bangla news

খালেদ হামিদীর স্বনির্বাচিত কবিতা

|
আপডেট: ২০১১-০৩-১৭ ১০:৩৭:১৪ এএম

স্বাধীনতা-উত্তর নতুন বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে আটের দশকটি বিভিন্ন কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের কবি ও কবিতা নতুন আলোয় স্বদেশ, বিশ্ব ও জগৎকে দেখতে সচেষ্ট হয়। এজন্য এই দশকটিকে অনেক কবি, অনেক স্বর, বহু ভঙ্গি। কোনোটা আদরণীয়, কেউ কেউ সমালোচিত।

[স্বাধীনতা-উত্তর নতুন বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে আটের দশকটি বিভিন্ন কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের কবি ও কবিতা নতুন আলোয় স্বদেশ, বিশ্ব ও জগৎকে দেখতে সচেষ্ট হয়। এজন্য এই দশকটিকে অনেক কবি, অনেক স্বর, বহু ভঙ্গি। কোনোটা আদরণীয়, কেউ কেউ সমালোচিত।

এই দশকটিতে সজ্ঞান ও অজ্ঞান, সাহসী ও শংকিত কাব্যচর্চার অপূর্ব সহাবস্থান মোটা দাগেই চোখে পড়ে। এটি পরবর্তীদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। এ সময়ে বিভিন্ন ছোটকাগজকে ঘিরে ঈষৎ সফল বা ব্যর্থ বেশ কিছু কাব্য-আন্দোলনও সংঘটিত হয়।

এই সময়টিতেই, মোটামুটি আশির শেষার্ধে, এই সব নতুন কাব্য-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন কবি খালেদ হামিদী। ভঙ্গিতে আপাত-পুরনো একটি চেহারা থাকলেও তার কবিতা সমকালকে বড় তীব্রভাবে ধারণ করে।

বাংলা কবিতার তিরিশি আধুনিকতার পর থেকে, কিছু বামমনস্ক-কবিদের সৃষ্টি ছাড়া, প্রায়শই গণমানুষ উপেক্ষিত থেকেছে। যদিও তৎকালীন পূর্ববাংলা, তার নানামাত্রিক পরাধীনতার ফলে, স্বাধীন-বাংলাদেশে সত্তর দশক পর্যন্ত কবিতায় কমবেশি গণমানুষের কথা বলেছে। অনেক সময় বাস্তবতার কারণে চেঁচিয়েই বলেছে। তাই স্লোগানসর্বস্ব হয়ে উঠেছে বহু কবিতা, কিংবা কবিতার নামে হয়ে উঠেছে স্লোগান। এসব কারণে আশির দশকের কবিতা, নিজস্বতার নামে, গণমানুষকেই উপেক্ষা করে ব্যক্তিসর্বস্ব হয়ে উঠার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল।   

এই সময় যে সামান্য কজন এই ‘চেষ্টা’ থেকে দূরে থেকে সমাজ-সময়-মানুষকে কবিতায় আত্মিকভাবে ধরতে চেয়েছেন, তাদের মধ্যে খালেদ হামিদী অন্যতম। তবে এই ব্যাপারটি তার মধ্যে ঘটে প্রধানভাবে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে, সম্ভবত, প্রবাসে দৈবের বশে অর্ধযুগ কাটানোর অভিজ্ঞতার ফলে। কেননা দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের অভিজ্ঞতা ও তাদের যাতনা ‘শিক্ষিত মধ্যবিত্ত’ হামিদীর পক্ষে অনুভব করা স্বদেশে কঠিনই ছিল। এই বোধের গাঢ় অভিব্যক্তি আছে তার ‘মুখপরস্পরা’ কাব্যগ্রন্থে, যেখানে উঠে এসেছে স্বদেশ ও বিদেশের বহু মুখের রেখা : কেদাক্ত-বিষণœ-বিধ্বস্ত-নিপীড়িত-জীবনযুদ্ধে পরাজিত।

পাঠক হিসেবে খালেদ হামিদীর কবিতায় পাই এক তির্যক ও অনুভূতিশীল কবিকে, যিনি জীবন-রীতি-নীতি-সমাজকে দেখেন সমালোচকের দৃষ্টিতে। আর এ সমালোচনা এমনকি তার নিজের শ্রেণীটির বিরুদ্ধেও। তার কবিতা একই সঙ্গে ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক, কারণ তিনি নিজের ভেতর দিয়ে দেখেন জীবন-জগৎ-সমাজকে, আবার জীবন-জগৎ-সমাজের ভেতর দিয়ে দেখেন নিজেকে। আর উভয়ে মিলেই তৈরি করে তার কাব্য-সারাৎসার। -সৈকত হাবিব]

