ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২৫ জুন ২০১৯
bangla news
ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর শেষ সাক্ষাৎকার- ২

উড়ালই ফিল্মমেকারের পরিত্রাণের পথ

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৩-১৩ ৪:৪১:৩১ এএম

কার্ডুলো : ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’-এর শূটিং সিনেমাস্কোপে করলেন কেন?

ত্রুফো : কারণ, এটা ফিল্মকে অধিক ‘প্রফেশনাল’, অধিক স্টালাইজড এবং কম ন্যাচারালিস্টিক করবে- এ রকম একটা কাঁচা অনুভূতি ছিলো আমার।

কার্ডুলো : ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’-এর শূটিং সিনেমাস্কোপে করলেন কেন?

ত্রুফো : কারণ, এটা ফিল্মকে অধিক ‘প্রফেশনাল’, অধিক স্টালাইজড এবং কম ন্যাচারালিস্টিক করবে- এ রকম একটা কাঁচা অনুভূতি ছিলো আমার। আয়ত জানালা হওয়ার এক আশ্চর্য গুণ আছে সিনেমাস্কোপের, যেটা অনেক ডিটেইলসকে গোপন করে ফেলে। ফলে একটা চরিত্র যখন রুমের ভেতর চলাফেরা করে, সে অনেকটা বিমূর্তভাবেই চলে- যেন সে একটা অ্যাকুরিয়ামের মধ্যে আছে। ‘শূট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার ও জুলস্ অ্যান্ড জিম’-এর শূটিং আমি সিনেমাস্কোপে করেছি। আর এই স্টালাইজেশন এই দুটি ‘স্টালাইজড’ ফিল্মে সম্ভবত বেশি ভালোভাবে কাজ করেছে।

কার্ডুলো : আপনার ক্যারিয়ারের প্রশ্নে ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’-এর সঙ্গে ‘শূট‘দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’-এর কি কোনো সম্পর্ক আছে?

ত্রুফো : ফ্রান্সে ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’-এর যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম, সেটার কারণেই আমি আমার দ্বিতীয় ফিচার ফিল্ম ‘শূট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’ বানিয়েছি। আমি উপলব্ধি করেছিলাম, আমেরিকান ফিল্মও যে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে- সেটা দেখানো দরকার। অতিরিক্ত গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচারণার পরও ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’-এর অসামঞ্জস্য সাফল্যে আমি ভালোই ঝাঁকুনি খেলাম। ফলে খ্যাতি ও অখ্যাতির ভাবনাকে ‘শূট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’-এ স্পর্শ করালাম। তাদের উলট-পালট করলাম। সেখানে বিখ্যাত মানুষ হয়ে উঠলো অখ্যাত। এই ফিল্মের দিকে এক নজর তাকালে আমার সে সময়কার ঝামেলাগুলোকে অনুভব করা সম্ভব।

একটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’ বানিয়েছি আমি। কারণ, এই ফিল্ম কখনো মুক্তি পাবে না- এমন ভয় ছিলো মনে। আর যদি সত্যি এটা মুক্তি না পায়, তাহলে মানুষ বলাবলি করবে, ‘সমালোচক হিসেবে সবাইকে অপদস্ত করার পর ত্রুফো এখন ঘরে মুখ লুকিয়ে থাকবে’! বিপরীতে, ‘শূট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’ এক রমরমা পরিস্থিতিতে নির্মিত হয়েছে। ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ’র সাফল্যকে এ জন্য ধন্যবাদ। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ-এ আমি যেখানে জাঁ-পিয়েরে লিওকে নিয়ে উদ্বেগে ছিলাম, সেই তুলনায় এ ফিল্ম করতে গিয়ে অভিনেতাদের নিয়ে অনেক বেশি আনন্দ পেয়েছি। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ-এর শূটিংয়ের সময় একেকদিন লিওকে যা দেখাচ্ছিলো কিংবা সে যা করছিলো- তাতে তাজ্জব হয়ে যাচ্ছিলাম। সকালে সেটের সামনে যে চেহারা নিয়ে সে হাজির হতো, তাতে মনে হতো- সারারাত ধরে কী যুদ্ধটাই না করেছে!

আমরা, ফিল্মমেকাররা শিশুদের নিয়ে কাজ করতে বেশি উদ্বেগে থাকি। কারণ, বড়দের মতো তাদের অভিন্ন আত্ম-কৌতূহল কিংবা আত্ম-মনোযোগ থাকে না।

Truffaut Mississippi Mermaidকার্ডুলো : দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ-এর নায়ক চরিত্রের জন্য বালকের খোঁজে ‘ফ্রান্স স্যঁ’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কথাটা কি সত্য?

