখে নাই। মার কাছে শুনেছে, তার বাপে নাকি বিয়া করছে একদিক দিয়া, ভাইগ্যা গেছে আরেক দিক দিয়া। জন্মের পর সাত-আট দিন পর্যন্ত তার কোনো নামই ছিল না। এক মেমসাহেব কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-‘এই পরীর বাচ্চাটার কী নাম দিয়েছ বুয়া?’
‘এহনও কুনো নাম দেই নাই আফা। আফনে একটা নাম দিয়া দ্যান।’
দুই গালে আদর দিয়ে তিনি বললেন- ‘ওমা! দেখো, দেখো! কী মিষ্টি চেহারা! বাবুটা! গু..টু গুটু গুটু..টুটুটু..যাও! আজ থেকে তোমার নাম ...।  
নামটা পাগলির কিছুতেই মনে পড়ছে না। মনটা জানি কেমন করছে। কতদিন তারে কেউ একটু নাম ধরে ডাকে না!

অনেক কিছু নিয়েই পাগলির আফসোস হয়। আবার ভুলেও যায়। ভুলে গেলেও কোনো ক্ষতি নাই। কিন্তু কুকুরটার সাথে জরুরি কথাটা ভুলে গেলে চলবে না। তাহলে ক্ষতি হবে। কিন্তু নিরিবিলি সময় কই? আরো আগেই বলা দরকার ছিল কিন্তু হয়ে ওঠেনি। তার পেটেও যে বাচ্চা আছে এতদিনে কুকুরটা টের পেয়েছে কি না কে জানে? পেতেও পারে। কিন্তু এই বাচ্চাটা যে সে চায় না, তা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। পোয়াতী হওয়ার ঘটনাটাও। এটা খুবই জরুরি ব্যাপার। হাজার হোক আপনজনকে তো জানানো দরকার। তা ছাড়া কী ভাববে?

কুকুরটার ব্যাপারে পাগলি সিরিয়াস। সে অবশ্যই কুকুরটাকে বলবে, মানুষের কাছ থেকে যাতে বাচ্চাগুলোকে দেখে রাখে। মানুষ খুব নিষ্ঠুর, ভীষণ নিষ্ঠুর। বড়-ছোট সবাই। হোটেলের পুলাপানরা যখন তখন গরম ফেন ছুড়ে মারে। সেদিন মেরেছে পাগলির গায়ে। যন্ত্রণায় সে কাতরাচ্ছে আর পুলাপানরা হাসছে- ‘পাগলি কান্দে...হা হা হি হি...’
অল্পের জন্য পেটের উপর পড়েনি তবে পিঠের অনেকখানি পুড়ে গেছে। তার কষ্ট দেখে ওরা হাসে কেন? পাগলির মাথায় খেলে না। পুড়ে যাওয়া দগদগে ঘাঁয়ের যে কী কষ্ট! পোড়া পিঠ নিয়ে একটু হেলান দিয়ে বসাও যায় না। এমন শরীর নিয়ে ইদানিং পাগলির হাঁটাহাঁটি অনেক কমে গেছে। তাছাড়া শরীরের ওজন মনে হয় প্রতিদিনই বাড়ছে। হাতে-পায়ে পানি নেমেছে। কোমরের ছালার গিট্টুটা আবার ঢিলা করা দরকার। শেষবার কে বেঁধে দিয়েছিল মনে নেই। সেই কবে থেকে বমির যন্ত্রণা শুরু হয়েছে! খাবারের গন্ধে নাড়ি-ভুঁড়ি উল্টে আসে। এখন দূর থেকেও বুঝতে পারে, আশেপাশের হোটেল-রেস্তোরাঁ কোন দিকে। তারপরেও উজ্জ্বল হোটেলের এই জায়গাটা পাগলির খুব পছন্দ। কুকুরটার জন্য খুব মায়া লাগে। বাচ্চাগুলোর জন্য সেই মায়া আরো বেড়েছে।
 
উজ্জ্বল হোটেলের এইটুকু জায়গায় কুকুরটার বাচ্চা-কাচ্চা নিয়া একদম হয় না। জায়গাটা ছাড়তে হবে। যাওয়ার আগে বাচ্চাগুলোকে কিছু একটা দিতে পারলে ভালো হতো-  ‘ওরা তো আর পর কেউ না।’
চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই বুকের মধ্যে কেমন জানি মোচড় দিয়ে ওঠে। যখনই পাগলি ভাবে তার চলে যাওয়ার কথা কুকুরটাকে ইশারায় বলবে, কুকুরটা তখনই নীরবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পাগলি তাকাতে পারে না, চোখ সরিয়ে ফেলে। বলা হয় না। কে জানে কুকুরটা কিছু বুঝতে পেরেছে কি না। পাগলির বুকের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট জানান দিচ্ছে। কিছু একটা মনে পড়ার আগে তার এরকম হয়।

