bangla news

মল্লিকা সেনগুপ্তর কবিতা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৫-২৯ ১১:১৫:২০ এএম

আশির দশকের বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম নারী কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত মারা গেলেন ২৮ মে, কলকাতায়। নারীবাদী এই মেধাবী কবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে পাঠকদের জন্য তার একগুচ্ছ কবিতা।

[আশির দশকের বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম নারী কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত মারা গেলেন ২৮ মে, কলকাতায়। নারীবাদী এই মেধাবী কবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে পাঠকদের জন্য তার একগুচ্ছ কবিতা।]

সুজাতা, ১১ মে ১৯৯৮  

(ঐ তারিখে ভারত যে পরমাণু বোমাটি ফাটায়, তার নাম স্মাইলিং বুদ্ধ)

কোথায়, কোথায় তিনি ?
ওরা যে বলল এই মরুস্থানে তিনি হাসছেন !

আমাকে তোমরা কেন যেতে দিচ্ছ না
এত পুলিশ পাহারা, লোকজন, অস্ত্রসম্ভার !
তোমরা বুঝতে পারছ না, উপোসি আছেন তিনি
আমি এই পরমান্ন নিয়ে তাঁর কাছে যেতে চাই
কয়েক শতাব্দি ধরে খুঁজতে খুঁজতে
আজ এত দিন পরে সন্ধান পেযেছি তাঁর এই মরুদেশে

বুদ্ধপূর্ণিমার রাত
ভয়ংকর শব্দ লেগে পরমান্ন চলকে পড়ল
চারিদিকে হৈ হৈ হাততালি, জনবিস্ফোরণ
সবাই বলল, দেখো, তিনি হাসছেন

তিনি হাসছেন ! এই ভয়-শব্দ  তাঁরই হাসির |
কাকে তোরা বেদিতে বসালি
কাকে তোরা সৈন্যদল পাহারা দিচ্ছিস
এ তো আলোকসামান্য সে মানব নয় !
এত ধোঁয়া, এত শব্দ  এত সৈন্যদল দিয়ে ঘেরা যে মানুষ
তাঁর পরমান্ন আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি
ওই যারা ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে
তাঁর পরমান্ন আমি সেই সব নিরন্নকে ভাগ করে দেব |

পারমানবিক বুদ্ধ এই দেশে থাকুক উপোসি |

স্বামীর কালো হাত

মশারি গুঁজে দিয়ে যেই সে শোয় তার
স্বামীর কালো হাত হাতড়ে খুঁজে নিল
দেহের সাপব্যাঙ, লাগছে ছাড় দেখি
ক্রোধে সে কালো হাত মুচড়ে দিল বুক
বলল, শোনো শ্বেতা, ঢলানি করবে না
কখনও যদি ওই আকাশে ধ্রুবতারা
তোমাকে ইশারায় ডাকছে দেখি আমি
ভীষণ গাড্ডায় তুমিও পড়ে যাবে,
শ্বেতার শ্বেত উরু শূন্যে দুলে ওঠে
আঁকড়ে ধরে পিঠ, স্বামীর কালো পিঠ |


তেভাগার ডায়েরি

আমি বিলাসিনীদের কাপড়ে নক্সা তুলি, সামান্য জীবিকা
পোকা আলু আর আতপ দেয় হাত ভরে
ভাসুরের কাছাকাছি এলোচুলে থাকি না কখনও

খোঁপায় জড়িয়ে নেব লাল ফিতে, কাস্তের ফলক
ক্ষেতের ফসল তিন ভাগ হবে, দুই ভাগ গৃহমূষিকের
উনুনের চার পাশে বসে হাত গরম করছি |

দূরের চাষিকে শালপাতা মুড়ে খবর পাঠাও
আনো কেরোসিন, যদি দরকার হয় আগুন জ্বালাব

বালিকা ও দুষ্টু লোক

বালিকাকে যৌনহেনস্থার দায়ে স্কুলবাসের ড্রাইভার ও হেল্পার ধৃত--
                                                   সংবাদ, আগস্ট, ২০০১

স্কুলবাসের বাচ্চা মেয়ে
সবার শেষে নামে
সঙ্গীগুলো বিদায় নিলে
তার কেন গা ঘামে !