ত্রুফো : হ্যাঁ, সত্য। রাস্তাঘাটে বাচ্চা খোঁজা এবং তাদের বাবা-মাকে বলা, ‘ওকে কি আমার ফিল্মে কাজ করতে দেবেন?’ -এ ধরনের আইডিয়া আমার পছন্দ নয়। আমি চেয়েছিলাম, বাচ্চাদের নিয়ে বানানো আমার এই প্রথম ফিচার ফিল্মে শিশু ও তাদের বাবা-মা স্বেচ্ছায় আসুক। তাই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের চ্যাম্পস-ইলিসির কাছাকাছি একটা স্টুডিওতে আসতে বলেছিলাম। সেখানে আমি তখন ১৬ এমএমে কাজ করছিলাম। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার স্ক্রিন টেস্ট নেওয়া হতো। সেখানে অনেক ছেলেকে দেখেছি আমি। তার মধ্যে জাঁ-পিয়েরে লিওও ছিলো। অন্য সবার চেয়ে অধিক ইন্টারেস্টিং ছিলো সে; ছিলো অধিক আবেগপ্রবণ, এমনকি অধিক আত্মহারা। সে সত্যি সত্যি এই চরিত্রটা চাইছিলো। আর সেটাই আমার মনে দাগ কেটেছিলো। শূটিংয়ের সময় গল্পের যে মান বেড়েছে, ফলে স্ক্রিপ্টের চেয়েও যে ভালো হয়েছে ফিল্মটা- সেজন্য লিওকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই।

কার্ডুলো : শুধুমাত্র দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ নয়, পুরো আঁতোয়ান দোয়ানেল কাহিনীপরম্পরার জন্ম দিয়েছেন লিও। ফিল্মের ইতিহাসে এটাকে ইউনিক বলেই মনে হয় আমার। ১৯৫৯ সালে শুরু করে পরবর্তী ২০ বছর তিনি চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন। পাঁচটা ফিল্মের ভেতর দিয়ে নিজেও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছেন। এই সিরিজের অন্য ফিল্মগুলো, মানে আঁতোয়ান অ্যান্ড কলেত, স্টোলেন কিসেস, বেড অ্যান্ড বোর্ড ও লাভ অন দ্য রান নিয়েও কথা বলি, চলুন। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ-এর শেষাংশে আমরা লিওকে সমুদ্র সৈকতে দেখি। অনেক ঝামেলা করে ও নানা দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে মাত্রই রিফর্ম স্কুল থেকে পালিয়ে এসেছে এই বালক।
Truffaut Stolen Kissesg
ত্রুফো : প্রথম ফিল্মের পর তাকে যখন ‘আঁতোয়ান অ্যান্ড কলেত’-এ আবার ফিরিয়ে আনি, তখন ‘লাভ অ্যাট টুয়েন্টি’ নামের এক অ্যান্থলোজি ফিল্মের একটা পার্ট হিসেবে সেটা কেবলই একটা নকশা ছিলো। সেখানে তার বয়স ছিলো ১৮। তখন সম্ভবত এটাই লিওর আসল বয়স। এই ফিল্মে আপনি কিছুতেই তার পরিবারের দেখা পাবেন না। আঁতোয়ান এখানে পেশাজীবন শুরু করেছে। কাজ করছে একটা রেকর্ড কোম্পানিতে। এবং আর্মিতে যোগ দেওয়ার কয়েক মাস আগেই তাকে প্রথমবারের মতো প্রেমে পড়তেও দেখি এখানে। ‘স্টোলেন কিসেস’ এক কথায় আঁতোয়ান দোয়ানেল অ্যাডভেঞ্চারের ধারাবাহিকতা। সেই একই চরিত্র আমার মতো, কিন্তু আমি নই; জাঁ-পিয়েরে লিওর মতো, কিন্তু লিও নয়।

আমি বলি কি, এরচেয়ে অধিক বলিষ্ঠ উপাদান নিয়ে শুরু করতে ভালোলাগে আমার। একটা ফিল্ম বানানোর অন্তত দুই-তিনটা কারণ থাকা চাই। যেমন, আমি যদি কোনো গ্রন্থ অবলম্বনে কাজ করি কিংবা কোনো পরিবেশকে একজন অভিনেতার মাধ্যমে চিত্রিত করি- ফিল্ম বানাতে গেলে এই দু’টি কিন্তু একসঙ্গেই আসে। স্বীকার করছি, শুধুমাত্র জাঁ-পিয়েরে লিওর সঙ্গে আরেকবার কাজ করার ইচ্ছেতেই স্টোলেন কিসেস বানিয়েছি। কমবেশি একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমি তাকে নিয়ে ফিল্ম বানানো শুরু করতে চেয়েছিলাম। আমি আমার স্ক্রিপ্টরাইটার কদ দো গিব্রে এবং বার্নার্ড রিভনকে সঙ্গে নিয়ে বসেছিলাম; এবং আলাপ করেছিলাম, ‘লিওকে নিয়ে আমরা কী বানাতে যাচ্ছি?’। তার পেশাদারী জীবনের প্রশ্নে আমরা একটা যথাযথ সরল সমাধান গ্রহণ করেছিলাম। কোনো এক ফোনবুকের পাতা ধরে একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভসের বিজ্ঞাপন খুঁজে পেলাম আমরা। ভাবলাম, ‘এ ধরনের চাকরি ফরাসি ফিল্মে চোখে পড়বে না। সাধারণত বিখ্যাত ডিটেকটিভ মার্লোর মতো একমাত্র আমেরিকান ফিল্মেই এটা পাওয়া সম্ভব।’ কিন্তু ফ্রান্সে এটা হাস্যকর হয়ে উঠবে। দোয়ানেলের রোমান্টিক জীবনের জন্য আমি তাকে তার বয়সী কিংবা আরেকটু কম বয়সী একটি মেয়ের বিপরীতে জুড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করলাম। এমনকি আমরা এও মনে করলাম যে, আর্মিতে থাকাকালেই মেয়েটিকে সে চিঠি লিখতো। তার মানে, তাকে আগে থেকেই চিনতো। পরে তাকে আমরা সেই প্রাণবন্ত অবস্থায় পাবো যেটাকে প্রত্যেক তরুণের ফ্যান্টাসি বলে ধারণা করা হয়। হাঁ, বিবাহিত নারীর সঙ্গে পরকীয়া। বিবাহিত নারী চরিত্রে দেলফিন সেইরিগকে ভেবে রেখেছিলাম আমি। কারণ, আমি এই সম্পর্কটিকে শোচনীয় করতে চাইনি; বরং কিছুটা স্বাপ্নিক কিংবা আদর্শিক করতে চেয়েছি।