সেই রাতের কথা মনে পড়ছে। যখন তারা সিদ্ধেশ্বরী মাঠের বস্তিতে থাকত। এই বস্তিটা আবার অন্যরকম। দিনে খেলার মাঠ রাতের বেলা বস্তি। বৃষ্টিতে মাথার উপর নীল পলিথিন নয়তো খোলা আকাশ। ক’দিন ধরে এক নাগাড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি আর থামে না, মাঝে মাঝে প্রচ- মেঘের গর্জনে কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। রাস্তায় আলো নেই, কারেন্ট চলে গেছে। আশেপাশের খুপরিগুলো বাচ্চা-কাচ্চাদের কান্নাকাটি, ঢাপুস-ঢুপুস বউমারার শব্দ আর গালাগালিতে সরব। যক্ষ্মা-কাশির খুক্কুর খুক্কর শব্দও থেকে থেকে কানে বাজছিল। মা চুলায় দু’টা চাল ফুটাচ্ছিল। ভেজা মাটিতে ইটের চুলায় আগুন। খালি ধোঁয়া হচ্ছিল, ফুঁ দিতে দিতে জান যায় অবস্থা। কখন যে ভাত হবে! ক্ষুধাও লাগছিল! এমন সময় মোটা মোটা কাপড়ের জামা-প্যান্ট, কালো রংয়ের বুট পরা বন্দুক হাতে তিনজন লোক বস্তিতে এসে এদিক-ওদিক উঁকি দিচ্ছিল। ভয়ে মা’র পাশে গুটিশুটি মেরে বসে ছিলাম। আগেও অনেকবার ভয় পেয়েছি কিন্তু এত না। হঠাৎ তাগড়া জোওয়ানের মতো একজন এসে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে হাত ধরে বলল-
‘চল, পাওয়া গেছে।’
মা ওদের পা জড়িয়ে ধরল ‘আমারে লইয়া যান, স্যার। মাইয়াডা আমার বোবা। ও রে ছাইরা দ্যান স্যার।’
‘চুপ কর। বোবা হইলে আরো ভালা, কারো কাছে কইতেও পারবো না, হা...হা...।’

তারা কোনো কথাই শুনল না। ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার দিতে খুব ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তো সেই ক্ষমতা দেয় নাই। বস্তির অনেকেই দেখেছিল কেউ এগিয়ে আসেনি। একটা ট্রাকের মতো গাড়িতে উঠিয়ে প্রথমেই ঝাঁপিয়ে পড়ল অসুরের মতো শক্তিশালী লোকটা। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরল আরেক জনের কথায়। কিন্তু নড়াচড়া করার কোনো শক্তি ছিল না। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল শরীর...।
‘বস! দাঁত লাইগা গেছে। নড়াচড়া করে না।’
আরেকজন বলে-‘কাজ সারছে! আমি এর মধ্যে নাই। এখনও সময় আছে ফালাই দে। ফালাই দে।’

এই পর্যন্ত মনে পড়ল পরিষ্কার। তারপর কবে থেকে ছালা গায়ে ঘুরে বেড়ায়, তা আর মনে করতে পারে না। এতদিন কোথায় কোথায় থেকেছে তাও মনে নেই। শুধু মনে পড়ে, সেই থেকে কোনো কিছুই আর আগের মতো লাগে না। সবই অপরিচিত, উল্টা পাল্টা লাগে। মাথাটা সব সময় গরম গরম লাগে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝড়-বাদলার দিন। আজ সকাল বেলা-ই বৃষ্টি নেমেছে। ঝুম বৃষ্টির সাথে দমকা বাতাস। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নাই। বৃষ্টি থামুক আর না-ই থামুক পাগলি আজ চলে যাবে। পাগলের আবার ঝড়-বৃষ্টি কী? কোথায় যাবে, সে জানে না। আট মাসের গর্ভ নিয়ে হেঁটে বেড়াবে এই নিষ্ঠুর শহরের পথে পথে...।


বাংলাদেশ সময় ১৬০৫, আগস্ট ১০, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2011-08-10 07:51:30