চিঠি

অর্ধেক আপেল থেকে উঠে আসে নাজিম হিকমত।
মানুষের মৃত চোখে বিদ্ধ হতে থাকে
         বাকি আধখানা।
এইসব দেখে শুনে এবার আমাকে ভাঙো আপেলের ঢিলে।
ভেঙে গেলে অতঃপর
                  আমাকে খুঁজো না।
                                     
ও জানে জিগার

হঠাৎ আমার জীবিকার ঘোর অভাব কখনো হ’লে
সমবেদনায় কার্ল মার্কস-এর বন্ধুর কথা ব’লে,
আমাকে বাঁচাতে নিশ্চয় নেবে দায়িত্ব কাঁধে তুলে
ব’লেই আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদছো আহার ভুলে।
ও জানে জিগার, ইয়ার আমার, ণজন্মাই তুমি;
তোমার আমার কবর খুঁড়তে দেবে না বিশ্বভূমি।
মার্কস-এঙ্গেলস্ তুলনারহিত, আমার কীর্তি কী সে?
মানবাধিক যে হলাম দো¯ত তোমার সঙ্গে মিশে।                    

রমিজা খালা

রমিজা খালা, রমিজা খালা, ভিা কেন কর;
তোমাকে খালা ডাকি কি আমি যখন দু’পা ধর!
তালাক পেয়ে হারালে স্বামী, হলো না বিয়ে আর;
পুরুষ বড় স্বার্থপর, খেপলে ছারখার!
নাছোড় দুই পুত্র থাকে, একটি মরে যায়;
দ্বিতীয় শুয়ে পাঘাতে, অন্নমুখো হায়!
অন্য ঘরে চাকরি ভালো, শত্র“ নিজ রূপ;
অমন আয় দারুণ কালো, তার চে’ আলো কূপ।
ক্রমান্বয়ে দন্ত গেছে, গেলো দেহের ধার;
শিকারি নর মেনেছে হার, মাঙন তাই সার।

আমার দানে আশিস ঝেড়ে দিও না খালা লজ্জা;
ঋণের নামে ভিক্ষা পেয়ে আমিও জ্বালি সজ্জা।
                                               
পুরুষেরও পণ্যায়ন

পকেট হইতে ওয়ালেট টেনে অর্থ দেখায় তরুণ;
নিজ উরুসন্ধিতে হাত রেখে নেভাতে চায় কি অরুণ?
এ কী আহ্বান বোধ-অগম্য রিয়াদে নতুন ব’লে;
ক্রমাগত ভাবা -
এরকমই থাবা
আঁকতাম নাকি দীর্ঘ জামায়, বিশাল রুমালে আদতে আরব হলে?
রক্তের নয় নিষিদ্ধ খুশি, রাজার মুলুকে সকলে যে রাজা!
গরিব দেশের নর, তাই পাই খোলা ইশারায় বাজারে নারীর সাজা।
যুদ্ধ বিনাই বিজিত বিধায় পুরুষও মালে গণিমত;
সাম্প্রদায়িক অভিন্নতায় কী অবিশ্বাস বলবৎ?
                                                                   
পরিচয়

আমার গায়ে বর্ষা শুকায়,
গ্রীষ্ম ভেজে লবণ-জলে।
কেউবা ডাকে চাষার ছেলে,
কেউ গালি দেয় কবি ব’লে।
                         (ঐ)
কাকতাড়ুয়া

জিন্দেগি আজ ধানতে শুধু, দিগন্তে লীন ক্রমশ সবুজ ঢেউ;
কাকতাড়ুয়ার আড়ালে হঠাৎ মনুষ্য ঢঙে নড়ে ওঠে কেন কেউ?
তার পরপরই কর্ণবিদারী আওয়াজে কিসের বিকট বিস্ফোরণ?
ভূমিকর চেয়ে হত্যাচেষ্টা নাকি এ খোদারও ঠাডার, বজ্রপণ?
বৃষ্টি তো নেই, হরিৎ দৃষ্টি নিঃস্ব আমারও পুঁজি;
কাকতাড়ানিয়া এভাবে কেবলই জীবন্ত হলে কোন্ সে অর্থ খুঁজি?
ঘুঘু ও চড়ুই কাকের সঙ্গে আমার দু’কাঁধে ব’সে
দেখিছে, কৃষকপুত্র আমারই সত্তা থেকেই, পড়িছে পক্ক সময়ের ধান খ’সে।
স্বপ্ন তথাপি সোনালি না হ’লে নুন-পান্তার প্রবাদে বাঁচাই সার;
সবুজের পরিবর্তে কৃষ্ণ চক্ষেই সবই দেখা, তাই আজই দুনিয়া অন্ধকার।

জানো না তোমরা, সব সত্ত্বেও পাখি তাড়ানোর নিত্য ছদ্মবেশে
প্রয়াত বংশপিতাও আমার কঙ্কালে স্রেফ হেঁটে ক্ষেতে ক্ষেতে দাঁড়ান দিবস শেষে।
                                                                 