কার্ডুলো : যা হোক, শেষপর্যন্ত সেইরিগ পারফেক্ট ছিলেন।

ত্রুফো : আসলেই। দেলফিনের সঙ্গে জাঁ-পিয়েরের প্রেমের কথা আমরা জানি। আমরা এও জানি, সে ভালো করেই জানে, সে যা জানে তা লিও জানে না। ফলে খেলাটা তিনটি পথে গেছে। ফলে জাঁ-পিয়েরে ও দেলফিনের কফি খাওয়ার দৃশ্যটি কেবল তাদের দৃশ্যই নয়; এটা চলেছে জাঁ-পিয়েরে, দেলফিন ও দর্শকের মধ্যে। তিনজন খেলোয়াড়কে নিয়ে এটা এতো বেশি দৃঢ়, এতো বেশি প্রবল যে, এই ফিল্মি টার্মকে আপনি আপনার সময়ে গ্রহণ করতে পারেন। দীর্ঘ নীরবতা আপনার ভেতর অদ্ভুত কিছুর প্রত্যাশা জাগাবে। ভাববেন, লিও বুঝি দেলফিনকে ঝুঁকে চুমু খাবে। আমরা তো জানি না ঠিক কী চাইতে হবে, তবে আমরা কিছু অনুমান করবোই।

এই দু’জনের প্রতি আমার নির্দেশনা ছিলো, ‘মধুময় উত্তেজনা শুধু একবার নয়, ছয়বার জাগিয়ে তোলো। এখনই দিও না চুমু কফিতে। এ রকম একটা দৃশ্যের জন্য পৃথিবীতে আমাদের অনন্ত সময় পড়ে আছে, যেখানে পরিস্থিতি টেনশনপূর্ণ।’

‘আঁতোয়ান, তুমি কি মিউজিক পছন্দ করো?’ দেলফিনের এমন প্রশ্নে লিও যখন জবাব দিলো, ‘ইয়েস, স্যার’, পূর্বাভাসটা তখন কাইমেক্সে পৌঁছলো। এই পয়েন্টে দৃশ্যটা ভুলভাবে ধারণ করলে তা পরের দৃশ্যকে ম্লান করে দিতো। কিন্তু এই যে, ‘ইয়েস, স্যার’- এটা অনেকটা চলমান গতিশীলতা। আর এটাকে এই ট্র্যাকে ধরে রাখতে হলে আপনাকে এর গতিবেগ বাড়াতেই হবে। Truffaut Shoot the Piano Playerফিল্মমেকার হিসেবে উড়ালই আপনার পরিত্রাণের পথ। আর লিও ভেগেছিলো মিউজিকের অতি উত্তেজক উন্মাদনায়। আমেরিকান ফিল্মে ধাওয়া করার দৃশ্যে যে মিউজিক ব্যবহার করা হয়, আঁতোয়ান দোহামের কাছে সেই মিউজিক চেয়েছিলাম আমি। এই মিউজিক টেনশন ধরে রাখে; কিন্তু সেটাকে ঝাপসা কিংবা বিচ্ছিন্ন করে না। আর এই মিউজিক অবশ্যই থামবে না; এমনকি সংলাপের সময়ও নয়। এ পুরোই এক উন্মতত্তা। এবং, ক্যামেরা অবিরাম মুভ করবে।

এই সিকোয়েন্সটি হিচককের কাছ থেকে শেখা আমার আরেকটি দৃষ্টান্তকে চিত্রিত করে। তিনি বলেছিলেন, ‘আবেগ সৃষ্টিতে কঠিন কাজ করো তুমি; আর একবার আবেগ সৃষ্টি হয়ে গেলে সেটাকে অক্ষুণœ রাখতে তারচেয়ে বেশি কঠিন কাজ করতে হবে।’

কার্ডুলো : ‘আঁতোয়ান দোয়ানেল’ সিরিজ শেষ হয়ে গেলো কেন?

ত্রুফো : এর কারণ হিসেবে আমি অনুমান করি, আঁতোয়ান দোয়ানেল নিয়ে আমি যে ধারণা পেয়েছিলাম, আর এই চরিত্রে লিও যেভাবে অভিনয় করেছে সেটা বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি বন্ধনে আবদ্ধ। এই চরিত্রের মধ্যে এমন কিছু একটা আছে, যা তাকে বড় হতে দিতে চায় না। আমি সেই বোকা বাবার মতো, যিনি তার ২০ বছর বয়সী সন্তানকে নাবালক বিবেচনা করেন : ‘তোমার নাক ঝাড়া দাও’, ‘সুন্দরী মহিলাকে হ্যালো বলো’। যে বাবা-মা তাদের সন্তানকে বড় হতে দিতে চান না, তাদের এই এক সমস্যা। কমিক স্ট্রিপ করতে গিয়েও মানুষ এই একই সমস্যায় পড়ে। তারা একটা চরিত্রকে সৃষ্টি করে, সেই চরিত্রের বয়স চিরকাল একই থাকে। তবে ‘বেড অ্যান্ড বোর্ড’ দিয়ে আঁতোয়ান চরিত্রটি প্রকৃতপক্ষে সাবালকত্ব পেয়েছে। ফলে এরচেয়ে বেশি দূরে যাওয়ার কোনো মানে ছিলো না। এ কারণে ‘লাভ অন দ্য রান’-এ এসে সিরিজটা শেষ হয়ে গেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, দুর্দান্তভাবে, এমনকি বেপরোয়াভাবে একটা শুভ-সমাপ্তি হয়েছে এর। আর সেটা এই সিরিজের পূর্ববর্তী চারটি ফিল্মের মতো নয়। সেই ফিল্মগুলোতে ছিলো ওপেন-এন্ডিং।