বাসের কাকু বাসের চাচা
কেমন যেন করে
হঠাত গাড়ি থামিয়ে দিয়ে
আমায় নিয়ে পড়ে

কাকু জেঠুর মতন নয়
দুষ্টু লোক ওরা
মাগো আমার বাস ছাড়িয়ে
দাও না সাদা ঘোড়া !

দুষ্টু কাকু দুষ্টু চাচা
থাকুক না তার ঘরে
বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে কেন
অসভ্যতা করে !

এই পৃথিবী সাদা কালোয়
মন্দ এবং ভাল
তবু কেন এই জীবনে
ঘনিয়ে এল কালো ?

আমার কিছু ভাল্লাগে না
স্কুলের বাসে ভয়
মাগো তোমার পায়ে পড়ি
ওই বাসে আর নয়

আমাকে আর কিছুতেই যেন
না ছুঁতে পারে ওরা
আমাকে দাও সবুজ মাঠ
পক্ষীরাজ ঘোড়া |

অনাবাসির চিঠি

এখানে জীবন বড় মায়াময়
বদলে গিয়েছে সমাজ সময়
এখানে সুখের ঘর বানিয়েছি
তপ্ত দুপুরে সারা দিন এ সি
তবু মনে পড়ে ধূ ধূ বাংলায়
বন্ধুরা মিলে শিতে বরষায়
চায়ের কাপেই তুলেছি তুফান
রকে বসে বসে সিনেমার গান

মন খারাপের বিকেলবেলায়
একটি মেয়েকে মনে পড়ে যায়
দেশে ফেলে আসা সেই সুখস্মৃতি
ভোলা তো গেল না প্রথম পিরিতি
এ দেশে আরাম এ দেশে ডলার
ছেলে মেয়ে বৌ ফিরবে না আর
এখন এখানে নামছে শেকড়
জমিও কিনেছি দু-এক একর

এখানে অশেষ অঢেল খাবার
এখানে পিত্জা হ্যামবার্গার
তবুও মায়ের হাতের শুক্ তো
মনে পড়লেই ভিষণ দুখ তো !
এখানে বৌরা স্বয়ংসিদ্ধা
নিজে হাতে কাজ তরুণী বৃদ্ধা
তবু মনে পড়ে কলেজের সেই
ছিপছিপে রোগা তরুণীটিকেই
বুকে দাগা দিয়ে গিয়েছিল চলে
আজও ডাক দেয় স্মৃতির অতলে

এখানে সুখের ঘর বানিয়েছি
তবু মনে হয় কি যেন হল না
বুক খাঁ খাঁ করে, বলো না বলো না
সুখপাখিটিকে হারিয়ে ফেলেছি |


ভাষা

ভাষা মানে তুমি আমি
ভাষা মানে বাংলা
ভাষা মানে বরাকর
থেকে ভাতজাংলা
বাজারের দোকানের
রাস্তার এ ভাষা
কবিতার স্লোগানের
বচসার এ ভাষা
বাংলায় কথা বলি
বাংলায় ছন্দ
তাই নিয়ে এত কথা
এত কেন দ্বন্দ্ব !
আমাদের বেঁচে থাকা
দাঁড়াবার ভঙ্গি
আমাদের শিকড়ের
পিপাসার সঙ্গী
আজ যদি সেই ভাষা
পথে পথে ভিখারি
যদি তাকে তাড়া করে
নিষ্ঠুর শিকারি
তবু ঘুম ভাঙবে না
পশ্চিমবঙ্গী !
একবার জেগে ওঠো
যুদ্ধের সঙ্গী |


আপনি বলুন, মার্কস

ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গমবোনা শুরু করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে ?

আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক, কে শ্রমিক নয়
নতুনযন্ত্রের যারা মাসমাইনের কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে !
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিকগৃহিণী
প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে, খাবার বানায়
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয় !
আপনি বলুন মার্কস, শ্রম কাকে বলে !

গৃহশ্রমে মজুরী হয়না বলে মেয়েগুলি শুধু
ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে
আর কমরেড শুধু যার হাতে কাস্তে হাতুড়ি !
আপনাকে মানায় না এই অবিচার

কখনো বিপ্লব হলে
পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাস্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী
হবে ?

বাংলাদেশ সময় ২০৫৫, মে ২৯, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2011-05-29 11:15:20