নমঃশূদ্র

নমঃশূদ্র, নমঃশূদ্র, পূর্বপুরুষ আমার,
মধ্যবিত্ত কেন আমি, না হয়ে মেথর, চামার!
কোন্টি ধর্ম, কী সংস্কৃতি, ফারাক বুঝতে না পাই;
প্রগতি ও অগ্রগতির বিভ্রমে খেই হারাই।

অথচ প্রয়াত এবং নিহত তুমি কি জানো না পিতঃ
বহু বছরের কপর্দকের গবাদি মা হ’লে প্রীত
আমিও, নিথর, হপ্তা আয়ুর বাছুরবিয়োগে কার?
প পরেই হঠাৎ ঠাডারে গাভীও হারালে তার
একই হলকায় জ্বলন্ত পিঠ সন্তান বুকে ধায়।
তৃপ্ত আহারে মাংস, আনাজ;
চিন্তাবিলাসী, ছুটতে নারাজ
তারই সাথে কিবা পিছু পিছু আমি, দর্শক শুধু, দুঃখমুগ্ধ, হায়!
                                                             
ধান থেকে শিশু হয়

চাঁদ হতে সিঁড়ি বেয়ে একদা নামিতেছিলো একটি বিড়াল।
শোনা মাত্র পুছ কেন এখনো ছড়াতে চাহি দূর মায়াজাল!
দেখো, জোছনায় গাহে অসংখ্য সন্তান গান একাকার স্নেহে;
ফেরাবে আমাকে নারী  শৈশব-কৈশোরে এই জনকের দেহে?
শিশু হতে অমতা নাকি পূর্বপুরুষের দীনতায় ম্লান
আমি, হামাগুড়ি এঁকে সদা চলি শিশুদেরও হাঁটুর সমান?
জানার আগেই, কোথা দুধের বাটিতে উল্টে ভাসে বিড়ালিনী?
এ সংঘট্টে চন্দ্রিমা ও মাতৃদুগ্ধে ব্যবধান খোঁজো কি সঙ্গিনী?
পাতার পৃথিবী থেকে নিদ্রাভঙ্গ শেষে পাখি হেঁটে দলে দলে
শ্রোতার আসনে যায়, খুদে মনুষ্যরাজির সুরের অঞ্চলে।
তথাপি জগৎ আজো যথেষ্ট প্রাচীন জ্ঞানে কেন অশ্র“পাত!
ধান থেকে শিশু হয়, ন্যূন চালেও মানুষ; হোক অল্প ভাত।
                                                          
দংশিত যাত্রা

হঠাৎ টের পাই মৃত্যু আমার আসন্ন।  আপাদমুণ্ডু তাই নিজের সমস্ত কেশ, চুল ও কুন্তল মুণ্ডন করলে তুমি এনে দিলে গেরুয়া পোশাক।  পরিধান শেষে শুয়ে পড়ি আমি দূর ও কাছের এক নদীর কূলঘেঁষা নৌকায়। অতঃপর নিদ্রিত এবং নদে জোয়ার সৃজিত হতে না হতেই জলযানটি তোমরা ঠেলে দাও জঙ্গম প্রবাহে। পুঁজিদংশিত আমি অকাল প্রয়াত এবং জীবন্মৃত, ভেসে যাই স্রোত-ঢেউ-তরঙ্গ আর লহরে-নহরে। তুমি আশাবাদী থেকো, একদিন সেই সাপ হয়তো জহর শুষে নেবে আমারই সমগ্র দেহ থেকে।  
                 
লোভের আশপাশে

পাখির নীড়ে ডিমের কুসুম কিসের প্রতীক তবে?
পীকুলের নিম্নবর্তী সুপ্রভাতেই বিনিয়োগের আহ্বান কে হেঁকে
নরের গোপন উত্থান-পতন হেন হাটের সক্রিয়তায় ক্রোধের আগুন জ্বালে?
সওদা আমার দেহের ডিম্ব^ অবিক্রীত সদা;
তবু স্মৃতির সূচক প্রায়ই ঊর্ধ্বগামী হাজার সখীর নামে।
প্রি লোভে বৃবাসী গৃহে ভাঙা ডিমের ছবির ডাকে
জলকামানের মুখোমুখি রক্ত অব্দি হারায় যেসব লোকে
তাদের জ্ঞানাতীত ভুবনে উড়িছে মোর বাঁচার রেণু অনšত প্রবাহে।
করুণার খুদ খেয়ে টেকা ডানাবিহীন পায়রাপ্রতিম এই আমারই গান
হৃত ক্ষেতের আলে আলে দূর রমণীর সহিত কাছের দোস্তরাও গাহে।

Khaled-Hamili

বাংলাদেশ সময় ২০৩০, মার্চ ১৭, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2011-03-17 10:37:14