কার্ডুলো : ‘বেড অ্যান্ড বোর্ড’-এ আপনি রোমান্টিক সম্পর্কের ঝামেলাগুলোর পরীক্ষা করেছেন। এগুলোর দ্বারস্থ হলেন কীভাবে?

ত্রুফো : আসলে ঝামেলা নয়; কালানুক্রমে কিছু সুখী-দৃশ্য এবং কিছু সিরিয়াস কিংবা নাটকীয় দৃশ্য নিয়ে কাজ করেছি।

কার্ডুলো : ‘শূট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’-এ একইরকম পরিবর্তনশীল টোন ছিলো।

ত্রুফো : হ্যাঁ, তা ছিলো। সেই ফিল্মে এটার প্ল্যান ছিলো। আমেরিকান ডেভিড গুডিসের ১৯৫৬ সালের উপন্যাস ‘ডাউন দেয়ার’ সূত্রেও তা ছিলো। তবে টোন বদলে যাওয়ার ব্যাপারটি শূটিংয়ের সময় জোরালো করা হয়েছে। কারণ, থিমবিহীন এক ফিল্মের মুখোমুখি হওয়াটা আমি উপলব্ধি করেছিলাম। স্টোলেন কিসেস ও বেড অ্যান্ড বোর্ড-এও একই ঘটনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে। এই ফিল্মগুলোতে কোনো স্পষ্ট সাবজেক্ট ছিলো না। শূটিংয়ের সময় আমার উপর কিছুদিন ছিলো বাণিজ্যিক চাপ। বাকি দিনগুলোতে ছিলো নাটকীয়তার চাপ।

স্টোলেন কিসেস-এ আমি যা করেছি তার সঙ্গে যদি বেড অ্যান্ড বোর্ড-এর তুলনা করি, তাহলে বলবো, মজার জিনিসগুলোতে আরো বেশি মজাদার এবং নাটকীয় জিনিসগুলোকে আরো বেশি নাটকীয় করার চেষ্টা করে গেছি। দুটি ফিল্মেই অভিন্ন মিশ্রণ ছিলো। তবে বেড অ্যান্ড বোর্ড-এ কেবল করেছি কথা বলার এবং মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আর আমি তা করেছি আঁতোয়ান দোয়ানেলকে বিবাহিত দেখিয়ে।

এর প্রায় দশ বছর পর ‘লাভ অন দ্য রান’ বানিয়েছি। এটাতে দোয়ানেল সিরিজের পুরনো ফিল্মগুলো থেকে নিয়ে ফ্যাশব্যাক ব্যবহার করেছি। আর তা ছিলো আমার জন্য উপসংহারের এক অনুভূতি। বর্তমানের গল্পকে এগিয়ে নেওয়ার বেলায় এবং নতুন চরিত্রদের প্রতি লাভ অন দ্য রান-এর পুরনো চরিত্রগুলো যখন কোনো স্মৃতি নিয়ে কথা বলে, তখন আমি সেই স্মৃতির দৃশ্য দেখাতে সক্ষম ছিলাম। এই ফিল্মে একটা পর্যালোচনা আমি ততোদিনে ঠিক করে ফেলেছিলাম; তা হলো এই ফিল্ম শেষ হওয়ার পর আঁতোয়ান দোয়ানেল চরিত্রটিকে আমি আর কখনোই ব্যবহার করবো না।

কার্ডুলো : এই ফিল্মে এতো বেশি ফ্যাশব্যাক ব্যবহার করলেন কেন? কিছু কিছু ক্ষেত্রে একে অহেতুক দীর্ঘ করার কৌশল বলে মনে হয়েছে।

ত্রুফো : ৯৫ মিনিটের ফিল্মে মাত্র ১৮ মিনিট ছিলো দোয়ানেল সিরিজের আগের ফিল্মগুলো থেকে আসা ফ্যাশব্যাক। এই ফ্যাশব্যাকগুলো ব্যবহার করে আমি একটা সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছি বলে মনে হয়েছে আমার, যা আগের কোনো ফিল্মমেকার কখনো করেননি। অতীত-সম্পর্কিত কোনো গল্প নিয়ে ফিল্ম বানাতে গেলে সবসময়ই একটা ঝামেলায় পড়া লাগে; তা হলো- পূর্ণবয়স্ক নায়কের মতো চেহারার কমবয়সী অভিনেতাকে খুঁজে পাওয়া। যেমন ধরুন, ‘দ্য ম্যান হু লাভড্ ওমেন’ বানানোর সময় আমি মতেঁপিলার রাস্তায় নিছক ভাগ্যবশে চার্লস ডেনারের মতো দেখতে এক বালককে খুঁজে পেয়েছিলাম। তাকে ব্যবহার করার সুযোগটা নিলাম আমরা। আর ডেনারের চরিত্রটির বালকবেলার দুই-তিনটা ফ্যাশব্যাক জুড়ে দিলাম।

