ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
bangla news

আহমদ ছফা একজন চণ্ডাল মুসলমান

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৬-৩০ ৫:৩৩:১৪ এএম

অমৃত মানে তো এইটাও ধইরা নেয়া যায় যে যার মরণ নাই। ছফার ক্ষেত্রে এমনটা বলাই যায়। আহমদ ছফার মৃত্যু নাই। বিশিষ্টদের মরণ হয় না, তারা দেহ রাইখা কর্মে বাঁচিয়া ওঠেন, চর্চিত হন। আর যখন তারা দেহসমেত বেঁচে থাকেন তখন তাদের বিষয় আলাদা।

অমৃত মানে তো এইটাও ধইরা নেয়া যায় যে যার মরণ নাই। ছফার ক্ষেত্রে এমনটা বলাই যায়। আহমদ ছফার মৃত্যু নাই। বিশিষ্টদের মরণ হয় না, তারা দেহ রাইখা কর্মে বাঁচিয়া ওঠেন, চর্চিত হন। আর যখন তারা দেহসমেত বেঁচে থাকেন তখন তাদের বিষয় আলাদা। দেহকালীন বেঁচে থাকবার সময়টাই বরং গুরুত্ত্বপূর্ণ। এই সময়ের কার্যকলাপ তার দেহ ছাড়িয়ে তারে অমর কইরা তুলে। ছফা দেহসমেত যখন বাঁইচা ছিলেন তখন কেমন ছিলেন। তারে কি আলাদা মনে হয় না, মনে হয় না তিনি একটা চণ্ডাল। এলোমেলো কথা বলেন, অগোছালো, আর ভীষণরকম রাগী। জন্ম নিছিলেন ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন-চট্রগ্রামে। লিখলেন যে কতো কিছু, বললেন যে কতো কথা।

 ছফার মনে মনে একটা আকাঙ্খা ছিল, পারেন নাই। পারার কথাও না। তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী হইতেন নামে একটা লেখা লিখছিলেন ১৯৯৩ সালে সাপ্তাহিক পূর্ণিমায়। তিনি এমন একটা সেনাবহিনী বানানোর কথা বলছিলেন যেখানে ৩০ লক্ষ লোক থাকবে যা আসলে সেনাবাহিনী হবে না হবে গনমিলিশিয়া। তিনি এরপর ধানমণ্ডী-গুলশান-বনানী এলাকায় যাদের বড় বড় বাড়িতে ৪ জন-৫ জন মাত্র লোক থাকে তাদের সেই দালান ভাইঙ্গা ফ্ল্যাট বানাইতে চাইছেন যেখানে ফুটপাথের লোকেরা আশ্রয় নিবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বোর্ড গঠন করতে চাইছিলেন সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলে। এই সাম্প্রদায়িকতা ছফার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ আছিল নিশ্চয়ই। সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস পারায়ে আসা ছফার মধ্যে এই বিষয়ক যাতনা ছিলই। তিনি মাইনা নিতেছেন ছ’ভাগ হিন্দুর কারণে দেশভাগ হইছে। তিনি এইটাও বলতেছেন, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ না হইলে, অর্থাৎ বাংলা যদি আলাদাই থাকত তাইলে বাঙালি মুসলমানের বিকাশ হইত। মুসলমানরা তখন হিন্দুদের সাথে সমঝোতা করতে পারত। অকপটে তিনি বলতেছেন, সুভাষবসু বাঙালি বইলাই তারে পাত্তা দেন নাই গান্ধি । বাংলা ভাগের জন্য টাকা দিয়েছিল টাটা, গান্ধিদের টাকা দিত মাড়ওয়ারি আর গুজরাটিরা । সুভাষরে কেউ টাকা দিতে চায় নাই, কেউ চায় নাই সে কংগ্রেসের সভাপতি হোক । এভাবেই, এবং আরো বিষয় আছে। ছফা বলতেছেন, কলকাতার বইমেলার একটা সাক্ষাৎকারে, ১৯৯৯ সালে, তিনি বলতেছেন বাংলার ভাগটাই গুরুত্বপূর্ণ আছিল, কারণ বাংলা ছাড়া পাকিস্তানের গুরুত্ব ছিল না। মুসলীম লীগও আছিল বাঙালিদের, হয়া গেল পাকিস্তানীদের। ইতিহাসে এইগুলা বাঙালির অবক্ষয়। তিনি আরো বলতেছেন, বাঙালির গঠনটাই হয় নাই। ভাষার প্রশ্নে সংস্কৃতির বোধ ছিল যতটা না চাকরির প্রয়োজনীয়তা ছিল তার চাইতে বেশি। ছফা তখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়তেন, তিনি সবার মুখে শুনতেন বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হইলে চাকরি পাইতে সমস্যা হবে। ছফার মতে শেখ মুজিব আছিলেন মার্কিন ঘেঁষা আর তার গুরু ছিলেন সোহরাওয়ার্দি। এরই সাথে বামপন্থীদের চিন পিকিং ভাগ। একটা উত্তাল আন্দোলন যখন জনগণরে সংগঠিত করতেছিল, তখনই এই সকল ভাগাভাগি জাতির গঠনরে অসম্পূর্ণ রাইখা দিছে। তিনি বলতেছেন, কলকাতা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হইতে পারে কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশকে কলকাতা আর কিছু দিতে পারবে না। আমাদের নিজেদের কক্ষপথ বাইছা নেয়ার কথা বলছেন ছফা। সেই কক্ষপথ নির্মাণের চেষ্টা তার ছিল, যে কেউ এইটা বিশ্বাস করবে।