তবে আপনার ভাগ্য অনেক ভালো হলে আপনি একজন মানুষেরই ১৪, ১৮, ২৪ ও ২৬, পরে আবার ৩৫ বছর বয়সের দৃশ্যধারণ করতে পারবেন। আঁতোয়ান দোয়ানেল সিরিজে আমি তা করতে পেরেছি। এ উপাদান হাতে থাকাটা মহামূল্যের। আমি এই বালকের জীবনের নানা বয়সকে ফিল্মে ধারণ করার সুযোগটা কাজে লাগিয়েছি। নতুন গল্পে তাকে ঠেলে দিয়েছি, যেন তাকে নতুনভাবে, যুগপৎ দেখায়। দেখায়, সে কেমন ছিলো পুরুষ হিসেবে, কেমন ছিলো কিশোর হিসেবে ও শিশু হিসেবে।
কার্ডুলো : তার এই কন্টিউনিটিকে ‘লাভ অন দ্য রান’-এর এডিটিং হাজির করেছে।

ত্রুফো : হ্যাঁ, এটা নিঃসন্দেহে এমনই এক ফিল্ম। ‘দ্য গ্রিন রুম’ ও ‘দ্য স্টোরি অব আদেল এইচ.’-এর মতো লাইনার ন্যারেটিভের তুলনায় এডিটিং এখানে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজ করেছে। এই ফিল্মের এডিটিংয়ে আমি সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছি- ১৬ সপ্তাহ। ফারেনহাইট ৪৫১-এ বই-পোড়ার দৃশ্যগুলো ফ্যাশব্যাকে দেখানোর পর থেকে এই ফিল্ম নিয়েই এডিটিং রুমে কাটিয়েছি আমি। লাভ অন দ্য রান-এ ছিলো অতি খাপছাড়া উপাদানগুলোকে সমরূপ করার, ফ্যাশব্যাক থেকে বর্তমান দৃশ্যে এসে চিন্তার রেলগাড়িকে অব্যাহত রাখার ঝামেলা। এর বেশিরভাগ ভাগ ভিজ্যুয়াল উপাদানই খাপছাড়া। ফলে বেশিরভাগ ইউনিটি সাউন্ডট্র্যাকে অক্ষুণœ রাখা আবশ্যক। কারণ, সাউন্ডই শূন্যস্থানের মাঝখানে সেতু হয়ে ওঠে।

আমি বলতে চাই, ইমেজ যখন বদলে যায়, সাউন্ড তখন বদলাতে পারে না, কিংবা যতোটা না বদলালেই নয়, ততোটাই বদলায়।

কার্ডুলো : শেষমেষ আপনি কি এই ফিল্ম নিয়ে খুশি?

ত্রুফো : সত্যি কথা বলতে, লাভ অন দ্য রান নিয়ে আমি খুশি নই। ফিল্মটা এখনো আমার কাছে অস্বস্তিকর। মানুষ হয়তো এটা উপভোগ করেছে। কিন্তু আমি খুব একটা খুশি নই। তবে একটা জিনিস, এই ফিল্মের এক্সপেরিমেন্টাল এলিমেন্টগুলোর বেশ নামডাক হয়েছে। একটা ফিল্মের শুরুতে যতোই এক্সপেরিমেন্টার অনুভূতি থাকুক, শেষে সেটাকে আপনি সত্যিকারের অবজেক্ট, সত্যিকারের ফিল্ম হিসেবেই আশা করবেন। ফলে তার এক্সপেরিমেন্টের বিষয়টির কথা আপনার মনে থাকবে না।

কার্ডুলো : ফিল্মে আপনি এক ধরনের ডায়েরি লিখে গেছেন, সেই দাবি কিন্তু তোলাই যায়। আপনি যেকোনো চরিত্রকে তার বিকাশধারার ভেতর দিয়ে দেখেন। তাই না?

ত্রুফো : হ্যাঁ। কিন্তু আসলেই কি তার বিকাশ ঘটে? আমি মনে করি, আঁতোয়ান দোয়ানেল সিরিজটা তার পরিপূর্ণ বিকাশ তৈরিতে সফল হয়নি। এই চরিত্রে কিছুটা আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে ঠিকই; তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা আমার জীবনী থেকে Truffaut Day for Nightদূরে-বহুদূরে সরে গেছে। যেমন ধরুন, আমি কখনোই তাকে উচ্চাকাক্সক্ষা দিতে চাইনি। কার্টুন ক্যারেক্টারের মতো সে আবার শেষে জমে না যায় এই ভেবে শিউরে উঠতাম আমি। জানেন তো, মিকি মাউসের বয়স কিন্তু বাড়ে না। দোয়ানেলের গল্প হয়তো ব্যর্থ; তবু এই সিরিজের প্রত্যেকটি ফিল্ম উপভোগ্য এবং দেখতে অনেক মজার।
 
আঁতোয়ানের জীবন কেবলই একটা জীবন উল্লাসের কিংবা মহাশ্চর্যের নয়। তবে সেটা আত্ম-অসঙ্গতি ও ভুলেভরা এক মানুষের জীবন। এ রকম এক মানুষকে পর্দায় প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখাতে যখন আমি সক্ষম, তখন আমি তার দুর্বলতার দিকে ফোকাস করি। দোয়ানেল সিরিজের বাইরেও এটা করেছি আমি। শূট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার-এ চার্লস আজাঁভো, দ্য সফ্ট স্কিন-এ জাঁ দিজাইলি ও দ্য ম্যান হু লাভ্ড ওমেন-এ চার্লস ডেনার শুধু নায়ক নন; তারা আমেরিকান ফিল্ম ‘নায়ক’দের ব্যাপকভাবে চিত্রিত করেন। তবে মানুষ সম্পর্কে সত্যি বলাটাই সম্ভবত ইউরোপিয়ান ফিল্মের প্রবণতা। তারমানে তাদের দুর্বলতা, তাদের অসঙ্গতি এবং এমনকি তাদের মিথ্যেও প্রকাশ করে এই চরিত্রগুলো।

কার্ডুলো : আঁতোয়ান দোয়ানেল চরিত্রটিকে ধরে বলা যায়, একই অভিনেতাকে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পাঁচটি ঘটনা নিয়ে কাজ করার একটা সুবিধা নিশ্চয়ই আছে।

ত্রুফো : হ্যাঁ, তা ঠিক। কোনো অভিনেতার সঙ্গে একবারের বেশি কাজ করাটা সবসময়ই ভালো। কারণ, শূটিংয়ের দিনগুলো এতো দ্রুত শেষ হয়ে যায় যে, অভিনেতারা অন্য কাজে চলে যাওয়ার পর ফিল্মমেকারের পক্ষে এডিটিং রুমে বসেই কেবল তাদের ভালোভাবে চেনা সম্ভব। এখানে আপনি তাদের সামনে-পেছনে টেনে টেনে, স্লো-মোশনে দেখতে পারবেন; সবকিছু খুব নিবিড়ভাবে দেখার সময় পাবেন। আমার তো মনে হয়, প্রথম ফিল্মটা একজন অভিনেতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো ব্যাপার পরের কাজেই আপনি তাকে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন এবং তার জন্য স্ক্রিপ্ট লিখে আনন্দ পাবেন।

কার্ডুলো : জাঁ-পিয়েরে লিও নিশ্চয়ই আপনার সবচেয়ে ভালো চেনা অভিনেতা। আপনি তাকে মানুষ হিসেবে যেমনি বড় হতে দেখেছেন, তেমনি ফিল্ম-আর্টিস্ট হিসেবেও বড় হতে দেখেছেন।

ত্রুফো : হ্যাঁ। তবে আমি চাইনি সে আমার কিংবা আঁতোয়ান দোয়ানেলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হোক। আপনি তো জানেন, সে অন্য ফিল্মও কাজ করেছে। এই যেমন, জাঁ-লুক গদারের মাসকুলাইন-ফেমিনাইন [১৯৬৬] করেছে। শুধু আমার কিংবা গদারের সঙ্গেই নয়, সে কাজ করেছে জুলিয়েন দুভিভিয়ে, জাঁ অস্টাচে, জাঁ ককতো, জার্জি স্কোলিমোভস্কি এবং আরো অনেক ফিল্মমেকারের সঙ্গে। দোয়ানেল সার্কেলের বাইরে আমি তাকে টু ইংলিশ গার্লস্ ও ডে ফর নাইট-এ ব্যবহার করেছি। তবে আঁতোয়ান দোয়ানেল চরিত্রে নিঃসন্দেহে সে সম্পূর্ণ পারফেক্ট হয়েছে। কারণ, তাকে মাথায় রেখেই চরিত্রটি লিখেছি আমি। কিছু দৃশ্য আমি বানিয়েছিও বটে; কারণ, আমি জানতাম, সেগুলো তাকে মজাদার করে তুলবে। সেগুলো লেখার সময় অন্তত তার কথা ভেবে হাসি পেতো আমার।

সমস্যা হলো, যে পরিস্থিতিতে মর্যাদাহানী ছাড়া সুবিধা করা যায় না, সেই পরিস্থিতিতে তাকে ঠেলে দিয়ে আমি ধরা খেয়েছি। সেইসব ক্ষেত্রে তাকে ঘিরে থাকা চরিত্রেরা সবল; আর আঁতোয়ানকে কী দুর্বল-ই-না লাগে! সিরিজটির স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে কিংবা শূটিংয়ে মজা করতে গিয়ে অনেক চড়া দাম দিতে হয়েছে আমাকে। অভিনয় করতে গিয়ে লিওরও একই অবস্থা হয়েছে। কারণ, চরিত্রটি সে ভালোবেসেই করেছে। কিন্তু পাবলিক কখনো কখনো দ্বিধায় পড়েছে, তখন তারা ভুলে গেছে যে, এটা একটা ফিকশন, এবং এখানে অভিনেতার অশুদ্ধ মন্তব্য থাকতেই পারে।

ডে ফর নাইট-এর শূটিংয়েও একই ব্যাপার ঘটেছে। ইতালিয়ান অসম্ভব সুন্দরী অভিনেত্রী ভ্যালেন্তিনা কর্তেজ নাটকীয় আক্রোশে মাতলামির অভিনয় করছিলেন। কারণ, তার পুত্র মারা যাচ্ছে কিংবা এ রকম কিছু একটা ঘটছে। এখন কেউ ভাবে না যে, ভ্যালেন্তিনা কর্তেজ শূটিংয়ের সময় সত্যি সত্যি মাতাল ছিলেন! ডে ফর নাইট-এ তরুণ অভিনেতা হিসেবে লিও কাজ করেছে। তার মধ্যে থাকা একটা রোমান্টিক সমস্যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরো শূটকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আর জানেন, কী হয়েছে? এটা থেকে কেউ কেউ ভেবে বসেছে, জাঁ-পিয়েরে লিও নাকি শূটিং শেষ হওয়ার আগেই সেট ছেড়ে যেতে উন্মুখ ছিলো! মানুষের এ রকম প্রতিক্রিয়ায় লিও কষ্ট পেয়েছে। সেটা পরে সে আমাকে বলেছে।

কার্ডুলো : চরিত্রের সঙ্গে সমীকরণ করার প্রক্রিয়া এই মানুষটিকে বারবার দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লৌজ-এ ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তাই না?