কিন্তু ছফা কি মুসলমান আছিলেন, বাঙালি মুসলমানের মন পড়তে গেলে এমন মনে হইতেই পারে। সেখানে তিনি লিখছেন মুসলমানদের নিয়া, বাঙালি মুসলমানের মন পড়তেছেন, আক্ষেপ করতেছেন, ক্ষোভ ঝারতেছেন, তিনি বলতেছেন বাঙালি মুসলমানরা  অপরিণত-অনুকরণ প্রিয়। ছফারে কি তাইলে চণ্ডাল মুসলমান বলা যায়। প্রধাণমন্ত্রী হইলে তিনি উপজাতিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করার কথা বলছেন। এইখানে আইসা খটকা লাগে, খটকা এই জন্যই যে তিনি উপজাতি বলতে কাদের বুঝাইলেন। কেমন করিয়া বুঝাইলেন। তিনি যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা কইলেন সেখানে কোন কোন সম্প্রদায় আছে। সেই সকল সম্প্রদায়ের সাথে আদিবাসীদের আলাদা রাখতে চাইলেন ক্যান। ছফা সব কিছুতেই মুসলমানদের রাখতেছেন। ভাষা আন্দোলনেও তিনি বেশিরভাগ অংশকে মুসলমান বইলা উপস্থাপন করলেন, তিনি প্রশ্ন তুললেন আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী, বাঙালি না মুসলমান। জল আর পানির যে ভাগ তা আসলে দলের তৈরি করা, উনগণের নয়, উনগণের যে ইতিহাস তা উহ্য থাকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দিয়াই তা বুঝা যায়। কিন্তু ছফার বিচারগুলা আলাদা। তার গুরু আব্দুর রাজ্জাকের কাছে কিছু ছবি ছিল, শেখ মুজিবের ছবি, সেখানে জিন্নাহর মৃত্যুর পর হাউমাউ কইরা কাঁদতেছেন মুজিব। কারণ তারা একসাথে পাকিস্তান আন্দোলন করছিলেন। মুসলমান বইলাই তারা পশ্চিমের সাথে লড়াইয়ের সাহস পাইছিলেন । তারপরও যখন লড়াইটা হল তখন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার বড় একটা কারণ ভৌগলিক দুরত্ব, ছফা যখন বলেন তখন সত্যটাই বলেন। এই বিশ্বাস তিনি তৈরি কইরা যাইতে পারছেন। তিনি যে মুসলমান আছিলেন তাও ঢাইকা রাখেন নাই। তিনি ঈদে মিলাদুন্নবির জলসায় বক্তৃতা রাখতেন, তিনি যে সাম্যের সমাজ দেখতেন তার সাথে ধর্মের নিগূঢ় যোগাযোগটাও দেখতে পাইছেন। বঙ্কিম সম্পর্কে ছফার মত লেখক হিসেবে বঙ্কিম সেক্যুলার কিন্তু বঙ্কিম যে রাষ্ট্র চান তা হিন্দুদের রাষ্ট্র। ছফার মতে, ধর্মের প্রতিদ্বন্দীতা হইতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি বা সাহিত্যের প্রতিদ্বন্দীতা নাই।

ছফা আবার মুক্তির পথ দেখেন বামপন্থাতেই। ১৯৬৫ সালের বামপন্থীদের অবার ফিরে আসার আশা তিনি রাখেন। বিশাল অংশের জনগণের মুক্তির প্রশ্নে, ইতিহাস আর রাজনীতির প্রশ্নে, যা সঠিক তা-ই বলার ক্ষেত্রে আরেকজন ছফা এখনকার জন্য জরুরি। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার জলদগম্ভীর গলা আর কারুর কাছ থেকে শোনা যায় না। ইতিহাসের প্রশ্নে ছফা নির্মোহ। বাঙালির গঠন যে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া অসম্পূর্ণ সেখানেই ছফার জোর হাজিরা আছে। এবং সেই হাজিরা এতোই সরব আর বিপুল যে, সেই হাজিরায় এতো বৈচিত্র আর রাগ আছে যে, ছফা অনিবার্য-এইটা অস্বিকারের উপায় নাই।

 বাংলাদেশ সময় : ১৫০০, জুন ৩০, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2011-06-30 05:33:14