ত্রুফো : হ্যাঁ, জ্যাকুলাইন বিসেট কিংবা ভ্যালেন্তিনা কিংবা জাঁ-পিয়েরে অমু্যঁর তুলনায় একই ফিল্মে এটি তার সঙ্গেই বেশি ঘটেছে। একে আপনি জনৈক ফিল্মমেকারের সংরক্ষিত বিজয় বলতে পারেন।

কার্ডুলো : আমি একটা কথা জানি। একবার টিভিতে আঁতোয়ান দোয়ানেল সিরিজের একটা ফিল্ম দেখানোর পরেরদিন আপনি একটা ক্যাফেতে গিয়েছিলেন। ছোট্ট সেই ক্যাফের ওয়েটার এসে আপনাকে বলেছিলো, ‘গতরাতে আপনাকে টিভিতে দেখেছি’। দোয়ানেল হিসেবে সে আপনাকেই শনাক্ত করেছিলো! তাই না?

ত্রুফো : সে আমাকে কফি ঢেলে দিচ্ছিলো আর বলছিলো, ‘ফিল্মটা নিশ্চয়ই অনেক বছর আগে বানানো?’ সে অন্তত বয়সের পার্থক্যটা দেখতে পেয়েছিলো!
কার্ডুলো : সে কিন্তু মিলও দেখেছিলো। ব্যাপারটা যখন ভাবেন, তখন তাজ্জব হয়ে যান না? নাকি বিব্রত হন? নাকি দুটোই?

ত্রুফো : ডে ফর নাইট-এ একটা দৃশ্য আছে লিও আর আমি মুখোমুখি, ক্যামেরার সামনে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে। আজব অনুভূতি ছিলো সেটা আমাদের দু’জনের জন্যই, আর সেটা ছিলো সামান্য কোনো মুহূর্তের চেয়েও অধিক কিছু।

কার্ডুলো : ১৯৫৭ সালে আপনি লিখেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের ফিল্ম হবে আত্মজীবনীর চেয়েও অধিক ব্যক্তিগত; অনেকটা স্টেটমেন্ট Truffaut The Story of Adele Hকিংবা ডায়েরির মতো। তরুণ ফিল্মমেকাররা নিজেদের ঘটনা ফার্স্ট পারসনে বলবে তাদের প্রথম প্রেম, রাজনৈতিক উপলব্ধি, ভ্রমণ, অসুস্থতা এবং এ রকম আরো কিছু। আগামীর ফিল্ম হবে ভালোবাসার এক কৃতকর্ম।’ আজ যদি কেউ ফিল্ম বানাতে চায়, তাহলে কি আপনি তাকে বলবেন, ‘তুমি আমাদের তোমার জীবনের কথা শোনাও। এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিংবা এরচেয়ে ইন্টারেস্টিং আর কিছুই নেই।’ নাকি বলবেন, ‘ইন্ডাস্ট্রি এখন অনেক কঠিন হয়ে গেছে। নিজেতে তাতে খাপ খাইয়ে নাও এবং আমি যা বলেছিলাম তা শুনিও না।’?

ত্রুফো : কথাটা খুব কৌশলে বললেন, মিস্টার কার্ডুলো! তবে ভালোই বলেছেন। আমার বুনো-স্বপ্নের পেছনে আমার ভবিষ্যৎবাণী পূরণ হয়ে গেছে- সেটা আপনি জানেন। ফলে আমি আজ উল্টো কথা বলবো না। কিন্তু আমাকে ‘বলতে’ হবে, ‘তোমাকে যা টানে, তা নিয়েই কাজ করো; তবে খেয়াল রেখো, সেটা যেন অন্যদেরও আকৃষ্ট করে।’

কার্ডুলো : এর মানে কী? আপনার ফিল্ম অন্যদের আকৃষ্ট করবে কি-না, সেটা জানবেন কীভাবে?

ত্রুফো : ১৯৫৭ সালে ঠিক কোন ধরনের ফিল্মের প্রতিক্রিয়ায় এই কথাগুলো লিখেছিলাম, সেটা আমি জানি। আমি এ ধরনের ফিল্মের কথা ভাবছিলাম...! থাক, বাদ দেন। আমি এখন কিছুতেই নেতিবাচক উদাহরণ দিতে চাই না। আমি এখন আর সমালোচক নই। শুধু এটুকু বলবো, আমি কেবল সেই ফিল্মের কথা ভাবছিলাম, যার শুরুর ক্রেডিটে আপনি এই কথাগুলো জুড়ে দিতে পারেন : ‘বাস্তব জীবনের সঙ্গে যেকোনো মিলই প্রকৃত আকস্মিকতা।’ ফিল্মের সবকিছুই মিথ্যে : নারী-পুরুষ সম্পর্ক, মানুষের দেখা হয়ে যাওয়ার রাস্তা, ‘সবকিছুই’।

এই কথা রোবের ব্রেসঁ, জ্যাক বিকার ও ম্যাক্স অফুল্সকে নিয়ে বলছি না আমি। এদের মতো কিছু ফিল্মমেকার আছেন, যাদের আমরা পছন্দ করি। কিন্তু আমি বলছি সেই সব ফিল্ম নিয়ে, পাঁচ-ছয়জন মিলে যার স্ক্রিপ্ট লিখে, একমাস ধরে যার রাজকীয় চিকিৎসা দেওয়া হয় ভার্সেইলসের ট্রায়াননে।

কার্ডুলো : ...কিংবা ফ্রেঞ্চ রিভেরায় শ্যূটের সময়...।

ত্রুফো : ঠিক ধরেছেন। এ ধরনের প্রক্রিয়া আসলে জঘণ্য ফিল্মের জন্ম দেয়। আমরা টিভিতে এখন সচরাচর সেগুলোর দেখা পাই। এই ফিল্মগুলো যে সময়ে বানানো, সেই সময়টা তাদের মধ্যে নেই। সময় তাদের এ রকম নির্দোষ সমজাতীয়তার উপবাস দেয়। ফলে একমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই আরো বেশি পরিমাণে ব্যক্তিগত ফিল্মের ডাক ফিরে ফিরে আসে। ঠিক যেন হ্যালো স্যাডনেস [১৯৫৮]-এর মতো ফিল্ম। ফ্রাঁসোয়া সেগানের টিনএজে লেখা উপন্যাস অবলম্বনে বানানো হয়েছিলো এটি। আমরা বস্তুত এমন ফিল্মই চেয়েছিলাম, কিংবা অন্তত এর কাছাকাছি কিছু। আমি মনে করি, সেটা হয়েছিলো। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যক্তিগতেরও অধিক কিছু হয়ে উঠেছিলো; হয়ে উঠেছিলো আত্মরতিকর। এ ধরনের ফিল্মের নির্মাতারা অতি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতেন। তবে কখনো কখনো কোনো বন্ধুকে দিয়ে স্ক্রিপ্ট পড়িয়ে নিয়ে তারা বেশ লাভবান হয়েছিলেন।

যেমন ধরুন, আত্মজৈবনিক চরিত্র থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের অনেক ফিল্মই সংখ্যায় একের অধিক হয়নি। আঁতোয়ান দোয়ানেল সিরিজে অবশ্যই আমি এমন চরিত্রের অনুসরণ করেছি। তবে কিছু কিছু জায়গায় গিয়ে এরসঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততাকে অনুভব করেছি। এক্ষেত্রে স্টোলেন কিসেস যথার্থ নাম। কারণ, এই ফিল্মেই আমি নিজেকে নানা সাপোর্টিং রোলে জুড়ে দিয়েছি। ফলে আমি ও অন্যরা আত্মনিষ্ঠতা ও আত্ম-অনুসন্ধানের চেয়ে পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লেষণে বেশি জোর দিয়ে ধীরে ধীরে কাহিনীমূলক ধারার দিকে ফিরে এসেছি।

এখন আমাদের দুই ধরনের ফিল্মই আছে। এটা ঠিক যে, সেন্ট-পল-ডি-ভেন্স কিংবা ট্রায়াননে লেখক/স্ক্রিপ্টরাইটার পাঠানোর মতো ক্ষমতাবান প্রডিউসার আর নেই। আর এটা সম্ভবত একটা ভালোদিকই। আজকাল নিজের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে যে তার নিজের মতো করে স্ক্রিপ্ট লিখে এবং এটাকেই যদি সবাই প্রাথমিক চিন্তা হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে সেটা হয়তো ভালো হবে না।

কার্ডুলো : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, মিস্টার ত্রুফো। জানি ব্যাপারটা আপনার জন্য সহজ ছিলো না। আপনি খুবই উদার এবং দয়ালু গৃহস্বামী।

ত্রুফো : আপনাকেও অশেষ ধন্যবাদ। আলাপটা আমার ভালোই লেগেছে। আর আপনার সমালোচক ক্যারিয়ারের জন্য শুভ কামনা রইলো। আচ্ছা, আপনি কি সমালোচকই থাকতে চান?

কার্ডুলো : এখন পর্যন্ত- হ্যাঁ।
ত্রুফো : ফিল্মমেকার হতে না চাইলেও যতোটা সম্ভব ফিল্মমেকিংয়ের কাছাকাছি থাকুন। মানে, আমি বলতে চাচ্ছি, এই ধরুন সেটে যাওয়া, স্ক্রিপ্টে পরামর্শ দেওয়া, টেলিভিশন ধারাবিবরণী, আর এ রকম সাক্ষাৎকার নেওয়া- যেখানে একাডেমিক কোনো বিষয় থাকার দরকার নেই।

এ ধরনের কর্মকা- আপনাকে আরো উন্নত করে তুলবে, কিংবা করে তুলবে আরো পরিপূর্ণ সমালোচক এবং বিশেষত অন্যরা যদি আপনার কাজকে ফলো করে, তাহলে শেষপর্যন্ত সেটা ফিল্মকে কম আত্ম-পরিচালিত করবে আরোবেশি সৎ করবে। আপনার মঙ্গল হোক!

বাংলাদেশ সময় : ১৫০০ ঘণ্টা, মার্চ ১৩, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2011-03-13 04:41:31